‘ব্ল্যাকবার্ডিং’ অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ভানুয়াটু ও আশপাশের দ্বীপ থেকে হাজার হাজার আদিবাসীকে অপহরণ করে ফিজি আর অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। আখ আর তুলোর খেতে অমানবিক পরিশ্রম, রোগ, নির্যাতন, অনেকে আর কোনওদিন বাড়ি ফিরতে পারেনি। পুরো একটা প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল— পরিবার, সংস্কৃতি, পরিচয় সবকিছু হারিয়ে। আমি বললাম, ‘এটা তোমাদের জাতীয় ট্রমা, তাই তো?’

‘হ্যাঁ, অ্যান্টনি ধরা গলায় বলল। আমাদের গ্রামের অনেককে কিডন্যাপ করে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গেছে। কেউ ফেরেনি।”

যে দেশেই যাই, ঔপনিবেশিক শাসনের এই নিষ্ঠুরতার ছাপ আজও স্পষ্ট।

আজ ভানুয়াটু একটি স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র। যেখানে ঐতিহ্য, ভাষার বৈচিত্র্য আর প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি।

এরপর অ্যান্টনি আমাদের নিয়ে গেল একটা সুপ কালচারাল ভিলেজে। গাড়ি পার্ক করে বলল, ‘চলুন, আপনাদের আসল ভানুয়াটু দেখাই।’

সবুজ বন, ছোটো নদী, পাখির ডাক— আধুনিকতা যেন এখানে ঢুকতেই পারেনি। পায়ে হাঁটা পথ, খোলা উঠোন, ধীর জীবন। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন কাজ, নাচ, গান, রান্না, শিকার আর বিশ্বাস, সবকিছু নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা হল। পর্যটকদের জন্য আয়োজন করা হলেও আন্তরিকতার কোনও অভাব ছিল না।

সেখান থেকে রওনা দিলাম ব্লু লেগুনের দিকে। মাঝপথে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে অ্যান্টনি বলল, ‘চলুন, আপনাদের ভানুয়াটুর বিখ্যাত আনারস খাওয়াই।”

রাস্তার ধারে ছোটো ফলের দোকান। আপত্তি করেও লাভ হল না। সবাই মিলে আনারস খেলাম। আমি বারবার টাকা দিতে চাইলে অ্যান্টনি হাসতে হাসতে বলল, ‘এটা আমার তরফ থেকে ট্রিট।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ব্লু লেগুন৷ গাছের ছায়া, শান্ত জল, প্রাকৃতিক সুইমিং স্পট। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার আদর্শ জায়গা। স্থানীয় পরিবারগুলো ছুটির দিনে এখানে আসে। আজ ভিড় একটু বেশি, কারণ আমাদের জাহাজের অনেক যাত্রীই এসেছে এখানে৷

ব্লু লেগুনের বিশেষ আকর্ষণ গাছের উপর থেকে জলে ঝাঁপ দেওয়া। বড়ো গাছের সঙ্গে বাঁধা কাঠের মাচা থেকে কেউ একা, কেউ আবার হাত ধরে, দল বেঁধে ঝাঁপ দিচ্ছে।

আমি অবশ্য শুধু ছবি তুলেই ফিরে এলাম।

এরপর অ্যান্টনি আমাদের নিয়ে গেল টার্টল বিচে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ টার্টল স্যাংচুয়ারি। নীল, স্বচ্ছ জল, সাঁতার কাটার জন্য একেবারে আদর্শ। বিচের একপাশে তারকাঁটায় ঘেরা স্যাংচুয়ারির ভিতরে ছোটো ছোটো কচ্ছপদের নিরাপদে রাখা হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে আহত কচ্ছপদের উদ্ধার করে এখানে এনে সুস্থ করে তোলা হয়। একটু বড়ো হলে, পুরোপুরি সুস্থ হলে, তাদের আবার সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়।

জলে নেমে কাছ থেকে কচ্ছপদের দেখা, তাদের স্পর্শ করার অভিজ্ঞতাটা মনকে এক অদ্ভুত শান্তি দিল।

কিন্তু ঘড়ির কাঁটা দ্রুত দৌড়াচ্ছে। আমাদের ফিরতে হবে। একটু দেরি হলে জাহাজ অপেক্ষা করবে না। তাই আর সময় নষ্ট না করে গাড়ি ছুটে চলল পোর্টের দিকে।

পোর্ট ভিলাকে বিদায় জানিয়ে আবার জাহাজে ফিরে এলাম, সঙ্গে নিয়ে এলাম বেশ কিছু দুর্লভ স্মৃতি।

আজ রাতে জাহাজের মুখ্য ডাইনিং হলে আছে ড্রেস আপ নাইট। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর শরীর একটু ক্লান্ত, তাই বিকেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শুরু হল প্রস্তুতি। সাধারণের মধ্যেও নিজেকে অসাধারণ করে তোলার চেষ্টা।

করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, সবাই যেন বদলে গেছে। কেউ ঝলমলে গাউনে, কেউ নিখুঁত স্যুটে। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর লাগছে মুখের হাসিগুলো। এই হাসিতে অফিসের ক্লান্তি নেই, দৈনন্দিন জীবনের তাড়া নেই, আছে শুধু আজকের রাতটা উপভোগ করার ইচ্ছে।

ডাইনিং হলে ঢুকতেই আলো বদলে গেল। ঝাড়বাতির নরম আলো, টেবিলে সাদা কাপড়, গেলাসে রঙিন পানীয়। চারদিকে মৃদু কথাবার্তা, হাসি, কাঁটা-চামচের টুংটাং— সব মিলিয়ে এক উৎসবের আবহ।

এখানে খাবার শুধু খাবার নয়, এটা একটা অনুষ্ঠান। ধীরে বসা, ধীরে খাওয়া, ধীরে কথা বলা। ওয়েটাররা প্রায় নিঃশব্দে কাজ করে, যেন রাতের ছন্দে কোনও ছেদ না পড়ে।

ড্রেস আপ নাইট হঠাৎ শেষ হয়ে যায় না। সে ধীরে ধীরে ফিকে হয়, একটা ভালো সন্ধ্যার মতো। এই রাতের সৌন্দর্য পোশাকে নয়; সেটা থাকে সেই মুহূর্তে, যখন আমরা একটু সময় নিয়ে নিজেদের সুন্দর করে তুলতে চাই।

রাতের জাহাজ আরও মোহময়। চারদিকে আলোয় ভরা। ডিনারের পর আমরা এসে দাঁড়ালাম থিয়েটারের দরজার সামনে। ভিতরে অপেক্ষা করছে অন্য এক জগৎ। নরম আলো, সারি সারি আসন, বন্ধ পর্দা, কিন্তু বাতাসে একটা প্রতীক্ষা ভাসছে।

হঠাৎ আলো নিভে গেল। এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা, তারপর সংগীত।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...