শুভংকরের সারাক্ষণ উশখুশ উশখুশ করে কাটছে। কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার গিয়ে কিচেনে চোরের মতো লুকিয়ে উঁকি দিয়ে এলেন। সোমাকে দেখে এলেন। স্বাধীনতা দিবসের ছুটির দিনটা সব কাজ মাটি করে দিল এই সোমা সুন্দরী! একটা লেখা নিয়ে বসার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অশান্ত মনে লেখার কাজ হয় না।
সোমা বড়ো একটা প্লেটে ফুলকো লুচি-তরকারি নিয়ে দ্রুত পায়ে ব্যালকনিতে এসে বলে, ‘ধরো। খেয়ে দ্যাখো। বউদির লুচিও তো খেয়েছ। আজ আমার লুচি খেয়ে দ্যাখো। সকাল সাড়ে ন’টা তো বাজে। পেটে তো কিছু পড়েনি। বউদি জানে তুমি রতনের কেবিনে গিয়ে চা—জলখাবার খেয়ে আসবে। তাহলে আমাকে কীসের জন্যি রাকা শুনি?’
শুভংকর লুচি-তরকারি মুখে দিয়ে কথা বলে ওঠেন, ‘ভারি চমৎকার লুচি করেছিস। বাঃ! তরকারিটাও ফার্স্ট ক্লাস। তুইও খা। তোর জন্য করিসনি?’
সোমা আঁচলে মুখের ঘাম মুছে নিয়ে বলল, ‘তুমি মেয়েদের চেনো না। মেয়েরা খাওয়ার চে খাইয়ে বেশি সুখ পায়।”
শুভংকর ভাবেন, কালে কালে মেয়েদের মুখের সংলাপ একইরকম হয় কী করে? চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ কি সেই একজনেরই? সংলাপে যে কোনও রকমফের নেই! শুভংকরের মা—ও তো বলত এই কথাটাই। ছোটোবেলা থেকে মাকে দেখেছেন তিনি। বাড়িতে লোকজনের আসা—যাওয়া লেগেই থাকত। দুপুরেও অনেকে হঠাৎ এসে পাত পেড়ে খেয়েছে। ওই তিথি মেনে না আসা অতিথি আর কী। সেই অতিথির ঠ্যালা সামলাতে হতো মাকেই। মায়ের কোনও ক্লান্তি ছিল না। তখন গ্যাস আভেন ছিল না। স্টোভ জ্বেলে বসিয়ে দিত ভাত। মা বলত, ‘অতিথি নারায়ণ। দুপুরবেলা কি ভাত না খাইয়ে ছাড়া যায়?”
কিন্তু, মা বা সোমা কারও স্কুলেই পড়েননি দোলন। তাই, বাড়িতে অতিথি এলে তার মুখে অন্য কথা— ‘ঝামেলা বাড়িও না। মানে মানে বিদেয় করো।’ এ নিয়ে শুভংকরের মনের ভিতর একটা কাঁটা খচখচ করে। সোমার তো ওকে লুচি করে খাওয়ানোর কথা নয়। ও তো আর নিজের জন্য করেনি, খায়ওনি। তাহলে? যে ভালোলাগাটা মায়ের মতো সোমারও আছে, দোলনের তা কোনওদিনই ছিল না।
ওদিকে, রান্নার কাজ শেষ করে সোমা বেসিনে সাবান ঘষছিল। ব্যালকনিতেই সুবোধ বালকের মতো বসে আছেন শুভংকর। তবে মাঝে কয়েকবার চোরের মতো কিচেনে উঁকি দিয়ে এসে সুবোধ বালক হয়ে বসেছেন। সোমা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে শুভংকরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, “আমার তো বাবা নেই। জন্মে ইস্তক দেখিনি বাবাকে। তাই…’ বলে থেমে যায় সোমা।
শুভংকর বলেন, ‘তাই কী? বল, থামলি কেন?’
সোমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘না কিছু না। ও তুমি বুঝবে না।’ নিজেকে সপাটে সামলে নিয়ে সোমা বলে, “ভালো কথা। তোমাদের যখন এত টাকা, তখন এখানে সেখানে না ছড়িয়ে, বউদিকে বরং বোলো আমার মাইনেটা একটু বাড়িয়ে দিতে।”
—কেন? তোর বউদি কি তোকে কিছু কম মাইনে দেয় নাকি? আর এখানে সেখানে ছড়িয়ে না দিয়ে মানে? টাকা আবার আমরা এখানে সেখানে ছড়িয়ে দিই কোথায়?
সোমা ট্যাক থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে বলে, “এটা ধরো। এটা ওই ডাইনিং টেবিলের নীচে পড়েছিল। তাই বলছি। সিওর বউদির টাকা।’
শুভংকর হাত বাড়িয়ে টাকাটা নেন। বলেন, ‘তাই হবে। তোর বউদিরই টাকা।’
সোমা ‘আমি আসছি’ বলে চলে যায়।
মধ্যমগ্রামে স্কুলে স্বাধীনতার পতাকা তোলার পর্ব সেরে গিন্নি দোলন ফিরলেন দুপুর গড়িয়ে। ফিরেই তাঁর প্রথম কথা, ‘সোমাকে একটু চোখে চোখে রেখেছিলে তো? মেয়েটার ভীষণ হাতটান স্বভাব।”
খুব গোপনে গোয়েন্দাগিরি করার নির্দেশ দোলনের মুখে সকালেও একবার শুনেছেন শুভংকর। এবার তাঁর চিবুক শক্ত হয়। তিনি পাঞ্জাবির পকেট থেকে পাঁচশো টাকার নোটটা দোলনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এটা তোমার টাকা। ওই ডাইনিং টেবিলের নীচে নাকি পড়েছিল। সোমা-ই পেয়ে আমায় ডেকে দিয়ে গেছে।’
(সমাপ্ত)





