তুই আমাকে একটু বকতে পারিস না? একটু চুলটা ধরে তো নাড়িয়ে দিতে পারিস, আমাকে একটু ঘৃণাও তো করতে পারিস! বলেই অদ্রিজা আবিরের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। আবির নির্বিকার। দূরে একটা উড়ে যাওয়া অচেনা পাখির দিকে চোখ তার। অদ্রিজা নিজের শরীরটা দিয়ে একটা হালকা ধাক্কা মেরে বলল— কীরে, বলবি না কিছু?
কোনও প্রেমিকা তার প্রেমিকের কাছে এরকম আবদার করতে পারে, সেটা আবিরের মাথাতেই নেই। বেঞ্চিতে পিছন দিকে হেলান দিয়ে বুকটাকে টান-টান করে অদ্রিজার দিকে এবার দেখল। অদ্রিজা ঈষৎ সামনের দিকে ঝুঁকে ঘাড়টাকে ঘুরিয়ে আবিরের দিকে ঠায় তাকিয়ে রয়েছে। সে এখনও উত্তরের অপেক্ষা করছে। ভারি সমস্যায় পড়ে গেল আবির। ইদানীং এই ধরনের কথাবার্তা বলে আবিরকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয় অদ্রিজা। তার এইসব কথার কোনও অর্থ খুঁজে পায় না সে।
আসলে প্রায় আড়াই বছর প্রেম করার পর দু’জনের সম্পর্কের মধ্যে যেন একটা ছোটো হাইফেন তৈরি হয়েছে। অদ্রিজার প্রতি আবিরের যে গভীর প্রেম, সেটাই যেন অদ্রিজার গায়ে ফোস্কা ফেলে দিচ্ছে। সে যেন ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে প্রতিদিন। দিন দিন তার অভিযোগ বেড়েই চলেছে।
আবির এ অসুখের চিকিৎসা জানে না। অদ্রিজা বলেছিল— আমার সব কথা তুই মেনে নিস কেন? আমি কি কোনও ভুল বলতে পারি না?
এটা অবশ্য প্রথম থেকেই হয়ে আসছে। অদ্রিজার কোনও কিছুতেই আবির দ্বিমত পোষণ করেনি। তার প্রতিটা সিদ্ধান্ত চোখ-কান বুজে সে মেনে নিয়েছে। মনে মনে ভেবেছে তাতে অদ্রিজা খুশি হবে। আনন্দ পাবে। সে ঘুণাক্ষরেও বোঝেনি, এটা শেষ পর্যন্ত অদ্রিজাকেই বিব্রত করবে।
কলেজ পিকনিকের সময় অদ্রিজা রেগে গিয়েছিল আবিরের উপর। কারণটা তেমন গুরুতর কিছু নয়। অন্যরা গাড়িতে গেলেও আবির নিজের বাইকে অদ্রিজাকে নিয়ে গিয়েছিল পিকনিকে। জায়গাটা ঠিকঠাক জানা ছিল না বলে অনেকটা সময় লেগে গিয়েছিল স্পটে পৌঁছাতে। তাতে অদ্রিজার কী রাগ! যাচ্ছেতাই কথা বলেছিল আবিরকে। কিন্তু আবির কোনও কথা বলেনি। অদ্রিজার উপর রেগে যাওয়া তো দূরের কথা, মাথা নিচু করে শুনে গেছিল সবটা। অদ্রিজার এইরকম আচরণ অনেকেই মানতে পারেনি। অনীত আর ঋতা তো যা-তা বলেছিল অদ্রিজাকে। সেদিন সে আবিরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারেনি। সারারাত বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল। মনে মনে ভেবেছিল— আবির কেন তাকে বকল না একবারও? কেন তাকে একটা চড় মারল না? তাহলে তো অন্তত এত কষ্ট তাকে পেতে হতো না।
এটাই একমাত্র নয়। গত সরস্বতী পুজোয় বন্ধু অনিমেষের বাড়ি গিয়েছিল সে। সেটা সে বেমালুম চেপে গিয়েছিল আবিরের কাছে। বলেছিল সরস্বতী পুজোতে মাসির বাড়িতে থাকবে। অনিমেষের বাড়িতে পুজো হয়। ঘরোয়া পুজো। তেমন কাউকে বলেনি। কিন্তু অদ্রিজাকে বলেছিল। আবির জেনেছিল অনেক পরে। কিন্তু কোনও কথা বলেনি। কৈফিয়তও চায়নি। এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনার পর শুধু সত্যিটা জানতে চেয়েছিল। অদ্রিজা মাথা নেড়ে বলেছিল— হ্যাঁ, সে অনিমেষের বাড়ি গিয়েছিল। আশা করেছিল সে, এই কথা শোনার পর আবির নিশ্চয়ই তাকে খুব বকবে। কিন্তু তা তো হল না। কেন? কেন তাকে কিছু বলল না আবির?
বেশ কিছুদিন দেখা হয়নি আবিরের সঙ্গে অদ্রিজার। কয়েকবার ফোন করেছিল আবির। ফোন বেজে গেছে। অবশেষে কোনও এক রাতে অদ্রিজার ফোন এল তার কাছে। ধরা গলায় বলল— তুই আমাকে ভুলে যা না প্লিজ!
এ কথার মানে বুঝতে পারে না আবির। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের তারা খসা দেখতে দেখতে বলল— এর মানে?
—তোকে আমি ছাড়তে চাই। তুই আমাকে ছেড়ে দে না!
আবির ভাবে ব্যাপারটা কত সহজ! পোশাক পরার মতো। পরা আর খুলে ফেলা। কত সহজ! চোখে জল এসে গেছিল। বলল— কারণটা যদি বলিস তাহলে অন্তত আক্ষেপ থাকবে না।
অদ্রিজা চুপ করে থাকে। কী করে বলবে সে! এভাবে কি বলা যায়?
আবির আবার জানতে চাইল। কিন্তু অদ্রিজা কিছু বলছে না। আসলে বলতে পারছে না। আবির যেন বুঝতে পেরেছে। বলল— কাল আমরা দেখা করব। আসিস প্লিজ। অন্তত একবারটি আসিস।
আবিরের মেস ফাঁকা। পরীক্ষা শেষ। সবাই বাড়ি চলে গিয়েছে। একটা ঘরে তিনটি চৌকি পাতা কোনও বেডিং নেই। গোটানো। তার একটাতে বসল অদ্রিজা। আবির একটা চেয়ারে বসল। অদ্রিজা যেন তাকাতে পারছে না আবিরের দিকে। জানলা দেখছে, ক্যালেন্ডার দেখছে, আয়না দেখছে। আবিরকে যেন দেখতেই পাচ্ছে না।
আবির বলল— বল, তুই কী বলছিলিস! বলেই অদ্রিজার দিকে তাকিয়ে থাকল আবির। অদ্রিজা যেন বোবা হয়ে গেল। কীভাবে বলবে সে!
আবির চেয়ার থেকে উঠে এসে অদ্রিজার পাশে বসল। এতদিন কোনও কিছু মনে হয়নি। আজ কিন্তু অদ্রিজার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। এর আগে এই মেসে এসেছে সে। মেসের ছেলেরা কেউ না থাকলে ওরা উদ্দাম প্রেমও করেছে। আজ আবির কী ভাবছে? অদ্রিজা ঠাওর করার চেষ্টা করল।
আবির আচমকাই অদ্রিজার ঘাড়ের কাছে কামড়ে দিল। কানের লতিতে দাঁত বসাল। অদ্রিজা যেন শিউরে উঠল। বলল – প্লিজ আমাকে দুর্বল করে দিস না।
(ক্রমশ…)





