হঠাৎ সেদিন আমার সমস্ত হিসেবনিকেশ উলটে গেল। একটু আগে থেকেই শুরু করি। সেই গতবারের মতো এবছরও মদন তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মঞ্চে উঠল। যথারীতি সেই অশ্রাব্য সংগীত পরিবেশনের উদ্দেশ্যে। হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিল বিজন। মদন কুশ্রী আঙ্গিক কসরতের সঙ্গে জগঝম্প আওয়াজ সহযোগে যে গান শুরু করল, তা মেশিনগানের থেকেও ভয়ংকর। হঠাৎ কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মঞ্চে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক অদ্ভুত আলোর ঝলকানি। একটা বিকট শব্দ। শর্ট সার্কিট। মঞ্চ অন্ধকার। ঘুটঘুটে। চারিদিকে হই হই। লোকজনের ছুটোছুটি। না পারছি কিছু দেখতে, না বুঝতে। দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টের আলো ঠিকরে এসে পড়ছে সরু হয়ে। তাতে আসল কিছু ঠাহর করা না গেলেও, দেখছি শুধু কিছু ছায়ামূর্তির দৌড়াদৌড়ি।

আমিও কিছু না বুঝেই একটু আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আসলে অজানা ভয়-ও তো একটা আতঙ্ক! আমি অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে একটু দূরে পিছিয়েই গেলাম। যেহেতু পাড়ায় কম মেলামেশা করার জন্য আমি প্রায় কাউকেই চিনি না, তাই জিজ্ঞেস করতেও ইতস্তত করছি। হঠাৎ একটা ছেলেকে দেখলাম ওদিকে দৌড়ে যাচ্ছে। মনে হল যেন মুখটা অল্প চেনা। তবে নাম জানি না। কী বলে ডাকব, বুঝতে পারছি না! শেষে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম। ডাক দিলাম, ‘ভাই শুনছ…, কী হয়েছে ভাই?’

—আর বলবেন না কাকা! পাঁচটা বডি। স্পট ডেড। মদনদা আর নেই।

—নেই মানে…!

–একেবারে ফিনিশ!

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই প্রথম জীবনে পারিপার্শ্বিক ব্যাপারে নাক গলাবার একটা আগ্রহ ভিতর থেকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। আমি আবার ধীর পায়ে মঞ্চের সামনে ভিড়ের দিকে এগোতে লাগলাম। সবে দু-চার পা এগিয়েছি, ঠিক তখনই কানে একটা ঘণ্টার আওয়াজ। আন্দাজেই বুঝলাম দমকল। একদম সঠিক ভাবনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই দমকলের গাড়ি এসে হাজির। তার পিছনেই বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার গাড়ি। অন্য সময় হলে, আমি পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার মানুষ। কিন্তু সেদিন যেন মন বলল, গল্পের রসদ আছে। দাঁড়িয়ে গেলাম। দমকলের সার্চলাইট জ্বলে উঠল। সেই আলোয় যা দেখলাম, তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ!

আলো-আঁধারিতে দেখি, একটা ছোটো লাশের পাহাড়। ইলেকট্রিকের তার পেঁচিয়ে পড়ে আছে মঞ্চের উপর। সবকটাই অল্পবয়সি। ফ্যাকাশে। ভালো করে ঠাহর করলাম, দেখলাম সংখ্যায় পাঁচজন। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার কর্মীরা এসে লাইন অফ করল। ইতিমধ্যে পুলিশও চলে এসেছে। চ্যাংদোলা করে সব বড়িগুলো তোলা হচ্ছে একটা জিপে। একদম শেষের বডিটা হালকা চিনতে পারলাম৷ মনে হল মদন। আমার হাত-পা কাঁপছে। মাথায় কিছু ঢুকছে না। বডিগুলো চলে যাওয়ার পর, আলোচনায় কান পাতলাম। খোঁজ করতে লাগলাম ঘটনার সূত্রপাত।

সারা মঞ্চে নাকি আলো আর শব্দ ব্যবস্থার প্রচুর তার ছড়িয়ে ছিল। মঞ্চের দুদিকে ছিল দুটো বড়ো স্ট্যান্ড ফ্যান। সিলিং ফ্যান এবারে আর রাখা হয়নি গত বছরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার জন্য। মদনের হাতেও ছিল মাইক্রোফোন। সেটার তার-ও লুটিয়ে ছিল মদনেরই পায়ের কাছে। কোনও একটা তারে নাকি জড়িয়ে যায় মদনের পা। যেটায় কারেন্ট ছিল। মানে বিদ্যুৎ আটকানোর জন্য তারের যে ইনস্যুলেশন থাকে, তা ফাটা বা খোলা ছিল। যার ফলেই তড়িতাহত হয়েছিল হয়তো মদন। এবার আচমকা মদন কারেন্ট খেয়ে পড়ে যাওয়ায়, ওর কাছের বন্ধুরা হতচকিত হয়ে যায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে মদনের উপর। সবক’টাই জড়িয়ে যায় বিদ্যুতের নাগপাশে। তখন বাকি সবাই কারণটা বুঝে যায়। আর কেউ ওদিকে এগোয় না। লাশ হয়ে পড়ে থাকে মদন আর তার চার বন্ধু। তবুও মনে একটা খচখচ থেকেই গেল। এটা কি দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত খুন? ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই থতমত। তাই বিজনকে গণধোলাই দেবে কে? কিন্তু এবারে তো আর আধমরা করে ছাড়বে না ওকে, একেবারে পিটিয়ে মেরেই ফেলবে। কিন্তু বিজন কোথায়?

এবার বিজনের খোঁজ শুরু হল। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বিজনকে। সেইদিন সারারাত বিজনকে অনেক খোঁজা হল। বিজনের টিকিটাও কোথাও পাওয়া গেল না। প্রাণভয়েই নিশ্চয় কোথাও পালিয়ে গেছে ব্যাটা। সেটাই স্বাভাবিক। শুধুই কি মার খাওয়ার ভয়ে নাকি অন্য কোনও কারণ। পুলিশ অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা দায়ের করল বটে। তবে বিজন ফেরার। একটা জিনিস আমি খেয়াল করলাম, পাড়ায় সবাই ঘটনাটা দুঃখজনক হিসেবে আলোচনা করলেও মনের ভিতরের একটা চাপা খুশি চোখেমুখে ফুটে উঠছে সকলের। আসলে পাড়ায় যে অসহ্য দৌরাত্ম্য করে বেড়াত মদন ও তার শাগরেদরা, তার থেকে বোধহয় মুক্তি পেল আপামর জনসাধারণ।

এরপর বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। সামান্য হলেও ধামাচাপা পড়ে গেছে ঘটনাটা। খুব সম্ভবত সেদিন রবিবার ছিল। আমি প্রতি রবিবারের মতোই গণশার চায়ের দোকানে গিয়ে একটু বসলাম। এক কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। সবে চায়ে একটা চুমুক দিয়েছি, গণশাই কথাটা পাড়ল, কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেল, বলুন তো স্যার!

—কোন ঘটনাটার কথা বলছ? ওই অনুষ্ঠানের দিনের দুর্ঘটনার ব্যাপারটা?

—হ্যাঁ, আপনি ওটাকে দুর্ঘটনা মনে করেন?

—তাইতো মনে হয়।

—কী বলছেন স্যার! মা মরা মেয়েটা ওইভাবে আত্মহত্যা করল, আর বাপ হয়ে ও ছেড়ে দেবে?

—কার কথা বলছ? সে তো রুমকি! তার সঙ্গে বিজনের কী সম্পর্ক?

–কেন? আপনি জানেন না স্যার! রুমকি তো বিজনেরই মেয়ে। কত কষ্ট করে মেয়েটাকে কলেজে পড়াত। খুব স্বপ্ন দেখত মেয়েকে নিয়ে!

—তুমি তো এতদিন বলোনি যে, বিজন রুমকির বাবা!

—সেটা আবার বলার কী আছে! সবাই জানে তো। আমি ভেবেছি, আপনিও জানেন৷

—না গো, আমি জানতাম না।

দেখলাম, বেখেয়ালে পুরো চা-টাই গেলাস থেকে পড়ে গেছে কাৎ হয়ে। আর এক কাপ চা দিতে বললাম গণশাকে। আকাশের দিকে তাকালাম। একটা ছোট্ট মেঘ এসে সূর্যটাকে ঢেকেছে। হয়তো কয়েক মুহূর্ত থাকবে এই ছায়াটা। তারপর আবার সেই, যা ছিল তাই। গনগনে জ্যৈষ্ঠের রোদ। এত বড়ো সূর্য! এত তার তেজ! তবুও এই ছোট্ট মেঘটা পারল তো কিছুক্ষণের জন্য হলেও তাকে ঢেকে দিতে। আসলে সবই হয়তো পারা যায়! শুধু ঠিকঠাক ভাবে নিজেকে সঠিক জায়গায় মেলে ধরতে হয়। আমরা ক’জনই বা সেটা পারি? তবে বিজন পারল। প্রণাম। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা, দয়া করে এরকম বিজনদের পাঠিও মাঝেমধ্যে এই পৃথিবীতে। এই কলুষিত সমাজকে কিছুটা হলেও সুনির্মল রাখার জন্য।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...