যমালয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। অন্ধকারের স্তব্ধতায় শাস্তির আর্তনাদ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে নিয়ন বাতি জ্বলে উঠেছে। মেঘের সুড়ঙ্গের ভিতর এত প্রকোষ্ঠ যে, কোথায় কোন বিভাগের শাস্তি হচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বিচারালয়ের এক কোণে কফিশপ। তার পাশেই পানশালা। পানশালার ভিতর থেকে ডিজের আওয়াজ আসছে। বিচারাধীন কবি কাঠগড়ায়। যম ও চিত্রগুপ্ত কফি নিতে গেলেন। সভাসদরা পানশালায়।

কয়েকজন প্রহরী কবিকে পাহারা দিতে লাগল। কিছু তরুণ-তরুণী হইহই করতে করতে ডিজে থেকে বেরিয়ে এল। চকচকে চেহারা দেখে মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে ডিজে দেখতে এসেছিল। তারা কবির দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসল, তারপর ফিসফিস করে কী সব বলতে বলতে বাইরে চলে গেল। কবির মনে পড়ে যাচ্ছে কফিহাউসের কথা, আড্ডার কথা, সেখানে প্রজাপতির মতো উড়ে আসা তরুণী কবি, পাঠকদের কথা, যারা ঘিরে থাকত, সই নিত। আজ কেউ নেই। তেষ্টায় প্রাণ ছটফট করছে কবির। পানশালার দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গেলেন কবি।

হঠাৎ নজরে পড়ল পানশালার পাশে একটা অন্ধকার প্রকোষ্ঠ। কবি দেখলেন ফুটন্ত তেলের থালাতে একটা রুপোর পাত্র। তাতে কী যেন একটা ফুটছে। ধোঁয়া উঠছে। আর একজন হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাত্রটায় জিভ দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতবার জিভ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, গরম পাত্রে জিভ ঠেকে যাচ্ছে আর আর্তনাদ করে সরে যাচ্ছে লোকটা। পিছনে দু’জন পেয়াদা চাবুক নিয়ে দাঁড়িয়ে, যেই মুখ সরিয়ে নিচ্ছে অমনি চাবুক মেরে বলছে, ‘খা… খা।’ আবার ঠেকাচ্ছে। আবার চিৎকার।

কবি এই দৃশ্য দেখে থাকতে না পেরে পাহারারত এক প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কী হচ্ছে?

প্রহরী— উনিও আপনার মতো একজন কবি। যিনি পুরস্কারের লোভে হেন কাজ নেই যে করেননি। এমনকী নিজের বন্ধু সৎ কবিকেও ল্যাং মেরে পুরস্কার হাতিয়েছেন। ওই যে রুপোর পাত্রটা দেখছেন, ওটাই ওনার স্মারক। ওতে গরম জল আছে। ওকে তিনদিন জল খেতে দেওয়া হয়নি।

বিচার পর্ব

চিত্রগুপ্ত— বলুন যাহা বলিবেন সত্য বলিবেন, কাব্য করিবেন না।

কবি— যাহা বলিব সত্য বলিব, কাব্য করিব না।

চিত্রগুপ্ত— আপনি যেদিন প্রথম ফেসবুকে লগ ইন করলেন, সেদিন ঠিক কী ভেবেছিলেন?

কবি— ভেবেছিলাম নতুন কবিরা আসবে আর আমাকে মাথায় তুলে নাচবে।

চিত্রগুপ্ত— তা হয়েছিল?

কবি— আলবাত হয়েছিল স্যার, আমি একটা পোস্ট দিলেই হাজার লাইক। চিত্রগুপ্ত— তা আপনি তরুণ কবিদের নিয়ে পোস্ট দিতেন?

কবি— তেমন না, মানে ওই প্রয়োজন বোধ করলে দু-একটা।

চিত্রগুপ্ত— হেঁয়ালি করবেন না, এটা আপনার নাটক করার জায়গা না, প্রয়োজন মানে?

কবি— স্যার, প্রয়োজন বলতে আমি একটু উঠি আর আমাকে নিয়ে ও একটু উঠুক এমন।

চিত্রগুপ্ত— মাই লর্ড নোট করবেন। কবিবর নিজের প্রয়োজনে অন্যের পোস্ট শেয়ার করতেন। অর্থাৎ খারাপ কবিতাও এর মধ্যে থাকত। নিজের প্রয়োজনে নিজের পরিচিত অনুজ কবিকে সুযোগ করে দেওয়া এক অপরাধ।

যম— নোট হল।

চিত্রগুপ্ত— আপনার সব বই কি নিজের লেখা? আপনি হলপ করে বলতে পারেন, আপনি একটিও শব্দ, একটি লাইনও টোকেননি?

কবি— তা কী করে বলি! এত বই পড়েছি, দু-একটা তো ঢুকে যেতেই পারে।

চিত্রগুপ্ত— আমার খাতা বলছে, প্রথম দিকে অনিচ্ছাকৃত টুকলেও, পরের দিকে বেশ কিছু ইচ্ছাকৃত টুকেছেন।

কবি— কোনও প্রমাণ আছে?

চিত্রগুপ্ত— আপনি পুরাণ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, উপনিষদ, গণিত, ফিজিক্স, জেনেটিক্স, অন্যান্য বিষয় কিছুই বাদ দেননি টোকা থেকে।

কবি— লেখার মধ্যে তো সবই থাকবে।

চিত্রগুপ্ত— তাহলে আপনার কী থাকল, খালি কলম ?

কবি— মানে?

চিত্রগুপ্ত— নোট করুন মাই লর্ড, ইনি প্রথমে অনুপ্রাণিত লেখা, পরে জ্ঞান হতে মহান কাব্য ও অন্যান্য ভালো বই, তরুণ কবিদের ভালো কবিতার সার টুকতে শুরু করেন।

চিত্রগুপ্ত— আপনি প্রেম করেছিলেন?

কবি— কবি তো প্রেমিক। তার প্রেম সদা চঞ্চল। অনেকবার প্রেমে পড়েছি।

চিত্রগুপ্ত— তার মানে আপনি বহুগামী ছিলেন। এক স্ত্রী-তে মন ভরেনি।

কবি— ঠিক সেরকম নয় হুজুর। কাব্যি করতে গেলে প্রেম দরকার, বিরহ দরকার। এমনকী নারী শরীরের রূপ জানতে হয়, দেখতে হয়। তবে খারাপ চোখে না স্যার ।

চিত্রগুপ্ত— মাই লর্ড, কবি নিজেই স্বীকার করছেন, কবিতা লেখার জন্য বাস্তবে অবাস্তবে বহু প্রেম করেছেন, এমনকী নারী শরীরও নিজের কাব্যে ব্যবহার করেছেন। মর্তে যেখানে তাকানোই শ্লীলতাহানি, সেখানে উনি নিজের প্রয়োজনে তাকে নিজের মতো সাজিয়েছেন।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...