পীরবত চেয়ারে বসেনি। সে তার নাতিদীর্ঘ শরীরে ঢেউ তুলে এসে আইজ্যাকের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েছে একটু ঝুঁকে। আজ পীরবত পরেছে ঘিয়ে রঙের কনুই পর্যন্ত ঢাকা জামা। কালো ট্রাউজারে ইন করে পরা। তার জামার উপরের দিকের দুটি বোতাম খোলা। সেখানে প্রকট হয়েছে ফরগেট মি নট-এর মতো দুই থোকা সাদা ফুল।
পীরবত মিষ্টি করে হেসে বেশ অনেকটা ঝুঁকে নিজের বুকের ধনরাশি আইজ্যাকের চোখের উপর মেলে দিয়ে বলল, ‘স্যার, এখন কি ডিকটেশন দেবেন? কাল নিলে হয় না! অফিসের প্রায় সবাই চলে গেছে। আপনার চেম্বারে আপনি আর আমি। ধারে-কাছে কেউ নেই।”
আইজ্যাক ভাবল পীরবত এত কথা বলছে কেন! সে তো কিছুই বলেনি। ডিকটেশন সম্পর্কে কোনও কথাই হয়নি। শেষবেলায় পীরবতকে অফিসে আটকে রাখার ইচ্ছেও নেই। তবুও কেন সে নির্জনতার কথা বলল। পীরবতের দুটি চোখের তারায় আমন্ত্রণ ঝরছে, দেখতে পায় আইজ্যাক।
খাসি মেয়েদের শরীর নিয়ে কোনও ট্যাবু নেই। শরীর, মন, বিত্ত— সব কিছুই তারা কমোডিটি হিসেবে দেখে। উপভোগের বিষয় হিসেবে দেখে। সৌন্দর্য বাঁচানোর জন্য যতটুকু যত্ন করতে হয় করে। তার বাইরে শরীর নিয়ে খাসি মেয়েদের কোনও ছুঁৎমার্গ নেই। আইজ্যাক দেখল পীরবতের চোখেমুখে তুখোড় আমন্ত্রণ।
—পীরবত এখন তুমি এসো। কাল সকাল দশটায় তোমার সঙ্গে প্রথমেই বসে গত দু’বছরের টেন্ডারের ফাইলগুলো দেখে নিতে হবে। নতুন টেন্ডার ফ্লোট করতে হবে। এখন এসো।
পীরবতের মুখের উপর থেকে ঝপ করে আলো কমে গেল। আইজ্যাক দেখল পীরবত তার টেবিলের সামনে ছোটো করে একটা চাটি মেরে বুঝি বিরক্তি প্রকাশ করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ভোরের ঘুমের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে আইজ্যাক আবার দেখল, না তার ইন্দ্রিয় জাগেনি। গত রাতের মতোই নিস্তেজ। সে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে বড়ো করে শ্বাস নেয়। এবার কী হবে! আরও একবার কি ঘুমিয়ে পড়ে দেখবে সত্যি সত্যি সে বৃদ্ধ হয়ে পড়ল কি না! এখন তার বয়স ছাপান্ন বছর চার মাস আঠারো দিন। এই হিসাবটা মাথায় আসতেই ভাবল, না আর ঘুম আসবে না। ঘুমঘুম ভাব আর নেই। জানলার পর্দা সরিয়ে দেখল ভোরের আলো ফুটে গেছে। তাহলে মর্নিংওয়াকে যাওয়াই শ্রেয় হবে। গীতাঞ্জলি স্টেডিয়ামের মাঠে সকালে অনেকেই দৌড়োতে আসে। অনেক মেয়ে-বউরাও আসে। আজ নিজে দৌড়োনোর ফাঁকে ক্যাজুয়াল সাদা টি-শার্ট পরা দিল্লিওয়ালি মাঝবয়সি সুন্দরী বউটিকে নিবিষ্ট তাকাবে। আইজ্যাক একটু বেশি করে ভাবল, রোজ চোখে চোখে কথা হয়। ভদ্রমহিলা মাঝে মাঝে গুড মর্নিং বলে হাত তুলে পাশ দিয়ে দৌড়ে যায়। আজ গুড মর্নিং বলে একটু ভাব করে নেবে। দাঁড়িয়ে একটু কথা বলবে। এটাও একটা টেস্টের অঙ্গ হবে। জানবে আইজ্যাক কি অনতিকালের ভিতর নারী বিমুখ হতে যাচ্ছে!
দুই
আজ অফিস যায়নি। এরকম একটা মানসিক আপসেট নিয়ে অফিসের জটিল পরিবেশ হ্যান্ডেল করা যায় না। কাজের বউ সারা দিনের রান্না করে গেছে অফিস টাইমের আগেই। আইজ্যাক স্নান সেরে টেবিলে ঢাকা দেওয়া খাবার খেতে যাবে, তখনই মন বিদ্রোহ করল। না না, রোজ রোজ এই ভাত মাছের ঝোল খেয়ে জামা-প্যান্ট পরে উবের ডেকে অফিস যাওয়া, কেমন যেন নালায় গড়িয়ে যাওয়া জীবনের মতো। ধুত, ভাল্লাগে না।
টেবিল থেকে না খেয়েই উঠে পড়ল। স্নান করার সময় মনের ভিতর এসে বাসা বেঁধেছিল ওই অফিস যাবে কি যাবে না দোলাচল। এখন সে না-যাওয়ার পক্ষে জোরালো সিলমোহর দিল। একটু বাঁধা ছকের বাইরে গিয়ে একটা দিন কাটালে যদি মানসিক শান্তি ফিরে আসে। যদি তার আত্মবিশ্বাস ফেরে। হ্যাঁ হ্যাঁ, লোকে বালির বাঁধ দিয়ে জল ঢোকা আটকানোর চেষ্টা করে, তাকেও তো একটা চেষ্টা করতে হবে। আইজ্যাক ফ্লাস্ক থেকে এক মগ চা ঢেলে গেঞ্জি আর পায়জামা পরে তিনতলার ব্যালকনিতে রাখা বেতের চেয়ারে এসে বসল। এই চা কাজের বউ বানিয়ে দেয়। গোটা দিন অফিসে এই এক ফ্লাস্ক চা তার সঙ্গী। আজ অফিসে যাবে না যখন বাড়িতেই তার ব্যবহার করে ফেলা যাক৷
চায়ের মগে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ হাতে দেখে সে বিরক্ত হল। ঘরের মেঝেয় ছুঁড়ে দিল। না না, খবর পড়ে অন্য লোকের ভাবনা ভাবার জন্য সে অফিস কামাই করেনি। সে নিজেকে নিয়ে ভাববে আজ। শুধুমাত্র নিজেকে উলটে-পালটে দেখবে। রিজ্যুভিনেট সম্ভব না, প্রাকৃতিক নিয়মে সে হেরে বসে আছে।
মনোনীতা কফি খেতে খেতে একদিন শ্যামবাজারের মোড়ে কফিশপে বসে বলেছিল, “তুমি এই যে সিঙ্গেল থাকার ব্যাপারে একেবারে ভীষ্মমার্কা একটা অ্যাটিচ্যুড দেখাচ্ছ, তা বয়স বাড়লে যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন কী করবে! নিজেকে এভাবে নষ্ট করতে নেই।’
—তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি নষ্ট করছি! করছি না। আমি ঘোরতর ভাবে বাঁচছি।
মনোনীতা অনেক পুরোনো বন্ধু। কলেজ দিনের। হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করে। স্বামী আর দুই কন্যা নিয়ে ঘোরতর সংসারী। কিন্তু আইজ্যাকের সঙ্গে যোগাযোগটা একেবারে ছিন্ন করে দেয়নি। ও মাঝে মাঝে এই কফিশপে বিকেলে বসে। একটু কফি খায়, গল্প করে।





