( ১ )

‘না গেলেই কি নয় রায়া? ওখানকার অবস্থা ভালো নয়, তুইও যাস না। যা হওয়ার তা তো হবেই। তোর কষ্টটা ভীষণ ভাবে অনুভব করছি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ওখানে গেলে আমি বোধহয় আর ফিরতে পারব না।’

অনন্ত শূন্যতায় মিশে যায় কথাগুলো। তবুও পাক দিয়ে জড়াতে থাকে রায়ার অন্তর। বিবেকের দংশন আর অপরাধ বোধ ঝাঁঝরা করে ফেলে একটা গোটা মানুষকে। মা প্রায়ই বলত, ‘কথা ক্ষণে, অক্ষণে ফলে।’ কিন্তু এ কথা এমন ভাবে ফলে যাবে, তা কি রায়া ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পেরেছিল? বুঝতে পারলে কি আর দেশে ফিরত! হঠাৎ উঠে আসা পাহাড়প্রমাণ ঢেউ যে এমন ভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে রায়া আর মানসকে, মুহূর্তেই তছনছ করে দেবে সুখের জীবন, তা যদি আগেই বুঝতে পারত রায়া, এমন জেদি ইচ্ছে কি সে মনে লালন করত? কিন্তু ভুল যে তার মাশুল কড়ায় গণ্ডায় উশুল করে নেয়, সে যে ক্ষমাহীন পিশাচের মতো গিলে খায় বেঁচে থাকার নিটোল গলিঘুঁজি!

এমন ঘটনা নিউজে কত দেখেছে রায়া আর মানস। কিন্তু সেই খবরগুলোই যে এমন ভাবে সত্যি হয়ে যাবে মানস আর রায়ার সুখের জীবনে, তা কি স্বয়ং বিধাতারও জানা ছিল? সামনে শোকের পাথার। অকুল সে পাথারের বুভুক্ষু গহ্বরে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে রায়া। সে শোক ভয়াবহ। প্রিয়জনকে হারানোর কষ্টের সঙ্গে মিশে আছে অপরাধবোধের সুবিশাল পাহাড়। নিজের দিকে ছুটে আসা অশরীরী কথাদের দোষারোপের তির! হাসপাতাল করিডোরের শীতল আবহাওয়ায় কে যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘তুমি, তুমি, তুমিই দায়ী রায়া। এ দেশে না এলে আমাকে এভাবে মরতে হতো না।’

হসপিটাল করিডোর প্রায় ফাঁকা। যে দু’জন রিসেপশনিস্ট বসেছিল, তারা বোধহয় দুপুরের খাবার সারতে গেছে নির্দিষ্ট পরিসরে। মেপে দেওয়া দূরত্ববিধি বজায় রেখে তিনজন মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। প্রত্যেকের চোখেই বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা। মানসের পাশের কেবিনেই ভর্তি ছিল বছর তেইশের এক যুবক। গতকাল বিকেলের দিকেই মারা গেল। ওর বাবা-ই বোধহয় এসেছিলেন ছেলের বডি নেওয়ার জন্য। মাত্র একজনকে অ্যালাও করছে হসপিটাল। তাই সমস্ত শোক-ভোগ সব ধারণ করতে হচ্ছে একা একা। ছেলের দেহ নেওয়ার জন্য অপেক্ষারত বাবাকে দেখে নিজের অনাবিল দুঃখকেও বেশ কম মনে হয়েছিল রায়ার। তাই যখন মানসের রিপোর্টগুলো কালেক্ট করে নিয়ে ডাক্তারকে দেখাতে বলা হয়েছিল রিসেপশন থেকে, রায়ার ক্লান্ত শরীর তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে যেতে পারেনি। ওয়ার্ড অ্যাটেনডেন্ট বলেছিল, ‘জলদি লাইয়ে, জলদি!’ কিন্তু রায়ার মধ্যে যেন কোনও তাড়া ছিল না। তবে কি মানসের বুকের ওঠা-নামা আর বীভৎস ছটফটানি দেখে রায়া বুঝতেই পেরেছিল তার ভবিতব্য?

(2)

নেদারল্যান্ডসে এখন না শীত না গরম। এখানকার আবহাওয়া আমাদের নর্থ বেঙ্গল বা সিকিমে যেমন মার্চ-এপ্রিলের দিকে থাকে, তেমন মনোরম। ডাচদের দেশের নিয়মকানুন বেশ কড়া। রাস্তায় অযাচিত গাড়ির ভিড় নেই, পরিবেশ তাই প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে। রায়াদের পুরো ডুপ্লেক্সটা প্রায় সাড়ে তিন হাজার স্কোয়ারফুটের। সামনে ত্রিকোণ করে সুন্দর বাগান, সবুজ ঘাসগুলো নির্দিষ্ট সময় অন্তর যত্ন করে ছাঁটা হয়। গোলাপি পিটুনিয়ার গায়ে একটা সাদা প্রজাপতি লেপটে আছে বেশ অনেকক্ষণ ধরে।

ওয়ার্ক ফ্রম হোমের মাঝখানে আধ ঘণ্টার জন্য রিল্যাক্সেশন। কফির কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে মানস বলে ওঠে, ‘প্রজাপতির লাইফ স্প্যান কত জানিস?’

—অল্পদিনই, তেমনটাই তো৷

—মাত্র সাতদিন। সুন্দর জিনিস বড়ো অল্প সময়ের জন্য এই পৃথিবীতে থাকে রো

—এখানে সবই সুন্দর! ওই দূরের পাহাড়, বেকারির জিনিস বয়ে নিয়ে আসা ছেলেটার সাইকেলের হুইসেল, রাস্তার পাশে ফুটে থাকা নাম না-জানা জংলি ফুল, টিনসেল গির্জা থেকে ভেসে আসা ঢং-ঢং শব্দ— সবটাই সুন্দর। আর আমরা তো সেই কোন কাল থেকে এই স্বপ্নটাই দেখেছিলাম যে, দু’জন দেশের বাইরে কোনও অচেনা অজানা সুন্দর মুলুকে বাসা বাঁধব। বাঁধন ছাড়া পাখির মতো উড়ে বেড়াব, ঠিক এই মুহূর্তটার মতো।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...