গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি), যা সাধারণত অ্যাসিড রিফ্লাক্স নামে পরিচিত, তখন ঘটে, যখন পেটের উপাদান খাদ্যনালীতে পিছনের দিকে প্রবাহিত হয়। যার ফলে বুক জ্বালাপোড়া, বুকে অস্বস্তি এবং কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা স্বরভঙ্গ হয়। এটি ঘটে কারণ নিম্ন খাদ্যনালী স্ফিঙ্কটার (এলইএস) এমন একটি অংশ, যা সাধারণত খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে অবস্থিত পেশির একটি বলয়, যা প্রধানত খাদ্যনালীতে পাকস্থলীর অ্যাসিডের ব্যাক ফ্লো বা রিফ্লাক্স প্রতিরোধ করে। এটি খাবার গিলে ফেলার সময় খাবারকে পাকস্থলীতে যেতে সাহায্য করে। কিন্তু বাকি সময় বন্ধ থেকে পাকস্থলীর অ্যাসিড ও পাচক রসকে খাদ্যনালীতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। অর্থাৎ, এটি ভালভের মতো কাজ করে। কিন্তু এটি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে বা শিথিল হয়ে যায়, তখন বারবার অ্যাসিড সৃষ্টি হয়ে খাদ্যনালীতে জ্বালাপোড়া করতে পারে। যদি চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে ক্রমাগত রিফ্লাক্স প্রদাহ (খাদ্যনালীতে প্রদাহ), আলসার এবং বিরল ক্ষেত্রে ব্যারেটের খাদ্যনালী নামে পরিচিত অংশে ক্যান্সার-পূর্ব পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বব্যাপী GERD-র প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক মেটা-বিশ্লেষণ অনুসারে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ-এ (জিইআরডি) আক্রান্ত। ভারতে, গবেষণায় দেখা গেছে যে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে এই রোগের প্রকোপ বেশি এবং কিছু অঞ্চলে প্রায় আট শতাংশ। অর্থাৎ, শহরাঞ্চলে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ-এর এই বর্ধিত হার আসলে জীবনযাত্রার পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। কলকাতার ইএম বাইপাস এবং মুকুন্দুপুরের মণিপাল হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের পরিচালক ডা. প্রদীপ্ত শেঠির মতে, জিইআরডি-তে বেশি আক্রান্ত হন মহিলারা, যাদের বেশিরভাগই ৩০-৫৫ বছর বয়সি প্রি-মেনোপজাল এবং মেনোপজাল। এই বৃদ্ধির জন্য অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং পরিবেশগত কারণ দায়ী।

খাদ্যাভ্যাসের কু-পরিবর্তনই এর অন্যতম প্রধান কারণ। ফাইবারজাতীয় খাবারের পরিবর্তে, ক্রমশ উচ্চ-ক্যালোরি, প্রক্রিয়াজাত উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, মশলাদার এবং ভাজা খাবার খাওয়ার ফলে এই ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এই খাবারগুলি গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে, যার ফলে রিফ্লাক্সের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়াও, খাবার খাওয়ার পরপরই শুয়ে থাকা এবং দেরিতে খাবার খাওয়া শহুরে পরিবেশে সাধারণ, যা রিফ্লাক্সের ঘটনাগুলিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

স্থূলতা এবং বসে থাকা জীবনযাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। অতিরিক্ত পেটের চর্বি পাকস্থলীর উপর চাপ বাড়ায়, যা খাদ্যনালীতে অ্যাসিডকে উপরের দিকে ঠেলে দেয়। ভারত এবং বিশ্বব্যাপী GERD আক্রান্ত অনেক প্রাপ্তবয়স্কের ওজন বেশি বা স্থূলতা রয়েছে, যা শারীরিক কার্যকলাপ হ্রাসের পাশাপাশি, জিইআরডি-র কবলে ফেলছে। আধুনিক কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত মানসিক চাপ এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস অতিরিক্ত ক্ষতি করছে। সেইসঙ্গে, অতিরিক্ত ক্যাফেইন কিংবা অ্যালকোহল ব্যবহারের মতো অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, অ্যাসিড রিফ্লাক্সকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

পরামর্শ

জীবনযাত্রার সহজ পরিবর্তনের মাধ্যমে GERD কার্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অতএব, কম মাত্রায় খাবার খান, খিদে পেলে তবেই খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। সাইট্রাস ফল, চকোলেট, ক্যাফেইন এবং উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবারের মতো পরিচিত ট্রিগার খাবার এড়িয়ে চলা রিফ্লাক্সের ঘটনা কমাতে পারে। খাওয়ার পর ২-৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শুতে যাওয়া এবং ঘুমের সময় বিছানার নরম বালিশকে মাধ্যম করে মাথা উঁচু করে রাখার মাধ্যমে এই সমস্যা এড়ানো যেতে পারে। এছাড়া, নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা পেটের চাপ কমায়। অন্যদিকে, ধূমপান ত্যাগ করে এবং অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত করে কিংবা বন্ধ করে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ এড়ানো যায়। তাই, ধ্যান বা যোগব্যায়ামের মতো কৌশলগুলির মাধ্যমে হজমশক্তি বাড়ানোর ব্যবস্থাও করতে হবে।

আসলে, ভারতে GERD-এর সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে মূলত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, স্থূলতা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার চাপের কারণে। অতএব, জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা দূর করে দীর্ঘমেয়াদী হজম স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো যেতে পারে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...