বলিদান (পর্ব ২)

অনেকদিন পর অনন্যা যখন সার্থকের এরকম আচরণের কারণটা জানতে পারল, ও মনে মনে খুব দুঃখিত বোধ করল। সার্থকের জন্য মনের কোণায় সহানুভূতি জন্ম নিল। দু’বছর আগে ক্যান্সারের মতো মারণ রোগে সার্থক স্ত্রীকে হারিয়েছে। পাঁচ বছরের ওদের একটি সন্তান আছে। দ্বিতীয়বার সার্থক আর বিয়ে করেনি কারণ সৎমা সম্পর্কে খুব একটা ভালো ধারণা সার্থকের নেই। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়েই সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে সার্থক।

এতটা শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা থাকতেও সার্থক যে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেয়, এটা ভেবেও ভালো লাগল অনন্যার।

একদিন লাঞ্চ টাইমে অনন্যাকে ক্যান্টিনে বসে খেতে দেখে সার্থক মনের মধ্যে ওঠা একটা প্রশ্ন না করে পারল না, “আচ্ছা অনন্যা, নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে পুণার মতো একেবারে অচেনা একটা শহরে বদলি নিলে কেন?”

—কারণ, ওটা শুধু চারটে দেয়ালযুক্ত একটা বাড়িই, আর হ্যাঁ মাথায় একটা ছাদ আছে এইপর্যন্ত! আনমনা হয়ে উত্তর দিল অনন্যা।

—মানে? সার্থক অনন্যার উত্তরের মানেটা ঠিক বোধগম্য করতে পারল না।

—বাড়িতে ভাই বোনেদের মধ্যে আমি সবথেকে বড়ো। বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর বাড়িতে রোজগার করার মতো কেউ ছিল না। ভাই বোনেরা পড়াশোনা করছিল। বাবার জায়গায় আমাকে কোম্পানি বহাল করে কারণ বাবার বস বাবাকে খুব শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসতেন। সংসারে অবশ্য আর্থিক অনটন কিছু ছিল না।

আমার মাইনেতে ভালো ভাবেই সংসারটা চলছিল। ভাই বোনের পড়াশুনোও বন্ধ হয়নি। কিন্তু বিয়ে করা সম্ভব ছিল না। বিয়ে করে নিলে বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে যেত আর ভাই বোনের কেরিয়ারটাও নষ্ট হয়ে যেত। উলটে অন্য আর একটা বিপদের সম্মুখীন হতে হতো।

একবার একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছিল। পাত্রপক্ষকে খুব সাহস করে একটা শর্ত দিয়েছিলাম — বিয়ের পর আমার মাসমাইনের অর্ধেক আমি নিজের বাড়িতে দেব। ব্যস, ওদের আগ্রহ ওখানেই শেষ। এরপর আর ওই শর্ত কারও সামনে রাখার সাহস হয়নি। আমার কাছে আমার ভাই বোন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমিই ওদের আশা-ভরসা ছিলাম। নিজের জীবন নিয়ে আমি খুব খুশি ছিলাম। ওদের পড়াশোনা শেষ হলে, নিজেদের কেরিয়ারে ওরা প্রতিষ্ঠিত হলে যতটা সম্ভব ধূমধাম করে ওদের বিয়ে দিই। মা-ও বোধহয় ওটার জন্যই বেঁচে ছিলেন। এরপর মা-ও মারা যান।

ভাইয়ের বিয়ের পরেই সমস্যা শুরু হয়। ভাইয়ের বউয়ের আমার মোটা মাইনের অঙ্কটা খুব পছন্দ ছিল কিন্তু আমি ওই একই বাড়িতে থাকি ওটা ওর পছন্দ ছিল না। আমাকে নিয়ে আমার ভাইয়ের সঙ্গেও কথা কাটাকাটি করত। ফলে ভাই-ভাইয়ের বউয়ের মধ্যে যেমন দূরত্ব বাড়ছিল, আমার আর ভাইয়ের মধ্যেও একটা দুর্ভেদ্য দেয়াল উঠতে আরম্ভ করল। বেশ বুঝতে পারছিলাম ওদের জীবনে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এবার সম্মানের সঙ্গে সরে আসাটাই সবার জন্য মঙ্গল। অফিসেও বদলির জন্য দরখাস্ত করি এবং কারণটাও ওদের খুলে বলি। প্রথম বদলি হয় হায়দরাবাদে। এখন কোন শহরে আমার বদলি হল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। সব শহরই আমার কাছে সমান।

এখানে পুণাতে এসে আমি মানসিক শান্তিতে রয়েছি। তারপর তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে এখন তো আরও ভালো লাগছে। সার্থক, আমি যেন আবার সেই কলেজের দিনগুলোতে ফিরে গেছি।

—অনন্যা, তোমার আত্মত্যাগের কোনও তুলনা হয় না। নিজের পরিবারের ভালোর জন্য এভাবে নিজের সুখ স্যাক্রিফাইস করা খুব সহজ কাজ নয়। তাও প্রথমবার নয়। পরিবারের জন্য নিজে বিয়ে করলে না আবার দ্বিতীয়বার সকলের ভালো চেয়ে নিজের বাড়ি ছেড়েই চলে এলে, যেটা কিনা মেয়েদের কাছে সবথেকে প্রিয় জায়গা। বলতে বলতে সার্থকের গলা অবরুদ্ধ হয়ে এল।

সার্থক অনন্যার জন্য গর্ববোধ করল। ওর মনের মধ্যে অনন্যার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা অনেকটাই বেড়ে গেল।

—তুমি কখনও কাউকে ভালোবেসেছ? ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল সার্থক।

—জানি না, আমার কাছে দায়িত্ববোধ-টাই এত প্রবল ছিল, ভালোবাসাটা কোনওদিন উপলব্ধিই করতে পারিনি। অনন্যার উত্তর শুনে সার্থকের মনে হল আজও অনন্যা সত্যিকারের ভালোবাসার অপেক্ষায় রয়েছে।

—এখন আর তো কোনও দায়িত্ব নেই, তাহলে কেন বিয়ে করছ না? আপন মনে করেই সার্থক অনন্যাকে প্রশ্নটা করল।

—সত্যি বলব, এক তো বয়স হয়ে গেছে আর দ্বিতীয়ত খোঁজার মতোও তো কাউকে দরকার। হতাশা ভরা ফ্যাকাশে হাসি হাসল অনন্যা!

—৩৪-৩৫ বছর এখনকার দিনে কোনও বয়স নয়।

—দেখি, আমার ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে যায়। অনন্যা এই আলোচনা বন্ধ করতে চাইছিল।

—তুমিও তো আমার থেকে মাত্র দু’বছরের সিনিয়র ছিলে, তাহলে তুমিই বা বিয়ে করছ না কেন? অনন্যা পালটা প্রশ্ন করল।

—শুধু ছেলের জন্য। মায়ের ভালোবাসা থেকে ও বঞ্চিত হয়েছে বলে বাবা হয়ে আমি ওকে ভালোবাসা দেব না? বাড়িতে ওর সৎমা নিয়ে এলে সে কেমন মা হবে কে জানে? তার উপর তার নিজের সন্তান হলে, আমার ছেলের খেয়াল সে কি রাখবে? এই প্রশ্নগুলোই আমার মনে ভয়ের উদ্রেক করে, স্পষ্ট উত্তর সার্থকের।

—ছেলে যেদিন কলেজ যাবে তখন না হয় দ্বিতীয় বিয়েটা করা যাবে, বলে সার্থক হেসে ফেলল। দেখাদেখি অনন্যাও হেসে ফেলল।

দেখতে দেখতে অনন্যা দু’টো বছর পুণায় কাটিয়ে ফেলল। সার্থক আর ও এখন খুব ভালো বন্ধু। একসঙ্গে দু’জনে বাইরে ঘুরতে যায় এমনকী সার্থকের সাত বছরের ছেলে কুশলও বেশিরভাগ সময় ওদের সঙ্গে থাকে। অনন্যাকে কুশলও খুব পছন্দ করে। ওকে অ্যান্টি সম্বোধন করে কুশল।

ক্রমশঃ

বলিদান (পর্ব ১)

চিন্তায় ডুবে গিয়েছিল অনন্যা। এতগুলো বছর পার করে ফেলল। কমদিন হল না ওর চাকরির। বাবার অবর্তমানে ছোটো ভাই বোনের দায়িত্ব ওর উপরেই এসে পড়েছিল, এক অজানা নিয়তির হাত ধরে। ভাই বোনকে উচ্চশিক্ষা দিতে গিয়ে নিজের দিকে আর তাকাবার সময় পায়নি ও। এই করেই বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে। অথচ শান্তি জোটেনি ওর কপালে।

ভাইয়ের বউয়ের গঞ্জনায় মাথার উপরের ছাদটুকুও ওকে ছেড়ে আসতে হয়েছে। অবিবাহিত ননদের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকা ভাইয়ের বউয়ের পছন্দ হয়নি। সেখানের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হতে দেখে অনন্যা নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে। ভরসা তার চাকরিটুকুই। একটি বিদেশি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো পদে সে কর্মরত।

দু’বছর হল হায়দরাবাদ থেকে পুণায় বদলি হয়েছে। পুণায় এসে জানতে পেরেছে তার কলেজের সিনিয়র সার্থকও এই একই কোম্পানিতে রয়েছে গত দশ বছর। কলেজে থাকতে কলেজের যে-কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো পরিচালনার দায়িত্বে অনন্যা এবং সার্থক দু’জনেই থাকত আরও অনেকের সঙ্গে। এই ভাবেই বন্ধুত্ব দু’জনের। অবশ্য সম্পর্কটা বন্ধুত্বেই থেকে গিয়েছিল, গভীরতা পায়নি।

পুণায় এসে অফিস জয়েন করার প্রায় তিন-চারদিন পর লাঞ্চ টাইমে হঠাৎ সার্থককে দেখতে পেয়ে খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠল অনন্যা।

অনন্যা, “আরে সার্থক না? তুমি এখানে?”

—হ্যাঁ, আমি এই অফিসেই কাজ করি কিন্তু আপনাকে ঠিক…’, সার্থক আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকাল অনন্যার দিকে! কারণ এখানে “তুমি’ সম্বোধন করার মতো এমন আপনজন কে হতে পারে। অবশ্য সার্থককেও দোষ দেওয়া যায় না। অনন্যার সৌন্দর্য এতটুকু কমে না গেলেও ছিপছিপে চেহারা আগের থেকে ভারী হয়েছে। চুল ছেঁটে কাঁধ অবধি এসেছে।

অফিসের তিন-চারজন কর্মচারীও অবাক হয়ে ওদের লক্ষ্য করছিল। ওরা নিশ্চিত ছিল অনন্যাই কোনওরকম ভুল করছে।

—সার্থক, আমি অনন্যা। জয়পুরে আমরা একই কলেজে পড়তাম। অনন্যা একটু আশ্চর্য হল, সার্থক ওকে চিনতে পারেনি দেখে! ও একটু লজ্জিত হল কারণ আশেপাশে সকলেই ওর দিকে এমন করে তাকাচ্ছিল যে ওদের চাহনি বলছিল অনন্যাই মস্ত ভুল করে বসেছে।

—সরি অনন্যা, আমি সত্যি তোমাকে চিনতে পারিনি। কলেজ ছেড়েছি প্রায় বারো-তেরো বছর হতে চলল। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তিও কমছে। যদিও পঁয়ত্রিশ বছর এখনকার দিনে কোনও বয়সই নয় তবুও সার্থক কথোপকথন চালাবার চেষ্টা করল।

অনন্যার দিকে ভালো করে তাকাল সার্থক। মনে পড়ল কলেজে থাকতে লম্বা বিনুনি করে আসত। এখন কাঁধ পর্যন্ত চুল খোলা রয়েছে। চোখেও পাওয়ারের চশমা উঠেছে। কিন্তু এত কথা সাৰ্থক সকলের সামনে বলাটা সমীচীন মনে করল না।

—তুমি কবে জয়েন করলে অফিস? আসলে আমিও পাঁচদিন ছুটিতে ছিলাম। আমার বাচ্চাটা অসুস্থ ছিল, সার্থক বলল।

—আমি চারদিন হল, অফিস জয়েন করেছি। অনন্যা সার্থকের ব্যবহারে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিল। ওর খালি মনে হচ্ছিল শুধুমাত্র ভদ্রতার খাতিরে সার্থক ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। নয় তো ওর সঙ্গে কথা বলার সার্থকের বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। যদিও কলেজেও বন্ধুত্ব কোনওদিন খুব গভীর ছিল না দু’জনের মধ্যে। কাজ নিয়েই যা দু’জনের কথাবার্তা হতো। কিন্তু একে অপরের অপরিচিত তো ছিল না।

এতবছর বাদে একটা অচেনা শহরে এসে পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়াতে অনন্যা খুব উৎসাহিত হয়ে পড়েছিল, সার্থকের ব্যবহার অনন্যার সেই উৎসাহে একেবারে জল ঢেলে দিল। সার্থকের চেহারায় যে, কোনও পরিবর্তন হয়নি এমন তো নয়। আগের থেকে ওর শরীরেও মেদ জমেছে, গোঁফ রেখেছে। তাও ওকে চিনতে বিন্দুমাত্র দেরি হয়নি অনন্যার। অফিসের সহকর্মীরাও ধরেই নিয়েছিল, ওদের দু’জনের সম্পর্কটা নিশ্চয়ই পুরোনো কলেজ প্রেমের বর্তমান রূপরেখা।

পরের দিন অনন্যার মুড খারাপ দেখে সার্থকের বুঝতে অসুবিধা হল না, ওর কথা বলার স্টাইলেই অনন্যা মনে মনে আহত হয়েছে। নিজেকে খুব দোষী মনে হল সার্থকের। লাঞ্চের সময় নিজেই এগিয়ে এসে অনন্যা-কে বলল, “খুব সরি অনন্যা, আমি তোমাকে একেবারেই চিনতে পারিনি।’ হাত দিয়ে কান ধরে কলেজের দিনের মতো বন্ধুত্বের ভাষা সার্থকের মুখে শুনে অনন্যা না হেসে পারল না।

—সার্থক আমার ছোটো চুল দেখে অনেকেই আমাকে চট করে চিনতে পারে না। তোমাকে আমি দোষ দিচ্ছি না। বুঝতে পেরেছি তুমি আমাকে চিনতে পারোনি।

—হ্যাঁ, কলেজে তুমি লম্বা বিনুনির জন্যই খ্যাত ছিলে আর সেই কারণেই ‘মিস কলেজ’-এর খেতাবও তোমার ঝুলিতে জুটেছিল। সার্থকের চোখের সামনে ভেসে উঠল অনন্যার চুলের সৌন্দর্যে কেমন ছেলেরা ওর জন্য পাগল ছিল।

—কী করি? অফিস জয়েন করার পর সকালের দৌড়াদৌড়িতে বিনুনি করার সময় কোথায়? তাই জন্য চুল কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছি। অনন্যার কথায় আফশোশ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল কারণ ভারতীয় নারীর কাছে নিজের চুলের সৌন্দর্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

অনেক সময় যখন আমরা একই শহরে বা একই কলেজে পড়ি এবং সেখানে রোজই প্রায় দেখা সাক্ষাৎ হতে থাকে তখন সেখানে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলেও ঘনিষ্ঠতা বাড়বেই এমনটা হলফ করে বলা যায় না। অথচ অন্য শহরে গিয়ে হঠাৎ যদি সেই দু’জনের দেখা হয়ে যায়, তাহলে মনে হয় দু’জন খুব কাছের মানুষ বহু বছর বিচ্ছেদ কাটিয়ে আবার একত্রিত হয়েছে। সার্থক এবং অনন্যার মনের অবস্থাটাও ঠিক এমনই ছিল।

কিছুদিন কাজ করতে করতেই অনন্যা লক্ষ্য করল অফিসের মহিলা সহকর্মীদের সঙ্গে সার্থকের কাজ ছাড়া কোনও কথা হয় না তাও বেশিরভাগই হ্যাঁ কিংবা হুঁ— শুধু এটুকুই। অথচ পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সার্থক খুব সহজ ভাবে মেশে এবং সবসময় তাদের সাহায্য করতে এগিয়েও আসে। এছাড়াও ঠিক ছ’টায় অফিস ছুটির সঙ্গে সঙ্গে সার্থক এক মুহূর্ত কারও অপেক্ষা না করেই একাই অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।

ক্রমশঃ

হনন (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

শ্রীর সঙ্গে প্রতি পদে পদে ঝগড়া ও আপস করে করে ধুঁকতে ধুঁকতে জীবন কাটতে থাকে বিতানের। শ্রীর জন্য দামি দামি শাড়ি, গয়না, দামি কসমেটিক, পারফিউমের জোগান দিতে দিতে কখনও কখনও তার পকেটের অবস্থা শোচনীয় হয়ে যায়। সমতা রক্ষা করতে পারে না অনেক সময়। সহ্য করতে না পেরে একদিন ফোন করে ফেলল শ্বশুরমশাইকে।

—নিজের লুকস আর আমাকে ঘিরে শ্রীর অবসেশন যে রোগের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্লিজ কিছু করুন, বাবা।

—না না, বাবা। মা মরা মেয়ে তো। আদরে আদরে মানুষ। একটু জেদি হয়ে গেছে। তুমি ওকে একটু সামলে রেখো। চিন্তা কোরো না সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন।

ফোনের ও প্রান্তে কাঁদতে থাকেন পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধ। মুখে আর কোনও কথা সরে না বিতানের। বাড়িতে মাকে কিছু বললে মা-ও সেই একই কথা বলে, ‘ঠিক হয়ে যাবে।’ বন্ধু আবারও বলে, ‘এ যুগের মেয়ে। মানিয়ে নিতে হবে রে, ভাই। তোকে খুব ভালোবাসে। চোখে হারায়। ভালোই তো।’

ভালো আর কিছুতেই হয় না বিতানের জীবনে। এভাবেই চলতে থাকে প্রতিটা দিন। ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যেতে থাকে সে। নিজেকে যেন শ্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। রাতে ঘুমের মধ্যেও শ্রীর এই ভয়ানক অবসেশন তাড়া করে ফেরে তাকে! নিজের জীবনটা যেন আঁজলা গলে বেরিয়ে যেতে থাকে ধীরে ধীরে।

এই করতে করতে প্রথম বিবাহবার্ষিকী এগিয়ে আসে বিতান আর শ্রীদর্শিনীর। খুব ধুমধাম করে উদযাপন করবার পরিকল্পনা নেয় তারা। আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবকে নিমন্ত্রণ করবার লিস্ট তৈরি হয়। কিন্তু লিস্ট দেখে প্রথমেই বাদ সাধে শ্রী, ‘তোমার মায়ের বান্ধবী রঞ্জনামাসিকে নিমন্ত্রণ করা যাবে না। ওঁর মেয়ে রনিতা খুব সুন্দরী, না? তোমার সঙ্গে তো ওর বিয়ের কথা হয়েছিল, অ্যাম আই রাইট? পুরোনো প্রেম চাগাড় দিক আর কি! আর তোমার অফিসের ওই দুই সুন্দরী মৃদুলা আর সেবন্তীও বাদ কিন্তু…’

—শোনো না, আমার কিন্তু অ্যানিভার্সারির গিফটে হিরের দুল চাই। হঠাৎ একেবারে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আদুরে গলায় বলে ওঠে শ্রী। প্রথম অ্যানিভার্সারিতে শ্রীকে সোনার কোনও গয়না দেবে ভেবে রেখেছিল বিতান। হিরের গয়নার কথা ঠিক ভাবেনি। এটা তার বাজেটের বাইরে।

রঞ্জনামাসিকে নিমন্ত্রণ লিস্ট থেকে বাদ দেওয়ায় বিতান বোঝে মায়ের মনটা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু বউমাকে খুশি করতে মুখ ফুটে মা কিছুই বলে না। বিতান শ্রীর মতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে সে না খেয়েদেয়ে কান্নাকাটি করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে। সেই রাতেই ব্লেড দিয়ে হাত কেটে সে ভয়ানক এক হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধাল। শেষপর্যন্ত শ্রীর সব কথাই তাদের মেনে নিতে বাধ্য হতে হল। ধুঁকতে ধুঁকতে বাঁচতে থাকে বিতান। মাঝে মাঝেই নিজেকে শেষ করে দেবার আগুনে-ইচ্ছে জেগে ওঠে তার মনে!

অনুষ্ঠানের দিন কয়েক আগে শ্রীর আবদারে অফিস থেকে ছুটি নেয় বিতান। শপিং-এ যাবে সে। দুপুরের ঠিক আগে আগে দু’জনে বেরিয়ে যায়। উদ্দেশ্য শপিং করে বাইরে কোথাও লাঞ্চ সেরে একেবারে বাড়িতে ফিরবে। পাঁচতলা বিখ্যাত বস্ত্রবিপনি সংস্থায় ঢোকে তারা। দোকানের মালিক বিতানের বাবার আমল থেকে পরিচিত। সাদরে অভ্যর্থনা জানায় তাদের। নিজের আর বিতানের পোশাক পছন্দ করতে শুরু করে শ্রী।

নিজের জন্য তুলে নেয় মটকা সিল্কের হাত বাটিক, র’তসরের ব্লক প্রিন্ট, স্ট্রাইপড কাতান, বিষ্ণুপুরী সিল্কের ওপর অ্যাসিড পেইন্টেড শাড়ি। এ কাউন্টার থেকে ও কাউন্টারে ছুটোছুটি করে যেন ছোঁ মেরে তুলে নিতে থাকে ব্যাঙ্গালোর সিল্কে কাঁথার কাজ, কোসাসিল্ক শাড়ি, কাঞ্জিভরম, ইক্কত, গাদোয়াল, নয়েল সিল্ক-কুর্তি, পালাজো, লং স্কার্ট, আনারকলি স্টাইলের লং কামিজ ও চুড়িদার কিছুই বাদ যায় না! তারপর নিতে থাকে বিতানের পাঞ্জাবি, জিন্স, শার্ট, শ্রী যেন হুঁশ হারিয়ে ফেলেছে। মুখে তার লেগে আছে অলৌকিক এক টুকরো হাসি। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে একতলা থেকে পাঁচতলা গোটা দোকানময় ছুটে বেড়াচ্ছে সে। খিদে তৃষ্ণাও ভুলে গেছে যেন!

—মুর্শিদাবাদি সিল্কে বাঁধনি আর অজরখ প্রিন্টের কম্বিনেশনের এই শাড়িটা নিই, বিতান? দু’ধরনের প্রিন্টে একটা এক্সক্লুসিভ মাত্রা পেয়েছে শাড়িটা, দ্যাখো দ্যাখো! বিতানকে শাড়িটা দেখিয়ে আদুরে গলায় বলে ওঠে শ্রী। তার উজ্জ্বল চকচকে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় বিতান।

—আর বাঁদিকে কোণের ওই শাড়িটা দ্যাখো! অলিভ গ্রিন বাফতা সিল্কের উপর কলমকারি প্রিন্টে স্মার্ট লুক! শাড়িতে এইসব প্রিন্টের বৈচিত্র এখন ট্রেন্ডিং, জানো? এ শাড়িটাও নিয়ে নেব? ঘামতে থাকে বিতান। দমবন্ধ হয়ে আসতে থাকে তার।

—আমি একটু বাইরে থেকে আসছি শ্রী। তুমি কেনাকাটা করো…

সন্ধে হয়ে এসেছে। সময় যেন উড়ে উড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে গোটা দোকানের আনাচকানাচে। হঠাৎ তার বাবার ফোনে হুঁশ ফেরে শ্রীদর্শিনীর।

—শিগগির বাড়িতে এসো। এক্ষুনি। রাইট নাও।

বাড়ি ফিরে শ্রী জানতে পারে একে একে প্রতিটি ধাপ। বিতান কাপড়ের দোকান থেকে বেরিয়ে বাড়ি এসে সোজা ঢুকে গিয়েছিল নিজের ঘরে। দরজা বন্ধ করে দিলেও জানালা দিয়ে বিতানকে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন তার মা। চিৎকার করে পড়শিদের ডাকেন তিনি। তারা এসে দরজা ভেঙে বিতানের দেহ নামিয়েছে। সবটা শোনার পর কেমন হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে শ্রী। যেন বুঝতেই পারে না কোথায় বাঁধল গোলমালটা! বিড়বিড় করে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকে।

পুলিশ আসে অনেক রাতে। আর শ্রীকে তখনও দেখা যায় বারান্দার এক কোণে জামাকাপড়ের প্যাকেটগুলো খুব শক্ত করে বুকে জাপটে ধরে মুখ নামিয়ে বসে আছে।

দিন সাতেক পরে শ্রীর বাবা তাঁর সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধু ডা. বসুর চেম্বারে যান শ্রীকে নিয়ে। সমস্তটা শুনে ডাক্তারবাবু বলেন, ‘সময়মতো প্রপার মেডিকেশন আর সাইকোথেরাপি শ্রীদর্শিনীকে তার সুস্থ জীবন যাপনে ফিরিয়ে দিতে পারত। সেটা তো গেল শ্রীর কথা। উলটো দিকে শ্রীর অস্বাভাবিকতার জন্য একটা তাজা তরুণ প্রাণ এভাবে অকালে যে চলে গেল, সেটাও হয়তো আটকানো যেত। আগে কেন গুরুত্ব দিলে না, বন্ধু!’

 

হনন (পর্ব ২)

২য় পর্ব

—এ কি! তুমি এত সাজগোজ করে জামা-কাপড় পরে বসে আছ কেন? কোনও অনুষ্ঠানে যাবে বুঝি?

কথার উত্তর না দিয়ে শ্রী বিতানকে জাপটে ধরে খাটে বসিয়ে দেয়। তারপর বলে, ‘কেন আমাকে দেখতে যথেষ্ট সুন্দর লাগছে না বুঝি? দ্যাখো… দ্যাখো… দ্যাখো ভালো করে। তোমার জন্যই তো সাজলাম। এগুলো কেরালার গয়না, জানো? বাবা কেরালার কান্নুরে পোস্টেড ছিলেন। তখন কিনে দিয়েছিলেন এগুলো।’ বিরক্ত হয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় বিতান।

—আঃ শ্রী! কী যে ছেলেমানুষি করো না! তোমাকে তো রোজই দেখছি। আমার জন্য এত সাজগোজ করবার তো কিছু নেই! বিতানের আরও কাছে এগিয়ে এসে তার বুকে মুখ গুঁজে শ্রী বলে ওঠে, ‘উঁহু, অনেকক্ষণ দ্যাখোনি তো আমায়। সারাটা দিন। মানে ঠিক আট ঘন্টা, ত্রিশ মিনিট, দশ সেকেন্ড।’ শ্রীর আলিঙ্গনে বিরক্তি যেন জাপটে ধরে বিতানকে।

—আঃ ছাড়ো এখন! সারাদিন পর অফিস থেকে ফিরেছি। এখন বড্ড ক্লান্ত, শ্রী। কোথায় চা, জলখাবার দেবে তা নয়… কী যে করো না এসব!

ফ্রেশ হতে বাথরুমের দিকে চলে যায় বিতান। পিছনে শ্রীদর্শিনীর মাথায় যে নীরবে ভিসুভিয়াস ফুটছে, তা বেশ বুঝতে পারে সে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা মায়ের ঘরে ঢোকে বিতান। দেখে মা শরৎকাহিনিতে মগ্ন। দেখেই মাথায় রক্ত উঠে গেল। এতক্ষণ মনে যে-ক্ষোভ, বিরক্তি জমেছিল পুরোটা উগরে দিল মায়ের উপর।

—বেশ ভালোই আছো তোমরা। একজন সাজগোজে বিভোর, আর একজন কাব্য-কাহিনি পড়তে ব্যস্ত। বাহ্! আমি যে সারাদিন পর অফিস থেকে ফিরে এসেছি সে দিকে কারও নজর নেই। বিতান দেখল ছায়া ঘনিয়ে এল মায়ের মুখে। লজ্জিত মুখে মা বলল,

—এইমাত্র সব সেরে এসে একটু বসলুম রে, বাবা। ওবেলার রান্নাটাও সেরে নিলুম। রাতে শুধু গরম গরম ভাত নামিয়ে খেতে দেব তোদের। তা এখন জলখাবারে কী দেব, বল?

গজগজ করতে করতে বিতান বলে, ‘কেন? একা সব কাজ করো কেন? তোমার আদরের বউমাটিকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিলেও তো পারো! শেখালে কি সে শিখবে না?’ মায়ের মুখটা যেন আরও কালো হয়ে যায়। মৃদু কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আসলে সে তো এ সংসারের নতুন মানুষ। এখন একটু সাজগোজ-আমোদ-আহ্লাদ করুক না মেয়েটা। ক’দিন পরে তো সংসারের জোয়ার  কাঁধে নিতেই হবে। যাক গে, তোকে একটু মুড়ি মেখে দিই, শসা-পেঁয়াজ দিয়ে?’

—নাঃ, শুধু চা আর বিস্কুট দাও। বলেই গট গট করে ড্রয়িংরুমের দিকে হেঁটে যায় বিতান। যেতে গিয়ে আড় চোখে শোবার ঘরের দিকে তাকায়। সেখানে যেন কঠিন নীরবতা বিরাজ করছে! আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাষ! টিভিটা চালিয়ে অস্থির ভাবে চ্যানেল ঘোরাতে থাকে বিতান।

মা কিছু না বললেও বিতান জানে সারাদিন রূপচর্চায় মত্ত থাকতে চায় শ্রীদর্শিনী। নানারকম রূপটান বা ফেসপ্যাক, হেয়ার প্যাক তৈরির উপকরণ বিতানই তো কিনে আনে শ্রীর ফরমায়েশ অনুসারে।

সকালে উঠে এক কাপ ঈষদুষ্ণ জলে একটা পাতিলেবু আর এক চামচ মধু মিশিয়ে খায় শ্রী। তারপর মুসুরডাল বাটা আর হলুদ দিয়ে একটা প্যাক তৈরি করে মুখে লাগায়। শেষে ঈষদুষ্ণ নারকেল তেলে এক চামচ লবঙ্গ তেল মিশিয়ে ভালো করে স্ক্যাল্পে মাসাজ করে। প্রায় দিনই বিতান দেখে বাড়িতে লবঙ্গ তেল তৈরি করে শ্রী।

লবঙ্গ, মিক্সার গ্রাইন্ডারে গুঁড়ো করে নারকেল তেলে মিশিয়ে একটা কাচের বোতলে ঢেলে খাটের নীচের অন্ধকারে রেখে দেয় এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহ পর মসলিন কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে সেই তেল মাথায় লাগায়। বিতান লক্ষ্য করে শ্রীর এইসব রূপচর্চা ও তার উপকরণ তৈরি করা শেষ হতে হতে মায়ের একটা ভাজা, মাছের ঝোল, ডাল নেমে যায়। বিষয়টা খুবই দৃষ্টিকটু ও বিরক্তিকর লাগলেও নতুন বউকে কড়া ভাবে কিছু বলতে পারে না সে।

কিছুক্ষণ পরে শোবার ঘরে ঢুকে মনটা ভারী হয়ে ওঠে বিতানের। দেখে ঘরের সারা মেঝে জুড়ে গয়নাগাটি, মেক-আপের জিনিস ছড়ানো। লিপস্টিক, আইলাইনারগুলো ভেঙে কুটিকুটি করে ফেলেছে। আর বিছানায় শুয়ে ফুলে ফুলে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শ্রী। কাছে গিয়ে তার পিঠে হাত রাখে বিতান। শ্রীর কান্নার তোড় আরও বাড়তে থাকে। মনে মনে অনুশোচনা হতে থাকে বিতানের। এতটা আঘাত না দিলেও হতো মেয়েটাকে। না হয় একটু সেজে তাকে দেখাতেই এসেছিল। একটু অবুঝ মা মরা মেয়েটা, বাবার আদরের। বুঝিয়েসুজিয়ে বললে নিশ্চয়ই একদিন ঠিক হয়ে যাবে সব। আদর করে শ্রীকে কাছে টেনে নেয় বিতান। শ্রীকে যে সত্যিই সে ভীষণ ভালোবাসে।

কিন্তু কিছুই ঠিক হল না। নিজের রূপচর্চা-সাজগোজ আর বিতানকে ঘিরে শ্রীর ভয়ংকর অবসেশন দিনের পর দিন বাড়তেই লাগল। সবসময় শ্রীর এক অমূলক ভয় যে, সে দেখতে খারাপ হয়ে যাচ্ছে আর বিতান অন্য মেয়েদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে…

—পুজোর দিনগুলোতে নিজের সাজপোশাকে সেরাটা দেওয়া মাস্ট। ভিড়ের মাঝে, বিশেষ করে তোমার অফিসের বিশ্বকর্মা পুজোর দিনের ওই গেট টুগেদারে নজর কাড়তে গেলে পোশাকের কালার, কাট, ফ্যাব্রিক সব হতে হবে একদম এক্সক্লুসিভ। জানো? কীভাবে সাজতে হবে ও ঘরোয়া রূপচর্চার নানা গাইড লাইন দিচ্ছে বহু প্রিন্টেড ও অন-লাইন ফ্যাশান ম্যাগাজিনগুলো। নেইলপলিশ পরতে পরতে এক নাগাড়ে বলে চলে শ্রী।

—সেবার তুমি অফিসের কম্পিউটার সেকশানের মৃদুলার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে দেখছিলে। সেবন্তীর সঙ্গে তোমার সে কী হাহা হিহি! এবার আমি আর কোনও রিস্ক নেব না বাবা। এবার আমার ড্রেস হবে এক্কেবারে হটকে! আর জানো তো আজকাল পুরো মুখের সাজে একই রঙের আধিক্য। এই মনোক্রোম মেক-আপ এখন রীতিমতো ভাইরাল।

শ্রীর স্বরে যেন একেবারে কোনও ক্লান্তি নেই! শুনতে শুনতে মাথা ধরে যায় বিভানের।

—জীবনটা শুধু সাজগোজ আর গয়নাগাটি নয়, শ্রী। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো লক্ষ্মীটি! এ তো মানসিক অসুখ! চলো তোমাকে নিয়ে কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাই। তিনি হয়তো তোমাকে কোনও ভাবে হেল্প করতে পারবেন।

—কী বললে? আমি পাগল? আমি পাগলের ডাক্তারের কাছে যাব? হাউ ডেয়ার ইউ! রাগে হাতের কাছে যা থাকে বিতানের দিকে ছুড়তে থাকে শ্রী!

 

 

হনন (পর্ব ১)

বিতানদের বাড়িটা সাবেকি আমলের। বাবার তৈরি বাংলো প্যাটার্নের কাঠের বাড়ি। বাড়ির সামনে ছোট্ট একখানি বাগানের বুক চিরে হাঁটাচলা করার সরু একটা মোরামের পথ। বাবা চলে যাবার পর একবার ভেবেছিল বাড়িটাকে রি-মডেলিং করবে। কিন্তু মা একদম রাজি হয়নি। আর ছোটোবেলার গন্ধমাখা এই বাড়িটা বিতানেরও খুব প্রিয়।

আজ অফিস থেকে ফিরে সামনের গেট দিয়ে ঢুকে বাগান পেরোতে পেরোতে নানান ফুলের একটা ককটেল সুবাস যেমন বিতানের নাকে এসে লাগে, সেই সঙ্গে কান ছুঁয়ে দেয় শ্রীদর্শিনীর গান— সাজনা হ্যায় মুঝে সজনা কে লিয়ে…। ভারি সুরেলা গলা তার।

শ্রীদর্শিনী বিতানের স্ত্রী। মাত্র তিনমাস আগে এক মাঘীপূর্ণিমার সন্ধেতে শ্রীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। বিতান আর শ্রীদর্শিনীর পরিচয় হয়েছিল এক বছর আগে একটি সোশ্যাল ম্যাট্রিমোনি সাইটে। তিন মাস তারা একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর, মেলামেশা করবার পর দু’জনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারপর চলেছিল ছ’মাসের কোর্টশিপ।

শ্রীদর্শিনী তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বিতানের চেয়ে অনেক বেশি বৈভবে মানুষ সে। শ্রীর বাবা রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। এছাড়াও তাদের পারিবারিক ব্যাবসা আছে। ভারতের নানা প্রান্তের সংস্কৃতি, সাজগোজ সম্পর্কে শ্রী বেশ ওয়াকিবহাল। এছাড়া গণিতে স্নাতকোত্তর শ্রীদর্শিনী পড়াশোনাতেও বেশ মেধাবী। অন্যদিকে, বিতান নিতান্তই সাধারণ। অ্যালুমিনিয়াম প্রস্তুতকারক সংস্থায় কোয়ালিটি কনট্রোল ইঞ্জিনিয়র সে।

বাবা ছিলেন ন্যাশনালাইজড ব্যাংকের ক্লার্ক। ছোটোবেলা থেকে তেমন কোনও বিলাসবহুল জীবনযাপন তাদের ছিল না। জীবনটা ছিল আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের মতো অত্যন্ত সাদামাটা। তাই মাঝে মাঝে বিতানের বেশ আশ্চর্য লাগে এটা ভেবে যে, তার মতো একজন সাধারণ ছেলেকে কীভাবে মনে ধরল অত উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে শ্রীদর্শিনীর!

বাগান পেরিয়ে এসে নিজেদের শোবার ঘরে ঢুকতেই ভীষণ চমকে উঠল বিতান। দেখল গা ভর্তি নানারকম সোনার গয়না পরে সেজেগুজে বসে আছে শ্রী। পরনে দামি শাড়ি, গলায় সীতাহার, কানে বড়ো ঝোলাদুল, হাতে মোটা সোনার চুড়ি, খোঁপায় বেলকুঁড়ির মালা। সামনে খোলা মেক-আপ বক্স, লিপস্টিক, আইলাইনার, আই-শ্যাডো — আয়নার সামনে বসে গভীর ভাবে নিজেকে দেখতে দেখতে মিটি মিটি হাসছে শ্রী। দেখেই চলেছে নিজেকে। যেন নিজের প্রেমে নিজেই বিভোর। চারপাশের কোনওকিছু সম্পর্কে তার যেন কোনও চেতনাই নেই।

বিয়ের আগে থেকেই বিতান জানত ভীষণ সাজতে ভালোবাসে শ্রীদর্শিনী। শ্রী সুন্দরী কিন্তু তার সাজগোজের জন্য অপরূপা হয়ে ওঠে সে। বিতানের সঙ্গে যখন দেখা করতে আসত তখন বরাবরই তার রুচিসম্মত সাজগোজ তাকে মুগ্ধ করত। শ্রীর দৌলতেই বিতান জেনেছে মেক-আপের খুঁটিনাটি, বিভিন্ন বিউটি প্রোডাক্টের কার্যকারিতা, ঘরোয়া রূপটানের উপকারিতা ইত্যাদি নানা বিষয়। তখন থেকেই বিতান লক্ষ্য করত তাদের কথোপকথনের বেশ অনেকটা অংশ জুড়েই যেন থাকছে সাজগোজ, রূপচর্চা বিষয়ক আলোচনা।

বিতান ছোটোখাটো সোনার গয়না বা জাংক জুয়েলারি, কিংবা লিপস্টিক, নেলপলিশ এসব উপহার দিলে ভীষণই খুশি হতো শ্রী। তাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে বিতানের কাছ থেকে এমন কমপ্লিমেন্ট পেলে শিশুর মতো আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠত। এমন কি পথ চলতি কোনও সুন্দরী মেয়ের দিকে বিতানের চোখ গেলে, ভারি অভিমানী গলায় শ্রী জিজ্ঞেস করত, ‘ওকে কি আমার চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে দেখতে, বিতান? আমি কি তেমন সুন্দরী নই?’

বিতান খুব আনন্দিত হতো। মেতে উঠত খুনশুটিতে। ভাবত শ্রী তাকে এত ভালোবাসে যে সবসময় তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায়। ভাবলেই বুক ভরে উঠত তার। কিন্তু কথায় আছে একজনের সঙ্গে এক ছাদের নীচে চাল-ডাল-তেল- হলুদের আটপৌরে জীবন শুরু না হলে তাকে সম্পূর্ণ চেনাই যায় না। বিতানের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছিল।

 

অচেনা নারী (শেষ পর্ব)

সুচরিতার কথা

অতনু গাড়ি চালিয়ে চলে গেল। ওকে শেষবারের মতো ফ্লাইং কিস দিলাম। এখন আমার অনেক কাজ। ঘরে গিয়ে ল্যাপটপে দেখতে হবে কত কম খরচে ফিউনারাল করা যায়। কোথায় দেখেছিলাম — এমনি খরচ ২,৫০০ ডলার, ভিউইং যোগ করলে ৪,০০০ ডলার। তাড়াতাড়ি দেখতে হবে। এরপর লোকজন আসতে শুরু করলে তো শোকে পাথর হয়ে যাবার অভিনয় করতে হবে।

সত্যি গুগুল-এর জবাব নেই। কাল মাত্র দশ মিনিটে বার করে ফেললাম একটা স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে কী করে গাড়ির ফ্রন্ট ব্রেক নষ্ট করে দেওয়া যায়। আবার ওরা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, গাড়ি স্টার্ট দিয়ে যেন রিভার্স না করতে হয়। তাই তো কাল আগে গাড়ি রাস্তার দিকে মুখ করে রেখেছিলাম। সকালে উঠে গিয়েছিলাম, ও কিছু সন্দেহ করে কিনা দেখতে। অতনু কিছু বোঝেইনি। আমাকে খুব বোকা ভেবেছে। ভুলে গেছে যে, রীতেশের জুনিয়র যে সাউথ ইন্ডিয়ান মেয়েটা কাজ করে, লতা, ও ছোটোবেলায় আমার বোনের ক্লাসমেট ছিল দিল্লিতে। তাই তো আমাকে কাল দুপুরে ফোন করে জানাল, ‘সুচরিতাদি, সামথিং ইজ ফিশি। ইওর হাজব্যান্ড কেম টু রীতেশ উইথ টু বেঙ্গলি ফ্রেন্ডস। দে ওয়ার টকিং ইন বেঙ্গলি বাট ইট সিম্স লাইক এ কন্সপিরেসি টু সেন্ড ইউ টু অ্যান অ্যাসাইলাম সুন। বি কেয়ারফুল।”

অতনু আমাকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে তারপর কী ডিভোর্স নিত? নিয়ে কাকে বিয়ে করত? ওই মুটকি বনানীকে? যার বাড়ি গেলে দহিবড়া নিয়ে এসে ‘অতনুদা, আরেকটা নাও, আরেকটা নাও’ করে অতনুর গায়ে ঢলে পড়ে?

এই রাস্তাটা আমার বাড়ির সামনে থেকে সোজা গিয়ে একটা টি জংশনে পড়েছে। সেখানে স্টপ সাইন। ক্রস স্ট্রিট দিয়ে এ সময় প্রচুর গাড়ি যায়। স্টপ সাইনে ব্রেক কষবে, গাড়ি সোজা রাস্তার মধ্যে গিয়ে পড়বে ট্রাফিকের মাঝে। শুক্রবার রীতেশের কাছে আমায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলে না? সরি, তার বদলে রীতেশই আসবে তোমায় দেখতে, কাসকেটে শোয়া অবস্থায়।

অতনু, তুমি কেন আমার কিসটা লুফতে গেলে সেই অনেকদিন আগের মতো? তখন রাকা বোধহয় বছর দুই। সামারে গাড়ি নিয়ে চলে যেতাম কোনও পাহাড়ে। রাকার পিছনে দাঁড়িয়ে আমি ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিতাম। তুমি ডান হাত বাড়িয়ে লুফে নিতে। রাকা বুঝতে না পেরে তোমায় জিজ্ঞেস করত, ‘বাবা কী লুফলে?” তুমি হেসে বলতে ‘একটা প্রজাপতি’। তারপর মুঠো খুলে বলতে, ‘যা, উড়ে গেল।’

রাকার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়তে। রাকা খুঁজে না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসে বলত, ‘বাবা কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না।’ আমি হেসে গাছটা দেখিয়ে দিতাম। এখন কী হবে?

আজ যখন রাকা এসে কাঁদতে কাঁদতে বলবে ‘বাবা কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না’ আমি কী উত্তর দেব? এটা আমি কী করলাম! এটা আমি কী করলাম! এটা আমি কী করলাম…! আমি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছি? ওই যে ফোন বাজছে! ওদিকে কি অতনু?

‘সু, আজ ভীষণ জোর বেঁচে গিয়েছি। ব্রেক কাজ করছিল না, স্টপ সাইনে না থেমে গাড়ি সোজা রাস্তার ওপারে ফুটপাথে। ভাগ্যিস কোনও গাড়ি ছিল না।’

নাকি পুলিশ? “ইস দিস অটনু রে’স রেসিডেন্স? সরি ম্যাম, অটনু ইজ নো মোর, স্পট ডেড ইন আ কার অ্যাক্সিডেন্ট।’ ফোনটা বেজেই চলেছে। আমি কেন উঠতে পারছি না সোফা থেকে? মনে হচ্ছে পা দুটো যেন কার্পেটের সঙ্গে পেরেক দিয়ে জুড়ে দিয়েছে কেউ। অতনু না পুলিশ। পুলিশ না অতনু? ভগবান যেন অতনু হয়, অতনু, অতনু, অতনু।

* এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক।

 

অচেনা নারী (৩-পর্ব)

অতনুর কথা

আজ মঙ্গলবার। মনটা বড্ড খারাপ। মনে পড়ে ছোটোবেলায় মায়ের হাত ধরে কালীঘাটের কালীমন্দিরে যেতাম শনি বা মঙ্গলবারে। বড়ো হয়ে ভাবতাম ওসব কুসংস্কার, মন্দির, পুজো থেকে শত হাত দূরে থাকতাম। কিন্তু আজ ভীষণ ইচ্ছা করছে মা কালীর ওই শান্ত শীতল মূর্তির সামনে গিয়ে বসে থাকি। বলি আমার সবকিছু নিয়ে শুধু শান্তি দাও।

সকালে অফিসে প্রবাল আর অভ্র এসেছিল। প্রায় জোর করেই আমাকে নিয়ে গেল রীতেশের চেম্বারে। রীতেশ আমাদের থেকে বেশ ছোটো। কিন্তু এই বয়সেই সাইকায়াট্রিস্ট বলে নাম করেছে। সকালে ওর এক ঘন্টা খালি ছিল। ওরা কুহকিনীর সব ই-মেইলগুলোর প্রিন্ট আউট নিয়ে এসেছিল। রীতেশ সব শুনে বলল, এটা এক ধরনের স্ক্রিৎজফ্রেনিয়া। যারা মানসিক ভাবে দুর্বল, তাদের মনের ক্ষোভ অনেক সময় আক্রোশে পরিণত হয়।

অতনুদা, ছোটোবেলায় দেশে দেখেননি, রাস্তাঘাটে পাগল বা পাগলি ঘুরে বেড়াচ্ছে— আর যাকে দেখছে গালাগালি দিচ্ছে। এটাও তাই। শুধু এক্ষেত্রে, গালাগালি দিচ্ছে ই-মেইলে। সবাইকে খারাপ কল্পনা করতে করতে একদিন কল্পনাটাই সত্যি বলে মনে হয়। তবে চিন্তা করবেন না। সবকিছুরই চিকিৎসা আছে। ফ্রাইডে ইভিনিং-এ সুচরিতাদিকে নিয়ে আসুন। কতগুলো টেস্ট করব। তবে হ্যাঁ, সময় সময় এরা কিন্তু ডেনজারাস হতে পারে। বিশেষ করে ট্রিটমেন্ট শুরু হলে। তখন এক বাড়িতে থাকা ঠিক নয়। রাত্রে যখন ঘুমোবেন তখন আপনারও ক্ষতি করে দিতে পারে। তাই মানসিক হাসপাতালে রাখতে হবে কিছুদিন। একদম ভাববেন না। এখানকার মানসিক হাসপাতাল খুব ভালো। ক’দিন পরেই দেখবেন ভালো হয়ে গেছেন।

সু মানসিক হাসপাতালে? না, অসম্ভব। প্রবালরা বোঝাল, দ্যাখ, রূপম আর সুমিত খুব রেগে আছে। ওরা চাইছিল ই-মেইলগুলো নিয়ে পুলিশের কাছে যেতে। আইপি অ্যাড্রেস থেকে ওরা লোকেট করে দেবে কোন কম্পিউটার থেকে মেইলগুলো এসেছে। তারপর তোর বাড়ির সার্চ ওয়ারেন্ট বার করতে পারলে তোদের দু’জনের হাতেই হাতকড়া পড়ত। আমরা জানি তোর কোনও দোষ নেই। তুই শুধু একটু বেশি ভালোমানুষ। বউকে সময়মতো কন্ট্রোল করতে পারিসনি। তাই আইনি ঝামেলার থেকে এটা ভালো না? আমরাও চাই সুচরিতা আবার আগের মতো ভালো হয়ে যাক। ক’দিনের তো ব্যাপার। কিন্তু সু রাজি হবে রীতেশের কাছে যেতে?

সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে ওকে বললাম, ‘তোমার শরীরটা বোধহয় ভালো যাচ্ছে না, একটুতেই আজকাল মাথা গরম করো। এই শুক্রবার একবার ডাক্তার দেখিয়ে নেব।”

সু খুব শান্ত ভাবে আমার দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, ‘কোন ডাক্তার?’

একটু ভয়ে ভয়ে রীতেশের নাম বললাম। অবাক হয়ে দেখলাম সু রেগে গেল না। শুধু বলল ‘আচ্ছা।’

আজ বুধবার। রোজকার মতো খুব ভোরে অফিস যাব বলে তৈরি হয়ে বেরিয়েছি, দেখি গাড়িটা ড্রাইভওয়েতে রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। কিন্তু আমি তো বরাবর গ্যারাজের দিকে মুখ করে রাখি। কাল কি রিভার্স করে রেখেছিলাম? মনে তো হচ্ছে না। কী জানি সু-র সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথাটাও বোধহয় খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ছোটোবেলায় স্কুল যাওয়ার সময় মা বলতেন, ‘সাবধানে যাস।’ মা তো কবেই উপরে চলে গেছেন। অথচ আশ্চর্য, ঠিক যেন ফিশফিশ করে মা-র গলা শুনলাম, ‘খোকা, সাবধানে যাস।’

অনেকদিন আগে মিহিরদার গলায় শোনা হেমন্তর একটা গান মনে পড়ল— আসব না ফিরে আর / আসব না। ফিরে কোনওদিন। মিহিরদা কী অপূর্ব গান করেন। ইশ বেচারার এখনও বোধহয় চাকরি নেই। দেশে থাকলে নামকরা গায়ক হতে পারতেন।

গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখি সু এসে দাঁড়িয়েছে। ও তো এত ভোরে ওঠে না। চোখাচোখি হতে সু ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল। মুখে মৃদু হাসি। আমিও অনেকদিন আগের মতো ডান হাত বাড়িয়ে লুফে নিলাম। এই মেয়েকে আমি কী করে পাগলা গারদে পাঠাব? না না, কিছুতেই পারব না।

গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। সেই গানটা মাথার মধ্যে এখনও ঘুরছে। একেক দিন এরকম হয়। ‘যাবার পথে পথিক যখন পিছন ফিরে চায়/ ফেলে আসা দিনকে দেখে মন যে ভেঙে যায়। চোখের আলো নিভল যখন মনের আলো জ্বেলে/একলা এসেছি আমি, একলা যাব চলে।’

সু এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ও কি বুঝতে পেরেছে আমরা কী প্ল্যান করছি? উঃ ভগবান! এই দোটানা থেকে আমায় মুক্তি দাও, মুক্তি দাও।

 

অচেনা নারী (২-পর্ব)

সুচরিতার কথা

আজ অনেকক্ষণ দত্ত মাসিমার সঙ্গে ফোনে কথা হল। ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন শিকাগোর এক বাঙালি মেয়ের সঙ্গে। বারবার বলছিলেন বিয়ের বরযাত্রী যাবার কথা শিকাগোতে। যা হাসি পাচ্ছিল। মাসিমা তো জানেন না ওনার মেয়ে বনানী আমাকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না। যখন শুনবে ওর মা ওর ভাইয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছে আমাদের, একেবারে তুলকালাম লাগিয়ে দেবে৷ ইশ, দৃশ্যটা যদি দেখতে পেতাম! এইসব বাঙালি মেয়েগুলোকে দেখলে আজকাল আমার পা থেকে মাথা অবধি জ্বলে যায়। সবকটা হিংসুটে, অহংকারী, স্বার্থপর। ভাবতে অবাক লাগে, এত বছর ওদের সঙ্গে মিশতাম কী ভাবে।

এই যে বনানী! মেয়ে রিমলি হাইস্কুলে গেল কি না গেল, ওর গান শুরু হয়ে গেল। আমার মেয়ে তো বলে দিয়েছে স্টানফোর্ড, ইয়েল, হার্ভার্ড, এমআইটি — কোথাও যাবে না। এ মেয়েকে নিয়ে কী যে করব!

আরে কোথায় চান্স পায় আগে দ্যাখ। তাও তো চার বছর দেরি। আর যা সব পাকা মেয়ে, এই বয়স থেকেই বয়ফ্রেন্ড। হয়তো দেখব হাইস্কুল ছাড়ার আগেই কারও গলায় ঝুলে পড়েছে। যা একখান ই-মেইল ঝেড়েছি, খেপে আগুন।

আজকাল যে-মেয়েগুলো বিয়ে করছে, সেগুলো তো আরও অসহ্য। বেশিরভাগ বিয়ের আগেই এদেশে এসেছে পড়তে বা চাকরি নিয়ে। আমাদের এমন ভাবে দেখবে যেন আমরা বরের ঘাড়ে চেপে এদেশে এসেছি। নিজেদের যোগ্যতায় ভারতবর্ষের সীমানা পার হতে পারতাম না। তেমনি ন্যাকা ন্যাকা কথা। ওই এক আছেন মিহিরদা। নিজেকে ভাবেন হেমন্ত। কোথাও গান বাজনা হলেই প্রথমে অনেক বাহানা করেন — আবার আমাকে কেন, আমি তো সব জায়গাতেই গাই। আর মেয়েগুলো শুরু করবে — একদম না বলবেন না মিহিরদা। গান না গেয়ে এখান থেকে যান দেখি। তখন যেন উপায় না দেখে মিহিরদা গান ধরবেন। আর আমাকে দেখলে ওই গানটা গাইবেনই — ‘কী গান শোনাব বলো, ওগো সুচরিতা’।

আগে বোকা ছিলাম, ওনার কথায় হাসতাম, এখন বুঝি সবক’টা পারভার্ট। অরুণিমা তো আরেক। তার গর্ব কী না, তার বর কোনও ক্যাসিনো থেকে কখনও খালি হাতে ফেরে না। বলতে ইচ্ছা করে তোর শ্বশুর বোধহয় মহাভারতের শকুনির বংশধর। জাত জুয়াড়ি। শকুনি নয়, বলা উচিত শকুন। এই বয়সেও রূপমদার চোখ ঘোরে হাঁটুর বয়সি মেয়েদের উপর।

অজন্তার তো বর আবার স্টক মার্কেটে পয়সা করেছে বলে এত গর্ব, যেন নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। সব থেকে ভালো দিয়েছি রাধাকে। বাবা ও শাশুড়ি গা ঘ্যাঁসাঘেঁসি করে দাঁড়িয়ে নায়াগ্রা ফলসের সামনে ছবি তুলেছেন উদ্ভাসিত মুখে। আবার সেই ফোটো পোস্ট করেছেন ফেসবুকে। এমন ই-মেইল দিয়েছি যে, পরের দিনই ফেসবুক থেকে ফটো ডিলিট। একটাই আফশোস। ই-মেইল পড়ার সময় ওদের চোখ মুখের ভাব কী হল দেখতে পাই না।

অতনুটাও আজকাল কেমন হয়ে যাচ্ছে। বোকাটে ধরনের। এতদিন আমেরিকায় থেকেও সেই ভেতো বাঙালি হয়ে রয়ে গেল। এখন মনে হয় অল্পবয়সে ওকে ছেড়ে কোনও সাদা ছেলেকে ধরা উচিত ছিল। এখন টু লেট। যাই এবার ল্যাপটপে বসে কুহকিনীকে ঘুম থেকে তুলি।

 

অচেনা নারী (১-পর্ব)

অতনুর কথা

সকালবেলা ম্যানহাটনের অফিসে পৌঁছে ল্যাপটপ ডকিং স্টেশন-এ লাগিয়েছি— অমনি মোবাইল বেজে উঠল। সতেরো তলা থেকে দেখা যায় দূরে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি। কিন্তু সে সব দেখে অভিভূত হওয়ার দিন আর নেই। এখন ফোন এলেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। কোনও বাঙালির ফোন নয় তো? ঠিক তাই। রূপম। ইচ্ছা না হলেও ফোনটা ধরলাম।

—অতনু?

—বলছি।

—কী ব্যাপার বল তো? তোরা কি আর আমাদের শান্তিতে থাকতে দিবি না?

—না মানে… কী হয়েছে?

—কী হয়েছে? অরুণিমার মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। দেশ থেকে ফোন পেয়ে ও তো খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তিনদিনের মাথায় ই-মেইল এল ‘কী রে খুব তো গর্ব করছিলি মেয়ে এমআইটি-তে চান্স পেয়েছে বলে, এখন কেমন লাগছে? মায়ের জন্য দেশে যাবি, না মেয়ের জন্য পার্টি দিবি?”

—ই-মেইল… মানে।

—থাক আর ন্যাকামি করতে হবে না। দেখ ‘কুহকিনী@ইয়াহু.কম’ তোর না তোর বউয়ের ই-মেইল আইডি, তা নিয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। তবে ওটা যে তোদের বাড়ি থেকেই আসছে তা এখানকার সব বাঙালিরা জানে। তবে আমরাও ছাড়ব না। এর একটা বিহিত করবই। ফোনটা কেটে দিল রূপম।

“তোর বউ’। ওরা আজকাল সুচরিতার নাম উচ্চারণ করতে ঘৃণা বোধ করে। অথচ এই রূপম – অরুণিমা, মিলন-অজন্তা, প্রবাল-মিতা, সুমিত-রাধা, অভ্র-বনানী, মিহিরদা-অঞ্জনাদি – এদের সঙ্গে এত বছর কত আড্ডা, শনিবারের ডিনার, রবিবার লাঞ্চ, ছেলেমেয়েদের জন্মদিনের পার্টি, পিকনিক, বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সরস্বতী পুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, দুর্গাপুজো— কী না করেছে এত দিন। আজ মুখ দেখাদেখি বন্ধ।

এসবের শুরু বছর দুয়েক আগে। আমাদের একমাত্র মেয়ে রাকা যখন হাইস্কুল পাস করে কোনও ভালো কলেজে চান্স পেল না, তখন থেকেই দেখি সুচরিতার মুখ গম্ভীর। বন্ধুদের ফোন করা বন্ধ, কাউকে বাড়িতে ডাকে না, কেউ আসতে বললে এড়িয়ে যায়। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হল তোমার? মেলামেশা বন্ধ করে দিচ্ছ নাকি?’

সু উত্তর দিল— আজকাল ওদের সঙ্গে মিশতে গেলে মাথা গরম হয়ে যায়। আমিও আর কথা বাড়াইনি।

এর ক’দিন পরে হঠাৎ এক সন্ধ্যায় মিলনরা ফোন করে বলল, ‘আসছি, জরুরি কথা আছে।’ মিলন আর অজন্তা এলে সু চা করে নিয়ে এল। ওরা দেখছিলাম বেশ গম্ভীর। হঠাৎ অজন্তা সু-কে জিজ্ঞেস করল, ‘কুহকিনী@ইয়াহু.কম কী তোর ই-মেইল আইডি।’

সু বলল, “না তো৷’ কিন্তু ওর মুখচোখ দেখে মনে হল, অবাক হওয়ার বদলে খুশির আভা।

—দ্যাখ বাজে কথা বলবি না। ইংলিশ অক্ষরে বাংলা কথা— দেশ থেকে পনেরো হাজার টাকা দামের শাড়ি কিনে দেখি খুব ডাঁট! নিজের চেহারা কি ভুলে গেছিস? দ্যাখ আবার ওই শাড়ি পরে ছবি ফেসবুকে পোস্ট করিস না! দেশের লোকেরা বলবে, তোদের ওখানে আজকাল কাজের লোক পাওয়া যায় বুঝি?

—আমি যে পাঠিয়েছি তোকে কে বলল? সুচরিতার গলায় রীতিমতো খুশির ঝলক।

—দ্যাখ শাড়ির দামটা খালি তোকেই বলেছিলাম। ছেড়ে দেবার পাত্রী নয় অজন্তা।

—সে তো কলকাতার দোকানদারও দামটা জানে। এবার সত্যিই হেসে গড়িয়ে পড়ল সুচরিতা।

ওরা আর বসল না। চা না খেয়েই চলে গেল। আমি স্তম্ভিত। সু-কে বললাম ‘তুমি সত্যিই ওই ই-মেইলটা পাঠিয়েছিলে?’

সু চেঁচিয়ে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, বেশ করেছি।’ উঠে শোওয়ার ঘরে চলে গেল সু। সেদিন আর এ নিয়ে কোনও কথা হয়নি।

এর প্রায় এক মাস বাদে, একদিন সকালে অভ্র-র ফোন অফিসে। ‘জরুরি কথা আছে, লাঞ্চের সময় তোকে অফিস থেকে তুলে নেব।”

অভ্র গাড়ি নিয়ে এসেছিল। কাছাকাছি চাইনিজ বাফেতে গিয়ে দেখি চাঁদের হাট — রূপম, মিলন, প্রবাল, সুমিত, মিহিরদা, অরুণিমা, অজন্তা, মিতা, রাধা, বনানী, অঞ্জনাদি সবাই হাজির। আগেকার মতো চেঁচিয়ে উঠলাম ‘একি! সারপ্রাইজ পার্টি নাকি?’ ওরা কেউ হাসল না। শুধু বনানী বলল, ‘চলো অতনুদা, খাবার নিয়ে নাও, তারপর কথা বলা যাবে।’

দশ ডলারে অল ইউ ক্যান ইট। খিদেও পেয়েছিল। সবাই যে যার ভর্তি প্লেট নিয়ে এসে বসলাম। তখনও জানি না আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

প্রথমে মিতা শুরু করল। অতনুদা, তুমি কতটা জানো আমরা জানি না, গত কয়েক দিন আমরা সবাই ‘কুহকিনী@ইয়াহু.কম’ থেকে ভীষণ বাজে বাজে ই-মেইল পাচ্ছি। আমরা জানি এগুলো সবই সুচরিতার লেখা। আমার বাবা কলকাতায় থাকেন, বয়স আশির উপর। জীবনে কখনও মদ ছোঁননি। একদিন রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটতে গিয়ে গর্তে পড়ে পা ভেঙেছেন। মেইল এল ‘আর এখান থেকে বাবার জন্য স্কচ নিয়ে যাস না, রাস্তায় বেরিয়ে মাতলামি করে লোকের মার খেয়ে একটা পা ভেঙেছে, এরপর আরেকটাও যাবে।’

—কিন্তু তোমাদের সঙ্গে অনেকদিন তো সুচরিতার যোগাযোগ নেই। ও এত সব জানবে কী করে? আমার গলা নিজের কাছেই অন্যরকম লাগল! আমি কি সুচরিতার হয়ে ওকালতি করছি?

—সে কথা আমরাও ভেবেছি। আসলে আমাদের ছেলেমেয়েদের নেটওয়ার্ক খুব স্ট্রং। মিতা বলে চলল

—তোমার মেয়ে রাকাকে একদিন ফোন করেছিলাম। ও বলল রোজ ওর মা ওকে ফোন করে সব মাসিদের কথা জিজ্ঞেস করে। ও বন্ধুদের কাছে যা শোনে তা-ই মাকে বলে। রাকাকে অবশ্য আমি আর কিছু বলিনি।

—আমি বয়সে বড়ো বলে বোধহয় তুই তোকারি করেনি। কিন্তু যা লিখেছে তা তোমাদের সামনে বলতে আমার লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে, অঞ্জনাদি বলে উঠলেন। তবে চুপ করে থাকতে তো পারব না, তাহলে এটা চলতেই থাকবে। জানো বোধহয় তোমাদের মিহিরদার চাকরি নেই। ও তো আবার গান বাজনা ভালোবাসে৷

মেইল এল ‘এবার মুখে রং মেখে রেড লাইট এরিয়ায় গিয়ে লাইন দাও, সংসার চালাবে কী করে? বরকে বলো তুমি যখন খদ্দের সামলাচ্ছ, তখন টুপি খুলে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে হেঁড়ে গলায় রবীন্দ্রসংগীত গাইতে— কিছু বাড়তি রোজগার হবে।”

—আমার বাবা ও শাশুড়িকে এক সঙ্গে গত সামারে দেশ থেকে এনেছি, রাধা বলল। মেইল এল, ‘তোদের তো একটাই গেস্টরুম, বাবা ও শাশুড়ি কি একই ঘরে? এবার ইস্কনের মন্দিরে গিয়ে মালাবদল করিয়ে নে। ওটাই বা বাকি থাকে কেন?’

—ছেলেদেরও বাদ দেয়নি, মিলন বলে উঠল৷ আমাকে আজকাল প্রায়ই টুরে যেতে হয়। তোর কুহকিনী লিখেছে ‘বউ তো মাত্র একশো ডলারে ঘরে লোক নিচ্ছে, রেটটা একটু বাড়াতে বলো। প্রসাদেরও তো স্টেটাস থাকে।’

—আমার ননদের ছেলে টুবাই এমএস করতে এখানে এসেছে দেশ থেকে, অরুণিমা বলল। ক’দিন আগে আমার মেয়ে পৃথার সঙ্গে শপিং মলে গিয়ে সুচরিতার সঙ্গে দেখা। পৃথা তো কিছুই জানে না। ‘মাসি মাসি’ করে অনেক গল্প করেছে। বাড়ি এসে আমায় বলতেই আমি ভয়ে কাঁটা। ঠিক যা ভেবেছি। রাত্রেই মেইল এল, “তুই কি তেলুগু হয়ে গেছিস? মেয়েকে পিসতুতো দাদার সঙ্গে ডেট করতে পাঠাচ্ছিস?’

—এ তো তবু ভালো৷ বনানী এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার বলে উঠল— রিমলিকে তো তোমরা জন্ম থেকে দেখছ অতনুদা। এখন গ্রেড নাইন। সেদিন স্কুলে হঠাৎ পেটে ব্যথা। ওরাই নাইন ওয়ান ওয়ান ডেকে হসপিটালে পাঠিয়েছে। ডাক্তার বলল অ্যাপেনডিসাইটিস। অপারেশনের পর দু’দিন হসপিটালে থেকে বাড়ি এসেছে। পরের সপ্তাহে কুহকিনীর মেইল, ‘অ্যাবরশন হয়ে গেল? বাচ্চাটার বাবা কে? চিনা না কাল্লু?’

ওরা আরও অনেক কিছু বলে যাচ্ছিল। আমার কানে আর কিছু ঢুকছিল না। সুচরিতা এত নীচ? এত কদর্য? ওদের ঠোঁটগুলো নড়ছে দেখতে পাচ্ছিলাম। শব্দগুলো বেরিয়ে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল। আমার কানে কিছুই আসছিল না।

 

এমএনসি-র প্রেম (শেষ পর্ব)

একটু বাদেই রঘু এসে ঢোকে অবনীবাবুর কেবিনে। স্যার, আপনি আমাকে ডেকেছেন? হ্যাঁ, আচ্ছা তুমি শুনলাম এখানে একাই থাকো। তা খাওয়াদাওয়া কোথায় করো? কোনওদিন অফিসের ক্যান্টিনে, কোনওদিন বাইরের হোটেলে। এভাবেই চলে যাচ্ছে।

–তা, বিয়ের কথা ভাবছ না কেন? বিয়ে করবে না বলে ঠিক করেছ নাকি?

—না স্যার, ঠিক তা নয়। এখনও তেমন ভাবে ভাবিনি।

—আমি আমাদের অফিসের একটি মেয়েকে জানি। তুমি যদি রাজি থাকো তবে আমি তাকে বলে দেখতে পারি। তোমাদের জন্য না হয় ঘটকালির অভিজ্ঞতাও হয়ে যাবে। বলা তো যায় না রিটায়ারমেন্টের পর কাজে লাগতে পারে, কী বলো? বলেই হা হা করে হাসতে লাগলেন।

বললেন— এক কাজ করো আজ ছুটির পর তৈরি থেকো। বাড়ি ফেরার পথে আজ শিপ্রা হোটেলে আমরা তিন কাপ কফি খেয়ে বাড়ি যাব।

—স্যার, দু’কাপ কফি তো বুঝলাম। কিন্তু তিনকাপের রহস্যটা ঠিক বুঝলাম না।

—ওটাই তো সাসপেন্স। সময় হলেই বুঝতে পারবে। সন্ধে সাড়ে ছ’টায় অফিস থেকে বেরিয়ে যেও। শিপ্রা হোটেলের কফিশপেই বাকি কথাটা হবে।

রঘু কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই, অবনীবাবু স্নেহাকে ইন্টারকমে ফোন করে বললেন— স্নেহা, তোমার সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় কথা আছে। সন্ধে সাড়ে ছ’টায় আমার কেবিনে চলে এসো। আমরা একসঙ্গে বেরিয়ে যাব। পথে একটু কফি খেয়ে যাওয়া যাবে।

বলে ফোনটা রেখেই বাড়িতে ফোন করে স্ত্রীকে বললেন— আজ আমার ফিরতে একটু দেরি হবে। একটু বিশেষ কাজে আটকে গেছি। অন্যপ্রান্ত থেকে আওয়াজ ভেসে এল — বাড়ি না এলেই তো পারো। বাড়ি তো শুধু খাওয়া আর শোয়ার জন্য মনে হয়। মাল্টিন্যাশানাল আর কর্পোরেট এই কথাগুলো শুনে শুনে একেবারে ঘেন্না ধরে গেছে, বলেই ফোনটা সজোরে রেখে দিল ও প্রান্ত।

সন্ধে হতেই অবনীবাবু স্নেহাকে নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে হাজির হলেন শিপ্রা হোটেলে। বললেন— চলো, ক্যাফেতে বসা যাক। ইতিমধ্যেই রঘুর ফোন এল, ‘স্যার, আমি রিসেপশন-এ পৌঁছে গেছি। আপনি কোথায়?”

অবনীবাবু বললেন— আমি ক্যাফেতে আছি। চলে এসো এখানে।

রঘু এসে হাজির হলে, স্নেহা ও রঘু একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। অবনীবাবু ব্যাপারটা সামাল দেবার জন্য ওয়েটারকে ডেকে তিন কাপ কফির অর্ডার দিলেন।

অবনীবাবু— স্নেহা ও রঘু, আমি তোমাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে যা জেনেছি তাতে মনে হল, তোমরা একে অন্যকে ভালোবাসো কিন্তু তোমাদের ব্যাপারটা আর এগোয়নি। তাই আমাকেই সে কাজটা করতে হল। আমার মনে হয় তোমাদের মধ্যে সম্পর্কটা গড়ে উঠলে তোমরা দু’জনেই সুখী হবে। আজ সকাল থেকে বহু সমস্যা মেটাতে মেটাতে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এই কফিটা খেয়েই আমাকে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে, আগামীকাল অফিসে দেখা হবে। অফিসিয়াল রিপোর্ট চাই কিন্তু, বলেই হাসতে হাসতে কফির দাম মিটিয়ে বেরিয়ে গেলেন হোটেল থেকে।

বাড়ি ফিরে দেখলেন সেখানকার পরিবেশটা বেশ থমথমে। তাই কথা না বাড়িয়ে জামা-কাপড় ছেড়ে ইজি চেয়ারে বসে স্নেহা আর রঘুর কথা ভাবছিলেন।

এমন সময় তাঁর স্ত্রী এসে বললেন— আমি আর তোমার সঙ্গে ঘর করতে পারছি না জানো। আজকাল তুমি আমার কোনও খোঁজ খবরই রাখো না। আজ আমার জন্মদিন সেটাও তুমি ভুলে গেছ। আমি ড্রাইভার গোপালকে ফোন করে যখন জানলাম যে তুমি একটি মেয়েকে নিয়ে হোটেলে গেছ, তখনই ঠিক করে ফেললাম। তোমার সঙ্গে আর থাকা যাবে না। এনাফ ইজ এনাফ। আমি ডিভোর্স চাই। কালই চলো উকিলের কাছে যাব।

অবনীবাবু কী করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে মনে মনে ভাবলেন, আজ অন্যের ঘর বাঁধার তোড়জোর করে এলাম, আর আমার নিজের ঘরই টালমাটাল হয়ে গেল বলে মনে হচ্ছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবনীবাবু মুখ খুললেন। বললেন— উমা, আমি কাল অফিস যাব না। তোমার সঙ্গে সারাদিন কাটাব। ডিভোর্সের কথাটা না হয় কালই ভাবা যাবে!

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব