অফিসের চার দেয়াল আর ল্যাপটপের একঘেয়ে স্ক্রিন যখন কর্মজীবনে ক্লান্তি নামিয়ে আনে, তখনই মুক্তির গান গেয়ে ওঠে ‘ওয়ার্কেশন’ (Workation)। এটি কেবল কাজের সঙ্গে ছুটির কোলাকুলি নয়, বরং এক চিলতে নীল আকাশ আর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে রুটি-রুজির সন্ধান। অর্থাৎ, ওয়ার্কেশন হল নাগরিক ব্যস্ততার মধ্যে এক টুকরো পাহাড়ি মেঘ কিংবা সমুদ্রের নোনা হাওয়া ছুঁয়ে বেঁচে থাকার আধুনিক কর্মসংস্কৃতি। যেখানে জীবিকা আর জীবন একে অপরের হাত ধরে পথ চলে। তাই, অনেকের পছন্দের শীর্ষে এখন ‘ওয়ার্কেশন’।
আসলে, ওয়ার্কেশন হল আজকের তরুণ-তরুণীদের নতুন কর্ম-সংস্কৃতি, যেখানে তারা বাড়ি থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতে পছন্দ করে। ইংরেজি ‘ওয়ার্ক ভ্যাকেশন’ (work vacation) শব্দটি থেকে উদ্ভূত এই শব্দটি (Workation) সেই সব তরুণ-তরুণীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়, যারা এক জায়গায় থাকার পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে।
কোভিড পরবর্তী সময় থেকে কিছু কোম্পানি তাদের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। এর ফলে, ক্রমাগত একই ঘরে এবং একই জায়গায় কাজ করতে করতে, কাজ এবং জায়গা উভয়ের প্রতিই ধীরে ধীরে একঘেয়েমি চলে আসে এবং কাজের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই একঘেয়েমি এড়াতে, তরুণ-তরুণীরা তাদের ল্যাপটপ এবং অন্যান্য অফিসের সরঞ্জাম নিয়ে দূরবর্তী কোনও স্থানে চলে যায়। তারা দিনের বেলা সেখানে কাজ করে এবং বাকি সময়টা আশপাশের এলাকা ঘুরে বেড়ায়, এভাবে একই সঙ্গে দুটি কাজ সম্পন্ন করে।
অভিজ্ঞতা
একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে বাড়ি থেকে কাজ করা এক তরুণী জানিয়েছেন, ‘গত এক বছর ধরে একই ঘর, ল্যাপটপ আর পরিবারের সদস্যদের মুখ দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই আমি আমার এক বন্ধুর সঙ্গে হিমাচল প্রদেশের বীর নামের একটি জায়গায় এক মাস থেকে কাজ করেছি। নিঃসন্দেহে, এই সময়ে আমার কাজের মান ও কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কারণ সেখানকার পরিবেশটা ছিল অন্যরকম এবং আমি আগের চেয়ে নিজের কাজে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পেরেছিলাম।”
মনে রাখা জরুরি
কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য ‘ওয়ার্কেশন’ একটি দারুণ উপায়। অফিসে গেলে সারাদিন বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে দেখা হয় ও কথাবার্তা হয়, যা কাজের চাপ কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, বাড়ি থেকে কাজ করলে একই জায়গা ও মানুষের কারণে একঘেয়েমি আসতে পারে। তাই, ‘ওয়ার্কেশন’-এর পরিকল্পনা করার সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি—
- আপনি কোথায় যাচ্ছেন তা আগে থেকে পরিকল্পনা করুন, যাতে সময়মতো আপনার থাকার জায়গা বুক করতে পারেন।
- যেহেতু আজকাল প্রায় সবকিছুই অনলাইনে করা হয়, তাই জায়গা বেছে নেওয়ার আগে ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করুন। কোনও জরুরি অবস্থায় যাতে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে আপনার অফিস এবং পরিবারের লোকজন, সেজন্য জায়গাটির সম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে তারপর যান।
- বাবা-মায়েরা প্রায়ই তাদের তরুণী, অবিবাহিত মেয়েদের এমন ভ্রমণে পাঠাতে অনিচ্ছুক থাকেন। এই ক্ষেত্রে মনখারাপ না করে, তাদের কাছে ‘ওয়ার্কেশন’-এর বিস্তারিত বিষয়গুলো নম্র ভাবে ব্যাখ্যা করুন। আপনার বাবা-মাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে প্রাথমিক ভাবে একটি ছোটো ‘ওয়ার্কেশন’-এর পরিকল্পনা করুন।
- একটি সাশ্রয়ী স্থান নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি কম খরচের মধ্যে থাকতে পারেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি: ‘ওয়ার্কেশন’-এ একজন কর্মী দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা) ল্যাপটপে অফিসের কাজ করেন এবং বাকি সময়টা (সকাল কিংবা সন্ধ্যা) স্থানীয় এলাকা ঘুরে দেখেন, প্রকৃতির আনন্দ নেন বা বিশ্রাম করেন। আসলে, প্রতিদিনের ট্রাফিক জ্যাম ও চার দেয়ালের একঘেয়েমি মানুষের মানসিক চাপ (Burnout) বাড়িয়ে দেয়। পাহাড় কিংবা সমুদ্রের কোলে বসে কাজ করলে মন শান্ত থাকে, যা কাজের মান উন্নত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পরিবেশ মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। এর ফলে কঠিন সমস্যার সমাধান কিংবা নতুন আইডিয়া সহজে মাথায় আসে। তবে, ‘ওয়ার্কেশন’ শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়, সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে এটি ততটাই কঠিন হতে পারে। পাহাড় বা প্রত্যন্ত গ্রামে হঠাৎ নেটওয়ার্ক চলে গেলে কিংবা লোডশেডিং হলে অফিসের কাজ আটকে যেতে পারে। তাই, ‘ওয়ার্কেশন’-এ যাওয়ার আগে হোমস্টে অথবা হোটেলের রিভিউ চেক করুন। ওয়াই-ফাই ব্যাকআপ এবং দুটি ভিন্ন কোম্পানির মোবাইল সিম সঙ্গে রাখুন।
—প্রতিভা অগ্নিহোত্রী





