অবশেষে কথা হল। অনিমেষ জানাল – আসবে, তবে আধা ঘণ্টা লেট হবে। কাজের চাপ আছে। আধাঘণ্টা কোনও ব্যাপার নয় সেটা অদ্রিজা জানে। কিন্তু এই আধাঘণ্টা যদি কয়েক ঘণ্টা হয়ে যায়!
সাড়ে সাতটাতেও বাবুর পাত্তাই নেই। অদ্রিজা সাজুগুজু করে বসে আছে। গলায় নেকলেসটা পরে নিয়েছে। খোঁপায় ফুলের মালা জড়ানোও হয়ে গিয়েছে। একবার ঘড়ি দেখছে, একবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। এরপর আরও দু’বার ফোন করা হয়ে গেছে। ‘একটু দেরি হবে’ বলে কাটিয়ে দিল আরও এক ঘণ্টা। খুব রাগ হচ্ছিল অদ্রিজার। মনে হয়েছিল যাবেই না আর। কিন্তু অনিমেষ নিজের থেকে ফোন করে বলল— প্লিজ তুমি একা চলে যাও। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই সরাসরি বিয়ে বাড়িতে গিয়ে ঢুকব।
অদ্রিজা প্রথমে মানতে চায়নি। কিন্তু না গেলে অঞ্জলি কাকিমা কী মনে করবেন ভেবে বেরোতেই হল। অঞ্জলি কাকিমার ছোটো মেয়ে আদুরির বিয়ে। ঠিক একটা বাড়ির পর ওদের বাড়ি। একেবারে না গেলে অঞ্জলি কাকিমা খুব দুঃখ পাবেন। অবশ্য বিয়ের অনুষ্ঠানটা একটু দূরে হচ্ছে। একটা ম্যারেজ হল ভাড়া করা হয়েছে। অদ্রিজা গুটিগুটি পায়ে সেখানে পৌঁছাল। একা একা যেতে খারাপই লাগছিল। তবে এটা প্রথম নয়। গত পাঁচ বছরে বহুবার এরকম হয়েছে।
অঞ্জলি কাকিমা অদ্রিজাকে দেখে বেশ গদগদ হলেন। অনিমেষের খোঁজ নিলেন। তারপর নানা ব্যস্ততার মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। বিয়ে বাড়িতে অঞ্জলি কাকিমাদের পরিবারের দু’চারজন ছাড়া কেউই অদ্রিজার চেনা নয়। একবার বিয়ের আসরে গেল সে। খুব ভিড়। ঠেলাঠেলি চলছে। অঞ্জলি উঁকি মেরে আদুরিকে দেখল। কী সুন্দর লাগছে তাকে। তবে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোই গেল না৷
একটা কোল্ডড্রিংকের গেলাস হাতে নিয়ে সোফায় বসল সে। ঘড়ি দেখল। অনিমেষ কি আদৌ আসবে? কী জানি! অদ্রিজার আর ফোন করতে ইচ্ছে করল না।
সোফায় তার পাশে এসে বসল এক মহিলা। বয়স তার মতোই হবে। অদ্রিজার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ দেখছিল। সে বলল – একা? অঞ্জলি আন্টির কেউ হন?
অদ্রিজা কথা বলার একজন লোক পেয়ে একটু কাছে সরে গেল।
অদ্রিজা নিজের ক্ষোভের কথা বলেই ফেলল। বলল – দেখুন না, আমার বর আসব বলেও এখনও এল না। একা একা ভীষণ বোকা-বোকা লাগছিল। ভাগ্যিস আপনি ছিলেন। তাই দুটো কথা বলতে পারছি।
মহিলা বেশ মিশুকে। নিজের থেকেই অনেক গল্প শুরু করল। নিজের সংসারের কথা, নিজের বরের কথাও বাদ দিল না। বলল— আমার বরটা আবার উলটো। আমাকে ছাড়া যেন চলেই না। সারাদিন সুযোগ পেলেই আমার পিছন পিছন শুধু ঘুর ঘুর করবে।
—আপনার বর তো তাহলে আপনার কথা খুব শোনে!
—শোনে মানে! যা বলব তাই করবে। আমি যদি ডানদিকে যেতে বলি তো ডানদিকে যাবে। উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে। তবে খারাপ লাগে না ভাই। এরকম ক’জনেরই হয়!
অদ্রিজা মহিলাকে ভালো করে একবার দেখে নিল। মহিলাকে দেখে বেশ খুশি খুশি মনে হল। অনেকক্ষণ ধরে একটা প্রশ্ন উঁকি মারছিল তার মনে। বলেই ফেলল— তা আপনার বরকে দেখছি না তো! আসেনি?
—আর বলবেন না! নতুন জুতো পরে আমার পায়ে ফোসকা পড়েছে। তা দেখে সে গেল ওষুধের দোকানে। কিছু একটা লাগাতে হবে! আমি অবশ্য বারণ করেছিলাম। কিন্তু কে শোনে কার কথা। কাছাকাছি তো কোনও ওষুধের দোকানও নেই। কোথায় গেল কে জানে!
অদ্রিজা আড়চোখে একবার মহিলার পায়ের দিকে তাকাল। একটু ছড়ে গেছে বটে! কিন্তু তেমন গুরুতর কিছু মনে হল না। মহিলার স্বামী যে মহিলাকে খুব ভালোবাসে, সেটা ভালোই বুঝল অদ্রিজা। মনের মধ্যে হঠাৎ যেন আবিরের কথা মনে হল। আবির অনেকটা এরকমই ছিল। অদ্রিজার এই কয়েক বছরের বিবাহিত জীবনে আবিরের কথা যে মনে পড়েনি তা নয়, মাঝে মাঝে বিভিন্ন ঘটনায় সে যেন মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায়। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাঁদের মতো, বিশেষকরে অনিমেষ যখন খুব অবহেলা করে তাকে। তখন আবিরের মুখটা ভেসে ওঠে। সে এখন কোথায়? কী করছে?
কিছুটা উদাস হয়ে গেছিল। এই সময় প্রচুর লোকের আনাগোনা দেখে বোঝা গেল, বরযাত্রীরা সব চলে এসেছে। অদ্রিজা ঘড়ি দেখল। প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে।
ভদ্রমহিলা অদ্রিজার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল— আপনি বরং খেয়ে নিন। আপনার বর বোধহয় আসবে না। কোনও কাজে হয়তো আটকে পড়েছে।
অদ্রিজা জানে, কাজ না ছাই! হয় কোনও বারে গিয়ে মদ খাচ্ছে, আর না হলে এরিনা, মিতিনদের সঙ্গে আড্ডা মারছে। এই ক’বছরে কম তো দেখল না। কথায় কথায় অদ্রিজা ওনাকে জিজ্ঞাসা করল— আপনারা থাকেন কোথায়?
ভদ্রমহিলা যে-জায়গা এবং যে-পাড়ার কথা বলল, সেটা খুব চেনা চেনা লাগল অদ্রিজার। মনে হয় যেন গিয়েছে অনেকবার। হ্যাঁ, ওই পাড়াতেই তো আবিরের আদি বাড়ি ছিল। একটা অন্যরকম সন্দেহ মনের মধ্যে জমা হতে লাগল তার। একবার ভাবল মহিলাকে ওনার বরের নামটা জিজ্ঞাসা করবে। তারপর ভাবল, সেটা ভালো দেখায় না। তাছাড়া উনি তো এখনই আসবেন, তখন তো দেখাই যাবে।
অঞ্জলি কাকিমা একবার এসে খেতে বলে গেলেন। নতুন আরেকটা ব্যাচ শুরু হয়েছে। এরপর দেরি করলে অনেক রাত হয়ে যাবে। তবে অদ্রিজা গেল না। ও মহিলার পাশেই বসে থাকল। তার সন্দেহটা সত্যি কিনা সে দেখতে চায়।
মহিলা উশখুশ করছিল। তাকিয়ে ছিল গেটের দিকে। অদ্রিজাও গেটের দিকে তাকিয়ে। না, অনিমেষের জন্য নয়। অন্য কারোর জন্য। মহিলা গেটের কাছে এগিয়ে গেল। সম্ভবত ওনার স্বামী চলে এসেছেন। তবে এতটা দূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। পিছন ফিরে আছে। তার উপর গেটের কাছে প্রচুর মানুষের ভিড়। অদ্রিজা সোফা থেকে উঠে একটু এগিয়ে গেল।
নীল রঙের টি-শার্ট আর জিন্স পরে দাঁড়িয়ে আছেন মহিলার স্বামী। দু’জনে কী সব কথা বলে হাসল এক চোট। তারপর মহিলা পাশের একটা সোফায় এসে বসল। অদ্রিজা দেখল, ভদ্রলোক এগিয়ে এসে হাঁটু মুড়ে বসে মহিলার পায়ে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে।
তবে সে আবির নয়। আবিরের মতোই কেউ…
(সমাপ্ত)





