( 3 )
স্বপ্ন দেখতে দেখতে কখন যেন বাস্তবের শিকড়টাই হারিয়ে যায়, কিংবা শিকড় ছিঁড়ে যায় একসময়। রিমি আর রায়া যখন খুব ছোটো, বিশ্বকর্মা পুজোর সময়টাতে আকাশে উড়ত রঙিন ঘুড়ি। তখন ওরা থাকত শিমুলতলার ভিটেতে। বিশাল ছাদে কচিকাঁচা আর বুড়োদের ঢল নামত। সেই দলের সঙ্গে মিশে থাকত দুই বোন।
লাটাই থেকে সুতো ছাড়তে ছাড়তে সময় সময় চোখের আড়ালে চলে যাওয়া ঘুড়ি অন্যের মাঞ্জা সুতোয় ভোকাট্টা হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যেত। সুতোকে ভুলে হাওয়ায় স্বাধীন ভাবে ভাসতে থাকা ঘুড়িটা হয়তো গাছের ডালে হোঁচট খেতে খেতে একসময় ছেঁড়া পোঁড়া পৃষ্ঠার মতো আটকে থাকত কোনও নিরুদ্দিষ্ট ঠিকানায়! সোদপুরে পাকাপাকি ভাবে ফ্ল্যাটে উঠে আসার পর রঙিন ঘুড়ির কথা ভুলেই গিয়েছিল রায়া। আকাশের দিকে তাকানোর ফুরসৎ আর ছিল না। ছিল কেবল আকাশে ওড়ার স্বপ্ন। কিন্তু এমন ভাবে মা চলে যাওয়ায় নিজেকে কেমন যেন ওই কাটা ঘুড়ির মতোই অসহায় লাগতে শুরু করেছে।
শোক ভোলার জন্য সময়ের মতো দাওয়াই আর হয় না। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হল না। রায়াদের ডুপ্লেক্স-এর সামনের রাস্তার দুপাশের ম্যাপল গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরে হাওয়ার কনকনে ভাব এল নেদারল্যান্ডস-এর ড্রিমসিম পাড়ায়। বাগানে নতুন ফুলের চারা বসাতে বসাতে মনে দোলা লাগে রায়ার। আদুরে গলায় সে মানসকে বলে, ‘চল না আবার নতুন করে স্বপ্ন সাজাই। আইভিএফ-এর প্রসিডিওর-এর ব্যাপারে ডাক্তারকে বলি। আর দেরি ভালো লাগছে না। এখন ওয়ার্ক ফ্রম হোম। আমি মেটার্নিটিতে থাকলে, তুইও কাজগুলো ম্যানেজ করে নিতে পারবি। মা তো নেই, যে সে আসতে পারবে।’
বোনডাস্ট-এর সাদা গুঁড়ো উড়োঝুড়ো মাটিতে মেশাতে মেশাতে মানস বলে ওঠে, ‘আমাদের স্বপ্ন এখন ডক্টর সোমের ল্যাব-এ ঘুমন্ত অবস্থায় সুরক্ষিত।’
—আমরা তবে দেরি কেন করছি?
—সময়টা আর একটু ভালো হোক। আগরপাড়ায় ঘরে ঘরে রোগ। পঁচিশ পয়সার জেরক্স-এর দোকানের আরাবুলদাকে মনে আছে তোর?
—আরে ওই তো, ওখানেই তো কতটা সময় কেটেছে আমাদের। অস্থির হয়েছি ভিড় দেখে। নোটস জেরক্স করার জন্য ওটাই ভরসা ছিল। অন্য জায়গায় তখন পার পেজ পঞ্চাশ পয়সা। পুরো কেমিস্ট্রি বইটা জেরক্স করতে হয়েছিল। মনে নেই তোর?
—আরাবুলদা গতকাল চলে গেছে রে। মা জানাল। ওখানকার অবস্থা ভালো নয়। তৃতীয় ঢেউ অনেকগুলো জীবন নিয়ে নিল।
—তোর মিতুকে মনে আছে?
—মিতালী চৌধুরী? দক্ষিণ পাড়া?
—ওর ভাই জিতুকে?
—হ্যাঁ। আমাদের থেকে বছর ছয়েকের ছোটো। কী সাংঘাতিক পাকা ছিল। তখন আমরাই ক্লাস নাইন। ওইটুকু ছেলে বলে কিনা আমার গার্লফ্রেন্ড কবে হবে?
—জিতু মারা গেছে।
-সেকি! কী হয়েছিল?
পোস্ট কোভিড ডিসঅর্ডার। প্যানক্রিয়াটাইটিস।
—খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। এত ভাবিস না।
—মা চলে গেল। একবার যেতেও পারলাম না।
—যাওয়া ঠিক হতো না রে। বাবাও তো বারণ করলেন।
সন্তানের কিছু হলে, বাবা-মা এসব চিন্তা করতে পারে? আসলে আমিই স্বার্থপর।
—সময় ও পরিস্থিতির উপর কারওর হাত নেই রায়া।
—আসলে আমরা স্বপ্ন দেখিনি। আমরা পালাতে চেয়েছিলাম। মধ্যবিত্ত ছাপোষা জীবন থেকে পালাতে চেয়েছিলাম।
আর একটু পরেই এ গল্পে আর এক ঝড় আসতে চলেছে। ঝড়ের পর আর একটা ঝড় এলে যেমন দিশেহারা মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে বেড়ায়, এ গল্পের ভবিতব্যও তাই। সাপ-লুডোর আটানব্বই নম্বর পর্যন্ত যে ঘুটির চালে কখনও ধোঁকা খায়নি, সামনের নিরানব্বই নম্বর ঘরের সাপের হাঁ-মুখ আচমকাই তার সামনে প্রকট হয়ে ওঠে। তাই খেলার প্রথম থেকেই হোঁচট খাওয়া ভালো।
একরকম অসময়েই রিমির ফোনটা এল। ড্রিমসিম পাড়ার ঘরে ঘরে তখন চলছে নতুন ট্রেন্ড, ওয়ার্ক ফ্রম হোম। এই সময় সাধারণত বাবা কিংবা দিদির ফোন আসার কথা নয়। ব্রেক টাইমও শুরু হয়নি। বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে রায়ার। মায়ের কথা মনে পড়ে। দিন দুয়েক ধরেই বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। গতকাল তো কাশির দমকে কথাই বলতে পারছিল না। কিন্তু সামান্য কাশি, জ্বর! কী আর এমন ব্যাপার? বরাবরই সিজন চেঞ্জের সময় বাবা একটু আধটু ভোগে। ওটা কমন ব্যাপার। মায়ের যত্নে সেরেও যেত দ্রুত। সকালের দিকে যখন হাঁটতে বেরোয়, নির্ঘাত মাফলারটা মাথায় চাপায়নি। এমন যে কেন করে? রিমির কাছে গিয়ে যে ক’টা দিন থাকবে, তেমন সুবুদ্ধিও নেই। স্বাধীনতা বিঘ্নিত হবে! নিজের বাড়ি ছেড়ে পরের বাড়ি, যতসব আজে-বাজে অজুহাত। এসব সাত- পাঁচ ভাবতে গিয়ে হাতের ফোন হাতেই বেজে বেজে থেমে গেল। ওদিকে কোডিং-ডিকোডিং-এর একের পর এক মেল ঢুকছে ল্যাপটপে। কী করা উচিত! মিনিট দশেকের ব্রেক অ্যাপিল করে একটা ফোন করে নেওয়াই যায়। ল্যাপটপটা বন্ধ করে মোবাইল হাতে নিল রায়া।
—বাবার শরীরটা বিগড়েছে। পালস রেট কম। একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
—বাবাকে ফোনটা দে।
—অত চিন্তা করিস না মা। রিমিটা ছেলেমানুষ। অসময়ে তোকে বিরক্ত করল।
বাবার গলাটা কেমন ফ্যাসফেসে শোনাচ্ছে। একটা সোঁ-সোঁ আওয়াজ হচ্ছে। কোথায় যেন ধাক্কা খাচ্ছে বাবার কণ্ঠস্বর…
বেশ কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে রইল রায়া। কিছুই ভালো লাগছে না। এক ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে সোদপুরের করুণাময়ী অ্যাপার্টমেন্টে, যে বাস্তব সে ছেড়ে এসেছে সেই কবেই! তারপর বছরে কেবল একটিবার অতিথির মতো যাওয়া আর মা-বাবার স্নেহ মেখে ফুল চার্জড হয়ে ফিরে আসা। কিন্তু সেই বাস্তব আজ ভীষণ ভাবে টানছে। মুক্তি নেই সে বাস্তবের শিকড় থেকে। একবার বাবার কাছে যেতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, সেরে যাবে বাবার শরীর।
(ক্রমশ…)





