যে-কোনও আসক্তি এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী জটিল মানসিক ও শারীরিক অবস্থা, যেখানে ক্ষতিকর পরিণতি জানা সত্ত্বেও, কোনও নির্দিষ্ট বস্তু (যেমন – মাদক) কিংবা আচরণের (যেমন— জুয়া কিংবা যৌনতা) উপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল হয়ে পড়েন কেউ কেউ। কিন্তু এটি এমন একটি বিষয়, যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে, সুস্থ জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অন্যান্য আসক্তির মতো কামাসক্তিও যখন অনিয়ন্ত্রিত এবং আবেগগত ভাবে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে, তখন তা অস্বাভাবিকতার জন্ম দেয়। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে ‘কম্পালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার’ বা CSBD বলা হয়। অবশ্য অস্বাভাবিক যৌন আচরণ সাধারণ ভাবে ‘নিম্ফোম্যানিয়া’ বা ‘হাইপারসেক্সুয়ালিটি’ নামেও পরিচিত।

আসলে, “নিম্ফোম্যানিয়া’ শব্দটির একটি দীর্ঘ ও বিতর্কিত ইতিহাস রয়েছে। ঐতিহ্যগত ভাবে, এটি এমন নারীদের বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হতো, যাদের যৌন তাড়না অস্বাভাবিক বলে মনে করা হতো। শব্দটি আসলে একটি পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। আধুনিক মনোবিজ্ঞান এখন আর চিকিৎসাগত ভাবে ‘নিম্ফোম্যানিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করে না, কারণ এটি লিঙ্গ-পক্ষপাতদুষ্ট এবং বৈজ্ঞানিক ভাবে এর অর্থ অস্পষ্ট। তাই, ‘নিম্ফোম্যানিয়া” শব্দের পরিবর্তে, ‘হাইপারসেক্সুয়ালিটি’ অথবা ‘কম্পালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার’ বা CSBD-র মতো শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন মনোবিদরা।

২০১৯ সালে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাস-এ (ICD-11 ) CSBD- কে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি দেয়। এই ব্যাধির বৈশিষ্ট্য হল— – তীব্র যৌন তাড়না বা আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে ক্রমাগত ব্যর্থতা। কিন্তু কে, কত ঘন ঘন যৌনকর্মে লিপ্ত হন, তার উপর ভিত্তি করে এই রোগ নির্ণয় করা হয় না, বরং অনুভূত মানসিক যন্ত্রণা এবং নিয়ন্ত্রণের অভাবের মাত্রার উপর ভিত্তি করে রোগ নির্ণয় করা হয়।

সিএসবিডি-তে আক্রান্ত অনেকে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক চক্রে আটকে পড়ার অনুভূতির কথা বলেন। যৌন চিন্তা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মকে প্রভাবিত করে। শুধু তাই নয়, সম্পর্ক, ঘুম এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ব্যাঘাত ঘটায়। কেউ কেউ পর্নোগ্রাফি-তে আসক্ত হয়ে পড়েন, কেউ আবার একাধিক যৌন মিলনের আকাঙ্খার ভাবনায় ডুবে থাকেন অথবা অতিরিক্ত সাইবার-সেক্স-এ লিপ্ত হতে পারেন। আসলে, একাকীত্ব, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা কিংবা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হিসেবে যৌনক্রিয়াকে ব্যবহার করেন অনেকে।

লার্স ভন ট্রায়ার রচিত ও পরিচালিত ইরোটিক ড্রামা ফিল্ম ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’-এও (২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত) তুলে ধরা হয়েছে এক মর্মস্পর্শী কাহিনি। এই ফিল্মটিতে জো-এর কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল জীবনের কাহিনি প্রদর্শিত হয়েছে। একজন স্নেহময় বাবা এবং উদাসীন মায়ের কাছে বড়ো হওয়া জো কৈশোরে প্রতিবেশী জেরোমের কাছে তার কুমারীত্ব হারায়। এরপর একাধিক কারণে সে কীভাবে ‘নিম্ফোম্যানিয়া’-র শিকার হয়ে উঠেছিল, তা অসাধারণ দক্ষতায় পর্দায় তুলে ধরেছেন পরিচালক লার্স ভন ট্রায়ার।

এই নিমফোম্যানিয়া (Nymphomania) হল নারীদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বা মাত্রাতিরিক্ত যৌন আকাঙ্ক্ষা। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই অবস্থাকে ‘স্যাটেরিয়াসিস’ (Satyriasis) বলা হয়। তবে, স্বাভাবিক ভাবে উচ্চ যৌনাকাঙ্ক্ষা এবং যৌন-ব্যাধির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা আবশ্যক। প্রবল যৌন আকাঙ্ক্ষা থাকা কোনও রোগ নয়। ব্যক্তি ও সংস্কৃতিভেদে যৌন অভিব্যক্তির ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়। কেউ যদি ঘন ঘন সম্মতিসূচক যৌনক্রিয়া উপভোগ করেন, তিনি কোনও ব্যাধিতে ভুগছেন না। সমস্যাটি তখন দেখা দেয়, যখন এই আচরণ অনিয়ন্ত্রিত, অস্বাভাবিক এবং শারীরিক ও মানসিক ভাবে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে।

অস্বাভাবিক যৌন আচরণকে (CSBD) আচরণগত আসক্তি, আবেগ-অনিয়ন্ত্রণ ব্যাধি, নাকি অবসেসিভ- কম্পালসিভ স্পেকট্রাম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা উচিত, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে। স্নায়ু মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, বারবার যৌন উদ্দীপনা মস্তিষ্ককে অতিসক্রিয় করতে পারে, যার মধ্যে ডোপামিন এবং রিইনফোর্সমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। আসলে, অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো প্রায়ই প্রধান ভূমিকা পালন করে। শৈশবের অবহেলা, মানসিক বঞ্চনা, যৌন নির্যাতন, দীর্ঘস্থায়ী লজ্জা, কম আত্মসম্মান এবং মানসিক আঘাত হঠাৎই কিছু মানুষকে অস্বাভাবিক যৌনতার দিকে পরিচালিত করতে পারে। এর ফলে, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তি, উদ্বেগজনিত ব্যাধি কিংবা বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উন্মত্ততার পর্ব চলাকালীন, ব্যাপকতর আবেগপ্রবণ আচরণের অংশ হিসেবে যৌন কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে পারে কিংবা অস্বাভাবিক হতে পারে।

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে যৌন আচরণের প্রেক্ষাপটকেও। এখন, পর্নোগ্রাফি এবং ভার্চুয়াল যৌনতার তাৎক্ষণিক সুযোগ করে দেয় ইন্টারনেট। দুর্বল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নারী- পুরুষদের জন্য এই নিরন্তর সহজলভ্যতা অস্বাভাবিক আচরণকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ বা যৌন সংযম কমিয়ে দিতে পারে। থাইরয়েড বা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা কিংবা হরমোনের অস্বাভাবিকতার কারণেও যৌন চাহিদা অত্যধিক হতে পারে।

চিকিৎসা না করা হলে, সিএসবিডি-র পরিণতি গুরুতর হতে পারে। এই রোগে আক্রান্তরা অপরাধবোধ, লজ্জা, গোপনীয়তা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, আর্থিক ক্ষতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মমর্যাদা হ্রাসের শিকার হতে পারেন। রক্ষণশীল সমাজে যৌনতাকে ঘিরে থাকা সামাজিক কলঙ্ক এই দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সে ক্ষেত্রে, মানসিক অবসাদও গ্রাস করতে পারে তাঁদের।

সিএসবিডি-র চিকিৎসার জন্য সহানুভূতিশীল এবং পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। থেরাপির লক্ষ্য সুস্থ যৌনতাকে দমন করা নয়, বরং ভারসাম্য, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক সুস্থতা পুনরুদ্ধার করা। কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি), সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা ব্যক্তির সমস্যা শনাক্ত করতে, বিকৃত চিন্তার ধরনকে জানতে এবং স্বাস্থ্যকর সমাধানের কৌশল তৈরি করতে সাহায্য করে।

সাইকোডায়নামিক সাইকোথেরাপি অস্বাভাবিক যৌন আচরণের অন্তর্নিহিত গভীরতর মানসিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং গভীর সমস্যাগুলোকে অন্বেষণ করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ এবং যোগাযোগ উন্নত করার জন্য এক বিশেষ থেরাপি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যখন অস্বাভাবিক যৌন আচরণের সঙ্গে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, শুচিবাই প্রবণতা কিংবা মেজাজের ব্যাধি সহাবস্থান করে, তখন প্রয়োজনে ওষুধ দেওয়া হতে পারে। অস্বাভাবিকতা দূর করার জন্য, সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটর (এসএসআরআই), মুড স্টেবিলাইজার কিংবা আবেগ-বিরোধী ওষুধও দেওয়া হয় অনেক সময়।

সম্ভবত সমাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হল — নৈতিক বিচারকে মানবিক উপলব্ধি দিয়ে বিচার করুন। অস্বাভাবিক যৌন আচরণে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা কেবল ‘অনৈতিক’ কিংবা ‘দুর্বলচিত্ত’ নন, তারা প্রায়ই গভীর আবেগীয় নিয়ন্ত্রণহীনতা, একাকীত্ব, মানসিক আঘাত কিংবা মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেন। লজ্জা কখনও হয়তো অস্বাভাবিক যৌন আচরণকে কিছুটা দমিয়ে রাখে। একইসঙ্গে, আধুনিক সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ, মানসিক স্বাস্থ্য, ডিজিটাল সীমারেখা, সম্মতি এবং অর্থপূর্ণ অন্তরঙ্গতার বিষয়ে আরও গভীর আলোচনার দাবি রাখে। আসলে, সুস্থ যৌনতা পরিমাপ করা হয় সম্মতি, মানসিক দায়িত্ববোধ, আত্ম-সচেতনতা এবং মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য দিয়ে।

মনোবিজ্ঞান এবং মনোরোগবিদ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— অস্বাভাবিক যৌন আচরণ ব্যাধি। কারণ, ‘নিম্ফোম্যানিয়া”-র মতো সেকেলে তকমা থেকে বেরিয়ে এসে আরও মানবিক ও বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে এক্ষেত্রে। তাই মনে রাখবেন, সমালোচনা করে নয়, বরং সুবিবেচিত সহানুভূতিকে মাধ্যম করে প্রতিটি অস্বাভাবিক আচরণের মানুষকে সমস্যামুক্ত হতে সাহায্য করুন। কারণ, অস্বাভাবিকতার আড়ালে একজন মানুষ থাকে, যে স্বস্তি, সহানুভূতি এবং আরোগ্য খোঁজে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...