অমিতাভবাবু হতবাক। রাজগুরু? সচ্চিদানন্দ? সে বুঝতে পারে, এই সময়ে তার উপস্থিতি যেন পূর্বনির্ধারিত ছিল। কেউ বা কিছু লোক তার আসার খবর জানত!

চন্দ্রাবতীর দৃষ্টি ঘুরে যায় দালানের এক কোণে, যেখানে একজন বয়স্ক পুরুষ ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন, “সময় শেষ হয়ে আসছে, কালো কাঠির সঙ্গেই অভিশাপ ঘনিয়ে আসছে।’

রাজগুরু সচ্চিদানন্দ অমিতাভ-কে জানালেন, রাজা তার গোপন ঘরে একটি তন্ত্রের চর্চা শুরু করেছিলেন। কালো কাঠি ছিল সেই যন্ত্রের কেন্দ্র, যার সাহায্যে অতীত ও ভবিষ্যতের দরজা খোলা যায়। কিন্তু সেই কাঠি অভিশপ্ত। একবার যার দেহের সঙ্গে লাগে, তার রক্তে তা মিশে যায়, সে আর স্বাভাবিক থাকে না। রাজা নিজেই উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন এবং আজ, এই চতুর্থ রাতেই, অভিশাপ পূর্ণতা পাবে— যদি না কেউ কাঠিকে ধ্বংস করতে পারে।

অমিতাভবাবু জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কীভাবে এসেছি এখানে?”

রাজগুরু শুধু একটিই কথা বলেন, ‘সময় যাকে খোঁজে, সে আর নিজের পথ তৈরি করতে পারে না। তাকে পথ বেছে নিতে হয়।”

মধ্যরাতে অমিতাভ ও চন্দ্রাবতী প্রবেশ করে রাজবাড়ির নীচের গোপন কুঠুরিতে। তিনটি দরজা— প্রথমটি রক্ত দিয়ে খোলে, দ্বিতীয়টি আগুন দিয়ে এবং তৃতীয়টি সত্য দিয়ে।

প্রথম দরজায় একটি পুরোনো ধাতব ছুরি— চন্দ্রাবতী নিজের আঙুল কেটে রক্ত দেয়।

দ্বিতীয় দরজায় অমিতাভ একটি প্রদীপে আগুন জ্বালিয়ে রাখে— আগুন না নেভা পর্যন্ত দরজা খোলা থাকে।

তৃতীয় দরজা কিন্তু আটকে যায়৷ কারণ সত্য কথা বলতে হবে। তবেই এই দরজা খুলবে।

অমিতাভবাবু ভেবে বলেন, ‘আমি সময়ের যাত্রী। আমি এই কাঠিকে খুঁজছি ধ্বংস করার জন্য।’

এক ঝলক আলো জ্বলে ওঠে, আর এর পরই দরজা খুলে যায়। তারা দেখতে পায় তাদের সামনে পড়ে থাকা একটি কাচের বাক্সের ভিতর সেই কালো কাঠি।

যখন অমিতাভ কাঠির দিকে এগিয়ে যায়, একটি ভয়ংকর কণ্ঠস্বর চারদিক বিদীর্ণ করে কাঁপিয়ে তোলে— ‘আমি মুক্তি চাই না। আমি পুনর্জন্ম চাই। আমাকে আবার খেলা শুরু করতে দাও।’

মনে হতে থাকে এই কণ্ঠস্বর যেন অমিতাভবাবুর মগজে ঢুকে যাচ্ছে।

অমিতাভবাবু বুঝতে পারেন, এই কাঠির ভিতর রয়েছে প্রাচীন কোনও আত্মা, যাকে তন্ত্রবিদরা একসময় বন্দি করেছিল।

তখনই তিনি এক ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন— কাঠিকে ছুঁয়ে আত্মাকে নিজের শরীরে প্রবেশ করতে দেবেন, যাতে চন্দ্রাবতী বেঁচে ওঠেন।

একবার স্পর্শ করতেই বিদ্যুৎ-এর ঝলকে চারিদিকটা আলোকিত হয়ে ওঠে। অমিতাভবাবু চিৎকার করে ওঠেন, মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এরপর হঠাৎ করেই অমিতাভবাবুর যখন জ্ঞান ফিরে আসে এবং দেখতে পান তিনি নিজের ঘরে— ২০২৫ সালের পার্ক স্ট্রিট- এর বাড়িতে শুয়ে আছেন। তখন দরজার বাইরে পুলিশের সাইরেন শুনতে পান৷

চোখ খুলেই দেখতে পান সেখানে বসে আছে চন্দ্রাবতী, আধুনিক পোশাকে। চন্দ্রাবতী হেসে বলে, “তুমি পেরেছ। অভিশাপ শেষ৷ কিন্তু তার একটা মূল্য দিতে হয়েছে।’

অমিতাভবাবু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেন— তার চোখের নীচে গাঢ় দাগ, মাথার কিছু চুল সাদা হয়ে গেছে।

হঠাৎ, টেবিলে রাখা ঘড়িটি আবার চলতে শুরু করে। ঠিক ১২:০২।

পুলিশ আসে একটি খুনের তদন্তে। রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপে পাওয়া গেছে একটি নতুন মৃতদেহ— একজন গবেষকের। তার পকেটে থাকা পরিচয়পত্রে লেখা— অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়।

অমিতাভ হতবাক হয়ে ফাইল দেখে। তার ছবি। তার নাম। কিন্তু সে তো জীবিত!

চন্দ্রাবতী তাকে বলে, “তুমি সময়কে ফাঁকি দিয়েছিলে। তাই সময় তোমার ছায়াটিকে রেখে দিয়েছে পিছনে। এখন তুমি আর নিজের পরিচয়ে ফিরে যেতে পারবে না।’

অমিতাভবাবু জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে আমি কে?’

চন্দ্রাবতী উত্তর দেয়, ‘তুমি সেই ব্যক্তি, যার অস্তিত্ব এখন শুধুই এক অতীতের গল্পে। তুমি এখন এক কালচিহ্ন। আর আমি সেই রাজকন্যা, যে চিরকাল তোমার অপেক্ষায় ছিল।

ঘরের আলো হঠাৎ-ই নিভে যায়। আবার সেই কাঠির ছায়া, ধোঁয়ার মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে তাদের অস্তিত্ব।

আজও নবগ্রাম রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মাঝে মাঝে দেখা যায় দুটি ছায়া—একজন আধুনিক পোশাকের যুবক, অন্যজন

প্রাচীন রাজকন্যা। কেউ কেউ বলে, তাদের চোখে নাকি সময় দাঁড়িয়ে থাকে।

আর সেই পুরোনো ঘড়ি?

আজও থেমে আছে ঠিক ১২:০২-এ।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...