পর্দা উঠতেই রং ছড়িয়ে পড়ল মঞ্চে। নাচ, গান, অভিনয়, সব এত নিখুঁত যে মনে হয়, বিশাল সমুদ্রের মাঝখানে এমন পারফরম্যান্স কীভাবে সম্ভব! শিল্পীদের শরীরী ভাষা, কণ্ঠের ওঠানামা, আলো-ছায়ার খেলা— সব মিলিয়ে মঞ্চটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।

কখনও জোরে হাততালি, কখনও নিঃশব্দ মনোযোগ৷ কখনও হাসি, কখনও বিস্ময়। মাঝেমাঝে ভুলেই যাই, আমি আসলে একটা জাহাজে বসে আছি, যেটা তখনও সমুদ্র চিরে এগিয়ে চলেছে।

থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ডেকে দাঁড়াতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগল। দূরে অন্ধকার জল, তার উপর চাঁদের আলো। এই রাতটা শুধু দেখার নয়, অনুভব করার। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে তারা দেখার সুখ হয়তো জীবনে বারবার আসে না। মুহূর্তটাকে হাতছাড়া করতে মন চাইছিল না। তাই উপরের ডেকে গিয়ে খোলা আকাশের নীচে সোফায় শুয়ে রইলাম।

কাল রাতে অনেক দেরিতে কেবিনে ফিরেছিলাম। তাই আজ সকালে ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে। বাইরে বেরিয়ে দেখি, জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে মাঝসমুদ্রে। কাছেই একটি ছোটো দ্বীপ, সবুজ গাছে ঢাকা। দূর থেকে তেমন কিছু দেখা যায় না। দ্বীপের চারপাশে বালির চর, তাই জাহাজটা অনেকটা দূরেই নোঙর বেঁধেছে।

বুঝতে অসুবিধা হল না এটাই আমাদের শেষ গন্তব্য— মিস্ট্রি আইল্যান্ড। ভানুয়াটুর আরও একটি ছোটো দ্বীপ।

মিস্ট্রি আইল্যান্ড কোনও সাধারণ দ্বীপ নয়। এখানে বন্দরের কোলাহল নেই, শহরের চিহ্ন নেই, এমনকী কোনও স্থায়ী বসতিও নেই। শুধু নীল জল, সাদা বালি, আর এমন এক নীরবতা— যা প্রশ্ন করে না, উত্তরও চায় না।

এই দ্বীপের আসল নাম ইনিউগ আইল্যান্ড। মিস্ট্রি নামটা দিয়েছে বহিরাগতরা। কিন্তু দ্বীপে পা রাখলেই বোঝা যায়, রহস্য নামের জন্য নয়, অনুভূতির জন্য।

এখানে কোনও রাস্তা নেই, কোনও গাড়ি নেই। দ্বীপটা পায়ে হেঁটেই ঘুরে দেখা যায়। চারদিকে শুধু সমুদ্র। নীলের এত শেড আগে কখনও চোখে পড়েনি। হালকা ফিরোজা থেকে গভীর নীল, যেন জল নিজেই রং বদলাচ্ছে।

দ্বীপে স্থায়ী বাসিন্দা না থাকলেও আশপাশের দ্বীপ থেকে স্থানীয় মানুষজন আসে। তারা জানে কবে জাহাজ আসবে। সেই হিসেবেই সকালে এসে এই দ্বীপটাকে সাজিয়ে তোলে পর্যটকদের জন্য। ছোটো ছোটো হস্তশিল্পের স্টল, শেল-জুয়েলারি এবং কাঠের তৈরি শো-পিস পাওয়া যায় ওই দ্বীপে। কোথাও বডি ম্যাসাজের ব্যবস্থা, কোথাও কয়েকজন মহিলা ছোটো ছোটো বাচ্চাদের চুলে আফ্রিকান ধাঁচের বেণি বেঁধে দিচ্ছে। কোথাও কোনও তাড়া নেই, দামাদামিও নয়, সবকিছুই ধীর, সহজ, স্বাভাবিক।

দিনের শেষে জাহাজে ফেরার সময় মনে হল, এখানে সভ্যতা হয়তো এক ধাপ পিছিয়ে আছে, কিন্তু শান্তির কোনও অভাব নেই। মানুষগুলো ভীষণ সৎ, মুখে সহজ হাসি, চোখের ভাষায় কোনও অভিনয় নেই।

ডিনারের পরে উঠে গেলাম উপরের ডেকে। খোলা ডেকে সিনেমা দেখা, ক্রুজে এই অভিজ্ঞতা থেকে কী করে বঞ্চিত হই! দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে থেমে গেলে, ডেকের আলো নরম হয়ে আসে। বিশাল স্ক্রিনটা ডেকের একদিকে জ্বলে ওঠে, আর ঠিক তার পিছনেই অন্ধকার সমুদ্র-ঢেউয়ের শব্দ যেন সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

হালকা ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগে। কেউ কম্বল জড়িয়ে বসেছে, কেউ ডেকচেয়ারে পা তুলে আরাম করে। হাতে পপকর্ন, আইস ক্রিম কিংবা গরম কফির কাপ। চারপাশে নীরবতা, কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই আছে সমুদ্রের গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস। সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

খোলা আকাশের নীচে, সমুদ্রের বুকে বসে সিনেমা দেখা— এটা শুধু বিনোদন নয়, এটা একটা স্মৃতি। এমন এক রাত, যা পরে মনে পড়লে মনে হয়, জীবন আসলে ঠিক এইরকমই হওয়া উচিত— একটু ধীরে, একটু নীরবে, আর অনেকটা আকাশ নিয়ে। দেখতে দেখতে দিনগুলো কেটে গেল। এবার ঘরে ফেরার পালা। জাহাজ আবার অস্ট্রেলিয়ার পথে যাত্রা শুরু করেছে। ফেরার পথে দু’টো দিন বেশ খানিকটা সময় কাটালাম জাহাজের লাইব্রেরিতে।

ক্রুজের শেষ সকালটা ছিল অদ্ভুত। সব কিছু ঠিক আগের মতোই আছে— সমুদ্র, আকাশ, ডেকের বাতাস। তবু কোথাও একটা বিদায়ের সুর ভাসছে।

জাহাজ ধীরে ধীরে বন্দরের কাছে আসে। স্থলভূমির রেখা স্পষ্ট হয়। কোলাহল, নিয়ম, সময়— সব আবার অপেক্ষা করছে। তবু জানি, এই ক্রুজ এখানেই শেষ নয়। কারণ সমুদ্র একবার যে ধৈর্য শিখিয়ে দেয়, সে শিক্ষা আর ফেলে আসা যায় না।

জাহাজ থেকে নামার সময় আর পিছনে তাকাইনি। কিছু বিদায় চোখে রাখলে ভারী হয়ে যায়। ভালো ভ্রমণগুলো বুকেই রাখা ভালো।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...