প্রেম-অপ্রেম

তারুণ্যে ভরপুর সেগুনগাছগুলো অল্প বাতাসেই বেশ মাথা নাড়ায়। মেন রোডের ধারে বাড়ি বলে দূষণের ছাপ বাড়ির গায়ে পড়েছে। সেগুনগাছগুলোর পাতার উপরেও। কর্পোরেশনের জল ইদানীং মানে কয়েক বছর হল চালু হয়েছে। সে জল নিতে হলে ছ’খানা গাছের মাঝবরাবর হেঁটে যেতে হয়। গাছগুলোর শিকড় এখনও পোক্ত নয়। মোটে পোক্ত নয়, বলতে গেলে কচি-ই। পাথুরে শক্তমাটি ভেদ করে মাটির গভীরে যেতে সময় চাই। অথচ কর্পোরেশনের জল এখন ঘরে ঘরে। দু’দিন পর পর রাস্তা ফুটো করে পাইপ বসে যায়। ঘরে পাইপ ঢোকা মানে আর রাস্তার কলে লাইন দিতে হয় না।

মনোজিৎ ভেবেছিল ওসব ঝামেলায় যাবে না। কুয়ো আছে। ভাবনা কী? গ্রুপ ডি-তে চাকরি করেও রিটায়ারের সময় দেদার টাকা এসেছে হাতে। তো, এত টাকা কি সব ভবিষ্যতের ভাঁড়ে জমা হবে। বর্তমান যদি হাঁপায়, ভবিষ্যৎ আসবে কী করে? সবকালেই টাকার খেলা চলে। ছেলে কুণাল বুদ্ধি দেয় বাপকে। মাধ্যমিক পাস কুণালের মাথায় বুদ্ধি গজগজ। কুয়ো এখন সমাজে অচল। পরিশ্রুত জল না খেলে সোসাইটিতে মান থাকে না। সোসাইটি এখানে পায়েল। কুণালের ধ্যান-জ্ঞান। সুতরাং বাড়িতে কর্পোরেশনের জল এল। দুটো সেগুনের মাঝবরাবর পাইপ ঢুকে গেল। মনোজিৎ স্নেহভরে সেগুনদের দ্যাখে। একদিন এরা মহীরুহ হবে। এত বড়ো বড়ো পাতা। চমৎকার বাতাস দেবে। জল এসেও স্বস্তি হয়েছে। ছেলেটা খুশি। মনোজিতের হাতে এখনও প্রচুর পয়সা।

শ্যালক বিবস্বান এসেছে জলপাইগুড়ির আদরপাড়া থেকে। এসেছে চকচকে অল্টো চেপে। গাড়ির হর্নে অ্যাম্বুলেন্সের ধামাকা। দেখেশুনে কুণালের মাথা খারাপ। মাতুলের প্রশ্রয় মিশে গেল এর সঙ্গে। জামাইবাবুকে আড়ালে ডেকে নিল বিবস্বান। সানগ্লাস খুলে পকেটে ঢোকাচ্ছে ও। দেখে খাপে ঢাকা ছুরি ভেবে চমকে উঠেছিল মনোজিৎ। দিনকাল ভালো নয়। স্বজনকেও ভয় হয়। হাতে পয়সা এসেছে কিনা!

‘বুদ্ধি খরচা করো মনোজিৎদা। সঙ্গে টাকাও। ভবিষ্যৎ তোমার ছেলে। ভয় কী?’ বিবস্বানের ধূর্ত চোখে বদবুদ্ধির পটাকা ফোটে। শ্যালককে খুব একটা বিশ্বাস করে না মনোজিৎ। নিজের লোককেই ভয় বেশি। কারণ, ঘরের খবর সে-ই জানে বেশি, দুর্বলতার সুযোগও সে-ই নেবে বেশি। ইদানীং কুণালের মন উড়ু উড়ু। পকেটে দামি মোবাইল। দামি বাইক। অ্যান্টি ড্যানড্রফ শ্যাম্পুর চুলে হাইলাইট। হাসি-কাশি সবই চেঞ্জ হয়ে গেছে ছেলের। মামার দেখাদেখি এখন আবার অল্টো না চায়।

জামাইকে আনমনা হতে দেখে সাবধান হল বিবস্বান। মেপে পা ফেলতে হবে। বিবস্বানের পরিচিত মানে সুপরিচিত সোমেশ দাসের মেয়েকে ছেলের বউ করে মনোজিতের ঘরে ঢোকাতে হবে। এ কাজটা পারলে সোমেশের কাউন্সিলার ভাই দীপেন দাসের নেকনজর পাবে বিবস্বান। নজরটা ঠিকঠাক পেলে ঠিকেদারির ব্যাবসা জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। সেই ক্ষীরে কিশমিশ আর এলাচের গন্ধ। লোকবলঅলা সংসারে অর্থবল না থাকায় কাজু-টাজু অনেক দূরের বস্তু ছিল। ইদানীং অবস্থা পালটেছে। তাই মাঝেসাজে রূপশ্রী সিনেমা হলের পাশের মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে ছানা আনে ছেলেদের জন্য। আপেল আনে বিধান মার্কেট থেকে। তাও শালা দাম কম নাকি?

‘ছেলেকে কিছু তো করে দিতে হবে। মার্কেট প্লেসে একটা স্টেশনারি দোকান দিয়ে দিই?’ মনোজিৎ শ্যালকের চতুর পরামর্শ চায়। শ্যালকটাকে খুব বিশ্বাস করে না মনোজিৎ। বিবস্বান এত টাকা পায় কোথায়? জাল নোট-ফোটের কারবার করে না তো!

‘তুমি জানো মনোজিৎদা, মার্কেট প্লেসে অ্যাডভান্স কত দিতে হয়? বাড়ির সামনের সেগুন কেটে ফ্যালো। দোকান লাগিয়ে দাও। ফাইন।’

‘সেগুন?’ অবাক হয় মনোজিৎ, ‘ওতো সবে বাড়ছে। শিকড় নড়বড়ে। কেটে কী লাভ? তাছাড়া শেকড় মাটির ভেতরে যাবে, তবেই শক্ত হবে। পোক্ত হবে!’ মনোজিৎ বিড়বিড় করে।

‘ধুর! মাটি শক্ত হয়ে উঠেছে। শেকড় বেশি গভীরে যাবে কী করে? আর মাটি কোথায়? সবই পাথর।’ বিবস্বান শব্দ না করে হাসতে থাকে– ‘পড়াশোনা ছেড়ে না দিলে ও একদিন অফিসার হতে পারত। স্টেশনারি দোকান ওকে মানায় না! এসটিডি বুথ খুলে দাও। সঙ্গে ফিল্মের সিডি, মিউজিক সিডি, মোবাইলের হ্যান্ডসেট… খুব চলবে।’ বিবস্বান সন্তর্পণে মূল ঘটনার দিকে এগোয়– ‘এখন শিলিগুড়ি জমে উঠেছে। নানা ধরনের লোক ভিড় জমাচ্ছে এখানে। আরে জামাইবাবু, তুমি তো পারলে না! ছেলেকে টাকা ধরতে শেখাও। এরপর বিয়ে আছে, ভালো মেয়ে চাই, তাই না? কচি সেগুনই বেচে দাও। শেকড়বাকড় বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো, বুঝলে?’

শ্যালকের ইঙ্গিতমতো শোরুম খুলে দিয়েছে মনোজিৎ। ‘দোকান’ শব্দটা পছন্দ নয় কুণালের। আসলে ইদানীং, অনেক কিছুই ঠিকঠাক বোধগম্য হচ্ছে না। শিলিগুড়ির জল বাতাসে কীরকম একটা গন্ধ ভাসছে। শপিং মল, বিগবাজার, সিনেম্যাক্সে বিদেশি ছবি…। সানি আর বাসব সেদিন কোন হোটেলে নাকি ফ্যাশন শো দেখতে গেছিল। একটা মডেল নাকি দীপিকার মতো দেখতে। দীপিকা পাড়ুকোন। পায়েলও তো দীপিকার মতো দেখতে। ওরও খুব মডেলিং-এর শখ। লোকাল কেবল চ্যানেলে অ্যাংকারিং করে। পরিচিত মুখগুলো কী করে যেন ক্যামেরার মুখ হয়ে উঠেছে। মাথাটা পাগল পাগল ঠেকে কুণালের। অনেক টাকা চাই। ইদানীং পায়েল বড্ড উড়ু উড়ু করছে!

বিবস্বান জানতো এমনটাই হয়ে থাকে। সময়টা বড্ড উদ্ভ্রান্ত। বয়সটাও। কী করবে কেন করবে বুঝতে পারছে না এরা। হঠাৎ করে মোটা টাকা হাতে এসে যাওয়ায় টলমল করছে দিদির পরিবার। বর্ধমান রোডে বিরিয়ানি খাওয়াতে নিয়ে গেল ভাগ্নেকে। সেখানে বসে জীবনের মূল অর্থ, অর্থ বিনা অনর্থ সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান দিল বিবস্বান মামা। বিরিয়ানির পাশাপাশি মামার কথা গিলছিল ভাগ্নে। শেষে তুরুপের তাস বের করল বিবস্বান– ‘বিয়ে কর। একটা বিয়ে তোকে করতে হবে।’

‘সে তো করব। আগে দাঁড়িয়ে নিই!’ কুণাল মৌরি চিবুচ্ছিল।

‘কবে? বুথ আর সিডির শোরুম তাড়াতাড়ি দাঁড়াতে দেবে? টাকা চটপট ধরতে চাইলে ডিসিশনও চটপট নিবি। দু’হাত ভরে পাবি, এমন একটা বিয়ে চাই। সঙ্গে পাওয়ারফুল শ্বশুর।’

কুণাল ভাবছিল পায়েলের কথা। পায়েল কোনওদিন কি মডেল হতে পারবে? ওর বাবা প্রাইমারি স্কুলের রিটায়ার্ড মাস্টারমশাই। কখনও তোবড়ানো স্কুটি চেপে নিউ সিনেমার পেছনে শেষবেলায় ঝড়তি পড়তির বাজার করে। লোকটা কুণালকে কতটা সাপোর্ট দেবে? কিন্তু পায়েল? দীপিকার মতো টোল ফেলে হাসে। পায়েলকে ছেড়ে দেবে? দিয়ে? টাকার বান্ডিল নিয়ে কে আর আসবে কুণালকে শাদি করতে?

‘আমার উপর ছেড়ে দে! তোর মত আছে মানে বাড়িতে সানাই বাজল বলে। রাজ ক্যাটারারকে রেডি থাকতে বলিস।’ হাসতে থাকে বিবস্বান। কুণাল কিন্তু কিন্তু করে– ‘আমার একটা রিলেশন আছে। এখন… পয়সা নেই তাদের। কী করা উচিত?’ কুণাল মোবাইল ফোনে পায়েলের হাসিমুখ দ্যাখে– দেখতে ফাইন। দারুণ নাচে। হিন্দি ডান্স। ‘ধুর! বলে দে শোরুম চলছে না! বাবার হাতে টাকা এসেছে সেকথা বলেছিস নাকি? খবরদার! শোন্, প্রেম করবি টাকার সঙ্গে। বাকি সব ফালতু। জীবনে টাকা থাকলে সব থাকে কুণাল, টাকা নেই মানে, তুমি ফালতু।’

‘বাবার হাতে টাকা কোথায়? আমার শোরুম, জলের লাইন, ফ্রিজ, কুলার, ডাইনিং টেবিল, মায়ের সোনার বালা, জামাইবাবুর জন্য সোনার চেন, দিদির ঝুমকো… মেঝেতে টাইলস…! কম লাগল?’ কুণাল হতাশ– ‘রিটায়ার করতে করতেই টাকা হাওয়া।’

‘শোন, তাহলে এখনই তোর টাকার দরকার। প্রথম কাজ হল প্রেমিকাকে ছেঁটে দে!’

প্রায় চমকেই উঠল কুণাল। কত সহজে বলে ফেলল মামা কথাটা। কী ভাববে পায়েল? সম্পর্কটা টেনে চলেছিল কুণালই। অথচ এখন ও-ই পিছিয়ে যাচ্ছে! অথচ কাজটা করতে হবে! মামা ভুল বলেনি কিছু! পায়েলও নাচতে চায়। বিখ্যাত হতে চায়। বিয়ে করতে চায় না। তবু… একটা প্রেম প্রেম ব্যাপার তো ছিল। কিন্তু মামা যা বলে, তা ঠিকই!

বিকেলে হুক্বাবারের পরের গলিতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেখানো কথা উগরে দেয় কুণাল। অবাক চোখে ওকে দেখল পায়েল। অবশ্য খুশিই হল। কত রঙিন দুনিয়ার হাতছানি চারধারে। রিয়ালিটি শো-এ একটা সুযোগ করে দেবে সুরযদা। এখন কেউ কুণালের সঙ্গে প্রেম করে?

পায়েলকে ছেঁটে দিয়ে ফিরে আসতে আসতে শাহরুখের দেবদাসের ডায়লগ বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মনেই করতে পারল না। সময়মতো কিচ্ছু মনে পড়ে না। অথচ মনটা খারাপ খারাপ লাগছে যেন। পাঁচদিন পরে কাউন্সিলারের ভাইয়ের মেয়েকে দেখতে গেল ও। মনোজিৎ চুপচাপ মুখবন্ধ করে চশমা পরে বসে আছে। বড়োলোকের উচ্চ মাধ্যমিক পাস মেয়ের জন্য কুণাল কেন? কুণাল কি কিছু আন্দাজও করতে পারে না! মেয়েটাই বা রাজি হল কেন কুণালকে বিয়ে করতে? বাবার প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না কুণাল। পারে না বলেই সারা বিকেল সেভকে গিয়ে কাটাল একা একা। সন্ধে নাগাদ বাড়ি ফিরছিল স্পোর্টিং ক্লাবের পাশ দিয়ে। পাত্রীর বাবা সোমেশ দাসের মুখোমুখি হয়ে পড়ল। হাসিমুখে পথ আটকাল দাস– ‘কোতায় যাওয়া হচ্চে?’ কুণাল দেখল সোমেশ দাসের হাতে গাড়ির চাবি। আই-টেন গাড়ি। এইসব গাড়ির স্বপ্ন কতদিন ধরেই দেখছে কুণাল!

‘চলো। আজ অঙ্কিতার বার্থ ডে। তোমারই প্রেজেন্ট থাকার কথা আজ।’ ‘কিন্তু’ কুণাল তো তো করে। বার্থডে মানে গিফটের প্রশ্ন আসছে। সোমেশ দাস টিপটিপে হাসিমুখে সমাধানের রাস্তা বাতলায়– ‘জীবনে হাজারবার অঙ্কিতা মানে তোমার ওয়াইফের বার্থডে আসবে। অনেক সময় পাবে গিফট্ দেওয়ার। নাউ, লেটস্ গো!’

যাব কি যাব না ভেবে ভেবে কুল পায় না কুণাল। মামা বিবস্বান বিবেকের মতো পাশে থাকে ভাগ্নের– ‘টাকা না থাকলে কেউ পাত্তা দেয় না!’

মাথা থেকে সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে কুণাল। আমি ঠাকুর হাবলা গোবলা। যা করাও তাই করি– ভাব নিয়ে সোমেশ দাসের গাড়ির পেছন ধরল ওর বাইক। হাজার বছর ধরে জন্মদিন উপভোগ করার মতো ভাগ্যবতী এক আয়ুষ্মতীর একটি জন্মদিনকে সমৃদ্ধ করতে ছুটছিল ও। এখন পায়েল অতীতমাত্র। সামনে অন্য নারী যার হাত ধরে কুণাল ছুটবে। চারধারে টাকা উড়বে। সব টাকা ধরবে কুণাল। হাত ভরে টাকা তুলবে ঘরে। পাঁচজনের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে। খাওয়াদাওয়ার জম্পেশ ব্যবস্থা ছিল। সোমেশের মেল মারফত আমন্ত্রণ জুটেছে বিবস্বান আর মনোজিতের। তেতলার ব্যালকনিতে অঙ্কিতার সঙ্গে বসে প্রাক-অনুরাগপর্ব সেরে নিচ্ছিল কুণাল। ওদিকে বিবস্বান ব্যাবসায়িক কথাবার্তা পাকা করে নিচ্ছিল। ‘দাদাকে বলে মোটা ঠিকেদারি দিতে হবে। নির্ভেজাল জামাই দিচ্ছি! সোনার চাকা। গড়গড় ছুটবে। ঝলক দেখবেন কেবল!’

সোমেশ টিপটিপ হাসে, ‘আমিও কম দিচ্ছি না। জামাইকে তুলব। সঙ্গে তার মামাকেও!’

তেরিয়া মেজাজ সামলেও অস্ত্র দেখাতে বাধ্য হল বিবস্বান, ‘তুলব মানে? তুলছি তো আমি! তোমার মেয়ের দুটো কেচ্ছা হজম করেছি! থার্ড হ্যান্ড মাল! নার্সিংহোমে গেছিল যেন কবে?’ নীচু স্বর বিবস্বানের। ব্যাবসার কথা! চ্যাঁচাতে নেই।

সুশৃঙ্খল ভাবে আলোচনাচক্র শেষ হল একসময়। জামাইবাবুকে নিয়ে অল্টোতে উঠে বসে বিবস্বান।

‘সব ঠিক আছে তো মনোজিৎদা? পাত্রী… বাবা… মা… বাড়িঘর…’

‘হ্যাঁ! লোক ভালো!’ মনোজিৎ বিজ্ঞের ভান করে। এছাড়া উপায় কি! দিনকাল হুড়মুড় করে পালটাচ্ছে। তার জীবনের সঙ্গে তার ছেলের জীবনের কত পার্থক্য। পাত্রী দেখা নিয়ে কত রোমাঞ্চ ছিল সেই সময়ে। সেই রোমাঞ্চ বিবাহিত জীবনেও শাল-সেগুনের শেকড়ের মতো গেড়ে বসত। এখনও ইচ্ছে করলে বউ-এর লাজুক মুখটা মনে করতে পারে। প্রথমদিন দেখা হওয়ার সেই লাজুক মুখ। অথচ কুণালের কোনও মানসিক বৈকল্য নেই। তবে ছেলের পেছনে ভারীসারি শ্বশুর থাকলে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা নেই। কিন্তু ভরসাই বা কি? মেয়েটা কেমন হবে…! তাছাড়া, সারা বাড়ি জুড়ে বড্ড বদ টাকার গল্প!

একটু আগে হবু শ্বশুরের গাড়ির পেছনে চলছিল, এবার মামার গাড়ির পেছনে চলছে কুণালের বাইক। অল্প অল্প বাতাস দিচ্ছে। আরাম হওয়ার কথা। কুণালের শীত করছিল। নিজেকে গরম রাখতে ছোটে ও। দেখে মনে হচ্ছে বাইকটা গাড়িটাকে ছুঁতে চাইছে। খুব শিগগির ওরও গাড়ি হবে। বাকি সব ক্রমান্বয়ে আসবে। প্রাপ্তির হাজার সম্ভাবনার মধ্যেও এমন শূন্যতা কেন চারধারে! বোধহয় থমকে গেছিল কুণাল। বিবস্বানের মুখ গাড়ির জানলায়– ‘কী হল? তাড়াতাড়ি আয়! কাল আবার কীসের বনধ্! অনেক কাজ! আয়।’

সেই অমোঘ আহ্বানকে উপেক্ষা করতে পারে না কুণাল। কার্গোর ছ’টা পকেটের একটা থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে। সামনে নতুন জীবন। গতস্য শোচনা নাস্তি। পায়েলের ছবিটা ডিলিট করতে করতে বিড়বিড় করে কুণাল, ‘ধুর! প্রেম করে কী লাভ? বেকার সময় নষ্ট। শ্বশুর বড়লোক হলে তবু কথা ছিল। না হলে কী লাভ?’

এলওভিই লাভ এখন হিসেবের দাঁড়িপাল্লায়। কিস্যু করার নেই কুণালদের। এখন শাল-সেগুনের শেকড় পোক্ত হওয়ার সময় পায় না। রোমাঞ্চ টোমাঞ্চ সেইরকম। পালটে যাচ্ছে পরিবেশ। পালটে যাচ্ছে মানুষ। চারধারে জাল জুয়াচুরি। কোথায় পৌঁছোতে চায় মানুষ, তারা নিজেও জানে না! সময়টা বড্ড উদ্ভ্রান্ত। ঠিকই ধরেছে বিবস্বান। মাটি শক্ত হয়ে উঠেছে। শেকড় এখন আর বেশি গভীরে যায় না। অল্পেই শুকিয়ে যায়।

প্রতীক্ষাপ্রান্তর

অসীম টুরে গেছে পাঁচ দিনের জন্য, তিতির কলেজে। কারেন্টও নেই। একা বাড়িতে লম্বা দুপুরটা কাটতে চাইছিল না। আজকের কাগজটা নিয়ে বিছানায় গড়াচ্ছিল নন্দিনী। এ পাতা থেকে ও পাতায় এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন ঘুরতে ঘুরতে আচমকাই চোখটা পার্সোনাল কলামে আটকে গেল। ডান দিকের কোণে একদম তলার দিকে ছোটো ছোটো কয়েকটা অক্ষর। আলাদা করে সেইভাবে চোখে পড়ার কথাই নয়। তবু পড়ল। হয়তো পড়ার ছিল বলেই। ‘জেনিফার ক্যাথারিন ম্যাকলেন অফ হ্যাপি নুক, জোরহাট– পাসড অ্যাওয়ে পিসফুলি, অ্যাট হার রেসিডেন্স। ফিউনারেল মাস অন’…

জেনিফার ম্যাকলেন? জোরহাটের জেনিফার ম্যাকলেন? এই নামে অনেকদিন আগে একজনকে চিনত না নন্দিনী? হ্যাপি নুকের জেনিফার ম্যাকলেন বলতে তো একজনের কথাই মনে পড়ে। মিস ম্যাকলেন তাহলে এতদিনে মারা গেলেন। কে দিল নোটিসটি? চার্চ থেকেই হবে নিশ্চয়ই। নন্দিনী অন্যমনস্কভাবে হাতের কাগজটা ভাঁজ করে। আশ্চর্য, একেবারে ভুলেই গিয়েছিল মহিলার কথা।

অসীমের পোস্টিং তখন ছিল অসমের জোরহাটে। জোরহাট টাউন থেকে একটু দূরে কিছুটা ভেতরের দিকে ছিল ওদের বাড়িটা। বেশ নির্জনই ছিল পাড়াটা সেই সময়। প্রচুর জায়গা, বাগান, ফলের গাছ-টাছ নিয়ে এক একটা বাড়ি। এরকমই একটা বাড়ির একতলাটা অসীমের অফিস থেকে তাদের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছিল।

কলকাতায় ও রকম বাড়ি স্বপ্নের অতীত। বিরাট বড়ো বড়ো চারখানা ঘর, আলো ভরা বাথরুম, বাদশাহি রান্নাঘর, সঙ্গে আলাদা প্যান্ট্রি, চারদিক ঘুরিয়ে কাঠের জাফরি ঝোলানো টানা বারান্দা, মানে এককথায় এলাহি ব্যাপার। কিন্তু এত বড়ো বাড়িতে সারাদিন একা একা কাটাতে নন্দিনীর দম বন্ধ হয়ে আসত। তাদের মানিকতলার বাড়িও যথেষ্ট বড়ো। কিন্তু সেখানে ছিল কাকা-কাকি, জ্যেঠা-জেঠি তুতো ভাইবোন সবাইকে নিয়ে বিশাল যৌথ পরিবার। চেষ্টা করলেও ওবাড়িতে একা থাকা যেত না।

সেই হট্টমালার দেশ থেকে বিয়ে হয়ে এসে পড়ল এই ভূতবাংলোয়। ঘর মোছা, বাসন মাজার জন্য একজন আর কাপড়চোপড় কাচার জন্য একজন, এই দু’জন স্থানীয় আদিবাসী কাজের মেয়ে ছিল, কিন্তু সারাদিনের জন্য নয়। সকাল সকাল এসে দশটার মধ্যে সব কাজ সেরে তারা চলে যেত। কতটুকুই বা কাজ থাকত দুজনের সংসারে। তাদের ওদিককার ভাষাও নন্দিনী সবটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারত না। ফলে সঙ্গী হিসেবে তারা খুব একটা অন্তরঙ্গ হয়ে উঠতে পারেনি।

তিতির হয়নি তখনও। অসীম অফিসে বেরিয়ে গেলে এত বড়ো বাড়িতে একলা নন্দিনী। শূন্যতা যেন বিশাল হাঁ করে তাকে গিলে খেতে এগিয়ে আসত। উপরতলায় কোনও ভাড়াটেও ছিল না যে গল্প করে সময় কাটাবে। পাড়াটাও এত চুপচাপ। লোকজন বাস করে বলে বোঝাই মুশকিল। কলকাতার শোরগোলের একেবারে বিপরীত। কী করে যে দিনগুলো কাটত এখন ভাবলেও অবাক লাগে। তখনই কোনও এক সময় মিস ম্যাকলেনের সঙ্গে নন্দিনীর পরিচয়।

নন্দিনীদের বাড়িটার ঠিক পাশেই একটা একতলা বাংলো প্যাটার্নের ছোটো বাড়ি ছিল। রংচটা, ধুলোটে। চওড়া কাঠের গেটের রং এককালে হয়তো সাদাই ছিল, বা অন্য কিছুও হতে পারে, বলা মুশকিল, কারণ বহুদিনের অযত্নে অবহেলায় সেটা একটা অবর্ণনীয় শেড ধরে নিয়েছিল। কার্নিশে যেখানে সেখানে বেয়াড়া বট অশ্বত্থের চারার যথেচ্ছ জবরদখল অভিযান। দেয়ালে জায়গায় জায়গায় বৃষ্টি গড়ানো শ্যাওলাটে সবুজ দাগ। গেটের পাশে বহু বছরের ময়লায় কালচে হয়ে যাওয়া ফলকে কষ্ট করে পড়া যায় ‘হ্যাপি নুক’। বাগান হয়তো কোনওকালে একটা ছিল, নন্দিনীর চোখে যেটা পড়েছিল তাকে বাগানের অপভ্রংশও বলা চলে না।

এই বাড়িতেই থাকতেন জেনিফার ম্যাকলেন। একাই। কাজের লোকটোকও কেউ ছিল না। অন্তত নন্দিনী তো কোনওদিন কাউকে থাকতেও দেখেনি, আসতে যেতেও দেখেনি। সঙ্গী বলতে একটি বৃদ্ধ পমেরিয়ান কুকুর। এত দিন পরে হঠাৎ তার নামটাও আজ নন্দিনীর মনে পড়ে গেল। পিক্সি। তাকে নিয়ে রোজ সকাল-বিকেল হাঁটতে বেরোতেন। চুপচাপ মাথা নীচু করে কোনও দিকে না তাকিয়ে একটু ঝুঁকে হেঁটে যেতেন, আবার ওই ভাবেই বাড়ি ফিরে আসতেন। যতদিন নন্দিনী ছিল ওখানে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা ওই রুটিনে কোনওদিন ছেদ পড়তে দেখেনি।

মিস ম্যাকলেনের মতো নিরুত্তাপ মানুষ নন্দিনী আজ পর্যন্ত আর দ্বিতীয় একজন দেখল না। কোনও মানুষ যে তার চারপাশের জগৎ সম্বন্ধে এতটাই নিরাসক্ত হতে পারে ভাবা যায় না। কারমেল কনভেন্টে ইংরেজি পড়াতেন। শোনা কথা, ছাত্রীরা নাকি আড়ালে বলত ‘আইসবার্গ’। স্বভাবের জন্য না চেহারার জন্য সেটা জানা যায়নি। তবে দুদিক থেকেই নামটা মানানসই।

রোগাপাতলা ছোটোখাটো চেহারা। গায়ের রং পুরোনো খবরের কাগজের মতো। সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন মুখ। পাতলা ফ্যাকাশে ঠোঁট। ফ্যাকাশে সবজেটে চোখের মণি। ফ্যাকাশে বাদামি চুল। চিরটাকাল পরনে হালকা রঙের ছাঁটকাটহীন ঢোল্লা হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ঝুলের ফ্রক। সব মিলিয়ে একজন ফ্যাকাশে মানুষ। কেউ ডেকে কথা বললে উত্তরে বাধ্য হয়ে ভদ্রতাসূচক দু-চারটে কথা যা বলার বলতেন, নইলে চুপচাপ। গলার আওয়াজও চেহারার মতোই নিষ্প্রভ, নিরুত্তেজ। কোনও ওঠাপড়া নেই। স্কুল, বাড়ি আর পিক্সির মধ্যেই ওঁর জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল। প্রতি রবিবার অবশ্য নিয়ম করে চার্চে যেতেন। আর প্রতি মাসে দিন দুয়েক বাড়ি তালা বন্ধ রেখে সম্ভবত গৃহস্থালির টুকটাক কেনাকাটার জন্য টাউনেও যেতেন। কারণ এবং গন্তব্যস্থলটা লোকের ধরে নেওয়া। কোনওটাই কারও সঠিক জানা ছিল না, কারণ উনিও কোনওদিন কাউকে ডেকে বলেননি, আর ওঁর কাছে কোনওদিন কেউ জানতেও চায়নি। কাকেই বা বলবেন, কেই বা জানতে চাইবে। কুকুরটি ছাড়া তো তিন কুলে কোথাও কেউ ছিলও না। অন্তত আছে বলে কেউ জানত না। উনি যে দিনগুলো বাড়ির বাইরে থাকতেন সেই কটা দিনের জন্য পিক্সি চার্চের ফাদার অ্যান্টনির কাছে থাকতে যেত।

নন্দিনী বলতে গেলে সেধেই আলাপ করেছিল। ওঁর বাড়িতেও গিয়েছিল কয়েকবার। উনি অবশ্য বিশেষ আসতেন না। দেখা হলে বেড়ার পাশে বা গেটের ওধারে দাঁড়িয়েই সামান্য দুচারটে সৌজন্যমূলক কথা বলে চলে যেতেন। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে স্পষ্টই অনীহা ছিল। তবে পরের দিকে মাঝেমধ্যে কেক বা বিস্কিট গোছের কিছু ভালোমন্দ বানালে ডাক দিতেন। নন্দিনী খেয়েও আসত, নিয়েও আসত। জিজ্ঞাসা করে করে শিখেও নিয়েছিল ওঁর কাছ থেকে নানারকম।

একদিন, শুধু একদিনই মিস জেনিফার ক্যাথারিন ম্যাকলেনকে অন্যরকম দেখেছিল নন্দিনী। একটা পুরো দিন।

সেদিন সকালে একটু বেলার দিকে মিস ম্যাকলেনের গেটের লেটারবক্সে পিওন চিঠি ফেলে গিয়েছিল একটা। নন্দিনী নিজের শোবার ঘরে কী যেন করছিল। জানালা দিয়ে ব্যাপারটা দেখতে পেয়ে মনে মনে একটু অবাকই হয়েছিল। এতদিনের মধ্যে কোনও দিনও ওবাড়িতে কোনও চিঠিপত্র আসতে দেখেনি সে। পিক্সির ডাকাডাকির আওয়াজ পেয়েই আসলে তার চোখ বাইরের দিকে গিয়েছিল। সে বেচারাও পিওন নামক খাকি পোশাকধারী অপরিচিত জীবটিকে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে পাহারাদারির সহজাত সারমেয় প্রবৃত্তি পালনের তাগিদে পরিত্রাহি চেঁচিয়ে যাচ্ছিল। একটু পরে মিস ম্যাকলেনের ভাবভঙ্গি দেখে নন্দিনীর অবাক হওয়ার মাত্রাটা আরও বেড়ে গিয়েছিল যেন। পিক্সির চিৎকারে উনিও বেরিয়ে এসেছিলেন। পিওন চলে যেতে যেতে হাতের ইশারা করে বুঝিয়ে দিল চিঠি দিয়ে গেছে। উনি খানিকক্ষণ যেন কিছু না বুঝে পিওনের চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে ছিলেন। তারপরে পায়ে পায়ে গেটের দিকে এগোলেন।

নন্দিনী ঘটনাটা কী ঘটছে দেখার জন্য জানালার পাশ থেকে সরেনি, ওখান থেকেই তাকিয়ে ছিল। মিস ম্যাকলেন লেটারবক্স থেকে চিঠিটা বার করে একটু হতবুদ্ধি ভাবে প্রথমটা ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাদামি কাগজের খামটা হাতে নিয়ে ভুরু কুঁচকে উলটেপালটে দেখছিলেন, বোঝার চেষ্টাই করছিলেন হয়তো তাঁকে কে চিঠি লিখতে পারে। তারপরে ওখানে দাঁড়িয়েই খামটা ছিঁড়ে চিঠিটা বার করলেন। নন্দিনী আশ্চর্য হয়ে দেখল চিঠিটা পড়তে পড়তেই ওঁর হাবভাব কেমন যেন পালটে গেল। দূর থেকেও সে বুঝতে পারছিল মহিলা থরথর করে কাঁপছেন। হাত বাড়িয়ে একবার গেটটা ধরারও চেষ্টা করলেন। নন্দিনীর ভয় হচ্ছিল উনি পড়ে-টড়ে না যান। হয়তো কোনও খারাপ খবর আছে চিঠিতে। তারপরে আরও অবাক হয়ে গেল যখন দেখল উনি ওদের বাড়ির দিকেই আসছেন।

মিস ম্যাকলেন বেল বাজানোর আগেই নন্দিনী বারান্দায় বেরিয়ে এসেছিল। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন উনি। মুখচোখ যেন কেমন কেমন। নাকের তলায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে। কিছু না বলে অকস্মাৎ নন্দিনীর দিকে চিঠিটা বাড়িয়ে ধরলেন। নন্দিনীও কিছু না বুঝেই ওঁর হাত থেকে ওটা নিয়ে নিল। পড়তে ইশারা করছিলেন মিস ম্যাকলেন। তখনও কথা বলতে পারছিলেন না। নন্দিনী আগে ওঁকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে ঘরে বসাল। তাড়াতাড়ি এক গ্লাস খাবার জল এনে দিল। উনি এক নিঃশ্বাসে জলটা শেষ করে গ্লাসটা ফিরিয়ে দিলেন। তারপরে কেমন যেন গা ছেড়ে দিয়ে সোফার পিছনে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। নন্দিনী নজর ফেরাল হাতে ধরা চিঠিটার দিকে।

চিঠিটা লিখেছেন কোনও এক ডাক্তার এসপি বড়ুয়া। ইংরেজিতে লেখা চিঠির বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায়–

‘ডিয়ার জেনিফার,

আশা করি ভালোই আছ। তোমার জন্য সুখবর আছে একটা। তুমি হয়তো জেনে খুশি হবে যে ফ্র্যাংকলিনের মধ্যে আজকাল আগের থেকে অনেক বেশি উন্নতি দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ওর ঘরে রাখা তোমার ছবিটা দেখে তোমাকে চিনতে পেরেছিল। কাল নিজে থেকেই বলল, জেনি খুব ভালো চকোলেট কেক বানায়। আমার মনে হচ্ছে নতুন ওষুধটায় বোধহয় কাজ হচ্ছে।

যে জন্য তোমাকে চিঠিটা লেখা। আমি ভাবছিলাম এ মাসে তুমি না এসে যদি আমিই ফ্র্যাংকলিনকে নিয়ে তোমার কাছে যাই তাহলে কেমন হয়? একটা চেঞ্জও হবে ওর। তাই এই বৃহস্পতিবার বিকেলে তোমার বাড়ি আসছি আমরা। তৈরি থেকো।’ তারপরে আবার পুনশ্চ দিয়ে লিখেছেন– ‘খুব বেশি কিছু আশা কোরো না। এই রিঅ্যাকশনগুলো প্রায়ই খুব একটা পার্মানেন্ট হয় না। তবুও লেট আস হোপ ফর দ্য বেস্ট।’

বৃহস্পতিবার? বৃহস্পতিবার তো আজকেই। কিন্তু কে এই ডাক্তার বড়ুয়া? যে ফ্র্যাংকলিনের কথা চিঠিতে আছে সে-ই বা কে? আর এই চিঠি পেয়ে মিস ম্যাকলেনেরই বা অমন অবস্থা কেন হল? নন্দিনী সত্যি কিছুই বুঝতে পারে না। এ প্রহেলিকার উত্তর একমাত্র মিস ম্যাকলেনই জানেন। ধাঁধায় পড়ে সে মিস ম্যাকলেনের দিকে তাকায়। আর অবাক হয়ে দেখে মিস ম্যাকলেন কেমন অদ্ভুত চোখে ওর দিকেই চেয়ে আছেন। চেয়ে আছেনও, আবার নেইও। ওঁর ওই ফ্যাকাশে সবুজ চোখের দৃষ্টি যেন নন্দিনীকে ভেদ করে, এ ঘর ছাড়িয়ে কোথায় কতদূরে উধাও হয়ে গেছে।

আস্তে আস্তে একটি দুটি করে কথা বলতে আরম্ভ করেন জেনিফার ম্যাকলেন। তারপরে বাঁধভাঙা বন্যার মতো বেরিয়ে আসতে থাকে অনেক দিনের অনেক জমে থাকা কথা। গলার আওয়াজ থরথর করে কাঁপে। আর নন্দিনী স্তব্ধ হয়ে শুনতে থাকে এক আশ্চর্য কাহিনি। যাকে কাহিনি না বলে রূপকথা বলাই বোধহয় উচিত।

আসাম চা বাগিচার দেশ। আর চা বাগিচা মানেই প্ল্যান্টার। প্রথম দিকে খাঁটি সাহেবরাই বাগান চালাত। পরে আস্তে আস্তে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। সে জায়গায় আসতে শুরু করে দেশি সাহেবরা। এ কাহিনির যখন শুরু তখন সবে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিছু কিছু বাগানে দু-একজন সাদাচামড়া সাহেব তখনও ছিল। তাদেরই একজন রঙালি টি এস্টেটের ছোটো সাহেব প্যাট্রিক ম্যাকলেন। প্যাডি সাহেব। প্যাডি সাহেবকে সবাই চিনত দুটো কারণে। এক নম্বর কারণ তার দিলদরিয়া স্বভাব। গায়ের রংটা তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত ঠিকই, তা নইলে এদেশের লোকেদের সঙ্গে মেলামেশায় সে, সাহেব আর নেটিভের কোনও ফারাকই রাখত না। কত প্ল্যান্টারদের কত অত্যাচারের কাহিনি সে সময় বাগানের কুলি কামিনদের মুখে মুখে ফিরত, কিন্তু প্যাডি সাহেব সম্বন্ধে কেউ কোনওদিনও অমন কথা ভাবতেও পারত না।

আর দু-নম্বর কারণ তার মা-মরা একমাত্র মেয়ে জেনি মেমসাহেব। জেনিফার ক্যাথারিন ম্যাকলেন। বলতে গেলে সেটাই তখন সাহেবকে চেনার প্রধান কারণ। বিশেষ করে উঠতি যুবকদের মধ্যে। পাহাড়ি ঝরনার মতো চঞ্চল, পরিদের মতো সুন্দর উনিশ বছরের জেনি মেমসাহেবকে দেখলে অতি বড়ো গোমড়ামুখোদেরও মন ভালো হয়ে যায়। সেই সময় আশপাশের ছোটোবড়ো যত গার্ডেনের সব ইয়ং ম্যানদের জীবনের একটাই লক্ষ্য, কে জেনিকে একটু খুশি করতে পারে। পিকনিক, টি-পার্টি, ক্রিসমাস ড্যান্স– সবের মধ্যমণি জেনি ম্যাকলেন। মিস স্টুয়ার্ট, মিস ব্রাউনদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। জেনির সঙ্গে একটা ড্যান্স মানে জীবন সার্থক। জেনি কারও দিকে চেয়ে একটু হাসলে সে নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ভাবতে একটুও দ্বিধা করে না।

জেনি কাউকে নিরাশ করে না। কিন্তু কাউকে আশাও দেয় না। আজ ব্রিজ পার্টিতে ডিকি রবার্টসনকে পার্টনার করলে পরের দিন নাচের ফ্লোরে তার সঙ্গী হয় জেরি উইলিয়ামস। কেউ তার কাছে বিশেষ নয়। সবাই তার ভালো বন্ধু, ব্যাস।

বিশেষ তার একজনই। সেই ছেলেবেলা থেকেই। ফ্র্যাংকি। তখন ছিল শুধুই ফ্র্যাংকি। বড়ো হয়ে হল টগবগে তরুণ আর্মি অফিসার ক্যাপ্টেন ফ্র্যাংকলিন। প্যাডি সাহেবের বন্ধু ফ্রেডি ক্লিফটনের একমাত্র ছেলে। খাঁটি সাহেব ছিল না অবশ্য সে।

ফ্রেডি ক্লিফটন এদেশে আসার আগে ছিল বার্মায়। আজকাল যে দেশের নাম হয়েছে মায়ানমার। ইঞ্জিনিয়ার ফ্রেডি ক্লিফটন ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সেই বার্মারই এক সুন্দরী মেয়েকে। ফ্র্যাংকি ছিল তাদের ভালোবাসার ফসল। মিশ্র রক্তের সন্তান।

তাতে অবশ্য বাগানের কারও কিছু আসত যেত না। ওখানে অনেকেরই জন্মের ইতিহাস ফ্র্যাংকির মতোই। তাও তো তার মা, পাতা তোলা কামিন ছিল না। যথেষ্ট শিক্ষিত, ধনী ঘরের মেয়ে ছিল তার মা। কেবল বিজাতীয়, বিধর্মীকে বিয়ে করার অপরাধে সে মেয়ের পরিবার তাকে ত্যাগ করে।

ফ্র্যাংকির যখন বারো বছর বয়স তখন তার মা বাবা দুজনেই এক সাংঘাতিক কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। এ-দেশে তার আর কেউ ছিল না। বহু দূর আয়ারল্যান্ডে, কখনও-না-দেখা তার এক কাকা ছিল বটে, সে ভাইপোকে নিয়ে যেতে চাইছিল না। ঝুটঝামেলায় না গিয়ে প্যাডি সাহেব ফিউনারেল হয়ে যাবার পর সটান ফ্র্যাংকিকে নিজের কাছে রঙালিতে নিয়ে চলে এসেছিল। জেনির বয়স তখন আট। সেই থেকে জেনি আর ফ্র্যাংকি একসঙ্গেই বড়ো হয়েছে।

দশ বছর বয়স থেকেই জেনি জানত সে ফ্র্যাংকির। কী করে জানত জানে না। কিন্তু জানত। ফ্র্যাংকিও যেমন জানত জেনি তার। একমাত্র তার। তারা দুজন একে-অপরের জন্যই তৈরি। আর কেউ কখনও তাদের মধ্যে আসবে না, আসতে পারে না। এই ধ্রুব সত্যিটা মনের মধ্যে গেঁথে রেখেই জেনি দশ থেকে উনিশ হয়েছে, ফ্র্যাংকি হয়েছে তেইশ।

‘হি ওয়াজ সাচ আ হ্যান্ডসাম ডেভিল য়ু নো। অ্যান্ড ডেয়ারিং। আর্মি জয়েন করল। ইউনিফর্ম পরে আমার সামনে দাঁড়াত। নানডিনি, বিলিভ মি, আমি মেল্ট করে যেতাম। আমাকে পেছনে বসিয়ে স্পিডে মোটরবাইক চালাত, ভাবতে পারবে না। আই থট মাইসেল্ফ দ্য লাকিয়েস্ট গার্ল অ্যালাইভ।’

নন্দিনী রূপকথা শুনছে। এই মিস ম্যাকলেনকে সে দেখেনি কোনওদিন। মিস ম্যাকলেনের গলায় উনিশের জেনি কথা বলে চলে। গলার আওয়াজ আর কাঁপছে না এখন। সেই কণ্ঠস্বরের সম্মোহনী ওঠাপড়া নন্দিনীকে আবিষ্ট করে ফেলে। রূপকথার নায়িকা স্মৃতিমগ্ন হয়ে নিজের কাহিনি শোনাতে থাকে।

‘সেদিন সানডে ছিল, জানো। আমাদের ফর্মাল এনগেজমেন্ট হয়ে গেল। ফ্র্যাংকি আমাকে আংটি পরাল। আমি পরালাম ফ্র্যাংকিকে। চার্চে বিয়ের নোটিস পড়ল। তিন মাস পরে আমাদের বিয়ে। উই ওয়্যার সো হ্যাপি দ্যাট ডে।’ হালকা হাসির রেখা জেনিফার ম্যাকলেনের ঠোঁট ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।

নন্দিনী অবাক বিস্ময়ে মিস ম্যাকলেনের দিকে চেয়ে দেখতে থাকে। তার চোখের সামনে মধ্য চল্লিশের বর্ণহীন মিস ম্যাকলেন আস্তে আস্তে খোলস ঝরিয়ে আদ্যন্ত জেনি হয়ে ওঠে। পুরোনো কাগজের মতো গালে গোলাপি রক্তোচ্ছ্বাস, চোখে পান্নার দ্যুতি।

গুনগুন করে কত দিনের কথা বলে যান মিস ম্যাকলেন। আর নন্দিনীর চোখের সামনে আস্তে আস্তে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে রঙালি টি এস্টেট, জেনি মেমসাহেব আর সুদর্শন, ডাকাবুকো

ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটন।

আর তার পরে সেই রাতের কথা। জেনি আর প্যাডি সাহেবের সঙ্গে ডিনার সেরে ইউনিটে ফিরছিল ক্যাপ্টেন ক্লিফটন। ঠিক কী যে সে রাতে হয়েছিল কেউই জানে না, কিন্তু পরের দিন সকালে রাস্তার পাশে দোমড়ানো মোচড়ানো মোটরবাইকটা ও তার থেকে অনেকটা দূরে ন্যাকড়ার পুতুলের মতো তালগোল পাকিয়ে পড়ে থাকা ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটনের রক্তাক্ত অচৈতন্য শরীরটা দেখেছিল ভোরের পথচলতি বাগানশ্রমিকরা। খুব সম্ভবত কোনও মাতাল লরির ধাক্বায় বাইক শুদ্ধু রাস্তা থেকে ছিটকে গিয়েছিল ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটন।

‘ওরাই ওকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। পকেটে ডায়ারি ছিল, তাতে আমার ছবি, ঠিকানা ছিল। হাসপাতাল থেকে আমাদের খবর দেয়।’

মাথায় সাংঘাতিক আঘাত লেগেছিল ফ্র্যাংকির। বাঁচার আশাই ছিল না। দীর্ঘ সাঁইত্রিশ দিন কোমায় অচেতন ছিল সে। তারপরে জ্ঞান যখন ফিরল তখন ক্যাপ্টেন ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটন নিজের নামটুকুও মনে করতে পারে না আর। হাসপাতালের বিছানায় ফ্র্যাংকি তখন শুধুই স্মৃতিহীন, ভাষাহীন এক মানবশরীর মাত্র।

প্যাডি সাহেব অনেক করেছে তখন। মিলিটারির ডাক্তার ছাড়াও আরও বড়ো বড়ো ডাক্তার দেখিয়েছে। সবারই এক কথা। আশা ছাড়লে চলবে না। সময়, সময়ই করতে পারে যা করবার। ফ্র্যাংকির খুব ভালো বন্ধু ছিল ডাক্তার বড়ুয়া। সে-ও তাই বলে গেছে অহর্নিশ। ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো।

ধৈর্য ধরেছে জেনি। প্যাডি সাহেবের ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে গেছে একদিন, কিন্তু জেনির ভরসা ভাঙেনি। প্যাডি সাহেব অনেক বুঝিয়েছে মেয়েকে, মন পালটাবার অনেক চেষ্টা করেছে, তারপরে একদিন বোধহয় মনের দুঃখেই ফট করে মাথার শিরা ছিঁড়ে ওপরে চলে গেছে।

এই হ্যাপি নুক বাড়িটা অনেকদিন আগে কিনেছিল প্যাডি সাহেব। কখনও কোনও দরকারে বাগান থেকে টাউনে এসে রাত হয়ে গেলে এখানেই থেকে যেত। সাহেব মারা যাবার পর জেনিরও বাগানের পাট চুকে গিয়েছিল। সেই তখন থেকেই জেনি এখানে। সেও আজ প্রায় ছাব্বিশ বছর হয়ে গেল। এখান থেকে মাসে মাসে হাসপাতাল যেতেও সুবিধে। ধৈর্য ধরে থাকতে থাকতে ফ্র্যাংকির মুখে ধীরে ধীরে একটা দুটো কথা ফুটল। আর দিনে দিনে কখন যেন রঙালির চুলবুলি জেনি মেমসাহেব আস্তে আস্তে সব রং ঝরিয়ে ফ্যাকাশে মিস ম্যাকলেন হয়ে গেল।

সেই ফ্র্যাংকি আজ ডাক্তার বড়ুয়ার সঙ্গে আসছে, জেনির বাড়িতে।

‘তুমি বিকেলে একটু থাকবে আমার সঙ্গে, নানডিনি, প্লিজ? আয়্যাম ফিলিং সো নার্ভাস। ফ্র্যাংকি এতদিন পরে আসছে আমায় মিট করতে।’ নন্দিনী খুব অবাক হয়ে দেখে মিস ম্যাকলেন সদ্য প্রেমে পড়া কিশোরীর মতো টুকটুকে গোলাপি হয়ে যাচ্ছেন।

বিকেলে মিস ম্যাকলেনকে চেনা যাচ্ছিল না। ঘন সবুজ সিল্কের একটা অপূর্ব ফ্রক পরেছেন। পুরোনো কাটের জামা, কিন্তু কী যে সুন্দর মানিয়েছে ওঁকে। ঝলমল করছেন যেন। নন্দিনী কখনও লক্ষ্যই করেনি, মিস ম্যাকলেনের হাত পায়ের পাতা কী অদ্ভুত সুন্দর। ঝিনুকের মতো পাতলা, শাঁখের মতো মসৃণ। লম্বা আঙুলের ডগায় বাদাম শেপের হালকা গোলাপি নখ। চোখ মুখ চেপে রাখা উত্তেজনার আঁচে গনগন করছে। এই অপরূপা মিস ম্যাকলেন কোথায় ছিলেন এতদিন? নন্দিনী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

অস্থির ভাবে ঘরের মধ্যে ছটফট করে বেড়াচ্ছিলেন জেনিফার। বারবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। লজ্জাও পাচ্ছিলেন, নন্দিনী তাঁর অস্থিরতা বুঝতে পারছে বলে। টেবিলে একটা ট্রে আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছেন। চায়ের যাবতীয় সরঞ্জাম, আর একটা বড়ো প্লেটে নিজের হাতে তৈরি চকোলেট কেক। এত উত্তেজনার মধ্যেও কখন যেন ঠিক সময় করে বানিয়ে ফেলেছেন।

গাড়ির শব্দটা একই সঙ্গে দুজনের কানেই আসে। নন্দিনী মিস ম্যাকলেনের দিকে তাকায় একঝলক। যেখানে ছিলেন সেখানেই একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন উনি। মুখ থেকে সব রক্ত নেমে গিয়ে বরফের মতো সাদা দেখাচ্ছে। এক হাত দিয়ে অন্য হাতটা এত জোরে আঁকড়ে ধরেছেন যে আঙুলের গাঁটগুলো চামড়ার নীচে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। বন্ধ দরজাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন জেনিফার। নন্দিনীই এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খোলে।

দুজন মানুষ। একজনকে স্পষ্টই বোঝা যায় এদিককার অধিবাসী বলে। খুব সম্ভব ইনিই ডাক্তার এসপি বড়ুয়া। এক হাত দিয়ে আরেকটি মানুষের কাঁধ জড়িয়ে রেখেছেন। সে মানুষটি এক বিশাল বৃক্ষের বাজ পড়া শুকনো কাণ্ড। ঝুঁকে পড়া লম্বা শরীর, পোড়া তামাটে গায়ের রং। নীল হাওয়াই শার্ট তার গায়ে ঢলঢল করছে। গাল ভাঙা, চোখের কোলে গভীর ক্লান্তি। কানের দু-পাশে কিছু পিঙ্গলে সাদায় মেশানো চুল। বাকি মাথা ফাঁকা। বয়স আন্দাজ করা অসম্ভব। পঞ্চাশও হতে পারে, পঁচাত্তরও হতে পারে। পিঠে ডাক্তার বড়ুয়ার হাতের চাপ অনুসরণ করে পা ঘষে ঘষে সে এগিয়ে আসতে থাকে নন্দিনীর দিকে।

‘হ্যালো জেনি।’ নন্দিনী ডাক্তার বড়ুয়ার কথায় সচেতন হয়ে পিছনে তাকায়। কখন যেন মিস ম্যাকলেন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। ‘আমরা এসে গেছি।’

কথার জবাব দেন না জেনিফার। তাঁর দৃষ্টি শুধু দ্বিতীয় মানুষটির দিকে। ডাক্তার বড়ুয়া তার পিঠে চাপ দেন। ‘চিনতে পারছ ফ্র্যাংক? তোমার জেনিকে?’

ফ্র্যাংক নীরব থাকে। চোখে কোনও ভাষাই ফোটে না। মিস ম্যাকলেন নিজের হাতদুটো শক্ত করে মুঠি করেন। মুখ একবার লাল একবার সাদা হয়। নন্দিনীর ভেতরে কী একটা ভাঙতে থাকে, ভেঙে ভেঙে যায়।

ডাক্তার বড়ুয়া আস্তে আস্তে ফ্র্যাংককে ভেতরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসান। সামনে টেবিলে মিস ম্যাকলেনের সাজানো ট্রে।

‘দেখছ ফ্র্যাংক, চকোলেট কেক। তুমি তো ভালোবাসো। দ্যাখো, জেনি নিজে বানিয়েছে, তোমার জন্য।’

ফ্র্যাংকি দুহাতে দুটো কেকের টুকরো তুলে নেয়। বাচ্চাদের মতো একবার এ-হাত একবার ও-হাত থেকে কামড়ায়। থুতনিতে গুঁড়ো গুঁড়ো ঝরে পড়া কেক মাখামাখি হয়ে যায়। শব্দ করে চিবোয় ফ্র্যাংকি। অথচ কী আশ্চর্য, মুখে কোনও অভিব্যক্তি ফোটে না।

‘আর এক পিস কেক নেবে ফ্র্যাংকি?’ জেনিফার খুব নরম গলায় বলে।

ফ্রাংকি কোনও উত্তর দেয় না। শুনতে পেল কী না তাও বোঝা যায় না। তাকিয়ে থাকে সোজা নির্বিকার। ফাঁকা দৃষ্টি জেনিফারকে ভেদ করে চলে যায়। তার হাতে মুখে আইসিঙের ক্রিম আর কেকের গুঁড়ো লেগে থাকে। সে বুঝতেও পারে না, বসে থাকে স্থির। জেনিফার ফ্রাংকির সোফার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে। অসীম মমতায় পরিষ্কার নরম ন্যাপকিন দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দেয়, হাত মুছিয়ে দেয়।

গোধূলির রং আস্তে আস্তে সন্ধ্যায় পালটে যেতে থাকে। আগে থেকে সাজিয়ে রাখা ট্রে-র কাপ ভর্তি চায়ে সর পড়ে যায়। ঘরের কোণায় কোণায় অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসে। টেবিলবাতিটা জ্বেলে দেয় নন্দিনী।

জেনিফার ফ্র্যাংকির দুটি হাত মুঠিতে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেই থাকে। হাতদুটি অল্প অল্প কাঁপে, পাতলা দুটি ঠোঁট কত কিছু বলতে চেয়ে থিরথির করে। কিন্তু কোনও কথাই বেরোয় না। বোধহীন, ভাষাহীন ফ্রাংকির মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে চোখের পলকও বুঝি পড়ে না তার।

ঘরের মধ্যে ক্রমশ ভারী হয়ে জমতে থাকা একরাশ নৈঃশব্দ্য নন্দিনীকে চেয়ারে গেঁথে রাখে। নড়াচড়া করলেই যেন কী একটা ঘটে যাবে। সে শুধু দুচোখ মেলে এই ট্র্যাজিক মূকাভিনয় দেখতেই থাকে। গলার কাছে কী যে ভীষণ কষ্ট শক্ত হয়ে ডেলা পাকায়, সে জোর করে করে গিলে গিলে সেই ডেলাকে নীচে পাঠায়। কতক্ষণ যেন কেটে যায় এমনি করেই।

ডাক্তার বড়ুয়াই শেষে উঠে দাঁড়ান। শব্দ করে গলা পরিষ্কার করেন। ‘সরি জেনিফার।’ নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে অনেকক্ষণ পরে ওঁর কথাটা যেন ভীষণই জোরে বেজে ওঠে মনে হয়। চোখ তুলে তাকাতে পারছিলেন না ভদ্রলোক। গলা নামিয়ে আবার বলেন, ‘এবার যেতে হবে আমাদের।’

ডাক্তারের গলার আওয়াজে ঘোর ভাঙে জেনিফারের। ‘ফ্র্যাংকি আমার কাছে থাকতে পারে না? প্লিজ ডাক্তার? ও তো অনেক ভালো আছে আগের থেকে। ওকে তো এখন তোমরা এখানেই রাখতে পারো।’ জেনিফারের কণ্ঠস্বরে একরাশ আকুল আর্তি। অসহায় আশা ভরা দুটি চোখ ডাক্তার বড়ুয়ার দিকে চেয়ে থাকে।

জ্বলন্ত টেবিলবাতিটার চারপাশে একটা মথ অবিশ্রাম পাক খাচ্ছিল। ডাক্তার বড়ুয়া সেইদিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন। অনেকক্ষণ এমন ভাবে চুপ করে থাকেন যেন কানেই যায়নি। তারপর চোখ না সরিয়েই খুব নরম গলায় বলেন, ‘এইরকম সোবার কোয়ায়েট মোমেন্টগুলো ফ্র্যাংকির লাইফে খুবই রেয়ার, জেনিফার। তুমি পারবে না। পারবে না ম্যানেজ করতে তুমি। মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হবে…’ জেনিফারের দিকে তাকিয়ে কথা শেষ না করেই থেমে যান ডাক্তার।

এতক্ষণে বাঁধ ভাঙে। কী অসহ্য এক আক্ষেপে জেনির মুখ দুমড়ে দুমড়ে যায়। শব্দহীন কান্নায় বিকৃত মুখ দু-হাতে ঢেকে ফেলে সে। কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে শরীরটা। ডাক্তার বড়ুয়া আর নন্দিনী দুজনেই অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে শুধু। গতে বাঁধা সান্ত্বনাবাক্য এখানে এত অর্থহীন।

অস্বস্তি কাটানোর জন্য নন্দিনী চায়ের সরঞ্জামগুলো সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তার বড়ুয়া ফ্র্যাংকির দিকে তাকান। এ ঘরের চারজন মানুষের মধ্যে একমাত্র ফ্র্যাংকিরই কোনও বিকার নেই।

গেটের বাইরে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়ানো গাড়িটা এই সময়ে একবার জোরে হর্ন বাজায়। চমকে তাকিয়ে নন্দিনী এতক্ষণে দেখতে পায় গাড়িটার গায়ে বড়ো বড়ো সাদা অক্ষরে লেখা ‘সেন্ট জর্জেস অ্যাসাইলাম’।

পরের দিন সকালেও মিস ম্যাকলেনকে দেখেছিল নন্দিনী। রোজকার মতোই হালকা রঙের হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ঝুলের ঢোল্লা ফ্রক পরে পিক্সিকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। মাথা নীচু, চোখ রাস্তার দিকে। বর্ণহীন, নিষ্প্রাণ, ফ্যাকাশে এক প্রৌঢ়া।

টিউব লাইটটা হঠাৎ দপদপ করে জ্বলে উঠে নন্দিনীর চোখটা ধাঁধিয়ে দিল। যাক, এতক্ষণে কারেন্ট এল তাহলে। বাবা, পাঁচটা বাজে। তিতিরের কলেজ থেকে ফেরার সময় হয়ে এল। সবিতা বিকেলের কাজ করতে এসে যাবে আর একটু পরেই। নন্দিনী দ্রুত হাতে খোলা চুল গোছাতে গোছাতে বিছানা থেকে নামে। আলস্যমন্থর স্মৃতিমেদুর দুপুরের ভার তাকে ছেড়ে চলে গেছে, এবার আবার সংসারের অভ্যস্ত ছন্দ তার আপাদমস্তক অধিকার করে নিতে শুরু করে।

মিস ম্যাকলেনের মতো ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া কাগজটা দলামোচড়া হয়ে খাটের উপরেই পড়ে থাকে।

 

ভিতরের লোকটা

অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন প্রণববাবু। মেয়ে বলেছিল, চা-টা অন্তত খেয়ে যাও।

–এসে খাচ্ছি। বলে বাইরের ঘেমো পোশাক না ছেড়েই শুধু জুতোটা খুলে চটি গলিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। নিজের অক্ষমতা ঢাকতেই এত তাড়াহুড়ো। অফিসে বসে ফোন পেয়েছিলেন মেয়ের। বলেছিল, বাবা, মায়ের জ্বরটা বেড়েছে। একশো চার। মাথা তুলতে পারছে না। কী করব?

প্রণববাবু বলেন, তোর দাদাকে বল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। তাকে যদি না পাস, তুই-ই নিয়ে যা।

–ঠিক আছে। বলার পর মেয়ে জুড়ে দিল, আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো।

ফেরা হয়নি। মেয়েও জানে প্রাইভেট কোম্পানির কেরানি বাবা, ইচ্ছে থাকলেও তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারবে না। মায়ের শরীর খারাপটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাওয়াতে ঘাবড়ে গিয়ে আকুতিটা জানিয়েছিল।

প্রণববাবু বাড়ি ফিরে শুনলেন ছেলে তার মাকে নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। খুব সংকটজনক অবস্থা ছাড়া ডাক্তারকে কল দেওয়া হয় না। প্রণববাবুর সামর্থ্য কম। মেয়ে পিউ দাদাকে ফোন করে ডেকে রিকশাভাড়া, ডাক্তারের ফিজ আর অল্প কিছু টাকা ওষুধের জন্য দিয়েছিল। ছেলে সমু বেকার। পার্টিঅফিস অথবা পাড়ার ক্লাবই তার আস্তানা। খেতে শুতে আসে বাড়িতে। বাবাকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে সমু। প্রণববাবু কাছাকাছি এসে পড়লে ওর চেহারায় কেমন একটা যেন অসন্তোষ ভাব ফুটে ওঠে। বাবার প্রতি সমুর কীসের এত বিরাগ, প্রণববাবু বুঝে উঠতে পারেন না। ছেলেকে লেখাপড়ার ব্যাপারে কখনও চাপ দেননি। যা দেওয়ার দিয়েছে ওর মা। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর ছেলে দিনের পর দিন বেকার বসে আছে। কোনও গঞ্জনা করেননি প্রণববাবু। বলেননি, সংসারের হালটা এবার ধর। বোনের বিয়ে দিতে হবে। অনেক খরচা আছে সামনে…। প্রণববাবু জানেন এই কথাগুলো ছেলেকে বলার কোনও দরকার নেই। এ-টুকু দায়িত্ববোধ সমুর আছে। সে নিশ্চয়ই সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে স্থায়ী কোনও রোজগারের। তাই তো পার্টিটা করে। ক্লাবে পড়ে থাকে যদি পাড়ার কোনও ব্যাবসাদার ওকে কোনও কাজ-টাজ দেয়। স্বাধীনভাবে ব্যাবসা করার জন্য সমু বাবার থেকে মূলধন চাইতে পারে না। সামান্য মাইনেতে বাবা যে কী ভাবে টেনেটুনে সংসার চালায়, সে ভালো মতোই জানে। ছেলের মা, মানে মিত্রা বারকয়েক প্রণববাবুকে বলেছেন, তোমার অফিসেই সমুর জন্য একটু চেষ্টা করে দেখো না। এতদিন ধরে কাজ করছ! একে তাকে ধরে যদি কোনও ভাবে ওকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়।

রক্ত জল করে খাটা নিজের ওঁচা কোম্পানিতেই ছেলের চাকরির জন্য ইউনিয়ন, ছোটো-মেজো কর্তাদের ধরেছিলেন প্রণববাবু, সুবিধে করতে পারেননি। কয়েকজন সহকর্মী কিন্তু পেরেছে, নিজের ছেলে, এমনকী নিকট আত্মীয়কে ঢুকিয়ে দিতে। প্রণববাবুর দ্বারা কেন হল না, কে জানে! ধরা-করায় কোথাও একটা খামতি থেকে গিয়েছিল নিশ্চয়ই। খামতিটা কী, জানতে চেয়েছিলেন স্ত্রীর কাছে। মিত্রা বলেছে, তুমি তো তেমন চালাক-চতুর নও। ঠিকঠাক তেল মারতে পারো না কাউকে। বড্ড গোবেচারা, মিনমিনে টাইপের।

সমু গোবেচারার সন্তান হওয়া মেনে নিতে পারে না, তাই বাবার প্রতি এত অসন্তোষ। কিন্তু জন্ম তো একটা অ্যাক্সিডেন্ট, কিছুই করার নেই মানুষের। তবে সমু যে আজ মা-কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল, এই ব্যাপারটাতে খুশি হয়েছেন প্রণববাবু। ছেলে বাড়ির প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েনি। সমস্যা হয়েছে একটাই, এত দামি ওষুধ লিখেছে ডাক্তার, সমু দু’ডোজের বেশি কিনতে পারেনি। বোন গোনাগুনতি টাকা দিয়েছে তাকে। এর জন্য প্রণববাবুই দায়ী। বাড়ির ওষুধপত্র তিনিই কেনেন। সেবা মেডিকেল স্টোর থেকে টোয়েন্টি পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট পান। এখানে সব দোকানে এখন টেন চলছে। সেবা-র মালিক বিদ্যুৎকে প্রণববাবু এককালে টিউশন পড়াতেন। সেই সম্মান এবং কৃতজ্ঞতা থেকে বিদ্যুৎ প্রণববাবুকে এক্সট্রা টেন পার্সেন্ট দেয়। তার সঙ্গে এটাও জানিয়ে রেখেছে, স্যার, টোয়েন্টি নিতে হলে আপনাকেই আসতে হবে। অন্য কাউকে দিয়ে পাঠালে দিতে পারব না। বাড়ির লোকের হাতেও না। ছাড়টা জানাজানি হলে বাকি কাস্টমারও ডিমান্ড করবে।

সেই কারণে বেশি টাকার ওষুধ কেনার হলে প্রণববাবুকেই আসতে হয় বিদ্যুতের দোকানে। বাড়ির লোক ব্যাপারটা জানে বলেই পিউ তার দাদাকে ওষুধ কেনার জন্য বেশি টাকা দেয়নি। আন্দাজ করে একদিন চলার মতো দিয়েছিল। ওষুধ দামি হওয়ার কারণে দু’প্রকার ট্যাবলেট দুটো করে হয়েছে। এক জোড়া খাওয়া হয়ে গেছে, সন্ধের দিকে খেতে হবে এক ডোজ। রাত থেকে ওষুধ নেই। এ-ছাড়া জ্বর বাড়লে যে ট্যাবলেটটা দিতে বলেছে ডাক্তার, সেটাও কিনতে পারেনি সমু। …বাড়ি ফিরে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে নেওয়ার পর প্রণববাবু চা খেয়ে সময় নষ্ট করেননি। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। জ্বর আয়ত্ত্বে আনার ওষুধটা হাতের কাছে থাকা খুবই জরুরি।

জিটি রোড ধরে এতক্ষণ সাইকেল চালাচ্ছিলেন প্রণববাবু। শোভনা বস্ত্রালয়ের পাশের গলিটা এবার ধরতে হবে। রাত হতে চলল, গলিতে আলো কম। বয়সের কারণে অন্ধকারে সাইকেল চালাতে একটু সমস্যা হয়। তার জন্য এই শর্টকাটের রাস্তাটিকে এড়ানোর কোনও মানেই হয় না।

গলিতে ঢুকে কিছুটা যেতে না যেতেই বাধা। বিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটছে, একটা ছেলেকে পাঁচ-ছ’জন মিলে বেদম মারছে। মার খাওয়া ছেলেটা মনে হচ্ছে বিদ্যুতের দোকান থেকেই ওষুধ কিনে ফিরছিল। প্ল্যাস্টিকের ছোটো ক্যারিব্যাগটা এখন রাস্তায়, ছড়িয়ে পড়েছে ট্যাবলেটের ফয়েল। এসব ঝুট-ঝামেলা একদম সহ্য করতে পারেন না প্রণববাবু। বুক ধড়ফড় করে। গলি সরু, তবু ব্রেক কষে সাইকেলের গতি কমাননি প্রণববাবু, মারধরের জটলার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, এমন সময় শুনতে পেলেন আর্তস্বর, কাকু বাঁচান! বাঁচান আমাকে!

গলি শুনশান। প্রণববাবু বুঝতেই পারলেন আর্তিটা তাঁর উদ্দেশ্যে। আবছা আলোতে ছেলেটাকে যতটুকু দেখেছেন, অচেনাই ঠেকেছে। গলাটাও কোনওদিন শুনেছেন বলে মনে করতে পারলেন না। প্রণববাবুর বয়সি যে কেউ এখন এই রাস্তা দিয়ে গেলে, ছেলেটা একই ভাবে বাঁচাতে বলত। যারা মারছে, তারাও যেন প্রণববাবুকে চিনে না রাখে। প্যাডেলে বাড়তি চাপ দিয়ে প্রণববাবু এগোতে লাগলেন। ছেলেটা চেনা হলেও মার আটকাতে যেতেন না। পাঁচ-ছ’জন মারমুখি জোয়ান ছেলে, যাদের হাতে লাঠিসোঁটাও আছে, তাদের বিরুদ্ধে এই বয়সে খালি হাতে দাঁড়ানোটা মূর্খামি হতো। তবে প্রণববাবুর মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। তাঁদের এই মফস্সল শহরটা বছর দশেক আগেও কত নির্ঝঞ্ঝাট, শান্ত-শিষ্ট ছিল। যত দিন যাচ্ছে দুর্গানগরে অশান্তি বাড়ছে। লেগেই আছে মারপিট, চুরি-ছিনতাই। যে-ছেলেটা মার খাচ্ছে, তার কেনা ওষুধগুলো রোগীর কাছে পৌঁছোবে না। ছেলেটারই চিকিৎসার দরকার পড়বে। হয়তো ওর বাড়ির কেউ অসুস্থ, মা অথবা বাবা, নিকট আত্মীয়ও হতে পারে। ছেলেটার অপেক্ষায় বসে থাকবে তারা।

গলি শেষ হতে চলল। মোড়ের মুখে আলো ঝলমলে ‘সেবা মেডিকেল’, কাস্টমারের ভালোই ভিড়। মন খারাপটা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে গেলেন প্রণববাবু। দোকানের সামনে রাখা বেশকটা সাইকেলের পাশে নিজের সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে চাতালে উঠে পড়লেন। তাঁর বাড়িতেও একজন অসুস্থ, ওষুধ নিয়ে ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি।

ভিড়ের কারণে একটু সময় লাগল ওষুধগুলো পেতে। এক সপ্তাহের প্রেসক্রিপশন করেছিল ডাক্তার, প্রণববাবু চারদিনের মতো নিলেন। মিত্রার একটা বদভ্যাস, শরীর একটু সামলে গেলেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। মিছিমিছি টাকা নষ্ট। দু’দিন ওষুধ খেয়ে রিপোর্ট করতে বলেছে ডাক্তার, তখন আবার কোনও ট্যাবলেট বদলে দিতে পারে। আগে থেকে বেশি নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।… ফেরার পথে গলির দিকে গেলেন না প্রণববাবু। ব্যানার্জিপাড়ার চওড়া রাস্তাটা ধরে মেন রাস্তার উদ্দেশ্যে এগোচ্ছেন। স্পিডে চালাতে চাইছেন সাইকেল, ঠিক মতো চলছে না। একটু টাইট আর টাল লাগছে সাইকেলটা। যখন ওষুধ কিনতে ঢুকেছিলেন দোকানে, কারওর অসতর্ক ধাক্বায় সাইকেলটা কি পড়ে গিয়েছিল? সেই কারণেই কি হ্যান্ডেল, প্যাডেল টাল খেয়ে গেল? এখন চেক করার সময় নেই, বাড়ি গিয়ে দেখবেন।

মেন রাস্তায় খানিকক্ষণ চালানোর পর প্রণববাবু টের পেলেন অস্বাচ্ছন্দ্যটা হ্যান্ডেল, প্যাডেলের নয়, গোটা সাইকেলের চলনটাই আলাদা ধরনের। বসার সিটটারও অনুভূতি অচেনা। তা হলে কি ওষুধের দোকান থেকে বেরোনোর পর ভুল করে অন্য কারওর সাইকেলে চেপে বসেছেন?

রাস্তার ধারে চলে গেলেন প্রণববাবু। সাইকেল থেকে নেমে দেখলেন, যা ভেবেছিলেন তাই! এটা তাঁর সাইকেল নয়। কোম্পানি আলাদা, সিটকভার কালো রঙের। তাঁরটা ছিল নীল। এত বড় ভুল হল! এইটা তাঁর সাইকেলের চেয়ে খানিকটা নতুন। কী করবেন এখন? বিদ্যুতের দোকানে গিয়ে দেখবেন, তাঁরটা আছে কিনা? যদি না থাকে? বিদ্যুৎ তাঁকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করবে, কী ব্যাপার মাস্টারমশাই, ফিরে এলেন!

সত্যিটা বলতেই হবে এবং রেখে আসতে হবে সাইকেলটা। বিদ্যুৎ হয়তো বলবে, নিয়ে যান। বোঝাই যাচ্ছে বদলাবদলি হয়েছে। আপনার সাইকেলটা কেউ ফেরত নিতে এলে আপনাদের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দেব।

এতটা দূর অবধি তবু ঠিক আছে। কিন্তু বদলাবদলির বদলে প্রণববাবুর সাইকেল যদি চুরি হয়ে থাকে, ফেরত পাওয়ার চান্স নেই। ভদ্রতাবশত এই সাইকেলটা রেখে আসতে হবে। এমনটা হওয়াও অসম্ভব নয়, এর মালিক সাইকেল হাপিশ হওয়া নিয়ে দোকানের সামনে এখন হই-চই করছে। প্রণববাবু পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের সাইকেল ছিনিয়ে নেবে। হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে প্রণববাবুকে। শুধু তাই নয়, কাল অফিস যাওয়ার সময় সাইকেল ছাড়াই পৌঁছোতে হবে স্টেশনে। নতুন সাইকেল কেনার বিলাসিতা করা যাবে না এখন। সাইকেল সারাইয়ের দোকানগুলোয় পুরোনো সাইকেল বিক্রি আছে কিনা খোঁজ নিতে হবে। তার মানে ততদিন পা দু’টোর উপর ভরসা। অফিস, দোকান-বাজার সব জায়গাতেই সময় লাগবে বেশি।

এর চেয়ে ভালো ক’টা দিন অপেক্ষা করা যাক। বদলাবদলির সম্ভাবনাই বেশি। এই সাইকেলের মালিক প্রণববাবুরটা দোকানে নিয়ে আসবে, বিদ্যুৎ চিনতেও পারবে। প্রণববাবুর সাইকেলের স্ট্যান্ডটা গোলমেলে, দাঁড় করাতে সমস্যা হয়। সেটা দেখে বিদ্যুৎ এক-দুবার বলেছে, স্যার, সাইকেলটা এবার পালটান। অনেকদিন তো হল। …আর একদিন বলল, স্ট্যান্ডটা অন্তত নতুন লাগিয়ে নিন।… সাইকেল ফেরত এলে বিদ্যুৎ লোকটাকে পাঠাবে প্রণববাবুর বাড়ি। তখনই যে যার নিজেরটা পেয়ে যাবে। এটা ঘটার হলে কালকের মধ্যেই ঘটবে। যদি চুরির ঘটনা হয়, ঘটনাটা ঘটবে না। যত দ্রুত সম্ভব একটা সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল কিনে, এটা বিদ্যুতের দোকানে দিয়ে আসবেন প্রণববাবু। ফেরত দিতে দেরির কারণ হিসেবে বলবেন, কাজে আটকে পড়েছিলাম। আসতে পারিনি।

ফের সাইকেলে উঠে পড়েছেন প্রণববাবু। অচেনা সাইকেল দেখে বাড়ির লোকের মনে প্রশ্ন জাগবে। কিছু জিজ্ঞেস করলে প্রণববাবু বলবেন, আমারটা একজন ভুল করে নিয়ে গেছে, আমি তারটা চেপে চলে এসেছি।

পরের দিন অফিস বেরোনোর আগে খেতে বসেছেন প্রণববাবু। মেয়ে পিউ খাবার দিচ্ছে টেবিলে। মিত্রার জ্বর নেমে গেলেও, শরীর খুবই দুর্বল। চেয়ারে বসে স্বামীর খাওয়া দেখছে। বলে উঠল, কাল তো বাজারের গলিতে একটা খুন হয়েছে, শুনেছ?

বুকটা ধড়াস করে উঠল প্রণববাবুর। সেই ছেলেটাই কি? মার খাচ্ছিল যে? ভিতরের উত্তেজনা সামলে স্বাভাবিক গলায় জানতে চাইলেন, কখন হল খুন?

– রাত আটটা নাগাদ। তুমি যখন ওষুধ আনতে বেরোলে। বাজারের দিকেই তো গিয়েছিলে, কোনও গোলমাল টের পাওনি? জানতে চাইল মিত্রা।

খাবার গলা দিয়ে নামতে চাইছে না, প্রণববাবু বুঝতেই পারছেন সেই ছেলেটাই। স্ত্রীকে বললেন, না, আমি তো কোনও গণ্ডগোলের আঁচ পাইনি। খবরটা কে দিল তোমাকে?

– সকালে সমু বলল। কাল রাতেই ঘটনাটা ওর কানে এসেছে। আজ কাগজে বেরিয়েছে খবরটা।

এবাড়িতে খবরের কাগজ নেওয়া হয় না। সমু পড়ে পাড়ার কোনও দোকানে বা ক্লাবে। প্রণববাবু চোখ বোলান অফিসে, কোনও সহকর্মীর থেকে নিয়ে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের মিত্রা বলতে থাকল, কী যে হচ্ছে আজকাল! কোন মায়ের কোল খালি হল, কে জানে! সমুরই বয়সি ছেলেটা। খুব নাকি পরোপকারী।

–সমুর চেনা, মানে আলাপ ছিল? খাওয়া থামিয়ে জানতে চাইলেন প্রণববাবু। আসলে জানার ইচ্ছে সমুর বন্ধু ছিল কিনা, তাহলে প্রণববাবুকে চিনতে পেরেই বাঁচাতে বলেছিল।

এবার পিউ উত্তর দিল, দাদা সেরকম তো কিছু বলল না। বন্ধু হলে নিশ্চয়ই কাল রাত থেকে হাসপাতাল-বাড়ি করত।

একটু হলেও আশ্বস্ত হলেন প্রণববাবু, অপরাধবোধের ভারটা বাড়ল না।

বাড়ি থেকে স্টেশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন প্রণববাবু। অন্যের সাইকেলটাই চালাচ্ছেন। যা হোক তা হোক করে খাওয়া শেষ করেছেন আজ। কেন জানি তাঁর মনে হচ্ছে এই সাইকেলটা খুন হয়ে যাওয়া ছেলেটারই। ওর হাতে ওষুধের ক্যারিব্যাগ ছিল। সেবা মেডিকেলে গিয়েছিল নিশ্চয়ই। গলির কাছে বলতে ওই দোকানটাই। ওখান থেকে বেরিয়ে সাইকেলে ওঠার আগেই দুষ্কৃতীরা ওকে ধরে, কোনও না কোনও অছিলায় গলিতে এনে শুরু করে মার। গলি নির্জন, লোক জড়ো হয়ে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। এই সব কেসে পুলিশ বসে থাকবে না, এতক্ষণে খুনের তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। ছেলেটার সাইকেলের খোঁজ পড়বেই। প্রণববাবুর সাইকেল ছেলেটা নেয়নি, পাওয়া যাবে দোকানের সামনে। সেই সূত্র ধরে পুলিশ আসবে প্রণববাবুর কাছে। …ভাবনাটা মাথায় খেলতেই পা-দুটোর জোর যেন ঝপ করে কমে গেল। প্যাডেলে সে ভাবে আর চাপ দিতে পারছেন না প্রণববাবু। পুলিশের জেরা ভয়ানক জিনিস। এসে বলতেই পারে, খুনের চক্রান্তে আপনিও জড়িত। মার্ডারটা যাতে নির্বিঘ্নে হয়, সেই পরিকল্পনার অংশীদার হয়ে আপনি ছেলেটার সাইকেল নিয়ে সরে পড়েছিলেন। বেচারির পালানোর ন্যুনতম সুযোগটুকু ছিল না।… প্রণববাবু তখন যদি বলেন, ওরা মারধর শুরু করার পর আমি দোকানে গেছি।… পুলিশ বলবে, আপনি তার মানে দেখেছেন ছেলেটাকে মারা হচ্ছে। বাধা তো দেনইনি, পুলিশকেও জানাননি ফোনে। অপরাধ ঘটতে দেখে পুলিশকে না জানানোটাও অপরাধ।… কথাগুলো ভাবতে ভাবতে প্রণববাবুর মনে হচ্ছে সাইকেলটা কোথাও ফেলে হেঁটে স্টেশনে যাওয়া উচিত। কিন্তু কোথায় ফেলবেন? তাঁদের মফস্সলে কোনও ঝোপঝাড় আর অবশিষ্ট নেই। ঘেঁষাঘেষি বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান। অফিস টাইমে রাস্তায় এখন প্রচুর লোকজন। কোনও গলিতে গিয়ে যদি রেখে আসেন, কেউ না কেউ ঠিক দেখে নেবে, সাইকেলটা কে রাখল। তদন্তের সাক্ষী হয়ে যাবে সে। কী যে করা উচিত, বুঝে উঠতে পারছেন না প্রণববাবু। তবে এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও কিছু আশাব্যাঞ্জক পয়েন্ট মাথায় আসছে। প্রথমত, তাঁর সাইকেল যদি পড়ে থাকত সেবা মেডিকেলের সামনে, এতক্ষণে নিশ্চয়ই পুলিশ চলে আসত বাড়িতে। মাঝে একটা গোটা রাত গেছে। তদন্তপর্বের এই সময়টা ভীষণ মূল্যবান। সাইকেলটা নিয়ে গেছে অন্য কেউ, ফেলে গেছে এটা। প্রণববাবুর সাইকেল পড়ে থাকলে বিদ্যুৎ দোকান বন্ধ করার আগে লক্ষ্য করত এবং জানাত তাঁকে। অতএব সাইকেলটা খুন হয়ে যাওয়া ছেলেটার নয়। আর একটা আশার কথা, বাড়ির লোকও খেয়াল করেনি প্রণববাবু অন্য কারওর সাইকেল নিয়ে এসেছেন। তাঁর সাইকেল থাকে সিঁড়ির তলায়, সমুরটা ঢাকা বারান্দায়। বাড়ির কারওরই তেমন নজর যায় না সাইকেল দুটোর দিকে। ‘এই সাইকেলটা কার? তোমার সাইকেল কোথায়?’ এসব প্রশ্ন বাড়ির লোক আপাতত করছে না। যদি করে, সত্যি ঘটনা বললে ওদেরও মনে হবে সাইকেলটা বুঝি খুন হয়ে যাওয়া ছেলেটার। তার চেয়ে ক’টা দিন চুপচাপ থাকা যাক। যে ভুলোমনের লোকটা প্রণববাবুর সাইকেলটা নিয়ে গেছে, যদি ফেরত দিতে আসে, প্রণববাবু এটা দিয়ে দেবেন। ব্যস, ঝামেলা মিটে গেল।

পাঁচদিন কেটে গেল। অন্যের সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন প্রণববাবু। তাঁরটা এখনও ফেরত পাননি। বাড়ির লোকেরও চোখে পড়েনি এই সাইকেল আগেরটা নয়। এমনকী রেলস্টেশনে, যেখানে সাইকেল জমা দিয়ে অফিসের ট্রেন ধরেন, স্ট্যান্ডের ছেলেরাও অন্য সাইকেল দেখে কোনও মন্তব্য করেনি। আসলে সকলেই যে যার কাজে ব্যস্ত। প্রণববাবুও খুব একটা লক্ষ্য করার মতো ব্যক্তি নন, একেবারেই

ছা-পোষা। কেউ তেমন ধর্তব্যের মধ্যে আনে না। অতি সাধারণ হওয়ার এটা একটা সুবিধে। সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল কেনাটাও এখন মুলতুবি রেখেছেন প্রণববাবু। গতকাল মিত্রার ওষুধ ফুরিয়েছে, এখনও জ্বরটা ঘুরে ঘুরে আসছে, কোর্সের বাকি ওষুধগুলো প্রণববাবু আনতে গিয়েছিলেন সেবা মেডিকেলে, এই সাইকেলটা চেপেই গিয়েছিলেন। বিদ্যুৎ সাইকেল সংক্রান্ত কোনও কথাই তুলল না। ক’দিন আগে দোকান থেকে চার হাত দূরে ওই দোকানেরই এক কাস্টমার খুন হয়ে গেছে, সে সব নিয়েও কোনও আলোচনা নেই। যতদিন যাচ্ছে মানুষ কেমন যেন নিরাসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রণববাবু কিন্তু খবরটায় চোখ রেখেছেন। অফিসে গিয়েই সহকর্মীর থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বোলান একটা খবরেই। এখন ভেতর পাতায় এবং ছোটো হয়ে এসেছে খবরটা। ছেলেটা পরোপকারী তো ছিলই। কিছু সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। একটি প্রতিষ্ঠানের বাড়ি দখলে নিতে চাইছিল কিছু সমাজবিরোধী, ছেলেটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। খুন হতে হল অবশেষে। পুলিশ কয়েকজন আততায়ীকে চিহ্নিত করেছে। তারা সকলেই ফেরার। এই ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়, আকছার ঘটছে। প্রথমবার প্রণববাবুর সামনে ঘটল। প্রণববাবু যে দেখেছেন ঘটনাটা, আততায়ীরা ছাড়া আর কোনও সাক্ষী নেই। যদি মুখ না খোলেন, প্রণববাবু নিরাপদ, খুনিরাও।

ভুলো লোকটা এখনও প্রণববাবুর সাইকেল নিয়ে ফেরত আসেনি। বোধহয় ব্যস্ত মানুষ, টাইম পায়নি আসার। সাইকেলের মতো তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো লোকও হয়তো সে নয়। ভাবছে, কাজ চলে যাচ্ছে, যাক। কোথায় বদলাবদলি হয়েছে, সেটাও মনে হয় খেয়াল করতে পারছে না। প্রণববাবুও ঠিক করছেন যে ভাবে চলছে, চলুক। সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল কিনতে গিয়ে অযথা টাকা খরচ করার কোনও মানেই হয় না। অসুবিধে শুধু একটাই, সাইকেলটাতে এখনও তিনি স্বাচ্ছন্দ্য হতে পারেননি। বেশ সমস্যা হয় চালাতে গেলে। এখনও মনে হয় সাইকেলটা প্রণববাবুর মালিকানা পছন্দ করছে না। সে নিজের মতো চলতে চায়। হ্যান্ডেল ঘোরাতে হয় জোর করে। প্যাডেলে চাপ মারতে হয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। যান্ত্রিক কোনও জটিল গোলযোগ আছে সাইকেলটায়। সমস্যাটা ঠিক মতো বোঝানো যাবে না সারাইয়ের দোকানে। ত্রুটিটা নিজে অনুমান করতে চেয়ে গত পরশু অফিস ফেরত ট্রেন থেকে নেমে সাইকেল যেমন চলতে চেয়েছে, তেমনই চলতে দিয়েছিলেন প্রণববাবু। দেখা গেল সাইকেল বাড়ির উলটো পথে বেশ সাবলীলভাবে চলছে। প্রণববাবুদের দুর্গানগর পার হয়ে গেল, এরপর চণ্ডীতলা গ্রাম। অনিচ্ছুক ঘোড়ার লাগাম টানার মতো সাইকেল ঘুরিয়েছিলেন প্রণববাবু। বাড়ি ফিরতে যদি দেরি হয়ে যেত। চিন্তা করত মিত্রা, পিউ।

বাড়ির বিপরীত পথে সাইকেলের স্বাভাবিক চলনে প্রণববাবু বেশ বিস্মিত হয়েছেন। বড়ো খটকা লেগেছে মনে। আজ টিফিনের পর কেবল ফল্ট হয়ে কারেন্ট গেল অফিসে। ঘন্টা খানেক গরমে পচিয়ে ছুটি দিল কোম্পানি। অপ্রত্যাশিত ভাবে বেশ কিছুটা সময় পাওয়া গেল হাতে। সাইকেলটাকে ভালো করে পরখ করার এই সুযোগ। নিজেদের স্টেশনে নেমে, স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল নিয়ে চেপে বসেছেন প্রণববাবু। বলা যেতে পারে নিজেকে সাইকেলটায় সঁপে দিয়েছেন। সাইকেল চলছে তার মর্জি মতো। আগের দিনের রাস্তাই ধরেছে। চণ্ডীতলায় এসে পড়েছেন প্রণববাবু। খালের দিকে যে মেঠো রাস্তাটা গেছে সাইকেল নিজের থেকেই সেই দিকে বাঁক নিল। সন্ধে নামছে। এখন কি এই নির্জন পথে যাওয়া ঠিক হচ্ছে?

রাস্তাটা মাঠ ধরে গেলেও মাটির নয়। পুরোটাই মোরাম পাতা এবং লরি যাওয়ার মতো চওড়া। কারণ, এই রাস্তার শেষে আছে একটা ইটখোলা, তারপরই গঙ্গার খাল। ইটখোলার জন্যই রাস্তার এত যত্ন। এখানে একবারই মাত্র এসেছিলেন প্রণববাবু, ইটের দর করতে। দোতলা তোলার ইচ্ছে ছিল। বাজেট করার পর পিছিয়ে গেছেন। সাধ্যে কুলোয়নি। কিন্তু সাইকেলটা তাঁকে আবার এখানে নিয়ে এল কেন?… ভাবনা এগোল না। কারণ, সাইকেলও এগোচ্ছে না। যেন গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে গেছে। কাজ-কারবার কিছুই বুঝতে পারছেন না প্রণববাবু, নেমে পড়লেন সাইকেল থেকে। গড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাও এগোচ্ছে না। স্ট্যান্ড নামিয়ে দিলেন প্রণববাবু। দু’পা পিছিয়ে গিয়ে সাইকেলটার দিকে তাকালেন, সন্ধের আবছায়াতে সাইকেলটাকে কেমন যেন জীবন্ত মনে হচ্ছে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে এসেছে আরোহীকে, এখন চাইছে তিনি আশপাশটা পায়ে হেঁটে দেখুন। কিছু একটা তাকে দেখাতে নিয়ে এসেছে সাইকেলটা। দেখার মতো কী আছে এখানে? অদূরে ইতস্তত সার সার ইটের পাঁজা। মাঝে ঢিবির মতো ভাটি, এখন নিভন্ত। ঢিবিটা সন্ধের অন্ধকার মাখা। আকাশ ছোঁয়া চিমনির মাথায় দিনশেষের চিলতে আলো। নিয়ে যখন এসেছে, কিছু তো একটা দেখার আছে নিশ্চয়ই।

দৌড়ে সব থেকে কাছের ইট সাজানো পাঁজার কাছে গেলেন প্রণববাবু। আড়াল ধরে সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছেন! স্ফূর্তির আড্ডা চলছে। পরের লাটের ওপার থেকে আসছে আওয়াজ। আলোও জ্বলছে ওখানে। বিড়াল পায়ে এগিয়ে গেলেন প্রণববাবু। পাঁজাটার ধারে গিয়ে বাড়ালেন মুখ, তাস-মদের আড্ডা চলছে। ইটখোলার অফিস থেকে তার টেনে জ্বালানো হয়েছে মাথা ঢাকা দেওয়া বাল্ব। দলটাকে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে চমকে উঠলেন প্রণববাবু, সাতজনের চারজনই তাঁর চেনা! এই চারজন শোভানা বস্ত্রালয়ের গলিতে ছেলেটিকে মারছিল। পরে যে মারা যায়। আক্রমণকারী চারজনের বেশি ছিল। এক ঝলক দেখে এদেরকেই মনে রাখতে পেরেছেন প্রণববাবু। চারজনের দুজনকে ইট দর করতে এসে দেখেছিলেন এই খোলায়, সেটা এইমাত্র মনে পড়ল। ঘটনার সময় খেয়াল হয়নি। …পা কাঁপছে প্রণববাবুর, স্পষ্ট টের পাচ্ছেন সাইকেলটা মৃত ছেলেটারই। ওর আত্মা হত্যাকারীদের চেনানোর জন্য এখানে এনেছে। এদের হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। কিন্তু প্রণববাবু তো পুলিশের কাছে যাবেন না। বিস্তর ঝামেলা। যখন তখন ডেকে পাঠাবে থানা, আদালত। ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এরাও লোক দিয়ে শোধ তুলবে প্রণববাবুর উপর। অনেক কষ্টে টিকিয়ে রাখা তাঁর সাংসারিক জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। …ইটের পাঁজা থেকে সরে প্রায় দৌড়ে এসে সাইকেলে উঠে পড়লেন প্রণববাবু। সজোরে প্যাডেল মারতে লাগলেন। তিনি আর সাইকেলটার মর্জি মতো চলবেন না, সোজা বাড়ি ফিরবেন।

তা কিন্তু হল না। কী ভাবে জানি থানার সামনেই এসে পড়লেন প্রণববাবু। সাইকেলটাই নিয়ে এল আর কি! প্রণববাবু বুঝলেন নিস্তার নেই। অদৃশ্য একজন তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করছে। থানার বাইরে স্ট্যান্ড করলেন সাইকেল। নিরুপায় মুখ নিয়ে ঢুকলেন ভিতরে।

একঘন্টার উপর কেটে গেল থানায়। টেবিলের এপারে বড়োবাবুর মুখোমুখি বসে আছেন প্রণববাবু। নিহত ছেলেটির বিষয়ে যতটুকু যা দেখেছেন। তারপর যা যা ঘটেছে সবিস্তারে বলেছেন ওসিকে। আততায়ীর হদিশ পেয়েই ওসি ফোর্স পাঠালেন ইটখোলায়। মনে হচ্ছে গোটা দলটা ধরা পড়েছে। এই মুহূর্তে কানে ফোন রেখে ফোর্সের কারুর সঙ্গে কথা বলছেন ওসি। চোখেমুখে উৎফুল্ল ভাব। কান থেকে ফোন নামিয়ে বড়োবাবু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ইউ ডিড আ গ্রেট জব। সবকটা ধরা পড়েছে। সমাজের সবাই যদি আপনার মতো এগিয়ে আসত!

হ্যান্ডশেক সারা হল। প্রণববাবু বলতে যাচ্ছিলেন, আমি কিছু করিনি স্যার। যা করার ওই সাইকেলটাই… বললেন না। কথা বাড়িয়ে কী লাভ! বদলে বললেন, আমি তা হলে এখন বাড়ি যাই স্যার।

–সে কী, ওরা আসুক। আপনাকে তো আইডেন্টিফাই করতে হবে ওদের। ওসির কথায় মুখ আরও শুকিয়ে গেল প্রণববাবুর। বললেন, আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে স্যার। সেই কোন সকালে অফিসে বেরিয়েছি। তারপর এতক্ষণ সাইকেলিং! তা ছাড়া আপনারা যে-দলটাকে খুঁজছিলেন, তাদেরই তো পেয়ে গেলেন। আমার সাক্ষীর আর কী দরকার?

–এখন অত দরকার না পড়লেও, কোর্টে আপনাকে সাক্ষী দিতে যেতে হবেই। আপনি একমাত্র আই উইটনেস। আপনি না চেনালে ওরা শাস্তিই পাবে না।

এসব ঝামেলা আসবে, জানেন প্রণববাবু। সেই কারণেই থানায় আসতে চাননি। বাঁচার ক্ষীণ চেষ্টায় প্রণববাবু বললেন, আমার স্যার প্রাইভেট কোম্পানি। কোর্টে যাওয়ার ছুটি কি পাব? সাক্ষী দিতে গিয়ে চাকরি না চলে যায়।

–ছুটি পাবেন না মানে! কোর্ট ডাকলে মালিক ছুটি দিতে বাধ্য। দাপটের সঙ্গে বললেন ওসি। প্রণববাবু কল্পনায় দেখে নিলেন এই দাপটের আঁচ লাগল তাঁর সদাগম্ভীর বসের মুখে। মুহূর্তে মিইয়ে গেল সেই অভিব্যক্তি। মনের চোখে প্রণববাবু দেখছেন, বস এসে তাঁকে বলছেন, আপনি ভাই তাড়াতাড়ি কোর্টে যান। পুলিশ অফিসার এই মাত্র ফোন করল। কোর্ট থেকেই বাড়ি চলে যাবেন, আজ আর অফিসে আসতে হবে না। কাল যেমন আসার আসবেন।

–চলুন, এবার আপনার সাইকেলটা দেখা যাক। যে-ছেলেটা খুন হয়েছে, সে ওষুধের দোকানে সাইকেল নিয়ে গিয়েছিল, এমন কোনও খবর নেই আমাদের কাছে।

ওসির কথায় বাস্তবে ফিরেছেন প্রণববাবু। বললেন, চলুন, দেখুন কার সাইকেল। আপনাদের কাছে সঠিক খবর নাও থাকতে পারে।

থানার বাইরে বেরিয়ে সাইকেলের সামনে যেতেই থমকে দাঁড়ালেন প্রণববাবু। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। ভ্যাবাচাকা মুখ নিয়ে তাকালেন বড়োবাবুর দিকে। বড়োবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কী হল?

বিস্ময়ের গলায় প্রণববাবু বললেন, এ তো আমারই সাইকেলটা স্যার। যখন ভিতরে ছিলাম, কেউ কি বদলে দিল?

ওসির ঠোঁটে প্রবোধ দেওয়ার হাসি। বললেন, আপনার ধারণা মতো সাইকেলটা মৃত ছেলেটার। সে তো আর এসে সাইকেল পালটে দিয়ে যাবে না। কোথাও ভুল হচ্ছে আপনার। টেনশনে আছেন, বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিন।

প্রণববাবুর দেরি দেখে মিত্রা, পিউ বেশ টেনশনে পড়ে গিয়েছিল। ওরা নাকি ফোনও করেছিল, প্রণববাবু ধরেননি। ‘অফিসে কাজের চাপ ছিল, বেরোতে দেরি হয়েছে’, বলে প্রণববাবু হাতমুখ ধুতে বাথরুমে গেলেন। ফিরে এসে চা নিয়ে বসেছেন টিভির ঘরের সোফাটায়। স্ত্রী এবং মেয়ে রয়েছেন এই ঘরেই। ওদের উদ্দেশ্যে শান্ত গলায় বললেন, তোমরা খেয়াল করেছ, এই কদিন আমি অন্যের সাইকেল নিয়ে বাড়ি ঢুকছিলাম?

–কই, না তো। সিঁড়ির তলাটা ধুতে গিয়ে গত দু’দিন তোমার সাইকেলটাই তো দেখেছি। বলার পর মিত্রা সামান্য উৎকণ্ঠার গলায় জানতে চায়, কেন, কী হয়েছে?

–পরে বলছি। বলে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন প্রণববাবু। চলন্ত টিভির দিকে তাকিয়ে ডুব দিলেন মনের গভীরে। থানার বড়োবাবু বলছেন কোথাও একটা ভুল হচ্ছে তাঁর। একটা ব্যাপার একটু গোলমাল লাগছে বটে, দু’জন দুষ্কৃতীকে তিনি আগে থেকে চিনতেন ইট দর করতে গিয়ে দেখেছিলেন খোলায়। তা হলে কি ওদের ডেরায় অন্য কেউ নিয়ে যায়নি? তিনি নিজেই… বাকিটা আর ভাবতে পারছেন না। ভয়ে কপালে ঘাম এসে গেছে প্রণববাবুর।

রূপান্তর

আজ থেকে প্রায় আট মাস আগে বিয়ের দিন মৃন্ময়ীদেবীর সঙ্গে ঐশীর প্রথম দেখা। মৃন্ময়ীদেবী শতদ্রুর পিসিমা। থাকেন মেদিনীপুরে। বিয়ের শতব্যস্ততায় তখন ওনার সঙ্গে ঠিকমতো পরিচয় ঘটেনি ঐশীর। আজ আট মাস পর ওনার পদধূলি পড়তে চলেছে এ-বাড়িতে। থাকবেনও প্রায় মাসখানেক। খবরটা পাওয়া মাত্রই বাড়িতে বেশ একটা শোরগোল পড়ে গেল।

ওনার দাপুটে স্বভাব সম্পর্কে কমবেশি শ্বশুর, শাশুড়ি, বরের কাছে গল্প শুনেছে সে। যদিও কিয়দংশ তারও দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। বিয়ের সময়তেই পুরোহিতের ভুল মন্ত্রোচ্চারণে একেবারে দক্ষযজ্ঞ বাধিয়েছিলেন, পুরোহিতকে এই মারতে যান তো সেই মারতে যান… তারপর ঐশীর বাবা আর মৃন্ময়ীদেবীর ছোটোভাই রমাকান্তবাবুর মধ্যস্থতায় তিনি খানিক শান্ত হয়েছিলেন।

সেই কোন ছোটোবয়সে তিনি বিধবা হয়ে বাবার ভিটেতে গিয়ে উঠেছিলেন। এখনও ওই ভিটেই যক্ষের মতো আগলে রেখেছেন তিনি। বাবা সংস্কৃতের টোল চালাতেন, ফলে মেয়েও তাতে বেশ চৌকশ। বাবা গত হয়েছেন, ছোটোভাই তো পড়াশোনা চলাকালীন-ই কলকাতায় চলে এসেছিলেন। তারপর আর ওমুখো হননি। কালেভদ্রে বেড়াতে বা প্রয়োজনে গেছেন কখনও সখনও। গ্রামের ওই প্রাসাদোপম বাড়ির বাসিন্দা বলতে বড়োভাই, ভাই বউ, আর তিনি। ভাইয়ের এক মেয়ে। তার বিয়ে হয়ে সে শ্বশুরবাড়িতে। আর এক ছেলে ছিল বটে, তবে সে আর বেঁচে নেই। বছর সাতেক আগে বিনা নোটিশে দু-দিনের জ্বরে সব শেষ। সেই থেকেই বড়োভাই শয্যাশায়ী। বিঘের পর বিঘে জমিজমা, চাষবাস সবই এখন মৃন্ময়ীদেবীর রক্ষণাবেক্ষণে।

ছুটির দিন। একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠেছে ঐশী। রোজই তো সেই ১০টা – ৬টার ডিউটি। সকালে উঠে কাকচান সেরে কোনওরকমে নাকেমুখে গুঁজে ছোটা। একদিন এর অন্যথা হলে বেশ ভালোই লাগে। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে আজ সোয়া নটা বেজে গেছে তার। তারপর বাড়তি মেদ ঝরাতে ট্রেড মিলে মিনিট কুড়ি হাঁটা। অন্যান্য দিনের তুলনায় ছুটির দিনেই একটু স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ে আর কী! হাঁটতে হাঁটতেই কানে এল এক প্রৌঢ়ার গলা। এ গলা সে আগেও কোথাও শুনেছে। কিন্তু কোথায়?… উৎসাহবশত বসার ঘরে আসতেই দেখল শ্বশুর-শাশুড়ি, শতদ্রু সবাই মিলে সেই পিসিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দীপ্তিময়ের সেই টানা চোখ। বয়সের কারণে ত্বকে খানিক শিথিল ভাব এলেও, এককালে যে অপরূপা সুন্দরী ছিলেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যেমনি লম্বা দীর্ঘকায়া তেমনি রংও যেন ফেটে পড়ছে। হাঁ করে তাকিয়েছিল ঐশী। হুঁশ ফিরল তাঁর রাশভারী গলার আওয়াজে। ভারী গলায় তিনি কাদের যেন দুষছেন। ‘বেআদব সব ছেলেপুলে। একটু শিক্ষেদীক্ষে নেই গো, বড়োদের সম্মান পর্যন্ত করতে জানেনে সব। সক্বাল না হতে হতে বেহায়াদের মতো হাত ধরাধরি করে… ছি ছি ছি…।’

পিসিশাশুড়ির কথায় হাসি পেলেও নিজেকে সংযত করে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল ঐশী। দু-পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন আছেন পিসিমা?’

এই নাকি তাঁর নাতবউ! পরনে ট্রাউজার আর ঢলা গেঞ্জি। ঘেমে নেয়ে একাকার। দেখেই মৃন্ময়ীদেবীর চক্ষু চড়কগাছ।

‘থাক থাক। আর প্রণাম করতে হবে না।’ বলেই কয়েকপা পিছিয়ে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলি বেলা তো কম হল না, এখনও নাওয়া-খাওয়া হয়নি বুঝি?’

‘না আসলে একটু ব্যায়াম করছিলাম। আপনার আওয়াজ শুনে চলে এলাম। এবার…’

‘তা বেশ করেছ, এবার নেয়ে এসো দিকি।’

‘যাচ্ছি পিসিমা। তার আগে আপনার পছন্দের এককাপ চা বানিয়ে আনি। মার কাছ থেকে শিখেছি দেড় চামচ চিনি আর কড়া লিকার, তাইতো?’ বলেই হাসল ঐশী।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই চা বসা, আমি আসছি।’ সুমিত্রাদেবী বউমাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও সফল হন না। কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই গলা ভারী করে ভাজের দিকে তাকিয়ে, ‘ও তুমিও বুঝি এই মেয়ের পাল্লায় পড়ে শহুরে আদবকায়দা রপ্ত করেছ। ম্লেচ্ছদের মতো নাওয়া-ধোওয়া না করেই রান্নাঘরে ঢুকছ?’

‘না-না দিদি একদমই তা নয়। আমিই চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।’ বলেই রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন তিনি।

‘আপনার সঙ্গে অনেক গল্প করার আছে পিসিমা, আমি চটপট স্নান সেরে আসছি’, বলেই পিসিমাকে একবার জড়িয়ে ধরে ঐশী ছুটে পালাল স্নানঘরের দিকে।

‘কী মেয়েরে বাপু! বাপের বাড়ি থেকে কি কোনও রীতিনীতিই শিখে আসেনি? তা রমা তোরাও তো দেখছি আশকারা দিয়ে দিয়ে একেবারে মাথায় তুলে রেখেছিস। সংসারের আচার-ব্যবহার কিছু শেখা, নয়তো পরে তোদেরই ভুগতে হবে এই বলে দিচ্ছি।’ চা-আসা পর্যন্ত রমাকান্তবাবু আর শতদ্রুর এইভাবেই ক্লাস নিতে থাকলেন মৃন্ময়ীদেবী।

মৃন্ময়ীদেবীর বিপক্ষে গিয়ে কিছু বলার ক্ষমতা দুজনের কারওরই ছিল না। দিদির কথার প্রেক্ষিতে রমাকান্তবাবু শুধু এটুকুই বললেন, ‘তুমি যখন এসেই গেছ, তুমিই ওকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিও। আচ্ছা দিদি তুমি বোসো, আমি একবার বাজারটা ঘুরে আসছি’, বলে উঠতে যাবেন এমন সময় সুমিত্রাকে দেখে, ‘ওই তো সুমিত্রা এসে গেছে। তুমি চা খাও, আমি এক্ষুনি আসছি’, বলেই রমাকান্তবাবু বাইরে বেরিয়ে গেলেন। শতদ্রুও পিসিমার ব্যাগ-পত্র গেস্টরুমে রাখার বাহানায় ঘর থেকে সরে পড়ল। অগত্যা সুমিত্রাদেবী-ই বসে রইলেন ননদের উপদেশাবলি শোনার জন্য।

সন্ধেবেলা সকলে একসঙ্গে বসে চা-জলখাবার খেতে খেতে নানান আলোচনা চলছে। গল্পের আসর বেশ জমে উঠেছে। গ্রামের নগেনখুড়ো থেকে শীতের নলেন গুড়– কোনওকিছুই বাদ নেই। খাওয়াদাওয়ার কথা উঠতেই ঐশী হঠাৎই হাহা করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, ‘বাবা মনে আছে চিন্নাস্বামী আর তার পরিবারের কথা, সেই দিল্লি যাওয়ার সময় ট্রেনে?’

‘আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আবার থাকবে না! চিন্নাস্বামীর হাতির মতো চেহারার ছেলেটিকে বলে কিনা দিনদিন রোগা হয়ে যাচ্ছে। একদম নাকি খায় না। অথচ ট্রেন ছাড়ার পর থেকে একটা মুহূর্ত মুখ থেমে থাকেনি তার। বোধহয় দশজনের খাবার সে একাই খেয়ে নিয়েছে ততক্ষণে।’ বলেই শ্বশুর, বউ মিলে হেসে লুটোপুটি খেতে থাকল।

হাসিতে রাশ টানলেন পিসিমা। ‘আহ্ ঐশী একটু আস্তে। ভুলে যেও না এটা তোমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে কেউ তোমার বন্ধু নয়।’

কেউ কিছু বলার আগেই ঐশী অকপটভাবে বলে বসল, ‘মা-বাবার থেকে বড়ো বন্ধু আবার কেউ হয় নাকি পিসিমা? বাপি ছিল আমার সব থেকে প্রিয় বন্ধু আর এখানে বাবা-মা। কী বলো বাবা?’

উত্তর দেওয়া দূরস্থান, ঐশীর কথাতেই বিষম খেয়ে কাশতে কাশতে শ্বাস ফুলে উঠল রমাকান্তবাবুর। এই বুঝি দিদি ঝাঁপিয়ে পড়ল বেচারির উপর। হলও তাই।

‘বড়োদের মুখে মুখে কথা বলাটা মোটেই শোভনীয় নয় ঐশী। তাদের সম্মান করতে না পারো, অন্তত অনাদর কোরো না।’ বেচারিকে এমন ধমক দিলেন যে বাড়ির সকলের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

ঐশী জিভ কাটল, ‘ছি ছি পিসিমা, এমন বলবেন না। আমি আপনাকে হার্ট করতে চাইনি, আসলে দোষটা আমার বাপির। আপনার সঙ্গে যখন আমার বাপির দেখা হবে, আপনি খুব করে শাসন করে দেবেন তো। ওনার অপত্যস্নেহেই আমি বিগড়ে গেছি। ছোটো থেকে উনি-ই আমাকে শিখিয়েছেন, সবকিছু বন্ধুর মতো ওনার সাথে খোলাখুলি আলোচনা করতে। সেই অভ্যাসটাই থেকে গেছে। এখানেও তাই বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে, ভুলেই যাই যে উনি আমার শ্বশুরমশাই। ওনার সামনে বেশি কথা বলা সাজে না আমার।’ কথাগুলো বলে মাথা নীচু করে অপরাধীর মতো বসে রইল সে। ঐশীর মাথা নীচু করার ভঙ্গি দেখে শ্বশুর, শাশুড়ি, শতদ্রু – সকলেই হেসে ফেলল।

‘এই মেয়ের পাল্লায় পড়ে তোমাদেরও মাথা খারাপ হয়ে গেছে দেখছি।’ সকলকে হাসতে দেখে রাগে গজগজ করতে করতে নিজের ঘরে চলে গেলেন মৃন্ময়ীদেবী।

মৃন্ময়ীদেবী আসার পর থেকে এ-বাড়িতে বেশ একটা অদ্ভুতরকম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ওনার কাজই যেন ঐশীর দোষত্রুটি খুঁজে বার করা। তারপর তাকে ভৎসনা করা। বাড়ির অন্য সদস্যরা তাঁর হ্যাঁ-তে হ্যাঁ না মেলালেই মুখ ব্যাজার করে সেই একই সাবধানবাণীর পুনরাবৃত্তি, ‘প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলা হচ্ছে মেয়েটাকে।’

দিন দশেক এইভাবেই কেটে গেল। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন মায়াপুর থেকে খবর এল সুমিত্রাদেবীর ছোটোকাকা মারা গেছেন। দাহ হওয়ার আগে শেষবারের মতো দেখতে হলে এখুনি রওনা দিতে হবে। তখুনি শতদ্রু বাবা-মাকে নিয়ে গাড়িতে রওনা দিল মায়াপুরের উদ্দেশে। ফিরতে ফিরতে কাল সন্ধে হয়ে যাবে। বাড়িতে এখন ঐশী আর পিসিমা।

ভাই-ভাজ-ভাইপো রওনা দেওয়ার ঘন্টাখানেক পরে হঠাৎ ওনার মনে হল সময়টা ভালো যাচ্ছে না, তাই একবার মন্দিরে ঘুরে আসা দরকার। ফিরে আর কিছু খেলেনও না। ঐশী বারবার অনুরোধ করাতে জানালেন, ভোগ খেয়ে ফিরেছেন।

বিকেল থেকেই পিসি বারবার বাথরুম যাওয়া-আসা করছেন। সন্ধ্যার পর সেই আনাগোনার মাত্রা আরও বেড়ে গেল। সঙ্গে যোগ হল বমি। ঠিক করে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও নেই ওনার। সন্ধে গড়িয়ে রাত হতে চলল। বাড়িতে কেউ নেই। বাড়াবাড়ি হলে ঐশীর একার পক্ষে সামলানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। তাই দেরি না করে একটা রিকশা ডেকে এনে পিসিমাকে নিয়ে সোজা চলে গেল ডাক্তারখানায়।

চেম্বারে বেশ ভিড়। সকলেই অপেক্ষা করছেন তাদের পালা কখন আসবে। কিন্তু ততক্ষণ অপেক্ষা করলে পিসির অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। তাই একমুহূর্ত দেরি করা যাবে না ভেবে, সোজা পিসিমাকে নিয়ে ডাক্তারের রুমে ঢুকে গেল ঐশী। পাশ থেকে অপেক্ষারত অন্যান্য পেশেন্টদের বাড়ির লোকের দু-এক কথা কানে গেল বটে, ‘এভাবে হয় না, সিরিয়াল অনুযায়ী দেখাতে হয়। সব কিছুরই একটা নিয়ম আছে। আমরাও তো রোগী নিয়ে অপেক্ষা করছি।’

তাদের দিকে না তাকিয়েই ঐশী জবাব দিল, ‘নিয়ম-ই সিরিয়াস পেশেন্টদের আগে চেক-আপ করা।’ বলে পিসিকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল সে। ডাক্তারবাবু পেশেন্ট-এর অবস্থা দেখে আর দ্বিমত করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে চেক-আপ করে প্রয়োজনানুযায়ী ইঞ্জেকশন দিয়ে ওষুধপত্র লিখে দিলেন।

বাড়িতে ফেরার পর প্রেসক্রিপশন মাফিক তিনটে ট্যাবলেট খাওয়ানোর পরে খানিক স্বস্তি পেলেন মৃন্ময়ীদেবী। ওআরএস জলে গুলে বারেবারে একটু একটু করে পিসিমাকে খাওয়াতে থাকল ঐশী। ঘন্টা দুয়েক পর অবস্থার খানিক উন্নতি হলে মৃন্ময়ীদেবী ঐশীর দিকে তাকালেন, ‘যদি রাতবিরেতে আবার বাড়াবাড়ি হয় তাহলে…’ মৃন্ময়ীদেবীর চোখেমুখে তখন চিন্তার ভাঁজ।

‘আমি তো আছি। আপনি চিন্তা করছেন কেন? কিছু হবে না। আপনি ঘুমানোর চেষ্টা করুন’, বলে পিসিমার মাথায় হাত বোলাতে থাকল ঐশী। বউমার আত্মবিশ্বাসে মৃন্ময়ীদেবীর সমস্ত টেনশন দূর হয়ে গেল। শিশুর মতো ঐশীর কোলের কাছে এগিয়ে গিয়ে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করলেন তিনি।

মায়াপুর থেকে ফোন এলে তাদেরও সকলকে ভরসা দিল ঐশী, ‘চিন্তার কিছু নেই, এদিকটা আমি সামলে নেব।’

রাত্রে মৃন্ময়ীদেবী যতবারই চোখ খুলেছেন, বিছানার পাশে ঐশীকে পেয়েছেন। সারারাত জেগে মেয়েটা সেবা করেছে পিসিশাশুড়ির। মাঝে মাঝে চামচে করে নুন-চিনির জল দিয়েছে, খেতে না চাইলে ধমক দিয়েও খাইয়েছে। রাত দেড়টা নাগাদ ওনার শরীরটা বোধকরি আবার গুলিয়ে উঠেছিল, সামলাতে না পেরে বিছানাতেই কাপড়েচোপড়ে বমি করে ফেলেছিলেন তিনি। অপ্রস্তুতে পড়ে গেলেন তিনি। পিসিমাকে ইতস্তত বোধ করতে দেখে ঐশী সামান্য হাসে, ‘কেন এত সংকোচ করছেন। ঠিক আছে হয়ে গেছে। বরং উঠে গিয়ে ভালোই হয়েছে, এইবার একটু হালকা বোধ করবেন।’

এক এক করে ওনার কাপড় ছাড়ানো, ভিজে তোয়ালে দিয়ে গা পরিষ্কার করা, ফ্রেশ কাপড় পরানো, বিছানার চাদর বদলানো সব হাসিমুখে সেরে ফেলল ঐশী। তারপর ওনার মাথায় এমন ভাবে হাত বুলিয়ে দিল যে মিনিট পনেরোর মধ্যেই উনি ঘুমিয়ে পড়লেন।

সকাল সাতটায় মৃন্ময়ীদেবী ঘুম ভাঙতে দেখলেন ঐশী তার মাথার পাশে বসে খাটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘাড়টা কাত হয়ে গেছে। স্নেহের হাত মাথায় রাখতেই চমকে উঠল সে। ধড়ফড়িয়ে উঠল, ‘আপনি ঠিক আছেন তো পিসিমা? শরীর কেমন? আর বমি হয়নি তো?’ যেন ঘুমিয়ে পড়ে সে এক বিরাট অপরাধ করে ফেলেছে, সেই অস্বস্তিতে একসঙ্গে প্রশ্ন করে ফেলল ঐশী।

‘ওরে থাম থাম, আমি একদম ঠিক আছি। শেষবার বমি হওয়াতে শরীরটা বেশ হালকা হয়ে গেছে। এখন আর কোনও কষ্ট নেই। দ্যাখ একদম ফিট। আমার কথা ছাড়, তোর উপর দিয়ে অনেক ধকল গেল, এবার আরাম করগে যা তো। একটু ঘুমিয়ে নে। সারারাত ঠায় মাথার সামনে বসে ছিলি। আমি সব দেখেছি।’

‘আগে স্নান সেরে তোমার জন্য কিছু খাবার বানাই, তারপর না হয়…’

‘না না তোকে কিছু করতে হবে না। আমি সব করে নেব। তুই ঘুমুতে যা দিখি।’

‘কিন্তু’,

ঐশীকে থামিয়ে দিয়ে মৃন্ময়ীদেবী আদেশ দেবার মতো ভঙ্গিতে বললেন, ‘কিন্তু-টিন্তু কিছু নয়, তোকে বলছি না তুই শুতে যা।’

এই এক রাতেই ঐশী আর মৃন্ময়ীদেবীর সম্পর্ক এক গভীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। স্নেহপরবশ হয়ে ঐশী যে কখন তার পিসিমার কাছে তুমি থেকে তুই হয়ে গেছে, তা বোধকরি তিনিও টের পাননি। সত্যিই সময়ই পারে সবকিছু বদলাতে।

আদেশ অমান্য না করে পিসিমার খাটেই গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ল ঐশী। রান্নাঘরে যাওয়ার আগে বউমাকে ওভাবে শুতে দেখে একখানা চাদর চাপিয়ে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে গেলেন তিনি।

ঐশীর উঠতে উঠতে মৃন্ময়ীদেবীর ভাত-ডাল-আলু-পোস্ত সমস্ত কিছু কমপ্লিট। দুপুরে দুজনে একসঙ্গে লাঞ্চ সেরে দেদার গল্পে মেতেছে।

‘একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করে, ঠিক ঠিক উত্তর দেবে কি? যদি দাও তা হলে বলি। আসলে তুমি আসার পর থেকেই প্রশ্নটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।’

‘ভণিতা না করে কী বলবি বল দিকি?’

‘না দ্যাখো, আমরা প্রতিমাসে পার্লার ঘুরে আসছি, কত কত টাকা গচ্ছা দিয়ে আসছি, তবুও ত্বকে কোনও উজ্জ্বলতা নেই। আর তোমার এই বয়সেও এত গ্ল্যামার, রহস্যটা কী বলোতো?’ হাসতে হাসতে বলল ঐশী।

ঐশীর কানটা ধরে বলেন, ‘পিসিশাশুড়ির পিছনে লাগা হচ্ছে অ্যাঁ? ওরে মুখপুড়ি আমাদের সময় ওসব পার্লার ফার্লার ছিল না বটে, কিন্তু মা ঘষে ঘষে সর-বেসন মাখাতেন, বুঝলি।’

‘সত্যি বলছি তোমাকে দেখলে কেউ বলবেই না যে, তুমি বাবার থেকেও বড়ো। কী সুন্দর দেখতে তোমায়।’ মুগ্ধ চোখে তাকায় ঐশী।

‘নে আর আমড়াগাছি করতে হবে না।’ বলে মৃন্ময়ীদেবীও তার কৃত্রিম গাম্ভীর্য ভেঙে হেসে ফেললেন।

মায়াপুর থেকে ফেরার পর দুজনকে পাশাপাশি বসে এভাবে হাসিঠাট্টা করতে দেখে সকলেই হতবাক। পরিবেশ হালকা বুঝে রমাকান্তবাবু তো বলেই বসলেন, ‘একি রে বাবা, কোনও ভুল বাড়িতে ঢুকে পড়লাম না তো? নয়তো এমন মিরাকেল – ভাবাই যায় না!’

পাশে বসে থাকা বউমার গলা জড়িয়ে গালে একটা চুমু খেয়ে মৃন্ময়ীদেবী বললেন, ‘দ্যাখ রমা তুই আর তাচ্ছিল্য করিসনি বাপু। এমনিই আমি মরমে মরে আছি। আমার সত্যিই চিনতে ভুল হয়েছিল রে – এ যে একেবারে খাঁটি হিরে।’ বলেই চিবুকে একটু হাত বুলিয়ে বলেন, ‘জানিস কাল সারারাত ঠায় মেয়েটা মাথার কাছে বসে সেবা করেছে আমার। খাব না বলেছি বলে ধমক পর্যন্ত দিয়েছে। ঠিক আমার মায়ের মতো। আমার জন্য ডাক্তারখানায় কম রাগারাগি করেনি, ডাক্তারও বাধ্য হয়েছে আমাকে দেখতে। খুব বুঝেছি তোরা কেন এই পাগলিটাকে এত ভালোবাসিস।’ বলতে বলতে চোখের কোণায় জল ভরে আসে মৃন্ময়ীদেবীর। ‘মেয়েটাকে তো অকথা-কুকথা কম বলিনি, হাসিমুখে সব সয়েছে। আজকালকার দিনে এমন বউ পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের রে। সত্যিই ভাগ্যের!’ আবেগবিহ্বল হয়ে চোখ মুছলেন পিসিমা। মৃন্ময়ীর এই রূপান্তরে সকলেই বেশ হতবাক। পাষাণের ভেতরেও যে এত টলটলে জলের এক হ্রদ ছিল তা কে জানত!

 

শয়তানের মুখোশ

‘বাবা এ বাবা দমে জ্বালা কইরছ্যে। ইটা ঢুইকব্যেক লাই। ছোটো বঠে। বাবা এ…’

‘দেখছিস মাপ লিচ্ছি তবু কানের গড়াটায় সেই ঘ্যেনের ঘ্যেনের কচ্চিস। টুকু দাঁড়া ন, মাপটা লিয়েলি।’

‘বাবা এ বাবা…’ এবার ঘুমটা ভেঙে যায় দুলালের। এখন ঘরময় অন্ধকার, দাঁত বিছিয়ে খিলখিল করে হাসছে। বিছানা থেকে উঠে লাইটটা জ্বালায় দুলাল। অন্ধকারের দাঁতগুলো যে যার মতো ঘরের দেয়ালে লুকিয়ে পড়ে। ঘামে শরীরটা ভিজে গেছে দুলালের। মাটির কলশি থেকে গ্লাসে জল গড়িয়ে ঢক-ঢক শব্দে জলটা গিলে নেয় দুলাল। বাতাসি আলুথালু শরীর বিছিয়ে ঘুমোচ্ছে এখন। ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে বাতাসির চুপসে যাওয়া বুকদুটো বেরিয়ে পড়েছে বাতাসের খোঁজে। বালিশের তলা থেকে বিড়ির বান্ডিল আর দেশলাইটা নিয়ে একটা বিড়ি ধরায় দুলাল। বিড়ির ধোঁয়ায় ঘরটা আরও গুমোট হয়। দুলালের কানে স্বপ্নে শোনা কথাগুলো আবার ভিড় করে আসে…

১)

ভাদ্রমাসের মাঝামাঝি থেকেই কাজের চাপ বাড়তে থাকে দুলালের। এই দুটো মাস নিঃশ্বাসটাও গুনে-গুনে নিতে হয় ওকে। বাতাসি কাজে তেমন পটু না হলেও দুলালকে যথেষ্ট সাহায্য করে। মুখোশগুলোকে সময় মতো রোদে দেওয়া, পরিমাণমতো রোদ পাওয়ার পর সেগুলোকে তুলে ঘরে রাখা। দোকানে দোকানে গিয়ে অর্ডার নিয়ে আসা। সময় মতো অর্ডারের মাল দোকানে দিয়ে আসা। বাতাসি না থাকলে দুলালের একার পক্ষে সবদিক সামলানো সম্ভব হতো না।

পুরুলিয়ার মাহাত পাড়ায় গিয়ে দুলাল মাহাতোর নাম বললে যে কেউ ওর ঘরটা দেখিয়ে দিতে পারবে। রাজ্যপাল আর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বেশ কয়েকবার পুরস্কার পেয়েছে দুলাল। সেবছর দুর্গা পূজার সময় বাথানির মাঠে মরা মহিষ বানিয়ে শকুন নামিয়ে দিয়েছিল দুলাল। সেদিনের পর থেকে ছেলেবুড়ো সবাই ওকে এক নামে চেনে। তবে দুলাল মাটির কাজে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। ছৌনাচের মুখোশ বানাতেই ও বেশি ভালোবাসে। সারা বছর ধরেই মুখোশ বানাতে হয় ওকে। দুর্গা পূজার আগের কটা মাস খুব কাজের চাপ পড়ে যায়। নানান জায়গা থেকে অর্ডার আসে।

প্রতিদিনের মতো আজকেও দুলাল সকাল সকাল নিজের কাজ নিয়ে বসেছিল। আপন মনে রং করছিল একটা মুখোশ। বাতাসি মুখোশের সাইজ অনুযায়ী পেপার কাটছিল দুলালের পাশে বসেই। ঠিক এমন সময় একটা লোক ঢুকল ঘরের ভেতর। অদ্ভুত চেহারা লোকটার। কাঁচাপাকা চুল, গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঠোঁটের কোণায় হাসির রেখা ঝুলে আছে। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। পরনে আলখাল্লা ধরনের একটা পাঞ্জাবি। দুলাল কিছুক্ষণ চেয়ে দেখল লোকটাকে, তারপর বলল, ‘পূজার আগে আর লতুন অডার লিব লাই।’ লোকটা কিছুই বলল না। হাসি মুখে তাকিয়ে রইল একটা মুখোশের দিকে। কথাটা বলার পর দুলাল ভেবেছিল লোকটা হয়তো কিছু বলবে। লোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দেখে দুলাল এবার জিজ্ঞেস করল, ‘কীসের মুখশ চাই?’

এবার উত্তর দিল লোকটা, ‘আমি মুখোশ কিনতে আসিনি।’

‘তাহলে কী জন্যে আইচেন?’ জিজ্ঞেস করল দুলাল।

‘এমনি।’

লোকটার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না দুলাল। আর কথা না বাড়িয়ে বাতাসিকে চোখের ইশারায় ঘরের ভেতর ঢুকতে বলে, আবার নিজের কাজে মন দিল। বাতাসি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল দুলালের দিকে। তারপর চুপচাপ ঘরের ভেতরে চলে গেল। হাতে ধরে থাকা মুখোশটায় রং দেওয়া হলে দুলাল তাকিয়ে দেখে লোকটা নেই। কখন বেরিয়ে গেছে। লোকটার মতিগতি বোধগম্য হল না দুলালের। এমন তো কত লোকেই আসে-যায় ওসব নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবার সময় হয় না দুলালের। আজকের এই লোকটাকে দেখে কেমন যেন একটা খটকা লাগল ওর।

হাতের রং করা মুখোশটাকে উঠোনের রোদে নামাতে গিয়ে দুলাল খেয়াল করল সদর দরজার কোণায় একটা প্যাকেট পড়ে আছে। প্যাকেটটা কুড়িয়ে থমকে গেল দুলাল। একবান্ডিল পাঁচশ টাকার নোট রাখা আছে প্যাকেটটার ভেতর। বুকটা ছ্যাঁক করে উঠল দুলালের। কোনও বদ মতলব নিয়ে আসেনি তো লোকটা? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল কয়েকবার। কোনও উত্তর পেল না। একবার ভাবল প্যাকেটটা নিয়ে গিয়ে লোকাল থানায় দিয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত সাহস হল না দুলালের। পুলিশের চক্বরে পড়লে বিপদের সম্ভাবনাই বেশি। শেষ পর্যন্ত অনেক চিন্তা ভাবনা করে প্যাকেটটা ঢুকিয়ে রেখে দিল একটা মুখোশের ভেতর। যদি লোকটা আবার আসে তাহলে ওকে ফিরিয়ে দেবে…

২)

নানান কাজের চাপে টাকার প্যাকেটটার কথা মাথাতেই ছিল না দুলালের। মনে পড়ল মুখোশটা বিক্রি করতে গিয়ে। মুখোশটা হাতে নিয়েও টাঙিয়েই রেখে দিল দেয়ালে। বেশ কিছুদিন হল পূজা পেরিয়ে গেছে। এখন কাজের তেমন চাপ নেই বললে চলে। দুলাল ভেবেছিল লোকটা হয়তো আবার কিছু দিনের ভেতর কোনও কুপ্রস্তাব নিয়ে আসবে। কিন্তু লোকটা সেই যে গেল আজও এল না। প্যাকেটটার কথা দুলাল বাতাসিকেও বলেনি। দুলাল জানে বাতাসি টাকার গন্ধ পেলে সেটা শেষ না করে শান্তিতে বসবে না।

দিন দিন কাজের পরিমাণ যতই কমছিল ততই বেশি মনে পড়ছিল টাকার প্যাকেটটার কথা। শেষ পর্যন্ত দুলাল যখন নিশ্চিত হল লোকটা আর আসবে না তখন হাত দিল টাকার প্যাকেটটায়। ওই টাকা খরচা করে ঘরের চাল-ডাল যেমন এল, ঠিক তেমন ভাবেই মুখোশের রং তুলিও এল। বিনা পরিশ্রমের টাকা খরচা করতে বিশেষ সময় লাগল না। মাস দুয়েকের ভেতরেই দুলাল শেষ করে ফেলল টাকাগুলো। টাকাটা শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর আবার হাজির হল লোকটা। লোকটা যে আবার কোনও দিন আসতে পারে সেটা কল্পনা করেও দেখেনি দুলাল। লোকটাকে দেখামাত্রই দুলাল মনে মনে ঠিক করে নিল লোকটা টাকার কথা বললে টাকাটার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে যাবে। কিন্তু আশ্চর্য, লোকটা টাকার কোনও কথাই বলল না। সেদিন যেমন নীরবে বেরিয়ে গিয়েছিল ঠিক তেমন ভাবেই বেরিয়ে গেল আজকেও। তবে আজকে আর কোনও টাকা রেখে গেল না লোকটা।

এবার বেশ চিন্তায় পড়ল দুলাল। কে এই লোকটা? কেন আসে ওর কাছে? কী করাতে চায় ওকে দিয়ে? নিজেই নিজেকে প্রশ্নে প্রশ্নে অস্থির করে দুলাল। কিন্তু উত্তরগুলো কিছুতেই ধরা দিল না ওর হাতে। শেষ পর্যন্ত বাতাসিকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল দুলাল। ওর একার পক্ষে আর চাপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তবে বাতাসিকে বলেও বিশেষ কিছুই লাভ হল না দুলালের। বাতাসি এমন কোনও পথ বলতে পারল না যে পথে ভাবলে মানসিক শান্তি পায় দুলাল।

৩)

আজকে আর রাতজেগে কাজ করতে ইচ্ছে করছিল না দুলালের। বেশ কিছুদিন হল শরীরটাও সাথ দিচ্ছে না ওর। বাতাসির সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমটা ভাঙল আবার সেই স্বপ্নটা দেখে। অনেক চেষ্টা করেও আর ঘুম এল না ওর। শেষ পর্যন্ত ঘরের কপাট খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতে হল ওকে। একটা বিড়ি ধরিয়ে বসল ঘরের বারান্দায়। আজকে আকাশ জুড়ে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখা মুখোশগুলো। ঘরের পিছন দিকের বাঁশ বাগান থেকে ডাহুকের ডাক ভেসে আসছে। এমন রাত মানুষের মনে নেশা ধরিয়ে দেয়। দুলালের ভেতরটাও আপন খেয়ালে গুনগুন করে ওঠে,

‘আইজ চাঁদ চইল্যেছে আকাশ গায়ে জোছনা বিছ্যায়ে

আইজ বুকের ভেতর প্রেমের খেলা দুবুক লাচ্যাইয়ে।

তুই ঘর ভিতরে ঘুমাই আছিস আমি বেকার বাজাই বাঁশি

আর কবে বুঝবি লো তুই আমি কীসের লাইগ্যে আসি?’

দুলাল গানটা থামিয়ে দিতেই দরজার বাইরে থেকে গানের পরের লাইন দুটো ভেসে আসে,

‘ওলো সখী তুই উঠার আগেই ভোর হইয়্যে যায় পাছে

আয়-না-গো তুই বাতাস হইয়্যে আমার বুকের কাছে।’

গানের শেষ দুটো লাইন শুনে দুলাল অবাক হয়ে যায়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কে এই গান গায়? এই গান তো দুলালের বানানো গান। এই গান অন্য কারুর জানার কথা নয়। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে বাইরের দরজাটা খুলল দুলাল। দরজাটা খুলেই দেখল সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় দুলাল পরিষ্কার দেখতে পেল লোকটা হাসছে। সরাসরি জিজ্ঞেস করল দুলাল, ‘এতো রাইত্যে কী জন্যে আইচেন?’

‘একটা মুখোশ চাই আমার।’

‘না আমি আপনারে কোনও মুখশ দিব লাই।’

লোকটা হাসতে থাকে। নিস্তব্ধ রাত্রিতে ভয়ংকর শোনায় সেই হাসির শব্দ। দুলাল নিজের কান দুটোকে প্রাণপণে চাপা দিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘আমি দিব লাই মুখশ। কোনও মুখশ দিব লাই।’

লোকটা হাসি মুখেই বলে, ‘মুখোশটা বানিয়ে ফ্যাল্। ওই মুখোশটা তোকে বানাতেই হবে।’ কথাগুলো বলেই লোকটা স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। দুলাল কান দুটোকে চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে কপাট কোণে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকটাকে আর দেখা যায় না। বাতাসি দুলালকে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে এসে কপাট বন্ধ করে দেয়।

৪)

পরের দিন সকাল সকাল বাতাসি কয়েকটা মুখোশ নিয়ে বাজারে বেরিয়ে পড়ে। এই মুখোশগুলো রমেন গাঙ্গুলি অর্ডার দিয়েছিল। মুখোশগুলো কলকাতায় যাবে। আজকে বাজারে আরও একটা কাজ আছে বাতাসির। দুটো কাজ সেরেই ও ফিরবে। বাতাসি বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পরই ভাঙা আলমারিটা থেকে দুলাল একটা মুখোশ বের করে আনে। আজ অনেক বছর পর দুলাল আবার বের করেছে মুখোশটা। সেদিন সারারাত কাজ করেও মুখোশটা শেষ করতে পারেনি দুলাল। সেই রাতের পর আর হাত দেওয়া হয়নি মুখোশটায়। আজকে যে ভাবেই হোক মুখোশটার অসমাপ্ত কাজটা ওকে শেষ করতে হবে। গতকাল রাতেই দুলাল বুঝতে পেরেছিল লোকটা কোন মুখোশটা নিতে চায়। আজ থেকে সাত বছর আগে একজন লোক এসেছিল দুলালের কাছে। একটা শয়তানের মুখোশ বানাতে বলেছিল দুলালকে। কাজটা নিয়েছিল দুলাল। কিন্তু শেষ আর করতে পারেনি।

মুখোশটায় রং করতে করতে দুলাল শুনতে পায়, ‘বাবা এ দমে জ্বালা কইরছ্যে। ইটা ঢুইকব্যেক লাই। ছোটো বঠে। বাবা এ…’

মাঝে মাঝে রং তুলি ফেলে কান দুটোকে চাপা দেয় দুলাল। কয়েক মিনিট পর কান ছেড়ে আবার কাজে মন দেয়। প্রায় ঘন্টা খানেক এভাবে চলার পর মুখোশটার কাজ শেষ হয়। একটা অদ্ভুত আনন্দ হয় দুলালের ভেতর। এর আগে কোনও মুখোশ বানিয়ে এতটা আনন্দ হয়নি ওর। যেমন বানাতে চেয়েছিল অবিকল তেমনই মুখোশ বানিয়েছে দুলাল।

মুখোশটা দুহাতে নিয়ে দুলাল ওটাই ভাবছিল কতক্ষণে লোকটা আসে। ও এলেই ওর হাতে মুখোশটা ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করবে ওকে। মুখোশটা কমপ্লিট হওয়ার পর সেই লোকটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাসি মুখে দুলালকে জিজ্ঞেস করে, ‘হয়েছে?’

‘হইচ্যে। কিন্তু এই মুখশটা লিয়ে যাবার পর আর আসা চইলব্যেক লাই আমার বাড়ি।’ দুলাল বলে।

লোকটা কোনও কথা না বলে মুচকি হেসে দুলালের কাছে এগিয়ে আসে। দুলাল শক্ত করে ধরে রাখে মুখোশটা। কয়েকপা পিছিয়ে গিয়ে দূরের থেকেই মুখোশটা দেখায় লোকটাকে। লোকটার পছন্দ হয়েছে বুঝতে পারে দুলাল।

লোকটা হাসি মুখে অস্ফুট সুরে বলে, ‘শয়তানের মুখোশ।’

যখন বাতাসি ঘরে ঢোকে তখনও দুলাল লোকটার সঙ্গে গল্প করছে। আজকে বাতাসির সঙ্গে আরও একজন এসেছে।

পুলিশ?

না পুলিশ নয়, মনের ডাক্তার। বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সুবিমল সরকার। ডাক্তারকে বাতাসি আঙুল বাড়িয়ে দেখায় দুলাল কেমন ভাবে নিজেই নিজের সঙ্গে গল্প করছে। শুধু তাই নয় দুলাল গল্প করছে সম্পূর্ণ দুরকম ভাবে। একটা ওর নিজের ভাষা। অন্যটা শহরের। বাতাসি দুলালের কাছে যেতে চাইলে সুবিমল বাধা দিয়ে ফিসফিস করে বলে, ‘ওকে মুখোশটা দিতে দাও।’

দুলালের কল্পনায় তৈরি লোকটা যখন কথা দেয় ও আর আসবে না, তখন দুলাল মুখোশটা শূন্যে তুলে ধরে। তারপর লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। বাতাসি আর সুবিমল সরকার মিলে দুলালকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসে। সুবিমল বলে, ‘ভয়ের কিছু নেই। আশা করি আজকের পর আর এই সমস্যা হবে না। তবে ওই মুখোশটা যেন ওর চোখে আর না পড়ে। পারলে ওটাকে পুড়িয়ে দিও।’

৫)

বাতাসি উঠোনে গিয়ে মুখোশটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যায়। অবিকল নিজের মুখোশ বানিয়েছে দুলাল। কাঁচাপাকা চুল, গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঠোঁটের কোণায় হাসির রেখা ঝুলে আছে। মুখোশ হাতে নিয়ে বাতাসি ডাক্তারের সামনে তুলে ধরে। মুখোশটাকে দেখার পর কয়েক মিনিট চিন্তা করে সুবিমল। কোনও একটা হিসেব মেলানোর চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর সুবিমল বাতাসিকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা দুলাল নিজের মুখোশ বানাল কেন? তোমার কী মনে হয়?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাতাসি বলে, ‘যেদিন রাইত্যে আমাদের ছেল্যাডারে সাপে কাইট্যে ছিল সেদিন একটা লোক আছিল একটা অডার লিয়ে। একটা শয়তানের মুখশের অডার। সেই অডারের কাইজটাই রাইত্যের বেলায় কচ্চিল দুলাল। আমি ঘুমোচ্চিলাম। তাতাই আমাকেও তুইল্যেছিল, উঠি লাই। উয়ার বাপও কাইজ ছ্যাইড়ে উঠে লাই। যখন জাইনত্যে পাইল্লম তাতাইকে সাপে কাইট্যাছে, তখন সব শেষ। সেদিন থ্যেইক্যেই তাতাই-এর বাপ ক্যেমন যেন হইয়ে গেছ্যে।’

‘আচ্ছা সেদিন তুমি টাকার বান্ডিলটা কোথায় রেখেছিলে?’

‘ওই কপাট কুনট্যায়।’ আঙুল বাড়িয়ে দেখায় বাতাসি।

‘দুলাল টাকাগুলো নিয়ে কোথায় রেখেছিল বলতে পারবে?’

‘একটা মুখশের ভিতর‍্। দাঁড়ান লিয়ে আসচি।’

বাতাসি মুখোশটা নিয়ে এসে সুবিমলের হাতে দেয়। সুবিমল মুখোশটা বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর বলে, ‘আচ্ছা এই মুখোশটার ভেতর আরেকটা ছোট্ট মুখোশ কেন আছে?’

এবার চুপ করে যায় বাতাসি। কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা পু্রোনো ব্যথাটা চোখের পাতা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়।

বাতাসিকে চুপ করে থাকতে দেখে সু্বিমল বলে, ‘আমাকে মুখোশ রাখার ঘরটায় একবার নিয়ে চলুন।’

না বলতে পারে না বাতাসি। মুখোশ ঘরে নিয়ে আসে সুবিমল ডাক্তারকে। ঘরটায় ঢুকে অবাক হয়ে যায় ডাক্তার। সারা ঘরটা জুড়ে কয়েক’শ মুখোশ রাখা আছে। দেব-দেবীদের মুখোশ থেকে শুরু করে পশু-পাখি কিছুই বাদ নেই। কিন্তু একটা দেয়াল জুড়ে ঝুলছে অদ্ভুত কিছু মুখোশ। প্রতিটা মুখোশের ভেতর একটা করে ছোটো মুখোশ আছে। একটা মুখোশ হাতে নিয়ে ভেতরের ছোটো মুখোশটাকে বের করার চেষ্টা করে ডাক্তার। পারে না। বড়ো মুখোশটার ভেতর ছোটো মুখোশটাকে এমন ভাবেই ঢোকানো আছে যে, দুটোকে আলাদা করা যাচ্ছে না কিছুতেই। সুবিমল অবাক চোখে বাতাসিকে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি নির্ভয়ে বলতে পারো। আমি কাউকে কিছু বলব না। কেন বড়ো মুখোশটার ভেতর ছোটোটাকে লুকিয়ে রেখেছে দুলাল?’

শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে বাতাসি বলে, ‘তাতাইকে সাপে কামড়্যায় নায়, ডাক্তারবাবু।’

‘তাহলে?’

‘সাত বছর আগে সেদিন যে লোকটা আইছিল, সে বইল্যেছিল…’

‘শয়তানের মুখোশ বানাতে। তারপর?’

‘মুখশটা মাপে ঠিক হচ্যিল লাই। তাতাই-এর বাপ তাই তাতাইকে মুখশটা পরাই মাপটা ঠিক করত্যে গ্যেইছিল…’ কান্নায় বাতাসির কথাগুলো ঠোঁটের ফাঁকে ফাঁকে জড়িয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ভেতরের কান্নাটাকে গিলে ফেলার চেষ্টা করে বাতাসি বলে, ‘তাতাই বারবার বইল্যেছিল, দমে জ্বালা কইরছ্যে। ইটা ঢুইকব্যেক লাই। ছোটো বঠে। উয়ার বাপ কথাগুল্যান কানেই নিল লাই। আর খুলত্যে পারে নাই মুখশটা। মাছের মতো ছটপট্যাই ছটপট্যাই মইরে ছিল তাতাই…’ নিজেকে আটকাতে পারে না বাতাসি। সাত বছর ধরে জমিয়ে রাখা চোখের জল আজ আর কোনও বাধা মানতে চাইছে না।

সুবিমল একটা মুখোশকে টেনে ছেঁড়ার চেষ্টা করে। পারে না। প্রতিটা কাগজের মুখোশের ভেতর টিনের পাত দেওয়া আছে। সুবিমল খেয়াল করে দেখে সব মুখোশগুলোর গঠন এক নয়। অধিকাংশ মুখোশের পিছন দিকটায় কিছু নেই, ফাঁকা। গোটা কুড়ি-পঁচিশ মুখোশ আছে যেগুলোর পিছনটাও সুন্দর ভাবে বানানো। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই কুড়ি-পঁচিশটা মুখোশ শয়তানের মুখোশ।

সুবিমল সরকার আগে তো একজন মানুষ, পরে ডাক্তার। ওর বাড়িতেও বছর পাঁচেকের একটা মেয়ে আছে। তাই ওর পক্ষে দুলাল কিংবা বাতাসির যন্ত্রণার জায়গাটা বোঝা কঠিন নয়। এতক্ষণে সুবিমল বুঝতে পারে, কেন দুলাল শয়তানের মুখোশে নিজের রূপ এঁকেছে। কেন শয়তানের মুখোশের ভেতর একটা করে ছোট্ট মুখোশ ঢোকানো রয়েছে।

দুলাল এখনও অচেতন ভাবে বিছানায় পড়ে আছে। সুবিমল দুলালের নাকের কাছে আঙুল নিয়ে গিয়ে দেখে গরম নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা। না নিঃশ্বাস স্বাভাবিক। এখন কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে না দুলাল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সুবিমল বাতাসিকে বলে, ‘চিন্তা কোরো না। দুলাল ওই বাজে স্বপ্নটা বা ওই লোকটাকে আর কখনওই দেখবে না। তবে হাঁ জ্ঞান ফেরার পর যদি কাঁদে তো ওকে মন খুলে কাঁদতে দিও।’ কথাটা বলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গিয়েও আবার একবার ফিরে আসে সুবিমল, ‘আরেকটা কথা। শয়তানের ওই মুখোশটা, যেটা দুলালের নিজের মুখের আকৃতি, সেটা যেন আর দুলালের চোখে না পড়ে। ওটাকে দূরে কোথাও পুড়িয়ে দিও কিংবা মাটি চাপা দিয়ে দিও।’

সুবিমল চলে যাওয়ার পর বাতাসি দরজার কোণায় দাঁড়িয়ে দুলালের মুখটা একবার উঁকি দিয়ে দেখে। কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। তারপর মুখোশটা নিয়ে বাড়ির পিছন দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। আর কোনওদিন দুলালের চোখে পড়বে না শয়তানের মুখোশটা।

 

সংক্রমণ

হ্যাঁচ্চো!

উফ, এই তো ঠিক বেরোনোর মুখে তোমার শুরু হল।

আমি কি ইচ্ছে করে দিলাম নাকি! হাঁচি আসলে কী করব?

ভাল্লাগে না ধুর! নাকটা টিপে ধরতে পারো না?

আচ্ছা এত কুসংস্কার কেন তোমার? হাঁচি দেওয়া যাবে না, বিড়াল রাস্তা কাটা যাবে না, ডাকা যাবে না পেছন থেকে… একের পর এক! পারা যায় না।

পারতে হবেও না। আমার বিশ্বাস আমায় নিয়ে থাকতে দাও। তোমায় ভাবতে হবে না।

কথা বলাই মুশকিল।

বলোই বা কতটুকু? সারাদিন তো কাজ, কাজ আর কাজ!

কাজ না করলে খাব কী ম্যাডাম?

ঢং!

তো এবার হয়েছে বেরোব এখন? না আরও টাইম পাস করতে হবে হাঁচি দেওয়ার অপরাধে।

এসো এবার। দুগ্গা দুগ্গা!

হাসতে হাসতে অফিসের উদ্দেশে রওনা দেয় মলয়, আটশো বর্গফুট এই ফ্ল্যাট-বাড়িতে দোলন এখন একেবারে একা।

পাঁচতলা এই বিল্ডিং-এ আলো বাতাস খুবই কম ঢোকে। গুমোট লাগে দোলনের। জানলা-দরজাগুলো খুলে সামান্য আলো ঢোকানোর চেষ্টা করে সে। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। রেলিং-এ হাত দিয়ে নীচে ছড়িয়ে থাকা শহরটা দেখার চেষ্টা করে। পাঁচ বছর হয়ে গেল সে এই বিরাট শহরের বাসিন্দা অথচ আজও একে নিজের বলে ভাবতে পারল না। সব যেন কেমন প্রাণহীন! ছোট্ট একটুকরো বারান্দায় বেশ কয়েকটা ফুল গাছ লাগিয়েছে দোলন। এই বারান্দাটাই তাকে বাড়ির স্মৃতিকে মনে করায়। সামান্য হলেও এই প্রাণহীন শহরে এক চিলতে নিজের গ্রাম গড়ে তুলেছে দোলন।

মলয় দোলনকে স্পেস দেয়। থাকতে দেয় নিজের মতো করে। দোলনের ভালো লাগে খুব। তবু কেন জানি না, কিছুতেই বুঝতে পারে না, এই পাঁচবছরে শহরটার মতো মলয়কেও তেমন করে আপন ভাবতে পারল না দোলন।

॥ ২ ॥

কী চ্যাটার্জী? তিনদিন তো ছুটি পেলে, তা বউদিকে নিয়ে কোথাও যাওয়া-টাওয়ার প্ল্যান করলে নাকি?

টেবিলে পড়ে থাকা ফাইলগুলো ডেসপ্যাচ করার আগে আরও একবার চোখ বুলিয়ে দেখছিল মলয়। কাল শুক্রবার, ম্যানেজিং ডিরেক্টরের একজন মারা যাওয়ায় হঠাৎ একটা ছুটি পাওয়া গিয়েছে, তারপর শনি-রবি। ইচ্ছে করলেই কাছে-পিঠে কোথাও ঘুরে আসা যায়। ফাইল থেকে মুখ তোলে মলয়। তারপর হেসে বলে নাহ, যাওয়া হবে না দাদা।

আরে ঘুরে এসো। মন্দারমণি, শঙ্করপুর অথবা ডায়মন্ড হারবারও যেতে পারো! যাওনি তো বউদিকে নিয়ে কোথাও।

একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মলয়। মুখে বলে হবে না গো বোসদা। অন্য কাজ আছে।

অভিজ্ঞ বোসবাবু আর কথা বাড়ান না, মলয়ের কাঁধে হাত দিয়ে আলতো চাপ দেন শুধু।

বোসবাবু চলে গেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মলয়। দোলনের কথা মনে পড়ে তার। মনে মনে ভাবে যাওয়া তো যেতই কিন্তু দোলন কিছুতেই রাজি হবে না। কিছু না কিছু বাহানা বানাবেই। পাঁচবছর বিয়ে হয়েছে তাদের, কিন্তু দোলনকে আজও চিনতে পারে না মলয়। কী চায় মেয়েটা? আদৌ কি কিছু চায়? সারাদিন বাড়িতে বসে বসে মলয়ের ফেরার অপেক্ষায় রান্নাবান্না করে, ঘর পরিষ্কার করে, পুজো করে আর তার সংসার সামলায়। কিন্তু কিছুতেই বাড়ি থেকে বেরোতে চায় না। প্রথম প্রথম খুব জোর করত মলয়। মনের মতো করে সাজাতে চাইত দোলনকে। শেষ পর্যন্ত সে হেরেই গেল।

গ্রামের মেয়ে দোলন। এক ঘটক মলয়ের মাকে ছবিটা দিয়ে গিয়েছিল। এক ঝলক দেখেই পছন্দ হয়ে যায় তার। অমন টানা টানা চোখ, টিকোলো নাক, দুধে আলতা গায়ের রং মলয়ের না করার কোনও কারণ ছিল না। বিয়ের পর পরই কলকাতায় নিয়ে আসে মলয় দোলনকে। আর তখনই মলয় টের পায় দোলন যত সুন্দরী তার চাইতেও বড়ো কথা সে অসম্ভব কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং ঘরকুনো, আনস্মার্ট একটা মেয়ে।

তবু ভালো মানুষ মলয় সবটা মেনে নিয়েছিল। বিয়ের পর পর দু’একটা পার্টিতেও নিয়ে গিয়েছিল প্রায় জোর করেই। স্বাভাবিক ভাবেই অন্যান্যদের কাছে হাসির পাত্র হয়েছে সে। যদিও এসব কিছুই দোলনকে বুঝতে দেয়নি কোনওদিন মলয়। শুধু ওদের দূরত্ব বেড়েছে ক্রমে ক্রমে। সব আছে কিন্তু কী একটা যেন নেই! হয়তো দোলনও তা টের পায় কিংবা পায় না, কে জানে!

একবার দিঘাও বেড়াতে গিয়েছিল তারা। মলয় অবাক হয়ে দেখেছিল বাড়ির পুরো ঠাকুর ঘরটাই তুলে এনেছে দোলন হোটেলের রুমে। মুহূর্তে একসঙ্গে সমুদ্রস্নানের আমেজ মাটিতে মিশে গিয়েছিল তার। ব্যস! সেই শেষ! আর কোথাও যাওয়ার কথা বলেনি কোনওদিন। দোলনও যেতে চায়নি।

॥ ৩ ॥

বৃহস্পতিবারের পুজো সারতে সারতে আজ বেশ বেলা হয়ে গেল দোলনের। সকাল থেকে না খাওয়া কাপড় ছেড়ে রান্নার আয়োজনে লেগে পড়ে দোলন। মলয় দুপুরে আসে না। ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়। তবু রোজ নানা রকম রান্না করে দোলন। টেবিলে সাজিয়ে রাখে। আজ শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। ডাল আর চাল মিশিয়ে তার মধ্যে দুটো খোসা ছাড়ানো আলু দিয়ে দেয়। অবশ্য না খেলেও হয়। এমনি কতদিন সে উপোস করে থাকে।

দোলন আভেনে কুকারটা বসিয়ে বাইরের ঘরে সোফায় গিয়ে বসে। মাথার দুপাশের রগটা দপদপ করে ওঠে। ঘাড়েও প্রচন্ড চাপ। মলয়কে কি একটা ফোন করবে? ভাবতে ভাবতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দোলন।

অফিস ছুটি হলে বাসস্ট্যান্ড-এ এসে দাঁড়ায় মলয়। আকাশে ঘন কালো মেঘ। যখন তখন ঝেঁপে বৃষ্টি নামবে। এত সুন্দর ওয়েদার, একটু লাল জলে গলা ভেজালে বেশ হতো। কিন্তু বাড়িতে দোলন গোপালের আসন পেতেছে, সেসব ঢোকানো বারণ। মনে মনে বিরক্ত হয় মলয়। সত্যি দোলন তার ভালোমানুষির বড়ো বেশি সুযোগ নিচ্ছে না তো? অন্য কেউ হলে! দোলনের উপর রাগ বাড়তেই বন্ধু অনিরূদ্ধকে ফোন করে মলয়। তারপর উলটো দিকের বাসে চড়ে চলে যায় ওদের পুরোনো ঠেকে, বন্ধ করে দেয় মোবাইলের সুইচ।

রাত বাড়তে থাকে, পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি। মলয়ের বেশ নেশা হয়েছে আজ। তার মধ্যেই টের পায় আজ বাড়াবাড়িটা বেশিই হয়ে গেল বোধহয়। বন্ধু অনিরূদ্ধকে বলে, আমায় বাড়ি দিয়ে আসবি রে, বড্ড দেরি হয়ে গেল। দোলন ভয় পাবে।

অনিরূদ্ধর কয়েক পেগেও সমস্যা হয় না। সে গাড়ি স্টার্ট দেয়। জানলার কাচে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে বসে আছে মলয়। মনে মনে অস্থির হয়ে উঠেছে সে। হঠাৎই সাংঘাতিক ভাবে গাড়িটা পাশ কাটায় অনিরূদ্ধ। মলয় চমকে উঠে বলে, কী হল রে?

আরে একটা কালো বিড়াল! এমনিতেই বৃষ্টি, ভালো দেখা যাচ্ছে না।

মলয় চিন্তিত গলায় বলে, মারলি নাকি?

অনিরূদ্ধ স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতেই সহজ ভাবে বলে, নাহ, মরেনি ব্যাটা একটুর জন্য। রাস্তাটা পেরিয়ে গেল।

মলয় উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, সেকি? রাস্তা কাটল নাকি? থামলি না কেন?

অনিরূদ্ধ মলয়ের ছোটোবেলার বন্ধু। তার জীবনের কথা সে জানে সবটাই। অবাক চোখে বন্ধুর দিকে তাকায় সে, কিরে তুইও কি দোলনের মতো…।

থতমত খেয়ে যায় মলয়। তাড়াতাড়ি বলে, আরে না রে, ওই বললাম আর কী!

কিন্তু সারা রাস্তা মনটা খচখচ করতেই থাকে তার।

॥ ৪ ॥

কয়েকবার কলিংবেল বাজানোর পরও যখন ওপাশ থেকে দোলন দরজা খোলে না, তখন ডুপ্লিকেট চাবিটা বের করে মলয় ব্যাগ থেকে। ঘর অন্ধকার, দোলন কি তবে ঘুমিয়ে পড়েছে? গা ছমছম করে ওঠে! নেশাটাও অনেকটাই কেটে গেছে এতক্ষণে। আলো জ্বালিয়ে দোলনকে ডাকতে গিয়ে চোখে পড়ে সোফার উপর আড়াআড়ি ভাবে পড়ে আছে দোলন। মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বেরিয়ে শুকিয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। ছুটে গিয়ে দোলনের মাথাটা কোলে তুলে নেয় মলয়। ততক্ষণে দোলনের শরীর বরফের চাইতেও ঠান্ডা হয়ে গেছে।

মলয় দিশেহারা হয়ে পড়ে। সকালেই তো সুস্থ ছিল মেয়েটা! হঠাৎ কী এমন হল যে… পাগলের মতো দোলনের নাম ধরে ডাকতে থাকে মলয়।

না, আর কোনওদিন সাড়া দেয়নি দোলন। পাঁচবছরের দাম্পত্যের মায়া এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে সে চলে গিয়েছে অনেক দূরে। মলয় বুঝতে পারে, দোলনের কাছাকাছি পাশাপাশি থেকেছে কিন্তু ওর মনের হদিশ পায়নি কোনওদিন। পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। এমনকী মেয়েটা নিজের যত্ন নিত কিনা তাও জানে না মলয়। নির্ঝঞ্ঝাট ভালো মানুষ বলে নিজেকে নিয়ে গর্ব করত মলয়। আজ তা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে দোলন নামে গ্রামের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মেয়েটা।

দিন পেরিয়ে যায় মলয় টের পায় দোলন ছেড়ে গেলেও তাকে দিয়ে গিয়েছে তার যাবতীয় বিশ্বাস, ধ্যান ধারণা।

এমবিএ পাশ করা ঝকঝকে ছেলেটা আজকাল গোপালকে খাইয়ে অফিস যায়। পেছন থেকে কেউ ডাকলে দুমিনিট দাঁড়ায় আর বেরোবার মুখে হাঁচি এলে নাক টিপে ধরে, ঠিক যেমন করে ধরতে বলত দোলন।

দোলনের রেখে যাওয়া কুসংস্কার ছোঁয়াচে রোগের মতো সংক্রমিত হয় মলয়ের মনে। মলয় জানে এই রোগ থেকে সে আর আজীবন মুক্তি পাবে না।

ভিওয়ানির রহস্য

শ্যামলের জীবনটা যেন কেমন একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেয়ে টিউশন করে আর কতদিন চলবে! এসব ভাবতে ভাবতে একদিন দিল্লিতে একটা ইন্টারভিউ পেয়ে গেল। দিল্লির কনটপ্লেস-এ ইন্টারভিউতে সিলেক্টও হয়ে গেল। জানতে পারল, চাকরিটা হরিয়ানার ভিওয়ানিতে। প্রথমে ভেবেছিল যাবে না। পরে ভেবে দেখল, ঘুরেই আসা যাক না। নতুন একটা জায়গা দেখেই আসা যাক। ভালো না লাগলে ফিরে আসবে নিজের রাজ্যে।

বাবা-মা ও বন্ধুদের উৎসাহে বেরিয়ে পড়ল ভিওয়ানির উদ্দেশে। প্রথমে ট্রেনে করে দিল্লি পৌঁছোল, সেখান থেকে বাসে করে নানারকম অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিওয়ানিতে নিজের গন্তব্যস্থলে পৌঁছোতে অনেক সময় লেগে গেল। ওখানে পৌঁছে তার নামে অ্যালট করা কোয়ার্টারও পেয়ে গেল। কোয়ার্টার-এ জিনিসপত্র রেখে দেখল ঘড়িতে চারটে বেজে গেছে। দুপুরের খাওয়া অবশ্য পথে একটা ধাবাতেই করে নিয়েছিল।

অনেক দূরের জার্নি বলে বাসওয়ালারা মাঝপথে এক জায়গায় বাস থামিয়ে বলেছিল, যাদের খিদে পেয়েছে তারা এই ধাবাতেই দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিতে পারেন। তবে সময় মাত্র ১৫ মিনিট দেওয়া হবে। তার মধ্যে খেয়ে বাসে এসে বসতে হবে। শ্যামলও সে সুযোগ ছাড়েনি। কারণ বুঝতে পেরেছিল এখন না খেলে ওখানে গিয়ে আজ লাঞ্চ কপালে নাও জুটতে পারে, তাই খাওয়াটা সেরে নিয়েছিল। তবে সে যা খাওয়া তা অন্য সময় হলে হয়তো ফ্রিতেও খেতে চাইত না। তবুও কোনও উপায় নেই ভেবে খেতেই হল!

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবল এবার আশেপাশে একটু ঘুরে দেখে আসা যাক। রাতের খাবারটা কোথায় খাবে ইত্যাদি। কারণ কোম্পানি থেকে থাকার জায়গাটা ফ্রি দিয়েছিল কিন্তু ভেতরে রান্নার কোনও জায়গা ছিল না। তাছাড়া সোমবার থেকে জয়েনিং বলে রোববারে এসে পৌঁছোবার ফলে, অফিসের থেকে খোঁজও নেওয়া যাবে না। এসব ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে পড়ল। ভাবল ফেরার পথে রাতের খাবারটাও খেয়ে ফিরবে।

কোয়ার্টার থেকে বেরোবার সময় একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানল, তাদের এই জায়গা থেকে শহর একটু দূরেই, তাই রিকশাতেই যাওয়া ভালো। দেরি না করে একটা রিকশা নিয়ে শহরে পৌঁছে গেল। গিয়ে দেখল সেখানে বেশকিছু দোকানপাট আছে ঠিকই কিন্তু সে হিসেবে এটাকে শহর বললে একটু অপমানই করা হবে মনে হয়।

হঠাৎ নজরে পড়ল একটা দোকানে কুলফি মালাই বিক্রি হচ্ছে। লোভ সামলাতে না পেরে ঢুকে পড়ল সেখানে। কুলফিটা খেয়ে দাম দিতে গিয়ে দেখল যে, অতদূরের রিকশা ভাড়া নিয়েছে মাত্র দশ টাকা আর কুলফি নিল চল্লিশ টাকা। বেশ বুঝতে পারছিল ইচ্ছে থাকলেও এ শখ রোজ পূরণ করা যাবে না। এরপর অনেক দোকান-বাজার ঘুরে খাবারের দোকানের খোঁজে এগোতে লাগল।

হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন লোকালয়ে গলিতে ঢুকে পড়েছিল খেয়াল নেই। হঠাৎ একটা বিকট চিৎকারে প্রায় আত্মারাম খাঁচা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। পরক্ষণেই দেখল কতকগুলো মযূর এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে যাচ্ছে আর ওই অদ্ভুত বিকট চিৎকার করছে। সন্ধে হয়ে গেছে তাই তারাও ফিরে যাচ্ছে তাদের বাসায়।

মনে মনে ভাবল, ঈশ্বরের কী অদ্ভুত সৃষ্টি! মযূর দেখতে এত সুন্দর কিন্তু তার আওয়াজ যে এত কর্কশ, তা না শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে না। একসাথে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশটা মযূর ডেকে ওঠাতে শ্যামল প্রথমটা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এ ধরনের বিকট আওয়াজ সে কখনও শোনেনি। যখন সে খাবার হোটেলে গিয়ে পৌঁছোল তখন সন্ধে হয়ে গেছে।

হোটেলে গিয়ে শুনল আজ স্পেশাল ডিশ হল, ক্ষীর। শুনেই জিভ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছিল শ্যামলের। মনটা আনন্দে ডগমগ করে উঠল। কিন্তু এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থাযী হল না। এই ক্ষীর খাওয়ার অভিজ্ঞতা সে কখনও-ই ভুলবে না!

ক্ষীর খেয়ে বুঝতে পারল যে, এখানে দুধের পায়েসকে ক্ষীর বলা হয়। আর সেটা দুধের পায়েসও বলা চলে না। সেটা একেবারে দুধ-ভাত ছাড়া আর কিছু নয়। প্রথম দিনই এমন ক্ষীর খাওয়াতে এখানে বাইরে খাওয়ার উৎসাহটা একটু কমে গেল।

সেখান থেকে কোয়ার্টারে ফেরার সময় থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হল। কোয়ার্টারে যখন ফিরে এল তখন বৃষ্টির গতিও অনেক বেড়ে গেছে। বৃষ্টির শাব্দিক অনুভূতিটা বরাবরই তার কাছে বেশ আনন্দময় কিন্তু আজ যেন কেমন একটা গা শিরশির করা ব্যাপার আছে বলে মনে হচ্ছে। এমনিতেই শীত পড়তে শুরু করেছে। শীতকে আরও জমিয়ে তুলতে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সুতরাং গা শিরশির করাটাই স্বাভাবিক।

ঘরে দুটো জানলা। আজ যেন কেন দুটো জানলাই বন্ধ করতে ইচ্ছে হচ্ছে শ্যামলের। দুমিনিটের ভেতরেই জানলা দুটো বন্ধ করে এসে চেয়ারে বসতেই, বারান্দার দিকের জানলাতে হঠাৎ খট করে শব্দ হল। চমকে উঠল শ্যামল। বারান্দাটা গ্রিল দিয়ে ঘেরা। ওখানে তালাও নিজে লাগিয়ে এসেছে। তাই সেখানে কেউ ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না। এমনকী তালাটা সে বাড়ি থেকেই নিয়ে এসেছিল। নিজের তালা-ই লাগিয়েছে।

মোটা কাঠের জানলা। এমনিতেই এখন বন্ধ। তাই বৃষ্টির দিনে এমন জোরে খট করে শব্দ করাটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। শ্যামলকে বেশি ভাবতে সময় দিল না ওপাশের কেউ। আবার খট করে শব্দ হল। শ্যামল ভাবতে লাগল, যেহেতু বারান্দাটা পুরো গ্রিল দিয়ে ঘেরা ও তালা দেওয়া, তাই গ্রিল পেরিয়ে আসা কারও-র পক্ষে সম্ভব নয়। এই দুর্ভেদ্য সুরক্ষা ভেদ করে জানলায় এসে ধাক্কা মারার কথা নয়।

শ্যামল চেঁচিয়ে উঠল কে… কে ওখানে? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল না। জানলায় আবার খট করে আওয়াজ হল। শব্দটা ক্রমশ যেন বাড়তে শুরু করল।

( ২ )

একে তো শীতের রাত, তার ওপর এই জায়গায় সে একেবারে নতুন। ভাবল এখানে সে নতুন, কেউ হয়তো ভয় দেখানোর জন্য এসব করছে। বিছানায় শুয়ে পড়ল কিন্তু শুয়ে ঘুম আসছিল না। আওয়াজটা ক্রমশ বাড়ছিল। বিছানায় শুয়ে ঘেমে নেয়ে অস্থির হয়ে গেল সে।

অন্যদিকের জানলাটায় কেউ ধাক্কা দিলে সে অন্তত বুঝতে পারত যে, এই বৃষ্টির দিনে হয়তো কোনও আগন্তুক বাইরে দাঁড়িয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। কিন্তু গ্রিল দিয়ে ঘেরা এই জানলাটায় কেউ ধাক্কা দেবে কি করে! কিছুতেই এ কথাটা তার মাথায় ঢুকছিল না। তাছাড়া শোওয়ার আগে তালা দিয়ে বন্ধ করে এসেছে। এসব আবোল তাবোল চিন্তা করতে করতে তার সব কিছুই যেন কেমন গুলিয়ে যেতে লাগল।

জানলাটায় ধাক্কাটা এবার থেমে থেমে আসছে। অনবরত ধাক্কা দিয়ে মানুষ যেমন ক্লান্ত হয়ে যায়, মনে হচ্ছে ওপাশের কেউ তেমনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আসলে ওপাশে কি কেউ আছে, না পুরোটাই তার মনের ভুল! হয়তো শুধু বৃষ্টিই হচ্ছে, আসলে হয়তো জানলায় কোনও ধাক্কার শব্দ হচ্ছে না। পুরোটাই তার মনের ভুল নয়তো!

শ্যামল এগিয়ে যায় জানলার দিকে, কান খাড়া করে আওয়াজটা শোনার চেষ্টা করে। কিন্তু একি, সত্যিই তো মনে হচ্ছে কেউ কয়েক সেকেন্ড পর পর একই তালে ঠক ঠক করে চলেছে। এবার তার মনে হতে লাগল হয়তো মনের ভুলে সে গ্রিলের তালাটাই লাগাতে ভুলে গেছে আর সেই সুযোগ নিয়ে কেউ হয়তো ঢুকে পড়েছে বারান্দায়। কিন্তু এত রাতে কে হতে পারে? তবে কি চোর! আর চোর হলে সে জানলায় কেন ধাক্কা দেবে। চোর হলে তো নিঃশব্দে আসবে। জানিয়ে আসবে কেন!

শ্যামলের মাথায় নানা প্রশ্ন এসে ভিড় করতে শুরু করেছে। কেউ কি তাকে ভয় দেখানোর জন্য এসব করছে? নাকি কোনও বোবা লোক বিপদে পড়ে জানলায় খট খট আওয়াজ করছে? নাকি অন্য কোনও প্রাণী? মনে পড়ে যায়, একবার তার বাড়িতে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ভাম-বিড়াল ঢুকে গিয়েছিল বারান্দায়। সেরকম কিছু নয়তো?

প্রথমে ভেবেছিল দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখবে। কিন্তু পরক্ষণে ভাবল না এত রাতে এই অজানা জায়গায় সেটা হয়তো ঠিক হবে না। এসব নানা অজানা আশঙ্কায় শ্যামল অনুভব করল, ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাপরের মতো ওঠানামা করছে। কোনও চোর-ডাকাত নয়তো!

চিৎকার করে সে কি লোকজন জড়ো করবে? এবার সে জোরে চেঁচিয়ে ওঠে, কে ওখানে? কিন্তু কোনও উত্তর এল না। এত রাতে জানলার শব্দ এবং নিজের ধারণা সম্বন্ধে স্পষ্ট ভাবে নিশ্চিত হতে পারল না বলেই, চিৎকার করতে তার ভীত-সন্ত্রস্ত সত্ত্বা বারণ করে দিল।

( ৩ )

এবার মনে হল বৃষ্টির তালে তালে কেউ যেন নাচছে আর তার পায়ে নূপুর ও হাতের চুড়ির আওয়াজ যেন তালে তালে বাজছে। এতে শ্যামলের মাথার ভেতরে কেমন যেন এক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে লাগল। ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছে না। সত্যিই কি কেউ বাইরে নাচছে, না এসব তার মনের ভুল!

এমনিতে শ্যামল খুব একটা ভয় পাওয়ার ছেলে নয়। এর আগে পাড়ায় কেউ মারা গেলে অনেক গভীর রাতেও তাকে নিয়ে দাহ করে এসেছে। সামাজিক পরোপকারে তার জুড়ি নেই। জানলার শব্দটাও থেমে গেছে নূপুরের ও হাতের চুড়ির আওয়াজের সাথে সাথে। তার মনে হচ্ছে কেউ নাচছে তার বারান্দায়, ঠিক জানলার পাশে। মাথাটা কেমন যেন বন বন করে ঘুরছে মনে হচ্ছে।

কল্পনায় সে দেখতে পেল রাজা-বাদশাদের হারেমখানার কোনও নর্তকী যেন সুযোগ পেয়ে আজ এই বারান্দায় এসে তার আসর বসিয়েছে। খালি তফাত হল, ঘরভর্তি শ্রোতা নেই। শ্রোতা শুধু একজন। আর সেটা হল সে নিজে।

ঘরের আলোটা জ্বলছে। শ্যামল আয়নাটার দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ নিজের মুখ দেখতে গিয়ে চমকে উঠল। আয়নায় এক নারীমূর্তি। এ কী করে সম্ভব। পেছন ফিরে দেখল, জানলার কপাট কখন খুলে গেছে বুঝতেই পারেনি। মনে হল কোনও এক নারী মূর্তি যেন জানলা থেকে সরে গেল। অন্য জানলাটা কিন্তু বন্ধই রয়েছে। নিমেষেই ঘোর কেটে যায়। বুঝতে পারে, সে ঠিকই শুনেছে এবং দেখেছেও ঠিকই। আবার সেই নারী মূর্তি যেন তার জানলা দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এরপর আর তার কিছুই মনে নেই।

( ৪ )

যখন জেগে উঠল তখন বুঝতে পারল, সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তখনও বারান্দার দিকের জানলাটা হাট করে খোলা। অথচ অন্যদিকের জানলাটা এখনও বন্ধই রয়েছে। রাতের ঘটনাটা তাহলে কি শুধুই তার মনের ভুল নাকি সত্যি!

গতকাল রাতের ঘটনাটা মনে করতেই আবার যেন কেমন একটা ভয় এসে বাসা বাঁধছিল। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। তাই মনেও একটু সাহস পেল। বাইরে থেকে কিছু লোকের কোলাহলও এসে কানে পৌঁছোল।

শ্যামল ধীর পায়ে বারান্দায় পা রাখল। দেখল গ্রিলের গেটে যে-তালাটা গতকাল রাতে লাগিয়েছিল সেটা এখনও বন্ধই আছে। এটা দেখে ভাবল, তাহলে গতকালের ঘটনাটা হয়তো মনের ভুল হতে পারে। কিন্তু তার এই ধারণা বেশিক্ষণ স্থাযী হল না, নিমেষেই বদলে গেল। বারান্দায় কিছু পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গিয়ে নীচে তাকিয়ে দেখল একটা গলার চেন ও একটা লকেট পড়ে আছে।

এগুলো দেখার পর শ্যামলের মন থেকে অনেকটাই বিভ্রান্তি কেটে গেল। কারণ সে নিশ্চিত যে গতকাল কেউ এখানে এসেছিল। তবে ওই লকেট ও গলার চেনটা তোলার সাহস তার হল না। কেউ যে এসেছিল তার প্রমাণ তার সামনে হাজির রয়েছে। ভাবল ব্যাপারটা প্রতিবেশীদের কাউকে জানালে হয়তো কিছু হদিশ পাওয়া যেতে পারে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দেখল পাশের কোয়ার্টারের সামনে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে কী সব যেন আলোচনা করছে।

( ৫ )

সেখানে পৌঁছে যা শুনল তা শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল শ্যামল। শুনল গতকাল পাশের বাড়ির মেয়েটি বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর আত্মহত্যা করেছে। আর আশেপাশের অনেক বাড়িতেই ওর উপস্থিতি অনুভব করেছে প্রতিবেশীরা। প্রায় একই রকম ভাবে যেরকম শ্যামল অনুভব করেছে।

প্রতিবেশীদের আলোচনার বিষয়ে একটা কথা সবাই বলছিল যে, গতকাল রাতে তাদের বাড়িতে কেউ এসেছিল। কিন্তু শ্যামল লক্ষ্য করল সবাই অনেক কথা বললেও তাদের বাড়িতে কেউ গলার চেন ও লকেট পেয়েছে বলে বলল না। ব্যাপারটা ভেবেই রাতের সেই অনুভূতি যেন আবার শীতল হয়ে নেমে গেল শ্যামলের মেরুদণ্ড বেয়ে। ভয়ে ভাবনায় কেমন যেন একটা অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করল শ্যামল।

শ্যামলের খালি মনে হতে লাগল, আবার যদি রহস্যমযী সেই মেয়েটি রাতে তার কাছ থেকে ফেলে যাওয়া লকেট ও চেনটা ফেরত চাইতে আসে, তখন কী হবে?

 

সুপর্ণার গোপন পাণ্ডুলিপি

অভিরূপ তাকিয়ে দ্যাখে– একজন যুবতি তাঁর খোঁজ করছে। ইশারায় পাশের লোকটিকে সে উঠে যেতে বলে। সামান্য বিরক্ত হয়ে লোকটি উঠে যায়। যদিও মুখে প্রকাশ করার সাহস পায় না। সম্পাদক ব’লে কথা। তাছাড়া রবিবারের পাতার দায়িত্বে সে। সামান্য লেখা ছাপানোর জন্যও তেল মারতে হয়। কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। ফ্রিল্যান্সাররা মাছির মতো সর্বক্ষণ ঘুরঘুর করে তার পেছনে। অভিরূপ বেশ মজা পায়, উপভোগও করে। চশমার ফাঁক দিয়ে ফের একবার যুবতিকে দ্যাখে। চেনা কি? প্রেসক্লাবে বা অন্য কোথাও ট্রামেবাসে কিংবা পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ? মনে পড়ছে না। মোটামুটি সুন্দরী, একটা আলগা জৌলুস আছে। একান্তে নিভৃতে কথা বলা যায়। যুবতিটি নমস্কার ক’রে সামনের চেয়ারে বসে। অভিরূপ একটা সিগারেট ধরায়। যুবতি বলে– আমার নাম সুপর্ণা। সুপর্ণা মজুমদার।

– আমার কাছে? আমাকে চেনেন?

নীলাদি পাঠিয়ে দিলেন। নীলা সরকার। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন। আপনাদের অফিসে চাকরি করেন। শিল্পসংস্কৃতির পাতা দ্যাখেন। সিডি ক্যাসেট ইত্যাদি রিভিউ করেন। আর তাছাড়া আপনি বাংলা সাহিত্যের এতবড়ো একজন নামজাদা লেখক। এ-বছর বইমেলায় কোন্ এক পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনার গল্পগ্রন্থের উদ্বোধনও হল। ‘ভালোবাসার ঋতুস্নান’ আমি পড়েছি। সত্যিই অন্যধারার। এছাড়া সোপান, জীবনানন্দ পুরস্কার… অভিরূপ লক্ষ্য করে– সুপর্ণা বেশ তৈরি হয়েই এসেছে। বেশ স্মার্ট।

– আমার গল্প আপনার ভালো লাগে?

সুপর্ণা ঠোঁটটা একবার জিভে বুলিয়ে নিয়ে বলে– ভালো লিখলে কেন লাগবে না। ইদানীং বাংলা গল্পের যা ছিরি! সস্তা প্রেমের গল্প। রিয়েলি ট্র্যাশ।

প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। বিশেষত কোনও সুন্দরী যুবতির মুখোমুখি ব’সে। সুপর্ণা ব’লে চলে– আপনার গল্পের স্টাইলই আলাদা। বেশ ভাবায়। বিষয়ও বেশ গম্ভীর, সিরিয়াস।

– আর্ট ফিল্মের মতো কি?

– আর্ট-কমার্শিয়াল বুঝি না। তবে দর্শকের মতো পাঠকের সংখ্যাও হাতেগোনা মুষ্টিমেয় হয় যদি, ক্ষতি কী? দে আর ইনডিড্ কমিটেড্।

– বাঃ, তফাতটা সত্যিই ধরেছেন তো! আসলে কী জানেন, পাঠকই তো সব। তা, এদের সংখ্যাই যদি আর্ট ফিল্মের মতো হাতেগোনা হয়, চিন্তা হয় বই-কি। ওদের সার্টিফিকেট-ই তো আসল।

অভিরূপ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলে বলে– কী খাবেন, কফি না চা? সুপর্ণা সামান্য ইতস্তত করে। অভিরূপ অর্ডার দেয়। কফিতে হালকা চুমুক দিয়ে সুপর্ণা বলে– একটা গল্প এনেছিলাম।

অভিরূপ এবার চাঁছাছোলা অফিসিয়াল ভঙ্গিতে জবাব দেয়– ফাইলে অনেক গল্প জমা হয়ে আছে। প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ। সুপর্ণা কিছুটা হতাশ হয়। অভিরূপ বলে চলে– আপনার লেখা কোথাও পড়েছি বলে মনে হয় না। আই মিন কোনও লিট্ল ম্যাগাজিনে। হাত পাকানোর ওগুলোই তো আসল জায়গা।

সুপর্ণা বলে– দু’একটা জায়গায় পাঠিয়েও ছিলাম। মেম্বার হতে হবে। বিজ্ঞাপন-টন জোগাড় করে দিলেও চলে। গ্রুপিং আছে। একটা লেখা ছাপানোর জন্য যে এত কসরৎ, আগে জানতাম না। অভিরূপ চশমার উপর ভ্রূ কুঁচকে বিস্মিত হয়ে জানতে চায়– তাই না-কি? সুপর্ণা বলে চলে– আসলে নীলাদির উৎসাহে… শুনেছি আপনি বড়ো ভালো…। অভিরূপ হঠাৎ হো হো ক’রে হেসে ওঠে। হাসি থামিয়ে বলে– কিছু মনে করবেন না। কথা দিতে পারছি না। নির্বাচিত হলে ছাপা হবেই।

– কতদিন পরে জানতে পারব?

– মাস তিনেক।

এর মধ্যে রোগা লম্বা এক গাল দাড়ি, কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতনি ব্যাগ নিয়ে এক যুবক কাচের ঘরের বাইরে অপেক্ষার পর মোটামুটি অধৈর্য হয়ে দরজা সামান্য ঠেলে মুখ বাড়িয়ে বলল– অভিদা…

অভিরূপ খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলে– তুমি!

– আজ্ঞে আমার গল্পটা।

– বললাম না বাইরে অপেক্ষা করতে।

– আজ্ঞে ছ’মাস হয়ে…

– কী জ্বালাতন! কী যেন নাম গল্পটার?

– ‘বসুন্ধরা তুমি দিলে’।

– ও। কিছু মনে কোরো না, আর একটা গল্প জমা দিও। কোথায় যে রেখেছি…

যুবকটি আদ্যন্ত বিস্মিত ও হতাশ হয়ে মাথা নেড়ে বিদায় নেয়।

সুপর্ণা বিনীতভাবে বলে– বাব্বা, আপনাকে কতকিছু ফেস করতে হয়।

– সম্পাদকের দায়িত্ব সাংঘাতিক।

হঠাৎ ক্রিং ক্রিং শব্দে ফোন বেজে ওঠে। অভিরূপ রিসিভার তুলে বলে– হ্যালো। ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বর শোনা যায়– সুকান্ত বলছি।

– কে সুকান্ত?

– সুকান্ত বসু। এর মধ্যে ভুলে গেলেন। গত শনিবার চাংওয়া বার-এ কত আড্ডা মারলাম। আপনার মাইরি দম আছে। তিন পেগ এক নিঃশ্বাসে সোডা না-মিশিয়ে…

– মনে পড়েছে।

– আমার গল্পটা।

– যাবে। আগামী সপ্তাহে অথবা তার পরের সপ্তাহে। ডেফিনেটলি।

– ধন্যবাদ।

সুপর্ণা বলে– আজ উঠি তাহলে। অভিরূপ প্রত্যুত্তরে বলে– উঠবেন? চলুন আপনাকে এগিয়ে দিই।

– নো থ্যাঙ্কস্। তার কোনও দরকার হবে না।

– ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আপনার ফোন নম্বর…

সুপর্ণা ফোন নম্বর দেয়।

রবিবারে স্বভাবতই ঘুম ভাঙে দেরিতে। একটা ফুরফুরে আয়েশি ভাব জড়িয়ে থাকে সারা দেহে। বেড-টি হাতে নিয়ে সুপর্ণা টিভির সুইচ অন করে। ‘গুডমর্নিং কলকাতা’ হচ্ছে। এর আগে, ঘুম থেকে উঠেই খবরের কাগজটা নিয়েই সাপ্লিমেন্টটা আগে খুলে দেখত। ভিতরে ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনা। গল্পটা প্রকাশিত হল কি-না। মাসখানেক ধরে একই অভ্যাস। ছাপা হচ্ছে না। ক্রমশ আশা ছেড়েই দিয়েছিল। হঠাৎ ছোটোভাই বিল্টু ঘরে ঢোকে কাগজ নিয়ে– দিদি তুই তো ছুপা রুস্তম মাইরি! সুপর্ণা কিছু বুঝতে পারে না।

– তোর গল্প ছাপা হয়েছে। আমরা কেউ জানিই না!

– কই দেখি? সুপর্ণা বিল্টুর কথা বিশ্বাসই করতে চায় না– ইয়ার্কি মারিস না। বিল্টু রসিকতা করে– মহাশ্বেতা নাকি আশাপূর্ণা?

– দে আমার কাগজটা। বিল্টু দেয় না– উহুঁ, এত বড়ো সুখবর। বল কী খাওয়াবি?

– তুই যা চাইবি।

– কী করে ম্যানেজ করলে গুরু?

সুপর্ণা মুখ ফসকে বলে ফ্যালে– অভি…

– অভি…।

– অভিরূপ। অভিরূপ ভট্টাচার্য।

– বাঃ দিদি জবাব নেই। একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি।

– এই ভালো হচ্ছে না বিল্টু।

সুপর্ণা টান মেরে কাগজটা ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে। কাড়াকাড়িতে হঠাৎ ফ্যাড়ফ্যাড় করে ছিঁড়ে যায় কাগজটা। রাগ সামলাতে না-পেরে বিল্টুর গালে ঠাস করে একটা চড় মারে। নিজেও শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে বলে– এ কী করলি তুই? আমার জীবনের প্রথম গল্প। …হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। রিসিভার তুলে সুপর্ণা বলে– হ্যালো!

– গুড মর্নিং মিস মজুমদার। কীরকম সারপ্রাইজ দিলাম? এবার, খুশি তো?

– ও মিঃ ভট্টাচার্য! কী অকৃতজ্ঞ আমি! ছিঃ ছিঃ! ফোনটা আমারই আগে করা উচিত ছিল। প্লিজ এক্সকিউজ মি।

– তাতে কি? এটা তো আমার কর্তব্য। আপনার প্রতিভার মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

– সো কাইন্ড অফ ইউ, মিঃ ভট্টাচার্য। আপনি এত ভালো…

অভিরূপ হঠাৎ হো হো করে হেসে ওঠে।

– জীবনের প্রথম গল্প ছাপা হল, অথচ…

– হোয়াটস্ রং উইথ ইউ, মিস মজুমদার?

– ভাইয়ের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে কাগজটা ছিঁড়ে…

– ও এই ব্যাপার। কতগুলো কমপ্লিমেন্টারি কপি লাগবে?

– একটাই যথেষ্ট।

– পেয়ে যাবেন। এইবারে অভিরূপ ঝোপ বুঝে কোপ মারার কথা বলে– আপনার গল্পটা অসাধারণ। আয়্যাম সো মুভ্ড। আপনার প্রতিভা আছে। আই ওয়ান্ট টু এক্সপোজ ইউ। বাংলা সাহিত্যে মহিলা লেখকের সংখ্যা হাতে গোনা। আরও লিখুন। আমি ছাপব। সম্ভব হলে রেগুলার কোনও কলাম। আয়্যাম অলওয়েজ উইথ ইউ। আপনি অসাধারণ।

সুপর্ণা নিরুত্তর। গ্যাস বেলুনের মতো হাওয়ায় ভাসতে থাকে শুধু। চোখের সামনে নাচতে থাকে প্রতিষ্ঠা, প্রশংসা, পুরস্কার।

এর মধ্যে আরও দুটো গল্প প্রকাশিত হয়েছে। পার্ক স্ট্রিটের অলি পাবের দো-তলায় এক নির্জন আলোছায়ার অন্ধকারে কোণের টেবিলে বসে দুজনে। কথা জড়িয়ে আসছে অভিরূপের। সুপর্ণার কাঁধে মাথা। হাত জড়িয়ে বুকের খুব কাছাকাছি। সুপর্ণা সোডামিশ্রিত তরলের অবশিষ্টাংশ গলায় ঢেলে বলে– অভি, আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। আমাকে স্বপ্ন দ্যাখাও। প্লিজ। অভিরূপ মাথা নেড়ে, শুধু বলে– হুঁ।

– কবে দ্যাখাবে?

– আজ কাল পরশু। যেদিন দেখতে চাইবে।

– সেই স্বপ্নটা… মঞ্চে আমি শুধু একা আর হলভর্তি লোক। শুধু হাততালি আর হাততালি।

– ক্যামেরা ভিডিও।

– ফ্ল্যাশের আলো আমার একদম সহ্য হয় না। চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

– অন্ধকারই ভালো, কী বলো?

অভিরূপ হালকা করে সুপর্ণার ঠোঁটে চুমু খায়। সুপর্ণা আপত্তি করে না।

– আমার পরের গল্পের নায়ক কে জানো?

– না।

– অভি। আমার অভি। কী, ছাপবে তো?

– সাবধান! বেশি অশ্লীল যেন না হয়।

– সুপর্ণা হঠাৎ পাগলের মতো হো হো করে হেসে ওঠে। অভিরূপ ঘড়ি দ্যাখে– ইটস টু লেট। সুপর্ণা আবদারের ভঙ্গিতে বলে– আর একটু থাকো না, প্লিজ অভি। নাইট ইজ টু ইয়াং। অভিরূপ তার হাত ধরে টানে– চলো!

– কোথায়!

– কেন, আমার ফ্ল্যাটে। সুপর্ণা নেশারু লাল লাল চোখে জানতে চায়– আমার সব গল্প ছাপবে তবে?

– গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, রিভিউ, ফিচার, আর্টিকল যা দেবে সব।

– না শুধু গল্পই দেব। আমি সুচিত্রা ভট্টাচার্য হতে চাই।

– আচ্ছা তা-ই হবে। সুচিত্রা সেন বানাব তোমায়।

– সুচিত্রা সেন নয়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য। প্রমিস?

– প্রমিস। আমার কথামতো চলো, আমি তোমায় বিখ্যাত করে দেব।

– সত্যি বলছ। মাইরি?

– প্রতিষ্ঠা প্রশংসা পুরস্কার তোমার পায়ের কাছে আদুরে বিড়ালছানার মতো গা ঘষবে।

– দারুণ মজা, তাই না!

– কদিন অপেক্ষা করো, ধারাবাহিক লেখার ব্যবস্থা করে দেব।

– আমি জানি তুমি খুব ভালো। তোমায় বিশ্বাস করি।

অভিরূপ সুপর্ণার মাখনের মতো নরম তুলতুলে গালে মুখ ঘষে বলে– প্লিজ সুপর্ণা, আর দেরি সহ্য করতে পারছি না। লেট আস…। সুপর্ণা ফের আদুরে গলায় বলে– আমায় কোনওদিন ছেড়ে যাবে না অভি।

– ধ্যাৎ, কী যে বলো!

– তোমরা পুরুষ মানুষেরা সব পারো। আমার চেয়ে আরও সুন্দরী আরও ভালো গল্পকার তোমার কাছে আসবে। সেদিন নিশ্চয়ই আমায় ভুলে যাবে। অভিরূপ নিরুত্তর। সুপর্ণা বলে চলে– আমার সঙ্গে বিট্রে কোরো না অভি। আই কান্ট টলারেট। তোমার বিশাল মহীরুহ জড়িয়ে অর্কিডের মতো শোভাবর্ধনের স্পর্ধা করি না, পায়ের তলায় ঘাসের বিছানাই আমার শান্তিনিকেতন। দেওয়া-নেওয়ার খেলায় আমায় ব্যবহার কোরো না। আমার ভিতরেও একটা সুন্দর মন আছে, প্রেম-ভালোবাসা আছে। মেয়েদের কাছে নষ্ট হওয়া যত সহজ, ভালো হওয়া ততটাই কঠিন। আমি স্বপ্ন দেখি অভি। বিখ্যাত হতে চাই। জানি, পথে অনেক চড়াই উৎরাই। তবু যে-কোনোও ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নদীতে ভাসমান পোড়া কাঠ বা গলিত মরদেহ আঁকড়ে ধরেও মানুষ বেঁচে থাকে। অভিরূপ তখনও নিরুত্তর। তার এক হাতে মদের গ্লাস আর অন্য হাত জড়িয়ে সুপর্ণার কোমর।

প্রধান সম্পাদক অলোকেশ ঘোষ সিগারেটের রাংতায় মোড়া জর্দা পান খুলে মুখে পোরে। পানের বোঁটায় লাগানো চুন সামান্য জিভে ঠেকিয়ে পিক ফ্যালে টেবিলের পাশে রাখা পিতলের পিকদানিটাতে। বিশাল টেকো মাথায় হাত বোলায়। সামনে বসা অভিরূপ লক্ষ্য করে, তার মুখটা ক্রোধ আর বিরক্তিতে ভরা। বুকটা অজানা আশঙ্কায় হঠাৎ কেঁপে ওঠে। চিফ এডিটর বলে কথা। অলোকেশ ফের একবার পিকদানিতে পিক ফেলে বলে– এসব কী শুরু করেছ অভি? অভিরূপ আমতা আমতা করে বলে– কী স্যার?

– সুপর্ণা মজুমদার কে?

– নতুন লিখছে।

– দেড় মাসের মধ্যে পর পর তিনটে গল্প!

– ভালো লিখছে স্যার তাই।

– শাট্ আপ। এটা অফিস, ব্রথেল নয়। মিস মজুমদার তোমার পেয়ারের লোক হতে পারে, কিন্তু তার সুযোগ নিয়ে কেউ যা খুশি তাই করবে? গোটা রবিবারের পাতার দায়িত্ব দিয়েছি বলে কি হাতে আকাশ পেয়েছ? কী ভাবো কী নিজেকে? দিবাকর মুখার্জির কাছে তো সামান্য ফ্রিল্যান্স করতে। এখন সম্পাদক হয়ে কি আরও দুটো পা গজিয়েছে?

অলোকেশ ফের একবার পিকদানিতে পিক ফেলে বলে– কফিহাউসে প্রায়ই তোমার নামে অভিযোগ শুনি। গল্প জমা নিয়ে ছাপো না। কখনও বলো, হারিয়ে গেছে। বিনয়দের গ্রুপটা তো তোমার উপর প্রচণ্ড রকম চটে আছে। কোনদিন আচমকা মেরে বসবে। লজ্জা-ঘৃণা কি কিছুই নেই?

অভিরূপ মাথা নীচু করে চুপচাপ বসে থাকে। এত অপমানিত সে জীবনে কখনও হয়নি। চোখ-কান দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছে। এসি চলছে। তবুও ঘাম ছুটছে দরদর করে। অলোকেশ না থেমে বলে চলে– ইদানীং সময় নেই, অসময় নেই যখন খুশি বেরিয়ে যাচ্ছ। কে এক বেঁটে মতো দীপক দাস না কুণ্ডু ডাকলেই বার-এ গিয়ে ঢুকছ। মাল খেয়ে ঢুকছ ডিউটি আওয়ার্সে। একের পর এক অভিযোগ। অভি তোমার যোগ্যতা আছে, প্রতিভা আছে, নিষ্ঠা আছে। এভাবে নিজের সর্বনাশ কোরো না। ম্যানেজিং কমিটির বোর্ডে ডিসিশন নেওয়া হয়েছিল, তোমায় ইমিডিয়েট স্যাক করা হবে। আমিই কিন্তু বলে-কয়ে কোনওরকমে বাঁচিয়ে দিয়েছি। তোমাকে গুয়াহাটিতে আমাদের ব্রাঞ্চ অফিসে ট্রান্সফার করা হল। কালই জয়েন করবে। উইশ ইউ গুড লাক অভি।

সপ্তাহখানেক অভিরূপের কোনও খোঁজ নেই। সুপর্ণা ভেবে কোনও কূলকিনারা পায় না। সে এখনও স্বপ্ন দ্যাখে। প্রতিষ্ঠা প্রশংসা পুরস্কার তার চোখের সামনে নাচতে থাকে। অথচ অভি নেই। কে গল্প ছাপবে? জলজ্যান্ত মানুষটা ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গেল। মনে মনে সে অন্যরকম ভেবেছিল। ওর শরীরের গন্ধ আজও সারা গায়ে লেপটে থাকে। কথা দিয়েছিল অভি। তার জীবনের গল্পের নায়ক হিসাবে ভেবেছিল। তবে কি? সন্দেহ দানা বাঁধে ক্রমশ। তবে কি সব পুরুষই সমান, সব সম্পাদকেরই একই মানসিকতা? দেওয়া-নেওয়ার খেলা শুধু, মদ আর মেয়েমানুষ কেবল? সুপর্ণার খুব কাঁদতে ইচ্ছা করে। কিন্তু না, হেরে গেলে চলবে না। এ লাইনে টিকে থাকতে হলে আরও কত নীচে নামতে হবে, কে জানে? অন্তর্বাসের ভিতর তার নতুন গল্পের পাণ্ডুলিপিটা আলতো করে ঢুকিয়ে নেয়। সুপর্ণা এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। সে সরাসরি কাগজের অফিসে আসে। অভির ঘরে ঢোকে। কিন্তু অভি নেই। অভির বসবার চেয়ারে অন্য একটি যুবক। অভির চেয়েও আরও সুন্দর দেখতে, আরও সুপুরুষ। সুপর্ণা জিভ দিয়ে ঠোঁটটা আলতো করে চেটে নেয়। যুবকটি ফাইল থেকে চোখ না সরিয়ে বলে– কী চাই? সুপর্ণা টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে। ইচ্ছাকৃতভাবে বুকের আঁচলটা খসে পড়ে। বাঁকা হাসি হেসে বলে– গল্প। সুপর্ণার দিকে না তাকিয়ে যুবকটি নির্লিপ্তভাবে বলে– রেখে যান। সুপর্ণা ভিতরে ভিতরে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে ওঠে। তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার ভঙ্গিতে বলে– অন্তত একবারটি দেখবেন না আমায়, আমি কি লিখেছি? ফাইল থেকে এবারও চোখ না সরিয়ে যুবকটি একইরকম নির্লিপ্তভাবে জবাব দেয়– গল্পের পাণ্ডুলিপি যখন, গল্প ছাড়া আর কি হতে পারে? আর তাছাড়া আমার কাছে গল্পই বিচার্য, গল্পকার নয়। হতবাক সুপর্ণা খসে-পড়া বুকের আঁচলটা আস্তে আস্তে তুলে নেয়।

দিতি-ও বাঁচতে চায়

হাতে ধরা ব্লাড স্যাম্পল-এর শিশি দুটো আর রিকুইজিশন স্লিপটা সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কের কোলাপ্সিবল গেটের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে দেয় নীলাদ্রি। ও পাশে থাকা ভদ্রলোক স্যাম্পল জমা নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে জানিয়ে দিল, ‘ঘন্টা খানেক পরে আসুন’।

কাল সকাল আটটায় দিতির অপারেশন। অত সকালে ব্লাড জোগাড় করা যাবে কিনা নিশ্চয়তা নেই। খামোকা টেনশন না পুষে, অমিতকে নিয়ে নীলাদ্রি তাই আগের দিন-ই এসেছে ব্লাড ব্যাঙ্কে। ব্লাড স্যাম্পল জমা দিয়ে এখন খানিকটা রিলিভড্। এলোমেলো চুল বাঁ হাতে ঠিক করতে করতে, সিগারেটের লম্বা টানের ধোঁয়ার সাথে, টেনশন হালকা করে হাওয়ায় মিশিয়ে দেয় নীলাদ্রি।

‘টেস্ট করতে, গ্রুপ মেলাতে এটুকু সময় তো লাগবেই। এক ঘন্টা এখানে দাঁড়িয়ে থেকেই বা করবি কী! চল একটু হেঁটে হেদুয়ায় গিয়ে বসি’– অমিত ঘুরে, সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকে। অমিতের সঙ্গে পা মিলিয়ে নীলাদ্রিও মানিকতলা মোড় পেরিয়ে হেদুয়ার দিকে এগিয়ে চলে। রবিবারের শান্ত বিকেলে বড়ো রাস্তাগুলো যেন ক্লান্ত বিবশ হয়ে শুয়ে আছে। এই ফাঁকা শান্ত রাস্তাঘাট হঠাৎ করে নীলাদ্রিকে দিতি-র কথা মনে করিয়ে দেয়। অপারেশন হয়ে যাওয়ার পর অনেকবার দিতিকেও এরকমই বিবশ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখেছে নীলাদ্রি। অ্যানিস্থেশিয়ার ঘোর কাটে না তখনও, আধো ঘুমে আচ্ছন্ন। হসপিটালে দিতিকে দেখতে অনেকেই আসে। জানতে চায় কেমন আছে সে। কিছুক্ষণ থেকে খোঁজ খবর নিয়ে ফিরে যায় তারা। কিন্তু দিতি কিছুই বুঝতে পারে না। জানতে পারে না কারা কারা এসেছিল ওকে দেখতে। কাটাছেঁড়া – অপারেশন – ব্যান্ডেজ – ড্রেসিং – ভয় – টেনশন সবগুলো মিলে যায় অ্যানিস্থেশিয়ার ঘোরে। হসপিটালের ধবধবে সাদা বেডে, ফ্যাকাশে দিতি তখন ঘোরের মধ্যে শুয়ে।

নীলাদ্রিকে অনেকক্ষণ চুপ থাকতে দেখে, অমিত বলে, ‘কী ভাবছিস? গ্রুপ মিলিয়ে ব্লাড পাওয়া যাবে কিনা! চিন্তার কিছু নেই, এখানে না পাওয়া গেলে পিপলস্-এ যাব, সেখানে না পাওয়া গেলে লায়ন্স এ…’, হঠাৎ থেমে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা দিতির ব্লাড গ্রুপ কী জানিস?’

‘জানি ‘বি’ পজিটিভ।’

‘তোর?’

‘বি পজিটিভ।’

‘আমারও। তাহলে তো চিন্তার কিছু নেই। কোথাও না পাওয়া গেলে আমরা তো আছিই।’

অমিত যেন সত্যিই চিন্তামুক্ত হল। নীলাদ্রিও অমিতের কথায় ভরসা পায়। রক্ত চাই– রক্ত। এক বোতল, দু বোতল, তিন… চার। নেই শুনলেই মাথায় হাত। পৃথিবীতে এই একটা জিনিসের জন্য মানুষকে মানুষের উপরই নির্ভর করতে হয়। যার কোনও বিকল্প নেই। টাকা পয়সায় যার মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।

পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ, সন্ত্রাস, হিংসা– রক্ত হোলির এক বিভৎস উৎসব, কত রক্তের অপচয়। অথচ এই রক্তের জন্য, জীবনের জন্য কত না কাতর চাহিদা আর উৎকণ্ঠার অপেক্ষা। কিছু মানুষ আছে এখনও, যারা মানুষের জন্য ভাবে, চায় সব মানুষ সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকুক এই সুন্দর পৃথিবীতে। তারাই তো অকৃপণ হয়ে দান করে দেহের লাল তরল অংশ– অমূল্য ধন ‘রক্ত’।

যেদিন লাল মারুতি চেপে পাঁচ-ছ’ জন এসে মালঞ্চ সিনেমা হলের সামনে সত্যকেই প্রকাশ্যে গুলি করে মেরে রেখে গেল। সেদিন রক্তে ভেজা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নীলাদ্রি, রাজনৈতিক ধিক্বার সভায় কোনও একজন নেতার মুখে শুনেছিল, ‘এসব বরদাস্ত করা হবে না। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ হবেই। রক্তের বদলে রক্ত চাই। আরও রক্ত।’

হঠাৎই ঘটনাটা মনে পড়ে গেল নীলাদ্রির। নিজের মনে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা, ওই যারা সত্যকে মেরে রাস্তায় রক্ত ছিটিয়ে গেল বা যে নেতারা রক্তের বদলে রক্ত চাইছিল, ওরা কি কখনও কাউকে রক্ত দেয়? তাহলে এত রক্ত আসে কোথা থেকে? যারা দেয় তারা নিশ্চয়ই দেওয়া-নেওয়ার হিসাব করে না। রক্তের বদলে রক্ত চাই বলে না।’

‘তুই কখনও ব্লাড ডোনেট করেছিস?’ নীলাদ্রির প্রশ্নে অমিত খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দেয়, ‘না, দিইনি। অফিসে একবার হেল্থ চেক-আপ ক্যাম্প হয়েছিল। সেখানে ব্লাড গ্রুপ টেস্ট করিয়েছি।’

‘আমি দু-একবার ব্লাড দিয়েছি, কিন্তু দিতি দিত– বছর বছর, ক্লাবের ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পে। ব্লাড নেওয়ার জন্য কার্ডগুলো তো ক্লাব থেকেই আনলাম।’

হাঁটতে হাঁটতে হেদুয়ার কাছে এসে বাঁদিকের বড়ো বিল্ডিংটার দিকে আঙুল তুলে অমিত নীলাদ্রিকে বলে, ‘এই স্কটিশে ভারতবর্ষের দু-দুজন বিখ্যাত ব্যক্তি পড়াশুনা করেছেন, যারা পৃথিবীর কাছে ভারতবর্ষকে নতুন করে পরিচিত করেছেন, গর্বের আসনে বসিয়েছেন। বলতো কে সেই দুজন?’

নীলাদ্রির মাথাটা যেন ফাঁকা ডিব্বা, সব ভুলে বসে আছে। অমিতের মুখের দিকে বোকা বোকা ভাবে তাকিয়ে থাকে।

‘স্বামী বিবেকানন্দ আর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু।’

উত্তর না দিতে পারায় নীলাদ্রি লজ্জাবোধ করে। ‘সরি! এটা বলা উচিত ছিল।’

কথা বলতে বলতে ওরা হেদুয়ায় ঢুকে পড়েছে। নীলাদ্রি ঘড়ি দেখে নেয়, এক ঘন্টা হতে কত দেরি আছে।

‘দিতিটা কি বল তো! সব কিছু ভুলে, নিজের গায়ে আগুন লাগাল ও! মৃত্যুকে এত কাছের মনে হল? কী দুঃসাহস!’

অমিতের কথায় নীলাদ্রি চকিতে ফিরে দাঁড়ায়– ‘না রে, মৃত্যুর কাছে এসে মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা যে কত প্রকট হয়ে ওঠে, দিতিকে তখন দেখলে বুঝতিস। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার জন্য আকুল হয়ে ওঠে মানুষ– আমি দেখেছি।’

সুইমিং পুলের রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে আছে নীলাদ্রি আর অমিত। সামনেই ডাইভ দেওয়ার জন্য ঢালাই করা জায়গাটা, যার একাংশ ঝুলে আছে পুলের মধ্যে। সেখানে বসে একজন অল্পবয়সি বউ আপন মনে শাড়িতে অ্যাপ্লিকের কাজ করছে। বোধহয় স্টাফ কোয়ার্টারে থাকে। বাদ দেওয়া টুকরো কাপড়গুলোর কিছু কিছু হাওয়ায় উড়তে উড়তে সুইমিং পুলের জলে এসে পড়ছে। ওই টুকরোগুলো উড়ে গিয়ে জলে পড়ছে কিনা বা জল নোংরা করছে কিনা সে ভাবনা নেই– স্বার্থপরের মতো বউটি নিজের কাজে মগ্ন। বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা বা মৃত্যুর জন্য দুঃসাহসী প্রয়াস। কোনও ক্ষেত্রেই বোধহয় মানুষ ভাবে না অন্যের কথা।

নীলাদ্রি আর অমিত পার্কের এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। পার্কের এক পাশে গোল হয়ে বসে আছে এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী। পাশের কলেজ হোস্টেল থেকেই বোধহয় এসেছে ওরা। কোনও বিশেষ আলোচনা বা পরিকল্পনায় তারা মশগুল। এরকম সুশৃঙ্খল ভাবে ওদের বসে থাকতে দেখে নীলাদ্রির বেশ ভালো লাগে। চারিদিকের অশালীন গুলতানি, ছন্নছাড়া অসহিষ্ণু চেনা সমাজ থেকে পৃথক ভালো কিছু দেখে মনটাও যেন শান্তি পায়। নীলাদ্রি মনে মনে ভাবে, এদের মতো মানুষেরাই নিশ্চয়ই মানুষের জন্য রক্ত দেয়।

একটু এগিয়ে এসে গাছতলায় সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চটায় এসে বসে নীলাদ্রি-অমিত। আগে থেকেই একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছেন ওখানে। পরিপাটি পোশাক, পাট ভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি পরনে, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, কেয়ারি করে চুল আঁচড়ানো, গলাবন্ধ ফুল হাতা সোয়েটার পরা।

সামনে দিয়ে অন্য একজন বয়স্ক ভদ্রলোক হাতে ধরা বন্ধ ছাতায় ভর দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছেন। তার উদ্দেশ্যে পাশে বসা ভদ্রলোক হাঁক ছাড়েন, ‘দাদা কত হল?’

ভদ্রলোক কানে কম শোনেন, থেমে, এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী বললেন, কীসে বদহজম হল?’

‘না না, বয়স কত হল?’

‘এই তো একানব্বই। শয়ে পড়তে এখনও নয় নয় করে ন’টা বছর বাকি।’

‘তা প্রায় টেনে এনেছেন। আমার তো একাশি, আমার থেকে পুরো দশ বছর এগিয়ে। আমরা কি আর পারব, আপনার মতো?’

মৃদু হেসে ভদ্রলোক উত্তর দেন, ‘যা ঠান্ডা পড়েছে।’

পাশের ভদ্রলোক উত্তর দেন, ‘দেখুন কী হয়?’

নীলাদ্রি ঘড়ি দেখে, অমিত শোনে, ‘আর কত বাকি?’

‘এখনও আধ ঘন্টা।’

অন্য একজন ধোপদুরস্ত ভদ্রলোক পাশে এসে বসলেন। তার পায়ের কেডস্টিও ধবধবে সাদা। আগের সেই ভদ্রলোক পাঞ্জাবির পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করতে করতে প্রশ্ন করেন, ‘ক পাক হল?’

নস্যির কৌটো বের করার সময় পকেটে রাখা খুচরো পয়সাগুলো ঝনঝন করে বেজে ওঠে।

‘এই তো সবে এক পাক দিয়ে এসে বসলাম।’

নস্যি নিয়ে পরিষ্কার রুমাল দিয়ে নাক, হাত মুছে ভদ্রলোক সোজা হয়ে বসেন।

‘ঘোষবাবুকে দেখলেন? এখনও বেশ শক্ত-সমর্থ্যই আছেন। একানব্বই চলছে!’

‘ভাইপোদের কাছে থাকেন। ভালো চাকরি করতেন, ভালো পেনশন। বিয়ে থা তো করেননি। সাংসারিক চিন্তাভাবনা নেই। সুস্থ থাকারই কথা।

‘আপনার কত চলছে?’

‘ক’দিন আগে সত্তর পার হলাম।’

‘আমার থেকে তো অনেক ছোটো। যান সন্ধে হওয়ার আগে তাড়াতাড়ি আরও দু-চার পাক ঘুরে আসুন। ভালো করে বাঁচতে হবে। কত কী আরও দেখবার আছে।’

‘না না, আর দেখবার ইচ্ছে নেই। ঘরে-বাইরে যা চলছে। তাড়াতাড়ি গেলেই বাঁচি।’

‘মানুষ হয়ে এসেছেন, অত তাড়াতাড়ি করে লাভ কী? যতদিন মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা যায় সেটাই ভালো। মরলে পরে কে যে কী হবে কে জানে!’

‘ওই দেখুন বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পের প্রোগ্রাম সেট করছে, আর আমরা রক্তচোষারা বসে আছি শুধু সময়ের অপেক্ষায়।’ একটু থামেন। ‘আচ্ছা, মানুষের জন্য কোনওদিন রক্ত দিয়েছেন?’

সংক্ষিপ্ত উত্তর– ‘না’।

ভদ্রলোক তবুও থামেন না, ‘সে কি কথা।’ মানুষইতো কেবল মানুষের জন্য রক্ত দিতে পারে। জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ ওরা কিন্তু পারে না। একবার চেষ্টা করে দেখুন না।’

‘আমাদের চেষ্টার দিন তো শেষ। আমাদের রক্ত সব শুকিয়ে গেছে। না হলে এত অনাচার, এই খারাপ সময়ে একটুও গরম হয় না কেন রক্ত?’ নীলাদ্রি-অমিতের দিকে ফিরে বলে, ‘এখন চেষ্টা করবে এরা। চারিদিকে লড়াই। অনেক অনেক রক্তের দরকার।’ বেঞ্চ থেকে উঠে ভদ্রলোক এগিয়ে যান। পাশের ভদ্রলোক অমিতের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘যাই যাই করছে। ওসব মিথ্যে মুখোশ। মরতে কেউ-ই চায় না। মরতেই যদি চায় তাহলে প্রতিদিন পার্কে এসে পাঁচ পাক ঘুরছে কেন? বাঁচতে চায় বলেই তো শরীরটাকে সতেজ রাখার চেষ্টা। রক্ত ফুরিয়ে গেলে দেখবে রক্ত চাইবে। এক বোতল, দু বোতল, তিন বোতল…।’

হাত ঘড়িতে সময় দেখে নীলাদ্রি উঠে দাঁড়ায়।

অমিত শোনে, ‘আর কত বাকি?’

‘মিনিট দশেক।’

বেঞ্চ ছেড়ে অমিতও উঠে দাঁড়ায়। পাশের ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আমাদের দুজনেরই বি পজিটিভ। কখনও রক্ত লাগলে বলবেন।’

পার্কের রাস্তা– মানিকতলা মোড়– সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্ক, পায়ে পায়ে শেষ হয় নীলাদ্রি অমিতের রাস্তা।

ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে ব্লাড কালেক্ট করে হসপিটালের ফ্রিজে সেই ব্লাড ঢুকিয়ে রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে নীলাদ্রি অমিতকে নিয়ে দিতির কেবিনের দরজা খুলে দাঁড়ায়, দরজা খোলার হালকা শব্দে দিতি ঘুরে তাকায় ওদের দিকে।

দিতির চোখে-মুখে আবার একবার দেখতে পায় বেঁচে থাকার আকুল আগ্রহ – ‘ব্লাড পেয়েছ?’

 

স্নেহ

অর্ক মায়ের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে অধৈর্য হয়ে ওঠে। ও জানে মা অনেকদিন ধরেই মাসিকে ফোনে চেষ্টা করছে কিন্তু মাসিকে কিছুতেই ফোনে ধরা যাচ্ছে না। আর মাসির খবর কয়েকদিন না পেলেই মায়ের কী অবস্থা হয় আন্দাজ করে নিয়েই অর্ক বলে, ‘মাসির চিন্তা করা বন্ধ করো এবার। মা, তুমি খুব ভালো করেই জানো মাসি ভালো আছে বলেই এখন তোমার ফোনও ধরছে না, তোমাকে একটা ফোন করারও প্রয়োজন মনে করছে না। কোনও প্রবলেম হলে কাঁদতে কাঁদতে আগে তোমাকেই ফোন করত।’

সুচরিতা অর্কর কথার কোনও প্রত্যুত্তর দিতে পারে না শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নেয়। আজকালকার ছেলে, ইমোশন খুব কম, তবে জীবনের উঁচু-নীচু পথটাকে অনেক ভালো ভাবে বোঝে, চেনে ওরা। তবে সেটা সুচরিতার কাছে কষ্টের নয়, গর্বের।

সুচরিতা বোঝে আজকের দিনে ওর নিজের ভালোমানুষি স্বভাবটাকে নিয়ে লোকেরা হাসিঠাট্টাই করবে, আড়ালে সকলে নিরেট, বুদ্ধিহীন বলবে। অথচ সত্যিই তো ছোটোবেলায় এত বুদ্ধি ছিলটাই বা কোথায় যে এক-দু’বার সাক্ষাতেই কাউকে বুঝে ফেলবে। জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বড়ো হওয়ার কারণে, বড়োদের মধ্যে সুচরিতার থাকার সুযোগ হয়নি। পরিবারের অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গেই মিলেমিশে মানুষ হয়েছে। বড়োরা কীভাবে ঘরসংসার সামলাচ্ছেন সেটা ঘুণাক্ষরেও সুচরিতা কখনও বুঝতে পারেনি। অথচ এখন তিন-চার সদস্যের পরিবারে বাচ্চারা বড়ো হচ্ছে কিন্তু সবদিকেই তাদের তীক্ষ্ণ  নজর। কারও সঙ্গে দুটো কথা বলেই ওরা বুঝে ফেলে মানুষটা কেমন।

‘আজই আমি মাসিকে দোকানে শপিং করতে দেখেছি। হয়তো অফিসে তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গিয়েছিল। মাসির সঙ্গে আরও দুজন ছিল। ওদের সকলের হাতেই অনেকগুলো করে ব্যাগ ছিল।’

‘তোর সঙ্গে কোনও কথা হয়েছে?’

‘না, আমি ফুটপাথে একটা দোকানে বসে বন্ধুদের সঙ্গে চা খাচ্ছিলাম। মাসিকে একটা দোকান থেকে বেরিয়ে আর একটা দোকানে ঢুকতে দেখলাম।’

‘তুই তো ভুলও দেখে থাকতে পারিস।’

‘কেন, আমি কি অন্ধ, নাকি চোখে কম দেখি যে মাসিকে দেখে চিনতে পারব না?’

‘তাহলে কথা বললি না কেন?’

‘বাব্বা! মাসি হেসে গড়িয়ে পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে আমাকে দেখতেই পায়নি। দিব্যি খোশমেজাজে ছিল… আর যেই তুমি ফোন করো অমনি মাসির কান্নাকাটি আরম্ভ হয়ে যায় যেন ওর চেয়ে দুঃখী সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আর একটাও নেই। মাসির যখন ভালো সময় যায় তখন কই, তোমাকে তো বলতে আসে না অথচ যেই সামান্য প্রবলেমের আঁচ পায় ওমনি তোমার কাছে এসে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। মা, মাসির চিন্তা করা ছাড়ো। ফোন আসেনি মানে ধরে নাও মাসি বহাল তবিয়তে আছে।’

সুচরিতা শাসনের ভঙ্গিতে অর্কর দিকে চোখ ফেরায়। কথা ঘোরাবার চেষ্টা করে কারণ সুপর্ণার নামে আরও দুটো বাজে কথা অর্কর মুখ থেকে শুনতে সুচরিতার ভালো লাগছিল না। অথচ মনে মনে সুচরিতা ভালো করেই জানে অর্কর প্রতিটা কথা সত্যি। ও ঠিকঠাকই চিনেছে নিজের মাসিকে। সুপর্ণার এটা বরাবরের স্বভাব। সাধারণ সমস্যাকে বাড়িয়ে বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না অথচ কোনও আনন্দের খবর থাকলে এমনভাবে সকলের কাছে চেপে যাবে যে অন্য লোকে মনে করবে দুঃখ ছাড়া মেয়েটার জীবনে সুখশান্তি একেবারেই নেই।

সুপর্ণাকে যতবার সুচরিতা এটা নিয়ে বলতে চেষ্টা করেছে প্রত্যেকবারই ওর একটাই উত্তর শুনে এসেছে, ‘তুই জানিস না দিদি, আমার ভালো কেউ সহ্য করতে পারে না। সকলে আমাকে হিংসা করে। ভালো কিছু আমার জীবনে ঘটলে অন্যের নজর লেগে যায়, তাই কাউকে আমি কিছু জানতে দিই না।’

সুচরিতা আশ্চর্য হয় সুপর্ণার কথা শুনে। আশ্চর্য, নিজের দিদিকেও বলা যায় না। তার মানে কি সুপর্ণা বলতে চায় ছোটো বোনকে দিদি হিংসা করছে? অথচ দিনরাত সুচরিতার একটাই চিন্তা, ছোটো বোনটা কীভাবে ভালো থাকবে? কী করে ওকে আরও সাহায্য করা যাবে?

সুচরিতার মনে পড়ল, এই তো কয়েকদিন আগেই সুপর্ণা কাজের মেয়েটার হাত দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়েছিল কিছু টাকা চাই লিখে। সংসার থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে সুচরিতা সামান্য কিছু টাকা জমিয়ে রাখে দুর্দিনের কথা মাথায় রেখে। ভেবেছিল বোন এলে ওখান থেকেই কিছু টাকা সুপর্ণাকে দিয়ে দেবে। ও ভালো করেই জানে ওই টাকা সুপর্ণা কবে ফেরত দেবে কোনও ঠিক নেই। আদৌ দেবে কিনা সেটাও অজানা।

এই ভাবেই দুই বোন মানুষ হয়েছে। দশ বছরের ছোটো সুপর্ণা। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই মা-বাবার কাছে সমানে শুনে এসেছে, ছোটো বোনের সব দায়িত্বই সুচরিতার। বোনকে চোখে চোখে রাখা, সঙ্গে করে স্কুল নিয়ে যাওয়া, টিফিন খেয়েছে কিনা দেখা, বোনকে আগলে আগলে রাখা সবই করেছে সুচরিতা। বিয়ের পরেও এর অন্যথা হয়নি। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরেও সুপর্ণার দায়িত্ব সুচরিতার ঘাড়েই এসে পড়েছে। সুচরিতা নিজেই বুঝতে পারেনি কবে থেকে ও বড়ো দিদির খোলস ত্যাগ করে সুপর্ণার মা হয়ে উঠেছে। অবশ্য এই নিয়ে সুচরিতার স্বামী এবং ছেলে প্রচুর হাসিঠাট্টাও করেছে, কিন্তু সুচরিতা কখনও প্রতিবাদ করেনি।

‘সুচি, তুমি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভালোমানুষ। নিজের বোনকে ভালোবাসো ক্ষতি নেই কিন্তু এতটা স্বার্থপরও ওকে করে তুলো না যে ওর নিজের চরিত্রই একদিন ওর সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মা-বাবাও শক্ত হাতে সন্তানের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তাকে শাসন করে কিন্তু তাই বলে কি তারা তাদের সন্তানের শত্রু? তাহলে তুমি কেন সুপর্ণার সব দোষ ঢাকবার চেষ্টা করো?’

‘আমি ওকে কী বলব? ও নিজে পড়াশোনা করেছে, ব্যাংকে চাকরি করে। ও বাচ্চা মেয়ে নয় যে ওকে বোঝাব। সবারই স্বভাবের কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে।’

‘যদি আলাদা আলাদা স্বভাবের কথাই বলো তাহলে ওকে ওর স্বভাব নিয়েই থাকতে দাও। ওর নিজের স্বভাবের জন্য যা কিছু সমস্যা সেটা সুপর্ণার একার, সেটা সমাধানের দায়িত্বও ওর উপরে কেন ছেড়ে দিচ্ছ না? সেখানে তুমি কেন ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছ? আমার আপত্তিটা এখানেই।’

শেখরের কথাটা ফেলতে পারে না সুচরিতা কারণ সুচরিতা জানে শেখর সত্যি বলছে। কিন্তু মনকে কীভাবে বোঝাবে সুচরিতা। বোনের প্রতি গভীর মমতাবোধ সবসময় সুচরিতাকে দুর্বল করে তোলে। এই যে সুপর্ণা টাকা চেয়েছে সেটা শেখরকে এখনও বলতে পারেনি সুচরিতা। মনে মনে ঠিক করে রেখেছে নিজের জমানো টাকা থেকেই সুপর্ণাকে কুড়ি হাজার টাকা এখন দিয়ে দেবে। কিন্তু কেনই বা এই টাকার দরকার সুপর্ণার, নিজের মনকেই সুচরিতা প্রশ্ন করে। সুপর্ণা ব্যাংকে চাকরি করে, মাইনেও খারাপ নয়। তাহলে? আর কতদিন সুপর্ণাকে এইভাবে সাহায্য করে যেতে হবে? মনে মনে বিরক্ত হয় সুচরিতা। কেন ও সুপর্ণার মুখের উপর ‘না’ বলতে পারে না? বেশ বুঝতে পারে সুচরিতা, সুপর্ণা ওর ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে ওকে ব্যবহার করছে।

শেখর বহুবার সুচরিতাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে সুপর্ণা ওকে নিজের কাজ গুছোবার জন্য খালি ব্যবহার করছে। সুপর্ণার এই স্বভাবের জন্য সুচরিতা অনেকটাই দায়ী। বোনের অন্যায় কোনওদিন সুচরিতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়নি উপরন্তু সকলের সামনে ঢাকবারই চেষ্টা করেছে। এমন অনেক সম্পর্ক রয়েছে যেগুলো ছাড়া জীবন এগোতে চায় না অথচ সম্পর্কগুলো শুধু ব্যথাই দেয়। দেওয়ার ইচ্ছেটা কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দেয়। আর পিছন ফিরে কিছুতেই তাকানো যায় না। অথচ যে পাচ্ছে, তার কিছুতেই আর আশ মেটে না। গোগ্রাসে সারা পৃথিবীটাকে যেন গিলে খেতে চায়।

সুপর্ণার বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। অথচ নিজেকে বদলাবার কোনও চেষ্টা নেই ওর। সুচরিতা ভাবে, সুপর্ণা কখনও কি বদলাবে? হয়তো না। অথচ ওর জন্য সুচরিতার সংসারে মাঝেমধ্যেই অশান্তির ঝড় বয়ে যায়। আশকারা তো সুচরিতাই দিয়েছে। যখন তখন এসে কেঁদে পড়া, টাকা ধার চাওয়া, সুচরিতার জীবনে নাক গলানো এগুলো সুপর্ণার অভ্যাস হয়ে গেছে। সন্তানকে শাসন করা যায়, গায়ে হাতও তোলা যায়। কিন্তু একটা বয়সের পরে কেউ কথা শুনবে কি শুনবে না সেটা পুরোটাই তার মানসিকতার উপর নির্ভর করে। কিন্তু সব জেনেশুনে চুপচাপ বসে থাকাটাও বোকামি। গায়ে হাত তুলে শাসন করা না-ই বা গেল কিন্তু শাসনের ভঙ্গিতে হাত তো তোলাই যেতে পারে, শরীরে না ঠেকালেই হল।

সুচরিতাও মনে মনে দৃঢ় হল, এভাবে আর সুপর্ণার অন্যায়গুলোতে সায় দেওয়া যায় না। বিকেলে সুপর্ণার বাড়ির রাস্তা ধরল। শেখরের ফিরতে রাত হবে, অতএব অর্কই মা-কে অটোতে উঠিয়ে দিল। গলির মুখটাতে অটো থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিল সুচরিতা। সুপর্ণাকে অগ্রিম কিছু জানায়নি ফোন করে যা এতদিন করে এসেছে ও। ফ্ল্যাটের সামনে এসে কলিংবেল বাজায় সুচরিতা। অল্প অপেক্ষার পরই দরজা খুলে দাঁড়ায় সুপর্ণা। দিদিকে হঠাৎ সামনে দেখে সুপর্ণার চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে, ‘দিদি তুই?’

সুচরিতার পেছনে আরও কেউ আছে কিনা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে সুপর্ণা শুকনো গলায় আবার জিজ্ঞেস করে, ‘দিদি তুই? একটা ফোন করিসনি কেন?’

‘ভাবলাম তোকে একটা সারপ্রাইজ দেব, তাই চলে এলাম। ভিতরে আসতে বলবি না… নাকি দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকব?’

সুপর্ণাকে পাশ কাটিয়েই সুচরিতা বসার ঘরে পা দেয়। সোফাতে সুপর্ণার কোনও সহকর্মী বসে আছে দেখে সুচরিতা থমকায়। ঘরে চোখ বুলোতেই চোখে পড়ে কার্পেটের উপর কাগজ পেতে হোটেল থেকে আনানো খাবার রাখা আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। প্লেটে খাবার নিয়ে গুছিয়ে সুপর্ণাকে কোনওদিন খেতে দেখেনি সুচরিতা। এখনও সেই অভ্যাস রয়ে গেছে সুপর্ণার। সুচরিতার চোখ পড়ে সোফায় বসা ভদ্রলোকের হাতেও হোটেলেরই খাবারের একটা বাক্স ধরা। চামচে করে সরাসরি বাক্স থেকেই খাওয়া হচ্ছিল সেটা বুঝতে ভুল হয় না। একটু লজ্জা অনুভব করে। সুপর্ণা নিজে এভাবে খায় ঠিক আছে তাই বলে অতিথির বেলাতেও একই নিয়ম?

সোফায় এসে বসে সুচরিতা। ওর মনে হয়, ভদ্রলোক যেন ওকে দেখে খানিকটা অস্বস্তিতে পড়েছেন। ব্যবহারটা কেমন যেন অসহজ মনে হয়।

সুপর্ণা ঘরে এসে বসতেই সুচরিতা চোখ ফেরায় ওর দিকে, ‘নিজেরই তো বোনের বাড়ি… শুধু শুধু ফোন করতে ইচ্ছে করল না। বসে বসে হঠাৎ মনে হল অনেকদিন ফোনে তোর সঙ্গে কথা হয়নি, তোকে দেখিনি। ব্যস চলে এলাম অটো ধরে। তুই কেমন আছিস? তোর কোথাও বেরোনোর নেই তো এখন?’

সুচরিতার মনে হয় সুপর্ণাকে একটু শুকনো লাগছে দেখতে। পাশের ভদ্রলোকটিও কেন জানি না উশখুশ করতে থাকেন। দু’জনকে দেখেই সুচরিতার মনে হয় যেন ওদের জীবনে একটা সাংঘাতিক অঘটন ঘটে গেছে।

‘কী হয়েছে, তোর শরীর ঠিক আছে তো?’

সুচরিতা জিজ্ঞেস না করে পারে না।

‘হ্যাঁ, মাঝে একটু শরীরটা খারাপ হয়েছিল। দিদি, ইনি ব্যাংকে আমার সহকর্মী। নাম সৃজিত। আমার শরীর খারাপের খবর শুনে আমাকে দেখতে এসেছেন।’

সুচরিতা স্পষ্ট বুঝতে পারে সুপর্ণা মিথ্যা কথা বলছে। ওর নিজের করা প্রশ্নটাই সুপর্ণার মুখে উত্তর জুগিয়েছে এটা কাউকে এসে বলে দেওয়ার দরকার নেই। সুচরিতা শরীর খারাপের প্রশ্নটা না তুললে হয়তো সুপর্ণার ঠোঁটে সদুত্তর কিছু জুটত না।

ছোটো থেকে সুপর্ণাকে দেখছে তাই ওকে বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয় না সুচরিতার। প্রত্যেকটা গতিবিধি ওর চেনা। অনেকটা বয়সের পার্থক্য দুই বোনের মধ্যে। সুচরিতার জন্মের পর দশ বছর পর্যন্ত ওর মা-বাবা দ্বিতীয় সন্তানের কথা চিন্তাতেও আনেননি। সুচরিতার নিঃসঙ্গতার কথা ভেবে এবং ওর বারো মাস অসুস্থ থাকার কারণে বাড়ির বড়োরা ওদের পরামর্শ দেন দ্বিতীয় সন্তানের জন্য। কারণ বাড়িতে আর সকলেরই দুটি করে সন্তান ছিল। সুচরিতা একা হওয়ার কারণে খেলার কোনও সঙ্গী ছিল না ফলে ও ধীরে ধীরে খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠছিল। সুচরিতার এই সমস্যার একমাত্র সমাধানের রাস্তা ছিল বাড়িতে ভাই কিংবা একটা বোন হওয়া।

ভাই, বোন হওয়ার আগে থেকেই সুচরিতার মা-বাবা ওকে বোঝাতে শুরু করেন বাড়িতে নতুন অতিথি এলে সুচরিতার দায়িত্ব অনেক বেড়ে যাবে। সত্যি সত্যিই সুপর্ণার জন্মের পর সুচরিতার শৈশব হারিয়ে গেল সুপর্ণার প্রতি কর্তব্য পালনে। সকলে এসে একটাই কথা সুচরিতাকে বলে গেল, ‘তুই বড়ো দিদি, দশ বছরের বড়ো। তোকে বোনের দায়িত্ব নিতে হবে বই-কি।’ ব্যস সুচরিতাও, বোনের কীসে ভালো, তাতেই নিজেকে সমর্পণ করে দিল। দশ বছরের মেয়েটার ঘাড়ে সুপর্ণা নামের দায়িত্ব বেশ শিকড় গেড়ে বসল।

‘সুচি, তুমি ওর মা নও… তোমারা তো একই মায়ের পেটের বোন, তাহলে তুমি এত কেন চিন্তা করো ওকে নিয়ে?’ কতবার শেখর সুচরিতাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু সুচরিতার অবচেতনে গভীরভাবে ওর মা-বাবা এটাই রোপণ করে দিয়েছিলেন যে সুচরিতার প্রয়োজনেই সুপর্ণাকে সংসারে নিয়ে আসা হয়েছে। ছোটোবেলার কোনও কথা সুচরিতা ভোলেনি। একসঙ্গে যখন খেতে বসত, তখন হঠাৎ যদি সুপর্ণা বিছানা ভিজিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ত অথবা খিদের জ্বালায় কান্নাকাটি জুড়ে দিত, খাবার ফেলে রেখে সুচরিতাকেই দৌড়োতে হতো। এখন সুচরিতার মাঝেমধ্যেই মনে হয় ওই কাজগুলো সত্যিই কি ওর করার কথা ছিল? ওগুলো তো মা-বাবার দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল। বোনকে পৃথিবীর আলো দেখিয়ে তারা সুচরিতার কাছে কী প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন? সুচরিতার জীবনে যে সঙ্গীর অভাব ছিল সেটার অভাব পূরণ করে তারা কি সুচরিতার উপকার করতে চেয়েছিলেন? এই ভার আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সুচরিতা বয়ে চলেছে। এখন বড়ো ক্লান্ত বোধ করে সুচরিতা। মা-বাবার প্রতি এই কর্তব্যের থেকে কবে মুক্তি পাবে সুচরিতা? সুপর্ণার ডাকে চিন্তার জাল ছিঁড়ে বর্তমানে ফিরে আসে সুচরিতা–

‘এই দিদি, কী ভাবছিস তুই? কোনও কথা বলছিস না কেন?’

সোফায় পড়ে থাকা প্যাকেটগুলোর উপর চোখ চলে যায় সুচরিতার। শহরের নামি কয়েকটা দোকানের নাম লেখা প্যাকেটগুলোয়। অর্ক সত্যি কথাই বলেছিল, বুঝতে পারে সুচরিতা। শরীর খারাপটা বাহানা মাত্র, আসলে সুপর্ণা ঘোরা-বেড়ানো, মার্কেটিং নিয়েই ব্যস্ত ছিল। দিদির একটা খোঁজ নেওয়া দরকার, সেটা ওর মনেও আসেনি।

সুচরিতা লক্ষ্য করে দুটো, তিনটে পোশাক ইতিউতি চেয়ারের উপর পড়ে রয়েছে। দেখে তো নতুনই মনে হচ্ছে। হয়তো সুপর্ণা পরে পরে দেখছিল আর নয়তো পরে দেখাচ্ছিল!

হঠাৎই সুচরিতার মনে হয়, তাহলে কি বসে থাকা পুরুষটির সঙ্গে সুপর্ণার কোনও গভীর সম্পর্ক রয়েছে নয়তো কোনও বাইরের পুরুষের উপস্থিতিতে সুপর্ণা পোশাক বদলাবার মতো নির্লজ্জ আচরণ করে কী করে?

‘তোর কি জ্বর হয়েছিল? ক্লাইমেট বদলাচ্ছে… চারদিকে ভাইরাল চলছে, একটু সাবধানে থাকতে পারিস তো’, এই বলে সুচরিতা চেয়ার থেকে জামাকাপড়গুলো উঠিয়ে একটা জায়গায় জড়ো করে। ঠিক সেই মুহূর্তে সোফায় বসা ভদ্রলোকও উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে, ‘আচ্ছা সুপর্ণা আমি এখন বেরোচ্ছি।’

‘আপনি উঠছেন কেন, বসুন না… খাবারটা তো এখনও শেষ হল না। সুপর্ণা, তুইও এসে এখানে একটু বস না,’ সুচরিতার গলার স্বরে এমন একটা আদেশের সুর ছিল যে ওরা দু’জনেই চমকে সুচরিতার দিকে তাকায়।

ভদ্রলোক কোনও কথা না বলে দরজার দিকে পা বাড়ান। সুপর্ণাকে দেখেও একটু আনমনা মনে হয় সুচরিতার।

‘অসুস্থ ছিলি যদি তাহলে হোটেলের খাবারগুলো খাচ্ছিস কেন?’ না চাইতেও সুচরিতার চোখ চলে যায় পড়ে থাকা খাবারের কৌটোতে। তেলের মধ্যে মাংসের টুকরোগুলো ভাসছে, একটা কোনও সবজি আর রুমালি রুটি পড়ে রয়েছে। ‘তোর সঙ্গে একটু দরকার ছিল, তাই আর আসার আগে তোকে ফোন করিনি। আমার কিছু টাকার দরকার… অর্কর একটা কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য। তোর কাছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো পাই।’

মুহূর্তেই সুপর্ণার মুখের চেহারা বদলে যায়, বিবর্ণ রং ধারণ করে। কারণটা সুচরিতা জানে তাই আবার জানার চেষ্টা করে না। সুপর্ণাকে টাকা দিয়ে এই প্রথম টাকা ফেরত চাইল সুচরিতা। সুপর্ণাও টাকা নিয়ে কোনওদিন ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। সুচরিতা খুব খুঁটিয়ে সুপর্ণার চোখের ভাষা পড়বার চেষ্টা করে কারণ ও বুঝতে পেরেছিল এখানে এসে সুপর্ণার সন্ধেটা মাটি করে দিয়েছে।

আপশোশ হয় সুচরিতার। একই মা-বাবার সন্তান হয়েও দুই বোনের চরিত্র কতখানি আলাদা। একই বাড়ির পরিবেশ কীভাবে দুজনের রক্তে আলাদা প্রভাব ফেলল?

‘আমার কাছে টাকা কোথায়?’ সুপর্ণা অস্ফুটে বলে।

‘কেন? একলা ফ্ল্যাটে থাকিস। তোর স্বামী আর ছেলে দুজনেই অন্য শহরে রয়েছে। তোর পুরো খরচা ভাস্কর পাঠায়। তোর নিজের মাইনের পুরোটা যায় কোথায়? নিজের জন্য একটা পয়সাও তো খরচ করিস না।’

সুপর্ণা অবাক হয়ে যায় দিদির কথা শুনে। সবসময় ওর হয়েই সুচরিতা মুখ খুলেছে তাহলে আজ হঠাৎ দিদি বিপক্ষে কী করে চলে গেল। অথচ সুচরিতা সবসময়েই চেয়েছে সুপর্ণা বিপথে না যাক। প্রতিদিন ভেবেছে, সুপর্ণা এবার নিজেকে বদলাবে। ওর স্বামী, ছেলে সকলেই ওর আচরণে বিরক্ত। সুচরিতারও বাড়ির কেউ সুপর্ণাকে পছন্দ করে না। একমাত্র ওই ঢাল হয়ে সুপর্ণাকে আগলেছে। সেই ঢাল-ই আজ তির হয়ে সুপর্ণাকে আঘাত করতে উদ্যত।

‘একটু একটু করে সংসার থেকে বাঁচিয়ে টাকা জমিয়েছি… অর্কর ভর্তির জন্য অনেকগুলো টাকা লাগবে এটা তো তুই জানতিস। আমাকে সাহায্য করতে হবে না কিন্তু আমার টাকাগুলো ফিরিয়ে দে। আমার তাতেই কাজ মিটে যাবে,’ উঠে দাঁড়ায় সুচরিতা।

সুপর্ণাকে দেখে মনে হচ্ছিল কাটলেও এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়বে না। মরা মানুষের মতো ফ্যাকাসে চেহারা হয়েছে ওর। ও স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি সুচরিতা এতটা মুখরা হয়ে উঠতে পারে, এতটা নির্দয় ভাবে সুপর্ণার সঙ্গে কথা বলতে পারে। সুপর্ণার স্ন্দুর সন্ধের শেষটার যে এমন পরিণাম হতে পারে, সেটা ও কল্পনাও করতে পারেনি।

‘দ্যাখ না দিদি, ভাস্কর কিছুই বুঝতে চায় না…’

ভাস্করকে খুব ভালো করেই জানে সুচরিতা। সুপর্ণা বরাবরই স্বামীকে ডমিনেট করে এসেছে। নিজের ইচ্ছে ওর উপর চাপাতে চাপাতে ভাস্করের জীবনটাকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ছেলেটাকেও কোনওদিন আদর করে কাছে টানার চেষ্টা করেনি। বাড়ির বাইরেই সময় কাটিয়েছে বেশি। তাই চাকরির বদলি হওয়াতে ভাস্কর যে খুশিই হয়েছিল সেটা সুচরিতার অজানা নয়। চাকরির দোহাই দিয়ে সুপর্ণা ওদের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করে। আর এই সুপর্ণাকে এতদিন, এতবছর ধরে সুচরিতা সকলের চোখের আড়ালে স্নেহ মমতা দিয়ে সিঞ্চন করে এসেছে। আজ আপশোশ হয় সুচরিতার।

দম আটকে আসতে থাকে ওর, সুপর্ণার ফ্ল্যাটের ভিতরে। একটা নেগেটিভ এনার্জি সুচরিতাকে সদর দরজার দিকে ধাক্বা মারতে থাকে। নিজের বোনের প্রতি এই ধরনের মনোভাব কোনওদিন সুচরিতা আগে ফিল করেনি। নিজেই ও সবথেকে বেশি দোষী। ঘৃণা হতে থাকে নিজের উপরেই সুচরিতার।

‘দিদি আর একটু বস না।’

‘না সুপর্ণা… আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। তোর সঙ্গে আমার এইটুকুই কাজ ছিল’, বলে সুপর্ণার হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে সুচরিতা বাইরে বেরিয়ে আসে। বাধভাঙা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে সুচরিতার দুই গাল বেয়ে। কী যেন আশায় একবার মুখ ফিরিয়ে দেখে, ফেলে আসা বাড়িটার দিকে। ওকে পেছন থেকে ডাকার মতো একটা মানুষের মুখও চোখে পড়ে না। গভীর শ্বাস নেয় সুচরিতা। এই তো বেশ ভালো হল। টাকা ফেরত পাবার আশা কম তবে ‘দিদি কিছু টাকা দে’ বলে হাত বাড়ানো সুপর্ণাকে আর দেখতে হবে না। হঠাৎই সুচরিতা বুঝতে পারে ঘাড়ের ভারী বোঝাটা কখন যেন হালকা হয়ে গেছে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অটো ধরতে এগিয়ে যায় সুচরিতা।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব