প্রাইমারি বিলিয়ারি কোলাঞ্জাইটিস, যা সাধারণত পিবিসি (PBC) নামে পরিচিত, এটি হল যকৃতের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এটি যকৃতের ভিতরের ছোটো পিত্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই পিত্তনালীগুলো পিত্তরস পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পিত্তরস হল এমন এক তরল, যা চর্বি হজম করতে এবং শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ অপসারণ করতে সাহায্য করে। যখন এই নালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন যকৃতে পিত্তরস জমতে শুরু করে, যা ধীরে ধীরে যকৃতের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং পরামর্শ দিয়েছেন ফর্টিস হাসপাতালের কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. তুহিন মিত্র।
রোগের কারণ
পিবিসি প্রধানত মহিলাদের, বিশেষকরে ৩০ থেকে ৬৫ বছর বয়সি মহিলাদের বেশি প্রভাবিত করে। অবশ্য পুরুষদেরও এই রোগ হতে পারে। এর সঠিক কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে চিকিৎসকরা মনে করেন যে, এটি জিনগত কারণ (যা একজন ব্যক্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে পারে) এবং পরিবেশগত কারণ, যেমন সংক্রমণ কিংবা নির্দিষ্ট রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে সম্মিলিত প্রভাবে ঘটে থাকে। সহজ কথায়, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল ভাবে শরীরের লিভার কোষগুলোকে আক্রমণ করে।
রোগের লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে, পিবিসি-তে আক্রান্ত অনেকেই অসুস্থ বোধ করেন না। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার সময় এই রোগটি ধরা পড়ে। যখন লিভার এনজাইমের মাত্রা, বিশেষকরে অ্যালকালাইন ফসফাটেজ (এএলপি) নামক একটি এনজাইমের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। তবে, যখন উপসর্গ দেখা দেয়, তখন সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলো হল ক্লান্তি (অস্বাভাবিক ভাবে ক্লান্ত বোধ করা) এবং ত্বকের চুলকানি (যাকে প্রুরাইটিস বলা হয়)। এই চুলকানি কখনও কখনও বেশ তীব্র হতে পারে এবং রাতে এর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।
রোগটি ধীরে ধীরে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি, অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস), ত্বক কালো হয়ে যাওয়া, চোখ ও মুখ শুকিয়ে যাওয়া এবং পেটের উপরের ডান দিকের অংশে, যেখানে যকৃত অবস্থিত, সেখানে অস্বস্তি। কিছু রোগীর ত্বকের নীচে কিংবা চোখের চারপাশে চর্বি জমা হতেও দেখতে পারেন, যা জ্যান্থোমাস নামে পরিচিত। আরও গুরুতর পর্যায়ে, যকৃতে ক্ষত তৈরি হতে পারে (এই অবস্থাকে সিরোসিস বলা হয়)। যার ফলে পেটে ফোলাভাব (অ্যাসাইটিস), প্লীহা বড়ো হয়ে যাওয়া কিংবা খাদ্যনালীর শিরা থেকে রক্তপাত (ভ্যারিসিস) হতে পারে।
সমস্যা
পিবিসি অন্যান্য অটোইমিউন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। অর্থাৎ, পিবিসি আক্রান্ত ব্যক্তিদের থাইরয়েডের সমস্যা, শুষ্ক চোখের সিন্ড্রোম (শোগ্রেন সিন্ড্রোম) কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের আর্থরাইটিস-এর মতো রোগও থাকতে পারে। এই কারণে, চিকিৎসকরা সাধারণত লিভার ছাড়াও অন্যান্য রোগের লক্ষণও খুঁজে দেখেন।
রোগ নির্ণয়
পিবিসি নির্ণয়ের জন্য, চিকিৎসকরা বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা এবং কখনও কখনও ইমেজিং কিংবা লিভার বায়োপসির উপর নির্ভর করেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ত পরীক্ষায় অ্যান্টি-মাইটোকন্ড্রিয়াল অ্যান্টিবডি (AMA) নামক একটি উপাদান খোঁজা হয়, যা পিবিসি আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই উপস্থিত থাকে। যদি এই অ্যান্টিবডিগুলোর সঙ্গে লিভারের অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়, তবে রোগ নির্ণয় সাধারণত নিশ্চিত হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে, রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে কিংবা রোগটি কতটা অগ্রসর হয়েছে তা পরীক্ষা করার জন্য লিভার বায়োপসি করা হতে পারে।
চিকিৎসা
যদিও পিবিসি সম্পূর্ণ ভাবে নিরাময় করা যায় না, তবে এটিকে কার্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, বিশেষকরে যদি রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়। এর প্রধান চিকিৎসা হল উরসোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড (ইউডিসিএ) নামক একটি ওষুধ। এই ওষুধটি পিত্ত প্রবাহ উন্নত করতে এবং যকৃতকে আরও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এটি প্রতিদিন গ্রহণ করতে হয় এবং সাধারণত এটি সুফল দেয়। অনেক রোগী যারা প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করেন, তারা ন্যূনতম সমস্যা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
যদি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ইউডিসিএ (UDCA) ভালো ভাবে কাজ না করে, তবে ওবেটিচোলিক অ্যাসিড বা ফাইব্রেট নামক নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক চিকিৎসায় পুরোপুরি সাড়া না পেলে, সে ক্ষেত্রে ওষুধগুলো রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
রোগের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক সময় চিকিৎসকরা এমন ওষুধ লিখে দিতে পারেন, যা শরীরে পিত্ত অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করে অথবা স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে পিবিসি-র ক্ষেত্রে সাইড এফেক্টস-এর মধ্যে চুলকানি কিংবা ক্লান্তির চিকিৎসা করা আরও কঠিন হতে পারে। কিন্তু ঘুম, পুষ্টি এবং সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করলে সুফল পাওয়া সম্ভব।
যেহেতু পিবিসি পিত্ত প্রবাহকে প্রভাবিত করে, তাই শরীর নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন, বিশেষকরে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে শোষণ করতে সমস্যায় পড়তে পারে। প্রয়োজনে চিকিৎসকরা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারেন। হাড়ের স্বাস্থ্যও একটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ পিবিসি আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাড় দুর্বল (অস্টিওপোরোসিস) হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করার প্রয়োজন হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
পিবিসি রোগীদের নিয়মিত ফলো-আপের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে সাধারণত রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান এবং জটিলতার জন্য পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। যদি রোগটি গুরুতর লিভার ক্ষতির পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। সৌভাগ্যবশত, পিবিসি রোগীদের জন্য প্রতিস্থাপনের ফলাফল সাধারণত খুব ভালো হয় এবং অনেকেই এর পরে সুস্থ জীবনযাপন করেন।
মনে রাখবেন, প্রাইমারি বিলিয়ারি কোলাঞ্জাইটিস হল মূলত যকৃতের রোগ, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিপরীত প্রতিক্রিয়ার ফলে ঘটে থাকে। এটি সাধারণত কোনও উপসর্গ ছাড়াই শুরু হয়। কিন্তু চিকিৎসা না করা হলে এটি যকৃতের গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং ইউডিসিএ-র মতো ওষুধের মাধ্যমে নিয়মিত চিকিৎসা রোগের গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনতে পারে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। সঠিক যত্ন, পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে, পিবিসি-তে আক্রান্ত অনেক রোগী বহু বছর ধরে এই অবস্থাটি সামলে চলতে পারেন।





