মাতৃত্ব একটা বড়ো দায়িত্ব। শিশুর জন্মের আগে থেকে, অর্থাৎ গর্ভাবস্থা থেকেই প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত মা-কে সজাগ থাকতে হয়। মা হতে কতটা কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে অথবা মা হওয়ার পর কতটা ওজন গেন করেছেন, হার্ডলি কোনও মা সেই খেয়াল রাখেন। দৈনন্দিন সাংসারিক কাজের চাপ ভুলে, সন্তানকে কীভাবে চলনে-বলনে, বুদ্ধিতে ক্ষুরধার করে তোলা যায়, সেই চিন্তাতেই মায়েরা বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
পাড়ার জিম অথবা প্রসারি শপ অথবা বাচ্চাকে নিয়ে পার্কে গিয়ে নিজেও একটু দৌড়ে নিতে গিয়ে অন্যান্য বাচ্চার মায়েদের মধ্যে একটাই আলোচনা কানে আসে, সবাই সবার বাচ্চাকে কী শেখাচ্ছে, কীভাবে তৈরি করছে, যাতে স্কুলে গিয়ে শিশুটি নিজেকে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে এযুগের শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতার সঙ্গে। স্কুলে ভর্তি হবে এমন বাচ্চা যদি শুধু অ্যালফাবেট্স, নাম্বাস, শেস এবং কালারস শেখে, তাহলে ধরে নেওয়া হয় এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাই, সন্তান হলেই মা-বাবার চিন্তা হয় যে, তাদের সন্তান ‘গিফটেড চাইল্ড’ কিনা। দুশ্চিন্তার বিষয় হয় তখন, যখন মা-বাবার কাছে সন্তান এক্সপেরিমেন্টের স্যাম্পল হয়ে যায়।
ব্যস্ত মায়েরা বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করার আগেই ভিডিও গেম্স কিংবা ব্রেন গেম্স-এ বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখতে চান এই ভেবে যে, এতে বাচ্চার থিংকিং প্রসেস-টা কুইক হবে এবং আধুনিক জীবনের চাহিদাগুলোর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু ভিডিও গেম্স-এর মাধ্যমে বাচ্চা যেটা অ্যাচিভ করতে পারছে, ভবিষ্যতে বাস্তবে দাঁড়িয়ে সেই অ্যাচিভমেন্ট পেতে যদি সে সক্ষম না হয় তাহলে? বুদ্ধি খাটিয়ে গেম্স জেতাটা হয়তো সহজ, কিন্তু বাস্তবে প্রতিযোগিতার প্ল্যাটফর্ম অতটা সহজ নয়।
অনেক অভিভাবকই গর্ব অনুভব করেন যখন তাদের ‘ছোট্ট সোনা’ নতুন ভিডিও গেম্স সম্পর্কে সব কারসাজি আয়ত্ত করে ফেলে এবং অন্যকেও অনায়াসে বুঝিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এটা বুঝুন যে, এইসব ভায়োলেন্ট ভিডিও গেমসগুলি বাচ্চার স্বাভাবিক নিজস্ব সত্তাটাকে চেপে রেখে বাচ্চাকেও ভায়োলেন্ট করে তুলতে পারে।
বাচ্চাদের কীভাবে মানুষ করবেন, কোন ধরনের পেশায় গেলে তারা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে – এসব নিয়ে মা-বাবা আজকাল অতিরিক্ত মাথা ঘামান। টিভি দেখতে দেখতে পলিটিক্যাল খবর যদি বাচ্চা বন্ধ করে দেওয়ার জেদ ধরে, মা-বাবা ধরে নেন তাদের সন্তান রাজনীতি অপছন্দ করে। সার্কাসের ক্লাউন দেখে বাচ্চাকে হাসিতে গড়িয়ে পড়তে দেখলে মা-বাবা ধরেই নেন, যাক, আর যাই হোক আমার সন্তান সার্কাসের ক্লাউন কোনওদিন হবে না। কিন্তু একটা ওইটুকু বাচ্চা কী বুঝবে ভোটে জেতার লড়াইটাই বা কী, অথবা আর্থিক মন্দাই বা কী অথবা সিনেমার পর্দায় হৃতিক রোশন, মাধুরীর মতো প্রশিক্ষিত ডান্সারদের হারাতে পারার অর্থই বা কী? অতএব, ভাবুন অন্য ভাবে এবং ওদের শিক্ষার শুরু হোক সঠিক ভাবে।
আরও বেশি সময় দিন ওদেরকে
বাচ্চাকে ট্যাব বা আইপ্যাড অথবা ল্যাপটপ দিয়ে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে, সঙ্গে টিভির অপশন দিয়ে রাখাটা, কোনও কিছু শেখানোর রাস্তা হতে পারে না। এগুলোর সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাচ্চা কাটিয়ে দিতে পারে, কিন্তু এর আলটিমেট রেজাল্ট খুব আশাতীত নয়। এতে বাচ্চা অলসও হয়ে ওঠে। বাচ্চাদের বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত। ফড়িং অথবা প্রজাপতি দেখতে পেলে বাচ্চাদের দেখান এবং ছোটাছুটি করে ফড়িং, প্রজাপতি ধরাটা যে একটা মজা, সেটা বাচ্চাদের বুঝিয়ে বলুন। প্রজাপতির পিছনে ছুটে ছুটে বাচ্চাদের ধৈর্য, একাগ্রতা যেমন বাড়বে, তেমনই অধ্যবসায়ও বাড়বে এবং সবকিছু চিনতে শিখবে। বাচ্চারা যেগুলো করতে পছন্দ করে না, সেগুলোও অভিভাবকেরা বাচ্চাদের দিয়ে করাতে চাইলে ওদের বুঝিয়ে বলতে হবে ভবিষ্যতে টিকে থাকার দৌড়ে ওইগুলো ওদের সাহায্যই করবে।
বাচ্চারা যদি কিছু সময়ের জন্য বসে কোনও খেলা খেলতে চায় তাহলে অভিভাবকেরাও বাচ্চাকে এনকারেজ করার জন্য বাচ্চার সঙ্গে বসে খেলায় যোগ দিতে পারেন। কিন্তু তাই বলে খেলতে খেলতে বাচ্চার খেলার ইচ্ছা চলে গেলে তাই নিয়ে বড়োদের ডিসহার্টেন হওয়ারও কোনও মানে নেই। খেলায় ওদের সাময়িক আগ্রহ না থাকলে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, ওরা শেখার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছে।
স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই বাচ্চাদের জন্য আলাদা বইয়ের তাক অথবা আলমারি থাকাটা কিন্তু দোষের নয়। সেখানে নামীদামি লেখকদের লেখা বাচ্চাদের বইও রাখা যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে ওই বইগুলোতে থাকা অক্ষরগুলোও বাচ্চার মুখস্থ থাকবে এটা ভাবাটা বাচ্চার উপর প্রেশার তৈরি করা। খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চার শখের রংবেরঙের বইয়ের তাকটি যেন শব্দকোশের ভারে ভেঙে না পড়ে৷
শিক্ষা দেওয়ার উপায়
‘A’ গ্রেড পাওয়া মানেই যে বাচ্চা ভবিষ্যতে খুব বড়ো জয় হাসিল করবে এমন ভেবে নেওয়া একেবারেই ঠিক নয়। বইয়ের নিয়ম মেনে বাচ্চাকে কিছু শেখাতে চাইলে, মা-বাবার সঙ্গে প্রয়োজনীয় বন্ডিং-টা ঠিকমতো গড়ে নাও উঠতে পারে, এমনকী জীবনের কিছু ভালো দিক বাচ্চা এনজয় করতে পারে না। কেজির গণ্ডি পার করার পর বাচ্চার হয়তো ইচ্ছে হল ডায়ারির পাতায় কিছু হিজিবিজি লিখে রাখার। ডায়ারির পাতার হিজিবিজিটা অবশ্যই হতে পারে মা-বাবার সঙ্গে কাটানো এক-একটা আনন্দের ঘটনা নিয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে পার্কে খেলায় মেতে ওঠা নিয়ে, গান-বাজনা, মায়ের হাতের রান্না করা প্রিয় খাবার নিয়ে, রাত্রে শুয়ে শুয়ে মায়ের মুখে শোনা গল্প নিয়ে, দাদু-ঠাকুমাকে নিয়ে, নিজের দেখা স্বপ্নগুলো নিয়ে। ছোট্ট সোনার হাতের লেখায় বানান ভুল হলে, তা ঠিক করে ওকে শেখান সঠিক বানান।
বাচ্চাকে কিছু শেখানোটা মজাদার হয়ে উঠতে পারে যদি সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতি মেনে চলা হয়। সবকিছু নিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলুন— যেমন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে গাছের পাতাগুলো কতটা সবুজ, সবুজের মধ্যেও আবার নানা শেডের বাহার, ফলের দোকানে আপেলটা কতটা লাল, সবজির বাজারে শেখান কোনটা কোন সবজি ইত্যাদি। আবার গরম, ঠান্ডা আর ঈষদুষ্ণ জলের মধ্যে কী পার্থক্য, চিজ এবং আনারসের টুকরোর মধ্যে আকার এবং স্বাদের কী অমিল রয়েছে। বাচ্চারা এইভাবে শিখতেও আনন্দ পাবে এবং তাড়াতাড়িও শিখবে। খাওয়ার সময় কাঁটা চামচের ব্যবহার ধৈর্য ধরে শেখাতে হবে, নয়তো খেলা ভেবে বাচ্চা কাঁটা চামচ দিয়ে আক্রমণও করে বসতে পারে।
ভালো হয়, সামাজিক আদব-কায়দাগুলো বাচ্চাকে সঠিক বয়সে শেখাতে পারলে, যখন সে এটিকেট শেখার মতো বয়সে পৌঁছোবে। তার আগে বাড়ির বড়োদের দেখে দেখে যতটা শিখতে পারে ততটাই যথেষ্ট ওই বয়সের জন্য। আগ্রহ নিয়ে বাচ্চা যখন কিছু শিখতে চায়, সেটা দেখে মা-বাবা আনন্দ পান। নীল তিমি যে হাতির থেকেও আকারে বড়ো এমন আজব অথচ সত্য তথ্য বাচ্চাদের মন দিয়ে শুনতে দেখা যায়। রোজ যখন সূর্য অস্ত গিয়ে চাঁদ ওঠে, তখন চাঁদের শেপ কীরকম অথবা আকাশে মেঘ জমেছে কিনা কিংবা দিনেরবেলায় সূর্যের রং কমলা না হলুদ হয়, নাকি লাল, তা দেখান। বাচ্চার দেওয়া বর্ণনায় মায়েরও এমন অভিব্যক্তি হওয়া উচিত যাতে বাচ্চার মনে হয়, সেই-ই একমাত্র মা-কে ভালো ভাবে বর্ণনা দিতে পারে এবং মা তার কথাই শুনতে সবথেকে বেশি পছন্দ করে।
শিক্ষা হোক আনন্দের
বাচ্চাদের জন্য নির্ধারিত বইয়ের কালো অক্ষরগুলো দেখে বাচ্চারা কোনও আনন্দ পায় না। বরং দৈনন্দিন জীবনচর্যা ও খেলাধুলোর মধ্যে দিয়ে শেখাটা বাচ্চাদের বেশি পছন্দের। রোজ জামা-কাপড় পরাতে গিয়ে জামা বা শার্টের কী রং, জামায় আঁকা ছবিগুলো কীসের, কাঁটা বোতাম আছে, দুটো জুতো এক জোড়া মোজা এগুলো বাচ্চাদের শেখানো যায়।
বাচ্চাদের সঙ্গে যত কথা বলবেন, ওদের জন্য তত ভালো এবং মায়েরা এটা সবথেকে ভালো পারেন। দাঁত মাজাতে মাজাতে তারা বাচ্চাকে বোঝাতে পারেন লাল ছোট্ট ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে তার ছোট্ট সোনার দুধের দাঁতগুলো মাজতে তাদের কতটা ভালো লাগে। এতে যে দাঁতের ক্ষয়কারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়ে যায় এবং দাঁতগুলো মুক্তোর মতো ঝকঝকে হয়ে ওঠে, তা ওরা বুঝতে শিখবে। অবশ্য গাম্ভীর্যের সঙ্গে রোজ একই বিষয় আওড়ালে বাচ্চার মনের কোণে ভীতি তৈরি হতে পারে। তাই গল্পের ছলে সহজ ভাষায় বাচ্চাকে সবকিছু বলতে হবে, বোঝাতে হবে।
বাচ্চাকে নিয়ে সবরকম এক্সপেরিমেন্ট করা ঠিক নয়, কারণ বাচ্চারা কম্পিউটারের মতো প্রোগ্রাম করা কোনও টেকনোলজির অংশ নয়। নামী স্কুল-এ ভর্তি করতে গিয়ে অভিভাবকেরা বাচ্চাদের কম্পিটিশনের মধ্যে ফেলে দেন এবং এর জন্য একটা বড়ো পরিমাণের অর্থ স্কুলকে ডোনেট করতেও তারা পিছপা হন না। এর সঙ্গে মা-বাবাদের মধ্যে নিজেদের মস্তিষ্কে জমিয়ে রাখা বিদ্যার ঝুলিও বাচ্চার ওইটুকু মাথার মধ্যে ঠেসে দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে বাচ্চাদের ব্রেন এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে, নতুন কিছু গ্রহণ করতে সে অস্বীকার করে।
বাচ্চাকে কিছু শেখাতে হলে অবশ্যই বড়োদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের মনের কোমল মাটিতে খুব সাবধানে ক্রিয়েটিভিটির বীজ বপণ করতে হবে। বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়োদের ভাবনাটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা যেন চিরাচরিত নিয়মের জালে বন্ধ হয়ে না পড়ে। রাস্তাটা যেন সহজ হয় আর শিশুটিকে ঘিরে যেন থাকে মা-বাবার ভালোবাসার মিষ্টি সুবাস।





