একটি প্রবাদ আছে— ‘যা-ই হোক বিচারের রায়, নর্দমার জল একই ভাবে বয়ে যায়।’ এই প্রবাদটি এমন বিবাদকে বোঝায়, যেখানে প্রতিবেশীরা একটি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া করে। কিন্তু সমস্যার কেন্দ্রে থাকা নর্দমাটি কারওর বাড়ির মাঝখান দিয়ে, সামনে দিয়ে কিংবা পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়ায়, অন্য বাড়ির জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ঠিক একই ভাবে, আজকাল গাড়ি পার্কিং নিয়ে সমস্যা এবং বিবাদ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। অনেককে বলতে শোনা যায়— ‘রাস্তাটা কমন হলেও, আমার গাড়ি আমি এখানেই পার্ক করব। দেখি কে, কী করতে পারে!’

এপ্রিল মাসে, দিল্লির একটি বিত্তশালী কলোনিতে পার্কিং নিয়ে বিবাদের জেরে এক ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে গুলি করে হত্যা করে। পাঁচতলা ভবনের সামনে পার্কিং নিয়ে বিবাদ কোনও নতুন বিষয় নয়, বিশেষকরে যখন নতুন ভাড়াটিয়ার একটি বিএমডব্লিউ, একটি ফরচুনার এবং আরও একটি সাধারণ গাড়ি থাকে, যা অন্য বাসিন্দাদের জন্য কোনও জায়গা রাখে না। এই বিবাদে ৩৪ বছর বয়সি এক ব্যক্তি নিহত হন এবং অপরাধীকে এখন বছরের পর বছর জেল খাটতে হবে, সেইসঙ্গে আইনজীবীদের লক্ষ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক দিতে হবে। আসলে,পার্কিং সংক্রান্ত এই বিবাদের ঘটনায় উভয় পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু মনে হচ্ছে না যে, অন্যরা এই ঘটনা থেকে কোনও শিক্ষা নিয়েছে।

দুর্বল নগর পরিকল্পনার কারণে, দেশের প্রায় সর্বত্র পার্কিং একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে, ক্রমশ ছোটো হতে থাকা বাড়িগুলিতে যানবাহন কোথায় পার্ক করা হবে, তা বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। আগে প্রতিটি বাড়িতে একটি করে গাড়ি ছিল, কিন্তু এখন অনেক বাড়িতে সবারই একটি করে গাড়ি হয়ে গেছে।

মেয়েরা গাড়ি চালানো শুরু করার পর থেকে গাড়ির সংখ্যা আরও বেড়েছে। শহরগুলো এত দ্রুত বিকশিত হয়েছে যে, গণপরিবহণ চাহিদা মেটাতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজের বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে এবং অতিথি গাড়ি নিয়ে এলে, তাদের গাড়িগুলোও অন্যদের বাড়ির সামনে পার্ক করাকে তারা নিজেদের অধিকার বলে মনে করে।

সারা দেশের আবাসিক এলাকাগুলো এখন গাড়িতে উপচে পড়ছে। বাড়িগুলোতে গ্যারেজ নেই, গণ-পার্কিংয়ের জায়গা দুষ্প্রাপ্য এবং তার উপর, এখন বেশিরভাগ মানুষ বড়ো গাড়ি ব্যবহার করছেন। দিল্লির ঘটনায় চার চাকার বড়ো গাড়ির পার্কিং প্রধান সমস্যা হলেও, সরু গলিতে পার্ক করা দু- চাকার যানবাহন নিয়েও একই ধরনের বিবাদ ঘটে, যেগুলো কখনও কখনও পথচারীদের পথও আটকে দেয়।

সমাধানটা সহজ নয়, কিন্তু ঝগড়া করলে গাড়ি ছোটো হয়ে যাবে না কিংবা রাস্তা চওড়া হয়ে যাবে না। সবচেয়ে ভালো হয়, যার সঙ্গে আপনার তর্ক হচ্ছে, তাকে কফি খেতে আমন্ত্রণ জানিয়ে পকোড়া খাওয়ান এবং বিষয়টি মিটিয়ে ফেলুন। কারণ, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করা অর্থহীন। যেখানে আমরা বছরের পর বছর ধরে আপোশে আমাদের গাড়ি পার্ক করে আসছি নানারকম সমস্যা সত্ত্বেও, সেখানে ঝগড়া করা অর্থহীন এবং ক্ষতিকারক। আজকের দিনে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বই হল নিরাপত্তার সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার, বন্দুক নয়।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...