নরদেহ পর্ব-৪

সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ সেরকম না হলেও সমস্যা হল মায়ের প্রশ্নেই। সিদ্ধার্থ একটা ছোটো চাল খাটানোর চেষ্টা করলেন, “ইচ্ছাপুরের হরিশের পৈতৃক বাড়ি থাকবে কুসুমের নামে। যে তাঁর দেখভাল করবে ওটা সেই পাবে, সেই সঙ্গে কুসুমের নামে রাখা টাকাও।”

নিলু তির্যক হেসে বলল, ‘বড়দা বোধহয় ও-ঘর থেকে আপনাকে শিখিয়ে এনেছে। আমার অত লোভ নেই কাকু। আমি অল্পতেই সন্তুষ্ট। মায়ের নামের জিনিস আমি কেন নিতে যাব?’ সেয়ানা আর কাকে বলে! ইঙ্গিতটা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল। সিদ্ধার্থ তাকালেন তপনের দিকে।

তপন বলল, ‘আমার ওসব কিছু লাগবে না। পরিস্থিতি একটু ঠিকঠাক হলে আমি এমনিতেই মাকে নিয়ে যাব। আমার একটু সময় চাই। বড়দা তো মুখের কথায় বিশ্বাস করছে না। ভাবছে কেটে পড়ব।’

নীপা বলল, ‘আমি দায়িত্ব নিতে পারি। কিন্তু দাদারা থাকতে মা আমার কাছে গিয়ে থাকলে সেটা কি ভালো দেখাবে? তাছাড়া আমার শ্বশুর-শাশুড়ি এখনও জীবিত। মা কি ওভাবে থাকতে পারবে?”

সিদ্ধার্থ বললেন, ‘সেটা হয় না। তবে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ব্যবস্থাই কর। তোদের মা শক্ত সমর্থ মানুষ। এখনও চলাফেরা করতে সক্ষম। এমন একটা মানুষকে নিয়েই যদি টানাহেঁচড়া হয়, তাহলে অশক্ত হলে কী অবস্থা হবে সহজেই অনুমেয়। বৃদ্ধাশ্রমই ওঁর জন্য ভালো জায়গা। অচেনা মানুষ অবহেলা করলে তবু মেনে নিতে পারবেন।’

চাল সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এরা যেমন লোভী তেমনি সেয়ানা। জানে সবাই, এই সম্পত্তি ফিরিয়ে দিলে ঘুরেফিরে ওদের কাছেই ফিরে আসবে আবার। বহুকাল আগে পড়া একটা গল্প মনে পড়ে গেল, নোনাজল। মনে মনে হাসলেন সিদ্ধার্থ। কিছু কিছু জিনিস হাজার চেষ্টা করেও আটকানো যায় না৷ এরা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়েই ছাড়বে। সেটাই বোধহয় কুসুমের নিয়তি। এদের কাছে সম্পর্কের কোনও মূল্য নেই। আর মূল্যহীন সম্পর্ক অচল পয়সার মতন, থাকা না থাকা সমান।

শেষ হুমকিটা দিলেন সিদ্ধার্থ, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি তোদের মাকে আমার কাছে নিয়ে রাখতেই পারি। কিন্তু সেটা কি ভালো দেখাবে? লোকে তোদের বদনাম করবে। আমারও। কিন্তু আমি পরোয়া করি না। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। বৃদ্ধাশ্রমে কেউ মন থেকে যায় না, পাঠানো হয়। একটা বড়ো গাছকে শিকড় টেনে তুলে অন্য জায়গায় পুঁতলে সেটা হয়তো মরে না কিন্তু সে কেমন বাঁচে সহজেই অনুমান করা যায়। আর কিছু বলার নেই আমার। এবার কী করবি তোরা বোঝ। তবুও তোদের মায়ের সঙ্গে আলাদা করে একটু কথা বলব, শুনব তিনি কী বলেন।”

এবার আক্রান্ত হল সিদ্ধার্থের আধপাগল ভাই মতি৷ ছোঁয়াচে রোগ, পাগল বলে তো আর কাউকে ক্ষমা করবে না। রাস্তা ঘাটে নিয়মনীতি না মেনেই বেরিয়ে পড়ত। কতক্ষণ আর পাহারা দেওয়া যায়? ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঠিক বেরিয়ে যেত। ধরে নিল মারণ ভাইরাস। পজিটিভ রিপোর্ট আসার পরেই হসপিটালে শিফট করে দিলেন সিদ্ধার্থ। কোভিড হসপিটালে বেডের সমস্যা থাকলেও অনিমেষের সহায়তায় একটা বেড জোগাড় হয়ে গেল৷ প্রাক্তন ছাত্র অনিমেষ সরকারি আমলা, ওর অনেক হাত। নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধার্থ ও রামের মায়েরও টেস্ট করাতে হয়েছে। দুজনেরই নেগেটিভ।

চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখলেন না সিদ্ধার্থ। তবুও বাঁচাতে পারলেন না ভাইকে। এই পৃথিবীতে রক্তের যোগসূত্রে একমাত্র এই ভাই-ই ছিল। ভাইয়ের দেখাশোনা, নিজের চাকরি, পড়াশোনা— এসব করতে গিয়ে বিয়েটাই আর করা হয়ে ওঠেনি। ভাই মারা যাওয়ার পর তাঁর জগৎটা হঠাৎ করে শূন্য হয়ে গেল। নিজেকে মনে হল শূন্যে ভাসমান এক নরদেহ মাত্র, যে-নরদেহের অস্তিত্বের আভাসটুকুও আর থাকবে না, দেহ বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে।

 

নরদেহ পর্ব-৩

তাপসকে কড়া ভাষায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন সিদ্ধার্থ, হঠাৎ তখনই মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল। আচ্ছা, হরিশ কি তাপসের নাম দিয়ে নিজের কোনও প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইল তাঁর কাছে? পর্যবেক্ষণ করে দেখল সিদ্ধার্থের প্রতিক্রিয়া? কী মারাত্মক! সেজন্যই কি বারবার বলত ফিরে এলে এটা করবে, সেটা করবে। সেসব কি এই সম্পর্কিত অনুসন্ধান? মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে অনুসন্ধান করার সময় না থাকাতে তাপসকে সামনে রেখে প্রশ্নটা করে বসেছিল? কাপুরুষ! এতই যখন সন্দেহ তখন নিজে সরাসরি প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারতিস। এই ভনিতার কী দরকার ছিল?

শ্রাদ্ধ হয়ে গেল হরিশের। কঠোর নিয়মে বাঁধা লকডাউন-শ্রাদ্ধ৷ গোনা গুনতি লোক নিয়ে কোনওরকমে পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করা, আড়ম্বরহীন, আতিশয্যহীন। সিদ্ধার্থের মনে হল, এটাই যথার্থ। আত্মার মুক্তি কামনায় করণীয় বিধি এমনই তো হওয়া উচিত। সবকিছুতেই আড়ম্বর যুক্ত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া বড়ো অদ্ভুত। কিছু কিছু জিনিস অন্তরের অন্তঃস্থলে বসে সমাধা করতে হয়, প্রকৃতির সংযোগে হয় না। মুশকিল হল, অন্তরের ঘরটাকে দেখেই বা ক’জন, চেনেই বা ক’জন! চর্মচক্ষু যা দেখে তার বাইরে যেন আর কিছুই নেই।

হরিশ আর নেই। ওঁর অনুরোধ রক্ষা করার দায়ও আর নেই। এখন ওঁর নির্দেশ পালন করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। সিদ্ধার্থ মনে মনে ঠিক করলেন, এবার বন্ধ করবেন আসা যাওয়ার অভ্যাস। কী কারণে আর যাবেন? এমনও তো হতে পারে, হরিশের কথাই ঠিক। তাপস মনে মনে সত্যি সত্যি এমন একটা নোংরা ধারণা পোষণ করে। এতদিন বলেনি সামনাসামনি কিন্তু এবার বলবে। কারণ হরিশের ঢাল আর নেই।

চারদিনের মাথায় ডাক পড়ল সিদ্ধার্থের। অপমান করার নিমন্ত্রণ? না গিয়েও উপায় নেই। ডাকার পর না গেলে অন্যভাবে নিতে পারে। হরিশ ওদের মনে এমন ভাবে গেঁথে দিয়ে গিয়েছে তাঁকে, এখন সিদ্ধার্থের মাঝে হরিশকে দেখবে ওরা। অন্তত যাদের মনে নোংরা কিছু নেই।

তাপস আলাদা করে ডেকে বলল, ‘আপনি তো আমাদের পরিবারের সবই জানেন। আসল কথাটা একবারেই বলি। তপন, নীপা ওরা সবাই বলছে, বাবা যখন নেই তখন সম্পত্তির একটা বন্দোবস্ত করে ফেলাই ভালো। আমি বড়ো ভাই হিসাবে ভেবে দেখলাম, সেটাই ভালো, ওদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলে আমারও শাস্তি। তাই ডেকেছি আপনাকে।”

“আমি কেন? আমি কে? না না তোদের পৈতৃক সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা করবি, সেখানে আমার থাকাটা শোভন দেখায় না। তোরা ঠিক করে নে। তাছাড়া তোর মা তো এখনও বেঁচে আছেন।’

“ওখানেই তো সমস্যা। আমি একচোট আলোচনা করেছি ওদের সঙ্গে। সম্পত্তির ভাগ নেবে সবাই অথচ মায়ের কী হবে, সে বিষয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে। আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আমরা সবাই মিলে রোটেশন করে মাকে রাখব। চার মাস বা এক মাস করে করে। কিন্তু তাতেও রাজি নয়। এ বলে ব্যাবসার সমস্যা, ও বলে কাজের লোকের সমস্যা নানা অজুহাত। আমি তো ওদের চিনি, একবার ভাগবাটোয়ারা হয়ে গেলে আর টিকিও খুঁজে পাওয়া যাবে না ওদের।’

খানিক চুপ করে থেকে সিদ্ধার্থ বললেন, ‘মায়ের একটা সঠিক বন্দোবস্ত না করে ভাগ বাটোয়ারা করার প্রশ্ন আসে না। তাঁর মতামত নিয়েছিস কিছু, নাকি তিনি সরল মানুষ বলে নিজেরাই সব ডিসিশন নিচ্ছিস? তাঁর ইচ্ছে অনিচ্ছেটাও তো জানা দরকার। তোরা এমন করছিস যেন সে অনাথ শিশু, তাঁকে নিয়ে যা খুশি তাই করা যায়।”

“মায়ের কোনও মতামত নেই। তাঁর বক্তব্য, তোরা যেটা ভালো বুঝিস তাই করবি। ওরা আমার ওপর দায় চাপাতে চায় কাকু। সেটা কি সম্ভব, নাকি নায্য, আপনিই বলুন? অপর্ণা বলছিল আপনিই পারেন এর সমাধান করতে। আমিও জানি মায়ের প্রতি আপনার একটা দায়িত্ব বোধ আছে, যেটা আপনি কোনওদিনই এড়িয়ে যেতে পারবেন না।’

হঠাৎ কথা হারিয়ে ফেললেন সিদ্ধার্থ। তবে কি হরিশের কথাই ঠিক? সেই সত্যেরই ইঙ্গিত দিল তাপস?

ইচ্ছে না থাকলেও বসতে হল সিদ্ধার্থকে। হরিশের সবচেয়ে বড়ো গুণ ভীষণ গোছানো টাইপের মানুষ ছিলেন। জীবনে রোজগারও করেছেন অনেক। কে কী পাবে না পাবে তার একটা ইঙ্গিতও দিয়ে গিয়েছেন। সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ সেরকম না হলেও সমস্যা হল মায়ের প্রশ্নেই।

নরদেহ পর্ব-১

“এখন সবাই একটু কিছু মুখে দাও।’’ গম্ভীর মুখে কথাটা বললেন সিদ্ধার্থ।

ঘরের সবাই অবাক চোখে তাকাল তাঁর দিকে। বলে কী লোকটা! মাথার ঠিক আছে তো? বাবার মৃত্যুর পর তিন ঘন্টাও কাটেনি। কোভিডে মৃত্যু, তাই ছুঁয়ে দেখারও সুযোগ পায়নি কেউ। শুধু ওখানে উপস্থিত তাপস আর নিলু দূর থেকে প্ল্যাস্টিকের মোড়কে আটকানো বাবার মুখটা দেখতে পেয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। সৎকারের ব্যবস্থা করেছিল ওদের লোকেরাই। কাঁদতেও পারেনি ওখানে। বাড়িতে ফিরে আসার পর একচোট কান্নার রোল উঠেছিল। সময় কান্নার জল শুষে নেয়। অন্তর গুমরে উঠলেও জল সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল একসময়। মাঝে মাঝে একটু নাক মোছা চলছিল, ঠিক তখনই সিদ্ধার্থ কাকুর এই কথা!

কান্না পর্ব শেষ। এখন চলছে শোক স্তব্ধতার পর্ব। পর্বের সমাহারই জীবন। অনেকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলেনি। মনে মনে হয়তো সিদ্ধার্থকে তুলোধনা করছিল। এইসময় এরকম একটা কথা বলা যায়? লোকটা মানুষ না জানোয়ার? অথচ যিনি মারা গিয়েছেন তিনি তো তাঁরই বাল্যবন্ধু। একটা মানুষ মরে গেল আর ওর কাছে খাওয়াটাই বড়ো হল? তিনি বিচক্ষণ, তিনি আবার একজন অধ্যাপক!

সময় আর কিছুক্ষণ সময় নিল, তারপরেই নিজের খেল দেখিয়ে দিল। সিদ্ধার্থ মনে মনে কষ্ট পেলেও জানতেন এটাই হবে। শোক আসলে একটা ঝোড়ো হাওয়া, সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে না।

তাপসদের মিনু মাসি খবর পেয়েই চলে এসেছেন লকডাউন উপেক্ষা করে। খুব বেশি দূরে থাকেন না বলেই সেটা সম্ভব হয়েছে। তিনি বললেন, “যে গেল সে তো আর ফিরে আসবে না। ভাবলেই বুক ফেটে কান্না আসছে। কী ভালোমানুষ ছিলেন জামাইবাবু। সবই নিয়তি। তোরা চেষ্টার তো কোনও ত্রুটি করিসনি। কিন্তু দাদার কথাটাও মানতে হবে। সবশুদ্ধু খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিলে কেমন করে চলবে? সামনে কত কাজ। আমি বরং ফ্রিজ থেকে কিছু ফল বের করে রাখি, একটু গরম হবে।’

সময় আর শোকের খেলা জমে উঠছে। এতক্ষণ শোক একচেটিয়া মাঠ দখল করে খেলছিল, এবার শিথিল হচ্ছে তার আধিপত্য, খেলা ধরছে সময়।

তাপসের বউ অপর্ণা বলল, ‘ফলগুলো ভালো করে স্যানিটাইজ করতে হবে। আমি যাচ্ছি আপনার সঙ্গে, চলুন।

শোকের চেয়ে বড়ো কর্তব্য। জীবন থাকলে কর্তব্য থাকবে। যে মরে যায় তার সঙ্গে সবাই তো একসঙ্গে মরতে পারে না। জীবন-মৃত্যুর টানাটানিতে যে যেদিকে থাকবে, তাকে সেখানেই লড়াই করতে হবে।

সিদ্ধার্থ সে অর্থে এ বাড়ির কেউ নন। আবার অন্যদিক থেকে অনেক কিছু। মৃত হরিশ মুখার্জির বাল্যবন্ধু তিনি। অকৃতদার। নিজের পরিবার বলতে এক আধপাগল ভাই, একটা পোষা কুকুর, আর রান্নার কাজের লোক রামের মা। রামের মায়ের আসল একটা নাম আছে বটে কিন্তু সেটা ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড আর আধার কার্ডের বাইরে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করার সুযোগই পায় না। মজার ব্যাপার, তিনি নিজেও সেটা মাঝে মাঝে ভুলে যান।

সিদ্ধার্থ ফিলোজফির অধ্যাপক ছিলেন। বছর পাঁচেক হল রিটায়ার করেছেন। বন্ধু হরিশের পরিবারকে নিজের পরিবারের মতো ভালোবাসেন। তার কারণও আছে একটা। সিদ্ধার্থের মা মারা গিয়েছিলেন শৈশবেই। সেই সময় থেকে হরিশের মা তাকে মাতৃস্নেহ দিয়েছিলেন। সখির ছেলে বলে কথা! সবাইকে বলতেন, ওরা দুজন আমার দুই সন্তান। ওদের বলতেন— আমি যখন থাকব না, তোরা দুজনে দুজনকে দেখে রাখবি।

হরিশের ডায়াবেটিস ছিল। কিছুদিন আগে হার্টের কিছু মাইনর সমস্যাও ধরা পড়েছিল। ইদানীং একটুতেই হাঁপিয়ে যেতেন। তবুও থেমে থাকেননি। বয়সের সিম্পটম বলে দিব্যি ইগনোর করে যাচ্ছিলেন। তবে করোনার আবির্ভাবে সবার মতো হরিশও ভয় পেয়েছিলেন। যথেষ্ট সচেতনতা অবলম্বন করে চলার চেষ্টা করতেন। মাঝে মাঝে হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার, ঘরবন্দি হয়ে থাকা, নিয়ম করে গার্গেল করা, প্রোটিন, ভিটামিন সি, কোনও কিছুই বাদ দেননি। তবুও তিনি করোনা আক্রান্ত হলেন। প্রথমে সর্দি, কাশি, গা-হাত-পা ব্যথা, তারপরে এল জ্বর। হাউজ ফিজিশিয়ান ডাক্তার মিত্র বললেন, ‘টেস্টটা করিয়ে নিন।’

টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ। হালকা শ্বাসকষ্ট শুরু হতেই হসপিটালে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হল। পুরো এলাকা তখন কনটেইনমেন্ট জোন। কেউ কোথাও যেতে পারে না, কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারে না, সে এক মহা বিড়ম্বনা। এক একটা বাড়ি যেন এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। সন্ধ্যা হতেই কোলাহলের শহরে মৃত্যুপুরীর নির্জনতা নামে। টিভি আর মোবাইল বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

দশ দিন লড়াই করার পর হেরে গেলেন হরিশ। হেরে গেলেন জীবনের কাছে। মাঝখানে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। তখন দু’বেলা ফোন করতেন সিদ্ধার্থকে। বাড়ির খবরাখবর নিতেন। আর বলতেন, এবার ফিরলে এটা করব সেটা করব, কত প্ল্যান! আসলে আইসোলেশন পর্বে হরিশ পিছনের জীবনটাকে দেখার, মূল্যায়ন করার অখণ্ড অবকাশ পেয়েছিলেন ওখানে। দূরে গেলে কাছটাকে দেখা যায়, একদম খাঁটি সত্য। কাছ থেকে কাছটাকে দেখাই হয়ে ওঠে না! হঠাৎ করে একটা লোক আবার অতটা সিরিয়াস হয়ে গেল কী করে কে জানে, চলে গেলেন হরিশ। হরিশের ছেলেরা হসপিটালের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু এই ডামাডোলে ধোপে টেকেনি।

 

মুখোশ (শেষ পর্ব)

গত সপ্তাহে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে সমর, মদের নেশায় চুর হয়ে একটা ওর চেনা-পরিচিত ক্যাসিনোতে যায়। ওখানে ও প্রায়ই যেত তাই ক্যাসিনোর মালিক ওকে খেলার জন্য দুই লক্ষ টাকা ধারও দেয়। কিন্তু সমর একঘন্টার মধ্যেই পুরো টাকা হেরে যায় এবং তার পরেও আবার টাকা ধার দেওয়ার জন্য ক্যাসিনোর মালিককে জোরাজুরি করতে থাকে। কিন্তু ওখানকার মালিক আর টাকা ধার না দিয়ে সমরকে চব্বিশ ঘন্টা সময় দেন আগের দুই লক্ষ টাকার ধার মেটাবার জন্য। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে বচসা হয় এবং পরিস্থিতি মারমারি পর্য‌ন্ত পৌঁছোয়। মারামারির মধ্যে সমরের হাতে ক্যাসিনোর মালিক খুন হয়ে যায়। ফলে খুনের চার্জ গিয়ে পড়ে সমরের উপর। ও কোনওমতে ওখান থেকে পালাতে পারলেও উপস্থিত সকলেই ওকে খুন করতে দেখেছিল। ফলে পুলিশের কাছেও ওর বিরুদ্ধে যথেষ্ট ছিল।

প্রণতি এবার একটু গম্ভীর হল। প্রণতির চোখে কিছুটা অনুকম্পা প্রকাশ পেল কিনা ঠিক বুঝতে পারল না সঞ্চিতা। আরও কিছু শোনার অপেক্ষায় নিঃশ্বাস প্রায় আটকে উঠছিল সঞ্চিতার। প্রণতি নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। আবার বলতে আরম্ভ করল, এবার নিজেকে একটু শক্ত করো সঞ্চিতা, কারণ এখন আমি যেটা বলতে যাচ্ছি সেটা তুমি নিশ্চয়ই স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবোনি। তোমাকে বিয়ে করার ছয়মাস আগে সমর একটি জার্মান মেয়েকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু মেয়েটি দুতিন মাস পরেই স্বামীর চালচলন ঠিক নয় বুঝে ওকে ছেড়ে চলে যায়। এখনও পর্য‌্যন্ত আইনত ওদের ডিভোর্স হয়নি। সেজন্য তোমার বিয়ে কতটা আইনসিদ্ধ সে নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সম্ভবত সেই কারণেই তোমার গর্ভপাত করানো হয়েছে, যাতে তোমার আর বাচ্চার জন্য ও সমস্যায় না পড়ে।

সমর ছেলেটি একেবারে ধোঁকাবাজ একটা ছেলে। ওকে দয়া করার কোনও মানেই হয় না। তুমি যেমন করে পারো এই বিয়েটা থেকে বেরিয়ে এসো। আমার পরিচিত উকিলের সঙ্গে আমি কথা বলছি, দেখি তিনি কী পরামর্শ দেন। কাল দুপুরে সমরকে কোর্টে তোলা হবে। আমি আমার উকিলের সঙ্গে ওখানে যাব। তুমি এখন বাড়ি যাও। তোমার যত জিনিস, গয়না, টাকা-পয়সা— সব নিয়ে আমার বাড়ি চলে এসো। এখানে তোমার একটা জিনিসেও কেউ হাত দেবে না। কেস মেটা না পর্য‌্যন্ত তুমি আমার বন্ধু, বোন হিসেবে এই বাড়িতেই থাকবে আমার কাছে।

চোখের জল মুছে সঞ্চিতা মাথা নেড়ে প্রণতিকে নিজের সম্মতি জানাল এবং ধন্যবাদ জানিয়ে প্রণতির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

নিজের বাড়িতে এসে সঞ্চিতা শাড়ি, জামাকাপড়, গয়না যা যা ছিল সব দুটো সুটকেসে ভরে নিল। গয়নাগুলো সব ঠিক আছে দেখে একটু আশ্চর্যও হল। ওর কাছে যা টাকা ছিল, জরুরি কাগজপত্র, পাসপোর্ট-ভিসা সব ব্যাগে ভরে নিয়ে সারা বাড়িটা একবার চোখ বুলিয়ে দরজায় তালা ঝুলিয়ে প্রণতির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।

 

পরের দিন সমরকে কোর্টে হাজির করা হল। সঞ্চিতা, প্রণতি উকিলের সঙ্গে ওখানেই উপস্থিত ছিল। সঞ্চিতা এবার সমরের মুখোমুখি হল, জিজ্ঞেস করল কেন একটা মেয়েকে ও এভাবে ধোঁকা দিল? সমরের কাছে কোনও উত্তর ছিল না। শুনানি হয়ে যেতে পুলিশ ওকে নিয়ে চলে গেল।

প্রণতির সাহায্যে সঞ্চিতা জার্মান মেয়েটির সঙ্গেও দেখা করল। সমরের সব ঘটনা শুনে মেয়েটিও অবাক হয়ে গেল। সমরের হাত থেকে রেহাই পেতে মেয়েটি কথা দিল সঞ্চিতাকে সবরকম ভাবে ও সাহায্য করবে।

সবার আশ্বাস পেয়ে সঞ্চিতা অনেকটাই চিন্তামুক্ত হতে পারল। ওর মনে হল সমরের হাত থেকে সহজেই ও মুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু সমরের কেস-টার নিষ্পত্তি হতে দেড় বছর গড়িয়ে গেল। ওর দশ বছরের সাজা হল। সঞ্চিতা এবার ডিভোর্স পেপার সাইন করাতে সমরের সঙ্গে দেখা করল। সমর শেষপর্য‌্যন্ত বিনা বাক্যব্যয়ে সমস্ত কাগজে সাইন করে দিল। অবশেষে সঞ্চিতা স্বাধীনতার স্বাদ পেল। এর জন্য প্রণতিকে ও বার বার ধন্যবাদ জানাল।

এতদিনে সমরের কুকীর্তির কথা বনানী পিসি আর নিজের মা-বাবাকে জানিয়েছে সঞ্চিতা। সকলেই প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেলেন। বনানীও সঞ্চিতার মা-বাবার থেকে ক্ষমা চাইলেন সঞ্চিতার এখানে বিয়ে ঠিক করার জন্য। যদিও এটাতে তাঁর কোনও দোষই ছিল না। তিনি নিজেও সমরের এই চারিত্রিক অবনতির কথা জানতেন না। কারণ সমর তাঁকেও অন্ধকারে রেখেছিল। সঞ্চিতার মা-বাবাও ওনাকে ক্ষমা করে দিলেন। একে অপরকে দোষারোপ করে আর লাভ কী?

দিনকয়েক পরে সঞ্চিতা মুম্বই এয়ারপোর্টে নামলে ওকে স্বাগত জানাবর জন্য ওর মা-বাবার সঙ্গে বনানী পিসিও হাজির হলেন। প্রণতির সাহায্য নিয়ে সঞ্চিতা পেরেছিল সমরের ভালোমানুষি চেহারাটা থেকে মিথ্যার মুখোশটা টেনে খুলে দিতে। সকলের সামনে ওর আসল চেহারাটা প্রকাশ করে দিতে। মুখোশধারি এরকম হাজার হাজার সমর সর্বত্র রয়েছে। সাহসের সঙ্গে সেই মুখোশ টেনে সরিয়ে দিতে মেয়েদেরই আজ এগিয়ে আসার দরকার।

মাঙ্কি ক্যাপ (২য় পর্ব)

(৩)

সাতসকালেই ঝিলমিলের এসএমএস— আই নিড এ মাঙ্কি ক্যাপ ইমিডিয়েটলি। ইমন মেসেজ পড়ে বিস্মিত হয়। ঝিলমিলের হনুমান টুপির আবার কি দরকার? ক’দিন আগেও দেখা হয়েছে। সকালবেলায় আরকেটি-র বাড়িতে লাইফ সায়েন্স পড়তে গিয়ে। কিছু তো বলেনি। মাফলার দিয়ে মাথা গলা ঢেকে ছিল। তেমন অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। অবশ্য ওপর থেকে বোঝা যায় না ভিতরে কী হয়েছে? কী ধরনের অসুবিধা? তবে এবারের হাড় হিম করা কনকনে শীত সত্যিই অসহনীয়। ঝিলমিলের কি তাহলে এক্সট্রা লার্জ প্রোটেকশনের দরকার এখন?

ইমনও এসএমএস পাঠাল— এক্সকিউজ মি। আই হ্যাভ ওনলি ওয়ান।

ঝিলমিলের চট্‌জলদি মেসেজ— ইফ ইউ লাভ মি, শেয়ার ইট। এতো ভারি বিপদ! নো ডাউট ঝিলমিলকে ইমন ভালোবাসে। কিন্তু তাদের বংশপরম্পরাগত মাঙ্কি ক্যাপ ভালোবাসার নামে উৎসর্গ করলে বাড়িতে তাণ্ডব থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধ বেধে যেতে পারে। টুপিদাদু জানতে পারলে ইমনকে আর আস্ত রাখবে না। তার বাবাও কি তাকে মার্সি করবে? যে টুপি পরিয়ে ইমনের বাবা তার মা-কে হাসিল করেছে ইমনও কি পারবে এই সুযোগে ঝিলমিলকে টুপি পরাতে?

ঝিলমিলের তবু বেপরোয়া আবদার— টুপি আমায় দিতেই হবে।

—টুপি ছাড়া আমি তোমায় সব দিতে পারি। প্লিজ মাইরি টুপি চেয়ো না।

—আমার টুপিই চাই।

—কী করে সম্ভব? টুপি আমাদের বাড়িতে একটাই। দাদু থেকে বাবা, বাবা থেকে আমি গসাগু-র মতো ব্যবহার করছি।

—গসাগু মানে?

—গরিষ্ঠ সাধারণ গুননীয়ক অর্থাৎ বড়ো থেকে ছোটো। এক্কেবারে কেসি নাগের ফর্মুলা।

—ওসব গ.সা.গু. ল.সা.গু. ছেড়ে ঝেড়ে কাশো তো চাঁদু। টুপি দেবে কি না?

—একি মামার বাড়ির আবদার নাকি?

—সামান্য টুপি দিতে পারো না, তুমি বাসবে ভালো?

—কি বলছ ঝিলমিল? ভালোবাসার জন্য আমার প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু টুপি দিতে পারব না। তুমি অন্য কিছু চাও, আমার আই ফোন, ল্যাপটপ, মানিব্যাগ…..

—আমার টুপিই চাই।

—বাজার থেকে কিনে নিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়।

—তুমি হয়তো জানো না এবারের কনকনে শীতে আলু পেঁয়াজের মতো বাজার থেকে মাঙ্কি ক্যাপও ভ্যানিশ। হাতে-গোনা দু-একটা যাও পাওয়া যাচ্ছে, তার দামও আকাশছোঁয়া। পঞ্চাশের হনু ব্ল্যাকে পাঁচশো হাঁকছে।

—কি বলছ?

—যা বলছি মার্কেট স্টাডি করেই বলছি। ভাবলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো। টুপি ছাড়া আমি বাঁচব না। আমার মান- সম্মান লাজ-লজ্জা সব ওই হনুমান টুপির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ইমন বোকার মতো জানতে চায়— এসব তুমি কী বলছ? আমি তোমার মাথামুণ্ডু কিছুই ছাই বুঝতে পারছি না।

—তোমায় অতশত বুঝতে হবে না। যা বলছি সেটা করতে পারবে কিনা বলো?

—আমি চেষ্টা করব ঝিলমিল। কিন্তু যদি না পারি? ঝিলমিলের সটান জবাব— আমাদের ভালোবাসার —দি এন্ড।

(8)

ইমনের দাদু স্বদেশ হালদার বিদ্যুৎ চমকানোর মতো বাজখাঁই গলায় চিৎকার করে বলেন— চোর শেষপর্যন্ত আর কিছু না নিয়ে মাঙ্কি ক্যাপ নিয়ে চম্পট দিল?

ইমনের বাবা লেপের ভিতর থেকেই জবাব দেয়— আপদ গেছে। এখন ক’দিন শান্তিমতো ঘুমোতে পারব। বাব্বা কয়েক রাত্তির যা ধকল গেল।

—মহিম তুই একথা বলতে পারলি?

—আগের গান্ধিটা ট্রাই করছ না কেন?

—হনুমানটা বেশ সেট হয়ে গিয়েছিল। দারুণ গরম হতো। শরীরে মনে বেশ চাঙ্গা বোধ করতাম। গান্ধি বড্ড সেকেলে হয়ে গেছে। আধুনিক ছেলেছোকরার দল যেন মানতেই চায় না। আমাকে টুপি দাদু বলে খেপাত— তোর মনে নেই?

—না পাওয়া গেলে কী করবে? ক’দিন পুরোনোটা দিয়ে চালাও। তারপর সময়মতো পেলে কিনে দেব। অন্তত মাথাটা তো বাঁচবে। সঙ্গে মাফলার, শাল জড়িয়ে নিলে দিব্যি ক’দিন কেটে যাবে। বরং বলি কি তুমি ক’দিন রেস্ট নাও। মর্নিং ওয়াকে না গেলেই নয়?

—আমায় জ্ঞান দিস না মহিম। আমি বিপ্লবী, চুটিয়ে স্বদেশি করেছি। আমাদের অভিধানে রেস্ট বলে কোনও শব্দ লেখা নেই। কিন্তু আমি ভাবছি এত সাধের মাঙ্কি ক্যাপটা মিসিং হল কী করে? চোর, সোনাদানা-টিভি-ফ্রিজ-ল্যাপটপ চুরি না করে শেষপর্যন্ত হনুমান টুপি? ভেরি স্ট্রেঞ্জ!

—এই প্রচণ্ড শীতে মনে হয় চোরের কাছে ওটাই মস্ত জরুরি, মহা মূল্যবান। আরে বাবা চোরও তো মানুষ নাকি? চোরেরও ঠান্ডা লাগে।

—ডোন্ট টক ননসেন্স, মহিম। এমন একটা সিরিয়াস ব্যাপারকে লঘু করে দেখা উচিত না।

—তুমিও পারো বাবা। সামান্য একটা টুপি নিয়ে কি কাণ্ডটাই না তুমি করছ।

—এটা সামান্য নয়। আমার কাছে বেশ রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে। প্রেস্টিজ ইস্যুও বলতে পারিস।

ক’দিন বাদে দাদুই আবিষ্কার করলেন ইমনদের পারিবারিক ঐতিহ্যশালী মিসিং লিংক মাঙ্কি ক্যাপটি। দাদু ইমনকে জরুরি তলব করলেন, পার্ক থেকে মর্নিং ওয়াক সেরে ফিরে আসার পর। দাদু কি শেষ পর্যন্ত ইমনকে সন্দেহ করছেন? ইমন কি ধরা পড়ে গেল? ইমনের বুকের ভিতর হাজারটা অশ্বখুর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ঝিলমিলকে ইমনই যে টুপিটা দিয়েছিল, দাদু জানল কী করে?

তার দাদু গলার মাফলার আলগা করে চাদরটা গা থেকে খুলে মায়ের দেওয়া এক কাপ গরম চায়ে তৃপ্তির চুমুক দিয়ে বললেন— জানিস দাদুভাই হনুমানটাকে খুঁজে পেয়েছি।

ইমন অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইল— কোথায়?

—পার্কে রংগন গাছের ঝোপের আড়ালে। আমি ঠিক চিনতে পেরেছি। হালকা হলুদ রঙের, মাথায় কালো উলের বল।

ইমন আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে বলে– ধ্যাৎ দাদু কী যে বলো না। তোমার চোখে নির্ঘাত ছানি পড়েছে। এরকম কালার কম্বিনেশন অনেক টুপির হতে পারে।

—আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না। আমার বিপ্লবীর চোখ। দূর থেকে দেখেই কত ইংরেজের দুরভিসন্ধি ফাঁস করে দিয়েছি। ঝোপের আড়ালে টুপিতে মুখ ঢেকে মেয়েটা এমনভাবে বসেছিল যাতে কেউ চিনতে না পারে আর তার গা ঘেঁষে ছেলেটি অশোভন অবস্থায়…। পার্কটা ক্রমশ দূষিত হয়ে যাচ্ছে রে দাদুভাই। আর বোধহয় মর্নিং ওয়াকে যাওয়া যাবে না।

ইমন দারুণ বিস্ময়ে হতবাক। তার চোখের সামনে সবকিছু এখন জলের মতো পরিষ্কার। আসলে ঝিলমিল তাকে ঠকিয়েছে। তাকেই মস্ত টুপি পরিয়েছে।

 

মাঙ্কি ক্যাপ (১ম পর্ব)

শীত এলেই সবার নজরে পড়ে মাঙ্কি ক্যাপটির উপর। প্রথমে ইমনের দাদু এক্স বিপ্লবী স্বদেশ হালদারের। একসময় চুটিয়ে স্বদেশি করেছেন। সার্থক তাঁর নাম আর কাম। মাথায় গান্ধি ক্যাপ। মনে হতো তিনিই মহাত্মা। স্বাধীনতার পরও টুপি মাথায়। গান্ধি যেন তাঁর তেলা নি-কেশ মাথায় চেপে বসেছে। পাড়ার উঠতি ছেলেছোকরার কাছে তিনি টুপিদাদু। কিন্তু দাদুরও বয়স বাড়ছে। সঙ্গে জাঁকিয়ে পড়ছে শীত। গান্ধি টাক মাথা সামলালেও কান আর নাকের ফুটোয় গোঁজ মারা তার কম্মো নয়। ফলত হিমেল হাওয়ার দাপটে ইমনের টুপি দাদু একেবারে কুপোকাত। গলায় ঘর্ঘর, নাকে সরসর আর কানের ভিতর কড়কড় অনবরত বেজেই চলেছে। তবু দাদু টুপি খুলবেন না। ডাক্তার সনাতন হাজরা ইমনের মাকে উপদেশ দিলেন— এমনটা কখনওই বরদাস্ত করা যাবে না। আরে বাবা বয়স তো হচ্ছে নাকি? কত চলছে?

ইমনের মা আঙুলের কড় গুনে বলেন— আশি ছুঁই ছুঁই।

ডাক্তার হাজরা চমকে উঠে বলেন— এই ভয়ংকর শীতে এখনও হাফ নেকেড ফকির হয়ে থাকতে চান। ভেরি স্ট্রেঞ্জ!

—বাবা তো সচিনের মতো সেঞ্চুরির পাহাড় গড়বেন বলে শপথ করেছেন।

—বলবেন, ওসব গান্ধিগিরি চলবে না। বুড়ো বয়সে যত্তসব ভিমরতি। নিউমোনিয়ায় একেবারে টেসে যাবে।

—তাহলে উপায় ডাক্তারবাবু?

—হনুমান ডট কমের যুগ। ছবিতে দেখেছেন বিশুর ছেলেটা মাথায় কী পরে আছে? ইমনের মা মাথা নাড়ে।

ডাক্তার হাজরা বিজ্ঞের মতো বলেন— আইসল্যান্ডে ওসব গান্ধি-টান্ধি এক্কেবারে অচল। হনুমানই পারে ওরকম রাবণের মতো ভয়ংকর প্রতিকূল আবহাওয়ার মোকাবিলা করতে।

—তার মানে, আপনি বলছেন মাঙ্কি ক্যাপ।

—গান্ধির বদলে হনুমান। ঠিক ধরেছেন।

—কিন্তু হনুমান টুপি যদি মাথায় না পরতে চান? আমার শ্বশুরমশাইয়ের যা জেদ।

ডাক্তার হাজরা খানিকক্ষণ গুম হয়ে কিসব চিন্তা করলেন। তারপর স্মিতহাস্যে বললেন— কুছ পরোয়া নেই। যে রোগের যেমন ওষুধ।

ইমনের মা বিস্মিতভাবে জানতে চাইলেন— সেটা আবার কী?

—কথা না শুনলে আমার কাছে নিয়ে আসবেন।

—আপনি কী করবেন?

—ঘুমের ওষুধ গিলিয়ে গান্ধি খুলিয়ে হনুমান পরিয়ে দেব।

—কতক্ষণ লাগবে?

—মাত্র সাড়ে সতেরো মিনিট।

—বলেন কী টুপি পরানো এত সোজা? এত তাড়াতাড়ি?

—আমার নাম…।

ইমনের মা সামান্য রসিকতা করে বলে— মুন্না ভাই এমবিবিএস। তাই না?

—ধ্যাৎ, কী যে বলেন। আমার নাম সনাতন হাজরা। রোগীদের টুপি পরানোই আমার কাজ। বিফলে মূল্য ফেরত।

ইমনের মা বিড়বিড় করে বলে— মুন্নার বদলে সনাতন। গান্ধির বদলে হনুমান। দুয়ে দুয়ে চার।   ভালোই মিলেছে।

ডাক্তার হাজরার চেম্বার পর্যটন করে ইমনের দাদু মাঙ্কি ক্যাপের স্বাদ টের পেয়েছেন এখন হাড়ে হাড়ে। তাঁর মুখে দিনরাত হনুমান চালিশা। হনুমান ভক্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। টুপির এত গুণ, আগে জানা ছিল না। শীত এলেই তিনি বাহুবলী হয়ে যান। প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহে যখন সবাই লেপের ভিতর জবুথবু, ঘুম আর ভাঙতেই চায় না, তখন ইমনের দাদু মাঙ্কি ক্যাপে মুখ ঢেকে স্বপ্নবীথি পার্কের ভিতর তিন রাউন্ড মর্নিং-ওয়াক সেরে অবলীলায় বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর সোজা ইমনের বাবার ঘরে ঢুকে এক ঝটকায় লেপ সরিয়ে মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ চাপিয়ে বলেন— যা আর দেরি করিস না। পার্কে দু-রাউন্ড মেরে আয়। ইমনের বাবার মুখে বিরক্তির সুর— আঃ আমাকে আবার টুপি পরাতে এলে কেন? দাদু নাছোড়বান্দা। টুপি পরানোয় তিনি জেনারেশন ধরে অভ্যস্ত করাবেনই। সবশেষে যে ইমনের পালা, তা আর নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। সে জানে লেপের তলায় ঘুমোনোর ভান করে পড়ে থাকলেও রেহাই নেই। দাদু ইমনের বাবার উদ্দেশ্যে বললেন – শোন মহিম, মাঙ্কি ক্যাপ পরে শীতের সকালে মর্নিং ওয়াকের মজাই আলাদা। ইমনের বাবা যেন তার দাদুর কথা শুনতেই পায় না। লেপের ভিতর শামুক হয়ে থাকতে চায়। দাদু তবু ছাড়ে না ইমনের বাবাকে। বলেন— কিরে উঠবি নাকি বউমাকে বলব গায়ে জল ঢেলে দিতে। ইমনের বাবা মুখ বিকৃত করে বলে— আঃ কি জ্বালাতন! শান্তিমতো ঘুমোতেও দেবে না নাকি?

—ব্যাটা কুম্ভকৰ্ণ। এত ঘুম আসে কী করে? রাতে ঘুমোসনি? হঠাৎ দাদু বাজখাই গলায় ইমনের মাকে চিৎকার করে ডেকে বলেন— বউমা, মহিম কি রাতে ঘুমায় না? তোমরা করো কী? মা আমতা আমতা করে বলে— আপনার গুণধর ছেলেকেই জিজ্ঞাসা করুন। আমি পই পই করে বলি, যা ঠান্ডা পড়েছে তাড়াতাড়ি লেপের ভিতর…। দাদু মাকে সমর্থন করে বলেন— ইউ আর রাইট বউমা। বাট মহিম…।

—সাত তাড়াতাড়ি লেপের ভিতর ঢুকলে ওর নাকি জ্বর আসে।

—হোয়াট ডু ইউ মিন বাই জ্বর?

—মানে গরম হয়ে গেলে আর ঘুম আসে না। —কই আমি তো এসবের বিন্দুবিসর্গ জানি না।

—আপনি গুরুজন। আপনাকে কি সব খুলে বলা যায়?

—তুমি কাছে থাকো না?

—আমি থাকলে জ্বর আরও বাড়ে।

—সে কি কথা! কেমন ব্যাধি?

—আপনার ছেলেই ভালো বলতে পারবে।

—ডাক্তার দেখাচ্ছ না কেন?

—আপনার ছেলে না যেতে চাইলে আমি কি আর করতে পারি?

—আঃ বউমা হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। তোমাকে শক্ত হতে হবে। তোমার হাতেই ওর কলকব্জা।

—শীত এলেই ও এরকম বিগড়ে যায়। মেশিন ঠিক থাকে না।

—না না এতো ভালো কথা নয়। এর একটা আশু বিহিত প্রয়োজন।

—দেখুন চেষ্টা করে। আপনার মধ্যস্থতায় যদি কাজ হয়। আমি তো অলরেডি ফেড-আপ।

এইবার দাদু ইমনের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন— কী’রে বউমা যা বলছে সত্যি?

ইমনের বাবা লেপের ভিতর থেকেই জবাব দেয়— হুম।

—রাতে ঘুমোস না?

—হুম।

—বউমার কথা শুনিস না?

—হুম।

—কী তখন থেকে হুম হুম করছিস?

—আঃ বিরক্ত কোরো না তো। লেট মি হ্যাভ এ সাউন্ড স্লিপ।

—রাতে না ঘুমিয়ে সকালে কেন ঘুমোচ্ছিস মহিম?

—ক’দিন ধরে অফিসের কিছু জরুরি ফাইল রাতে দেখতে হচ্ছে। তাই শুতে দেরি হচ্ছে। আর কোনও গল্প নেই।

ইমনের মার দিকে তাকিয়ে দাদু বলেন— ও তাই বল। আমরা তো অন্য কিছু সন্দেহ করছিলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন -ওরে বাবা সাতটা বেজে গেল। নে আর দেরি না করে মাথায় মাঙ্কি ক্যাপটা চাপিয়ে পার্কে দু-রাউন্ড মেরে আয়। দেখবি মন-মেজাজ একেবারে ঝরঝরে হয়ে যাবে।

ইমনের বাবার সেই এক বিরক্তিকর জবাব— আজ টুপি না পরলেই নয়?

— টুপি না পরলে ইউ মাস্ট ক্যাচ কাফ্ অ্যান্ড কোল্ড। আজকের টেম্পারেচার কত জানিস? অলমোস্ট এইট ডিগ্রি। ‘জয় হনুমান’ বলে বেরিয়ে পড়।

—আজ আমি টুপি পরব না।

—ছেলেমানুষি করিস না মহিম। টুপি তোকে পরতেই হবে।

—কিছুতেই না।

—অবাধ্য হোস না। তুই ভালো করেই জানিস। আমি এক সময় স্বদেশি করেছি। কতজন গোরাকে চ্যাংদোলা করে ছুড়ে মাটিতে আছড়ে ফেলেছি। গান্ধি ছেড়ে এখন আমি হনু হয়েছি। আমার এখন মহাবলী শক্তি।

হঠাৎ ‘জয় বজরংবলী’ বলে একলাফে ইমনের টুপিদাদু তার বাবাকে চ্যাংদোলা করে তুলে বাইরে এনে ফেলে। তারপর মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ পরিয়ে বলেন— মহিম তুই এখনও আমার কাছে দুগ্ধপোষ্য শিশু রে।

(২)

সেদিনটাও ছিল এমনই এক ভয়ংকর শীতের সকাল। হনুমান টুপি মাথায় ইমনের বাবা বেরিয়েছে মর্নিং ওয়াকে। কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটিতে তখন পড়ত বাবা। সঙ্গে চাকরির পরীক্ষা। পা থেকে মাথা পর্যন্ত বডি ফিট। বাইসেপস, ট্রাইসেপস, সিক্স প্যাকস সবই তার স্বাস্থ্যবান শরীরে সুসজ্জিত ও সুশোভিত। কিন্তু শীতকাল এলেই কেমন জবুথবু হয়ে যায় ইমনের বাবা। সামান্য ঠান্ডা যেন সহ্য হয় না। হাঁচি একবার শুরু হলে তিন কুড়িতে গিয়ে থামত। নাকের ট্যাপ কলে প্যাঁচ বিকল। অনবরত জল পড়েই চলেছে। ইমনের ঠাম্মা বুকে গরম তেল মালিশ করে মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ চাপিয়ে বলত— যা মর্নিং ওয়াকটা সেরে আয়। তোর বাবা আগেই বেরিয়েছে। আমি গরম জল চাপাচ্ছি। চা খেয়ে বাজারে যাবি। ইমনের বাবা ঠাম্মার কথা শিরোধার্য করে প্রাতভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে।

আড়াই রাউন্ড মারার পর হঠাৎ ইমনের বাবার বোধোদয় হয় কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। একেই ভয়ংকর ঠান্ডা। তার উপর পার্ক প্রায় জনমানবশূন্য। যে দু-চারজন সিনিয়র সিটিজেন হাঁটাহাঁটি দৌড়াদৌড়ি লাফালাফি করছিল তারাও একবার কোনওক্রমে রাউন্ড মেরেই সটকেছে। কেবল ইমনের নির্ভীক স্বাস্থ্যবান বাবা একা শীতের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

পিছনে না তাকিয়েই জোরে পা চালায় তার বাবা। ভাবে, নির্ঘাৎ কোনও চোর-ডাকাত। তার পকেটে বাজারের টাকা। আঙুলে জন্মদিনের সোনার আংটি। মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ। সব কেড়ে নিলে, খুলে নিলে তার যাবতীয় বীরত্ব ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাবে। ওর হাতে নিশ্চয়ই অস্ত্র আছে।

এরকম ভাবে বেশ কিছুক্ষণ পিছু-নেওয়া আগন্তুকের সঙ্গে ছোটাছুটি লুকোচুরি খেলার পর অকস্মাৎ এক মেয়েলি কন্ঠস্বরে ইমনের বাবার সম্বিৎ ফেরে। তার বাবা শুনতে পায়— প্লিজ হেল্প মি…. আর পারছি না… ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি… আমাকে বাঁচান।

মেয়েলি কেসে তার বাবা কোনওদিনই পাশ করতে পারেনি। বরাবরই শূন্য পেয়েছে মেয়ে পটানোর পরীক্ষায়। অথচ কলেজ ইউনিভার্সিটিতে তার বন্ধুরা ক্যান্টিনে বাথরুমে-সিঁড়িতে- ব্যালকনিতে— যত্রতত্র নির্ভয়ে টুকলি করে পাশ করে যাচ্ছে। ইমনের বাবার কানে ফের সেই করুণ আর্ত কন্ঠস্বর — আমাকে বাঁচান… আমি জমে যাচ্ছি… মরে যাচ্ছি। ইমনের বাবা মনে মনে ভাবে— কেসটা জন্ডিস নয় তো? বাঁচাতে গিয়ে যদি ফেঁসে যায়? মেয়েরা সব পারে। ইমনের বাবা তবু সাহস সঞ্চয় করে ‘জয় বজরং বলী’ বলে একলাফে মেয়েটির সম্মুখীন হয়— আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কেন? কী চান বলুন তো? মেয়েটি তার কথার জবাব না দিয়ে ইমনের বাবার মুখের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। বাবা থতমত খেয়ে যায়। মনে মনে বলে— কী মেয়েরে বাবা, কথা নেই বার্তা নেই। প্রথম সাক্ষাতেই মুখ দেখাচ্ছে। এরপর না জানি কী করতে বলবে। এদিকে মেয়েটি প্রচন্ড ঠান্ডায় প্রায় বাকরুদ্ধ। আঙুল দেখিয়ে কোনওক্রমে বলে — টুপি। ইমনের বাবা চমকে উঠে বলে— টুপি কেন?

—বাইটিং কোল্ড। বুঝিনি বাইরে এতটা ঠান্ডা। টুপি না জড়ালে কানের যন্ত্রণায়…।

—কিন্তু আমার টুপি আপনাকে জড়ালে আমার হাঁচি, কাশি, নাকের জল…।

—আপনি কি চান না একটা অসহায় মেয়েকে এই নিষ্ঠুর আবহাওয়া থেকে বাঁচাতে, উদ্ধার করতে। আপনি সু-পুরুষ স্বাস্থ্যবান। আপনি নিশ্চয়ই চান না চোখের সামনে অসহায় মেয়েটি শীতের প্রচন্ড কামড়ে ফালাফালা হোক। ইমনের বাবার মনে হল, কে যেন তার জামা-প্যান্ট-মাফলার-সোয়েটার-হনুমান টুপি সব খুলে নিয়ে প্রায় অর্ধনগ্ন দেহে এক বালতি জল ঢেলে দিল।

মাথার মাঙ্কি ক্যাপটা একটানে খুলে ইমনের বাবা মেয়েটির মাথায় পরিয়ে দিল। উষ্ণতা পেয়ে মেয়েটি ক্রমশ স্বাভাবিক হতে থাকল। তার মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি। কিন্তু টুপি খসিয়ে হাড়-কামড়ানো কনকনে শীতে ইমনের বাবা টানা এক মাস বিছানায় শয্যাশায়ী হয়েছিল। মেয়েটি এর মধ্যে বার কয়েক এসে তার বাবাকে উষ্ণ করে দিয়ে গেছে। এরপর তার বাবার চাকরি, তার বাবার বিয়ে সবই সম্ভব হয়েছে মেয়েটির চিরস্থায়ী সঙ্গলাভ এবং ভালোবাসার হাতের-গরম স্পর্শে। মাঙ্কি ক্যাপের আড়ালে সুজাতা সরকার নামের সেই মেয়েটি এইভাবেই ইমনের বাবার অর্ধাঙ্গিনি এবং ইমনের গর্ভধারিণীরূপে আবির্ভূতা হয়েছিলেন।

সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-৩০

মনে মনে হাসে কস্তুরী। কোথায় রবি? কোথায় ওর মা? ওরা এখন কেমন আছে? বাচ্চাটা অমন করে তাকিয়ে আছে কেন? ও কী কস্তুরীকে চিনতে পেরেছে?

নাহ! ওই তো ওর মা ওকে সরিয়ে নিচ্ছে কস্তুরীর থেকে! ওরা তাহলে ওর চেনা নয়, অচেনা।

ওর এলোমেলো চুলগুলো পাতলা হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ে কপালের এপার থেকে ওপার। মিনমিনে একটা শব্দ ভেসে আসে কানে। ঠেসান দেওয়া পিলারটা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে আরও আলো আরও অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায় কস্তুরী। আর তখনই প্রচন্ড একটা শব্দ সজোরে এসে ধাক্কা খায় ওকে।

শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে যেতেই প্রবল একটা টান অনুভব করে কস্তুরী।

( ১২ )

মন বলে যে একটা কিছু আছে। সেটাই আর নতুন করে অনুভব করতে পারছিল না কস্তুরী। এভাবে কোনও মানুষ অপমান করতে পারে, ওর তেত্রিশ বছরের জীবনে যা হয়নি আজ তা হচ্ছে। আজ তা হল।

শুনেছ খবরটা? দ্যাখো দ্যাখো রিপোর্টটা দ্যাখো। ওগো আমি তোমায় বলেছিলাম না এ মেয়ে সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে পাতলা একটা কাগজ ওর দিকে এগিয়ে দেন শাশুড়ি।

দোতলার ঘর থেকে হাঁক দিয়ে তড়িঘড়ি ডেকে পাঠান কস্তুরীকে। তারপরই মনের অনাবিল আনন্দে নিজেদের ভালোলাগার প্রকাশ করতে থাকেন।

কস্তুরীর ছোটো জা প্রেগন্যান্ট। এটা তারই মেডিকেল রিপোর্ট। গোটা বিষয়টায় অদ্ভূত আনন্দের ছোঁয়া থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু কস্তুরীকে এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে অপরের এগিয়ে যাওয়ার বিজয় পতাকা ওড়ানো দেখানোর মানে কী? হ্যাঁ তাছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়? গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আসছিল। মনকে যতই শান্ত করার চেষ্টা করছিল, ততই যেন অশান্ত সমুদ্রের ঢেউয়ে মতো উথালপাথাল হয়ে উঠছিল ওর বুকের ভেতরটা।

কী হল একেবারে যে থ মেরে গেলে? মুখে কুলুপ এঁটে থাকলে হবে? শ্রেষ্ঠা কী খায় না খায় সেসব তো দেখতে হবে? দেখো, মেযো ঘরে শুয়ে থাকলে রাতে কী খাবে একটু জিজ্ঞাসা করে এসো। আমি যাই একটা ফোন করে আসি। সবাইকে মিষ্টিমুখ করাতে হবে তো?

শাশুড়ি ড্রযিংরুম থেকে নিজের বেডরুমের দিকে উঠতেই তমালের বাবা বলেন, বউমা, আমাদের বংশপ্রদীপ আসছে, তুমি কিন্তু এভাবে মনমরা হয়ে সবসময় শ্রেষ্ঠার সামনে ঘোরাফেরা করবে না। তাতে ওর মন আর শরীর দুটোই খারাপ হয়ে পড়বে। হবু সন্তানের ক্ষতি। তোমার থেকে আমরা তো কিছুই পেলাম না। অন্তত এটুকু হেল্প পাব আশা করি।

হ্যাঁ বাবা। নিজের সম্মানের সবটুকু জলাঞ্জলি দিয়ে কস্তুরী ঘরে চলে এসেছিল। একটুও অবশিষ্ট ছিল না আর। ওর প্রয়োজন ফুরিয়েছে ওদের কাছে। হয়তো তমালের কাছেও। বিছানায় উপুড় হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। শরীরের সমস্ত সংযম হারিয়ে বাঁধভাঙা জলের মতো একে একে নেমে আসছিল অভিমান, যাবতীয় কষ্ট।

এখন থেকে বৈধভাবে বাঁজা এই অভিধায় বেঁচে থাকতে হবে ওকে। এই অভিধা কখনও মুছবে না জানে কস্তুরী। আসল সত্যিটা কারুর সামনে আসবে না। তমাল ওর থেকে অনেকটা দূরে চলে গেছে। শুধু শরীর থেকে নয়, মন থেকেও। কস্তুরীর জীবনে কে এই সর্বনাশ করেছে তাও ও জানে না।

ঋজুদা…? নাকি বুম্বা…! নাকি অন্য কেউ। কিন্তু কস্তুরীর শরীরের এতটা নিখুঁত বর্ণনা কে দেবে? ঘেঁটেঘুঁটে তমালের প্রোফাইল বের করে কস্তুরীর গোপন জানাবে কে?

বিশ্বাস করে না। তমাল একেবারেই আর কস্তুরীকে বিশ্বাস করে না। দশ বছরের বেশি সম্পর্কটা এভাবে একটা ছোট্ট ঝড়ে উপড়ে যাবে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। তাহলে সেই যে-ঝড়ে তমাল ওর হাত ধরেছিল, সবটাই কী দয়ার বশবর্তী হয়ে?

রঘু

মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির চাকরি। একদম দুয়ে নিয়ে ছাড়ে। রোজ রোজ অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয় খুব। তাই ‘স্লিপ ডেট’ কাটাতে রবিবারই ভরসা। সেখানেও জ্বালা। ন’টা বাজলেই গামলা মুখে বউয়ের গর্জন। চলো বাজার, বাজার চলো! এপাশ ওপাশ করে যে আরও আধঘন্টা ল্যাদ খাবো তার উপায় নেই। আজ যেমন গরম চায়ের কাপে আমার আঙ্গুল দিল ডুবিয়ে। ড্যাশের নাম খগেন। একলাফে বাথরুম গজগজ করতে করতে।

রবিবার বাজার সেরে আমাদের বন্ধুদের একটা আড্ডা হয় কাকার চায়ের দোকানে। জনা পনেরো থাকি। বাজার ফেলেই দে দৌড়। প্রথমে মাছ মাংস কিনে তারপর সবজি বাজার সারি। ক’দিন ধরেই চিংড়ি চিংড়ি করছে ছেলেটা। একটু বড়ো সাইজের কয়েকটা নিলাম। বাটা মাছ বাবার জন্য। কাতলা কিছুটা নিলাম বাড়ির বাকিদের জন্য। চিকেন নিয়ে সবজি বাজারে ঢুকতেই দেখি পল্টুর ফলের দোকানের সামনে খুব ভিড়। পল্টু জুতো খুলে কাউকে মারছে আর “চোর চোর” বলে চিৎকার করছে। উৎসাহী কয়েকজন বেশ সোচ্চার। তাদের হুলোর মতো মুখগুলো, যেন এখনি ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাকিয়ে দেখলাম সব মুখগুলোয় অপরের রাগ অন্যকে ঝাড়ার চেষ্টা।

একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম পল্টু জুতো নিয়ে একটা সাত-আট বছরের বাচ্চাকে মারছে। ছেলেটার জামা ছিঁড়ে গেছে। সারা মুখ লাল মারের চোটে। ঠোঁট দিয়ে রক্ত পড়ছে। খুব মায়া হলো। এইটুকু বাচ্চাকে কেউ ওভাবে মারে! ছুটে গিয়ে পল্টুর হাতটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলাম, “মেরে ফেলবি নাকি বাচ্চাটাকে”। আস্তে আস্তে ভিড় পাতলা হতে লাগল। নাটকের যবনিকা এতো তাড়াতাড়ি হবে ওরা ভাবতে পারেনি। এর মধ্যে তাপসদা হাজির।

তাপসদা অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি অফিসার। বিশাল চেহারা ও মোটা পাকানো গোঁফ ভয় ধরায়। তাপসদা পিছনে কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। পল্টুর হাতে একটা আপেল। মারার কারণ জিজ্ঞাসা করতেই বলল, “ছেলেটা আপেল চুরি করে ছুটে পালাচ্ছিল”। এর মধ্যে বাচ্চা ছেলেটা উঠে বসেছে। সারা শরীরে লাল লাল মারের দাগ।

হঠাৎ তাপসদা গম্ভীর গলায় বাচ্চাটাকে জিঞ্জাসা করল, “কি করেছিলিস সত্যি করে বল।”

তাপসদার চেহারা দেখেই ছেলেটা ভয় পেয়েছে খুব বোঝা গেল। একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘একটা আপেল কিনতে চেয়েছিলাম। পাঁচ টাকা আমার কাছে ছিল। দোকানদার বলল, দশটাকা দাম। আমি একটা ছোট আপেল দেখিয়ে বলি, এটা পাঁচ টাকায় দাও না। ও তখন আমাকে গালাগাল করে। বলে অতো কম দামে আপেল হয় না। তারপরও একটা নোংরা কথা বলে।’

‘আমি বলি ‘ওরকম খারাপ কথা কেন বলছো?’ বলতেই ও চিৎকার করতে থাকে আর বলে চোর চোর। আমি ভয় পেয়ে ছুটতেই ও ধরে মারতে শুরু করে। আরও কয়েকজন মারতে থাকে। আমি আপেল চুরি করিনি। আপেলে হাতই দিইনি।’ রিক্সা চালায় হারু সব দেখেছে। সে বলল, ‘বাচ্চাটা ঠিকই বলছে।’ পল্টু এমনি এমনি মারছে বাচ্চাটাকে। ব্যস, আগুনে ঘি পড়ল যেন।

তাপসদা পল্টুকে শূন্যে তুলে ধরে ছুড়ে ফেলল দূরে রাস্তার ওপর। তারপর আগুন চোখে মিলিটারি মার শুরু করল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকলে দেখছে। যারা এতক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে পল্টুর সঙ্গ দিচ্ছিল তারা পগারপার। তাপসদাকে থামানো যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ পর নিজের পায়ের জুতো খুলে বাচ্চাটার হাতে দিয়ে বলল, ‘তুই মার এবার ওর মুখে তোকে যেমন মারছিল।’

সকলকে অবাক করে বাচ্চাটা বলে উঠল, ‘মা বলে, বড়োদের অসম্মান করতে নেই। গায়ে হাত দিতে নেই’। স্তম্ভিত সকলে। বাচ্চার কথাটা সকলের হৃদয় ছুঁয়ে গেল যেন। পল্টুকে ছেড়ে হাসিমুখে তাপসদা বাচ্চাটাকে কাকার চায়ের দোকানে নিয়ে গেল।

বাচ্চাটার নাম রঘু। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, সকাল থেকে সে কিছু খায়নি। ওর মা এক বাড়িতে কাজ করে। তারা সকালে চা আর বাসি রুটি দেয়। ওর মা ওই রুটি নিয়ে এলে ওরা সকলে খাবে। বাড়িতে ওরা তিনজন। মা, বোন আর ও। বাবা ওদের ছেড়ে চলে গেছে। চা আর বিস্কুট হাতে চুপ করে বসে রইল রঘু। খেতে বলতেই কেঁদে ফেলল। বলল, ওর বোনের ক’দিন ধরে জ্বর। ও না খেয়ে আছে। এক বাবুর গাড়ি ধুয়ে পাঁচ টাকা পেয়েছিল কাল। ওই টাকা নিয়ে বোনের জন্য আপেল কিনতে এসেছিল। ক’দিন ধরেই রঘুর কাছে আপেল খাবার বায়না করছিল বোন। বোন না খেয়ে আছে, তাই ও চা বিস্কুট খেতে পারবে না!

তাপসদা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রঘুর দিকে। বোনের জন্য ওর ভালোবাসায় মুগ্ধ সকলে। তাপসদা হঠাৎ চিৎকার করে পল্টুকে ডাক দিল। মাথা নিচু করে পল্টু হাজির। ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে তাপসদার দিকে। তাপসদা হাসতে হাসতে পল্টুকে কাছে ডাকল। বলল, এক কেজি আপেল আর এক ছড়া কলা নিয়ে আয়। দৌড়ে গেল পল্টু দোকানে। আপেল আর কলা আনতেই একটা পাঁচশো টাকার নোট রঘুকে দিয়ে বলল, টাকাটা দে কাকুর হাতে। তুই তোর বোনের জন্য আপেল আর কলা কিনলি।

রঘু কিছুতেই নেবে না। ওর মা বলেছে, ‘এভাবে কেউ দয়া করলে নিবি না’। হো হো করে হেসে উঠল তাপসদা।

পল্টুকে বলল, ‘দেখলি এই ছেলেটাকে তুই চোর বলে মারলি। তোর ছেলেকে কখনও তুই এই শিক্ষা দিয়েছিস? এ ছেলে অনেক দূর যাবে, দেখে নিস।’ তাপসদা জোর করতেই রঘু বলে উঠল, তাহলে আমি বড়ো হয়ে চাকরি করলে তখন ফেরত নিতে হবে কিন্তু। উপস্থিত সকলে রঘুর কথায় হেসে উঠল। কয়েকটা কেক আর বিস্কুটের প্যাকেট আমি দিয়ে দিলাম ফলের ব্যাগে।

আনন্দে রঘু দে দৌড়। আমিও রঘুর মতো দৌড় লাগালাম সবজি বাজারের দিকে। দেরিতে বাজার নিয়ে ঢুকলেই বৌয়ের গামলা মুখের অগ্নিবান কল্পনা করতে করতে।

 

পিছল পর্ব- ০১

গাড়ির আওয়াজ শুনে সীমা জানলার বাইরে তাকাতেই নরেনের গাড়িটা গেট দিয়ে ঢুকছে দেখতে পেল। অন্যমনস্ক হয়ে যন্ত্রচালিতের মতো উঠে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। এটাই রোজকার নিয়ম। অফিস থেকে ফিরে হাতের কাছে এক কাপ চা না পেলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে নরেন। চা বানিয়ে ড্রয়িংরুম-এ আসতেই নরেনের বদলে অনিলকে দেখে বিস্ময়ে ভুরু কুঁচকে উঠল সীমার।

—হ্যাপি বার্থডে ম্যাডাম, ফুলের তোড়াটা সীমার হাতে ধরিয়ে হাত জোড় করল অনিল।

সীমা নিজেকে সামলে নিয়ে অনিলকে ধন্যবাদ জানাল। ব্যথিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, নরেন কোথায়? সীমার চাউনি কিছু খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবার অনিলের মুখের উপর এসে স্থির হল।

—স্যার-ই আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। হঠাৎ ওনাকে অফিসের কাজ নিয়ে শহরের বাইরে যেতে হয়েছে।

—এটা তো আপনার স্যার ফোন করেই আমাকে জানাতে পারতেন। সীমার গলার রুক্ষতা স্পষ্ট ধরা পড়ল।

—আসলে, স্যার এই বিশেষ দিনে আপনাকে মনমরা হয়ে থাকতে দিতে চাননি। এমন একটা এমারজেন্সি এসে গেল যে…।

—আপনাকে আর আপনার স্যারের হয়ে ওকালতি করতে হবে না। আমি আপনার থেকে ওকে বেশি চিনি। অনিলের কথার মাঝখানেই সীমা বলে উঠল।

কিছুক্ষণের জন্য দুজনেই চুপ করে রইল। পরিবেশ হালকা করতে সীমাই প্রথম বলল, আপনি কী করে জানলেন আজ আমার জন্মদিন?

—স্যারই বললেন, সীমা ডিনারে আমার জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চই। তুমি বরং গিয়ে ওকে খাওয়ার টেবিলে সঙ্গ দাও এবং আমি আসতে না পারার কারণটাও বুঝিয়ে বোলো। সেজন্যই আমি এখানে এসেছি, নয়তো আমিও খবরটা আপনাকে ফোনেই দিতে পারতাম।

—আই অ্যাম ভেরি সরি, আপনি প্লিজ বসুন। জন্মদিনে নরেনকে আসতে না দেখে সীমা কিছুক্ষণের জন্য ভদ্রতা দেখাতে ভুলে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু সামলে নিতেও বেশি সময় লাগলা না। চায়ে কাপটা অনিলের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেও সোফায় এসে বসল।

—আমি আপনার দুঃখটা বুঝতে পারছি ম্যাডাম। আপনি আমাকে দেখে রেগে উঠবেন এটাই স্বাভাবিক। আমার বোধহয় এভাবে চলে আসাটা উচিত হয়নি, অন্তত একটা ফোন…

আজকের দিনটা নষ্ট করতে সীমার মন চাইছিল না তাই কথার মোড় ঘোরাতে বলল, আপনার ফ্যামিলিও কি এখানেই থাকে? আমার এখানে মাঝে মাঝে নিয়ে আসতে পারেন।

—না ম্যাডাম আমি এখনও বিয়ে করিনি, সপ্রতিভ উত্তর অনিলের।

সীমা অনিলের দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকাল। বেশ লম্বা, চওড়া কাঁধ, রংটা একটু তামাটে বর্ণ হলেও আকষর্ণীয় ব্যক্তিত্ব এরকম একটা মানুষ এখনও বিয়ে করেনি! সীমার মনে হল এর নিশ্চই একটা কারণ আছে।

অনিল আগেও নরেনের সঙ্গে কয়েকবার এ বাড়িতে এসেছে। অফিসের লোকেদের বাড়িতে আসা খুব সহজ ভাবে নিতে পারত না সীমা। অনিলের সঙ্গেও এত কথা কখনও বলেনি সে। আজ বাধ্য হয়ে এবং নিজের ব্যবহারে লজ্জিত হয়ে সীমা অনিলের সঙ্গে বসে গল্প করতে লাগল।

কথায় কথায় সীমা জানতে পারল নরেনের কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি করা ছাড়াও অনিলের রাজনীতিতেও ইন্টারেস্ট আছে। সীমা অবাক হল এটা ভেবে যে, নরেন আর অনিলের স্বভাব সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর হওয়া সত্ত্বেও দুজনের মধ্যে কীভাবে বন্ধুত্ব হল!

ডিনার শেষে অনিল সীমার রান্নার প্রশংসা করতেই সীমা বলল, আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনার ব্যবহার এবং সেন্স অফ হিউমার সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আপনার জন্যই দিনটা আজ খুব ভালো কাটল।

অনিলও সীমাকে থ্যাংক ইউ বলে বিদায় নিল। নরেন আজকের দিনে শহরের বাইরে চলে যাওয়াতে মনে মনে ক্ষিপ্ত হয়েছিল সীমা। অনিলের সঙ্গে সন্ধেটা কাটিয়ে মনটা ভালো হয়ে গিয়েছিল ওর। নরেনের চিন্তাটা সরে গিয়ে সীমার মন জুড়ে দখল নিয়েছিল অনিলের উপস্থিতি।

রাত্রে নরেনের ফোন এল, সরি সীমা, আজ জন্মদিনের দিনও তোমাকে একটু সঙ্গ দিতে পারলাম না।

—ঠিক আছে, কী আর করা যাবে। রুক্ষ একটা উত্তর দিয়ে সামান্য একথা ওকথা বলে সীমা ফোন কেটে দিল।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সীমার নিজেকে খুব হালকা মনে হল। কিন্তু সন্ধেবেলায় একাকিত্ব বোধ থেকে আবার নরেনের প্রতি সীমার মন বিষিয়ে উঠল। ওর শুধু মনে হতে লাগল, মানুষের কাছে কি, খালি কাজে উন্নতি করা এবং টাকা উপার্জন করাটাই একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে? নরেনের সময় তো খালি অর্থ উপার্জন এবং ভোগবিলাসের সুবিধার ব্যবস্থা করার প্রচেষ্টাতেই অতিবাহিত হয়ে যায়। সারাটা দিন ও বসে বসে কী করে? সময় কাটাবার জন্য চাকরি করাও সীমার কোনওকালে পছন্দ ছিল না।

সেই মুহূর্তে কলিংবেল-টা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই মুখোমুখি হল অনিলের। অফিসের এক পিওন এসেছে ওর সঙ্গে। অসময়ে অনিলকে দেখে ক্ষণেকের জন্য মনের তিক্ততা ভুলে গিয়ে গতকালের সময় কীভাবে কাটিয়েছিল মনে পড়ে গেল সীমার।

সীমাকে দেখে অফিসের পিওন বলল, ম্যাডাম, স্যার অফিসের একটা জরুরি ফাইল বাড়িতে ভুলে রেখে গেছেন, আমি সেটা নিতে এসেছি।

নরেনের স্টাডিরুমে গিয়ে দেখল অনেকগুলো ফাইল ওখানে রয়েছে। ওর মধ্যে কোনটা দিতে হবে বুঝতে পারছিল না সীমা। তখনই পিছনে অনিলের কণ্ঠস্বর শুনল, আপনার সমস্যা কম করতেই আমি ওর সঙ্গে এসেছি। চলুন আমি ফাইলটা খুঁজে নিচ্ছি। একটা ফাইল বেছে সেটা ভালো করে দেখে পিওনের হাতে ফাইলটা ধরাতেই পিওন ফাইলটা নিয়ে চলে গেল। অনিলও বেরোতে যাবে, এমন সময় সীমা পেছন থেকে বলল, এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যান।

—না না আজ নয়, পরে একদিন স্যারের সঙ্গে এসে চা খেয়ে যাব।

—আসলে চা-টা তো একটা এক্সকিউজ। সত্যি কথা বলতে কি একাকিত্ব কাটাতেই আপনার সঙ্গে বসে একটু আড্ডা মারার ইচ্ছে হচ্ছিল। সীমা মনের কথা বিনা দ্বিধায় বলে ফেলল।

এরপর সঙ্গ দিতে অনিলও থেকে গেল এবং গল্পে দুজন মেতে উঠল। হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই অনিল উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘড়িতে রাত আটটা বেজে দশ মিনিট।

—আমার এখনই যাওয়া দরকার, কথায় কথায় রাত হয়ে গেল, বলে অনিল বেরিয়ে গেল।

সীমার ইচ্ছা করছিল আরও কিছুক্ষণ অনিলের সঙ্গে সময় কাটাতে কিন্তু সামাজিক মর‌্যাদা লঙ্ঘন করারও ওর সাহস ছিল না। বাধ্য হয়ে অনুমতি দিতেই হল।

অনিল চলে যাওয়ার পর ওর ব্যক্তিত্বেরই আকর্ষণ নিয়ে সীমা নিজের মনে নানা বিশ্লেষণ করে চলছিল। ওর কথা বলার স্টাইল, পোশাকের চয়ন, শব্দের মারপ্যাঁচ কোনও বিষয়ে গভীর জ্ঞান ইত্যাদি সবকিছু মিলে সাধারণের ভিড়ে ওকে একদম আলাদা করে দাঁড় করিয়ে দেয়।

আজি ঝড়ের রাতে…

আঠারো বছর বয়সের সময় যখন আমি কলকাতায় পালিয়ে যাই, তখন নন্দিনীর বয়স ছিল পনেরো। আজ তিন বছর পর আমি বাড়ি ফিরলাম। এখন আমার বয়স একুশ আর নন্দিনীর আঠারো। মা বললেন, দুজনের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে এবার চারহাত এক করতে হবে।

ওই যে কথায় আছে না, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে তিন বিধাতা নিয়ে। কেউ জানে না কার ভাগ্য কার সঙ্গে লেখা হয়ে আছে। কিন্তু শুরুটা তো এমন ভাবে হয়নি, হয়েছিল এক প্রাণবন্ত ছন্দে। নন্দিনী যে কখনও অন্য কারও হয়ে যাবে সে কথা তো কোনওদিন ভেবেই দেখিনি।

নন্দিনীর সঙ্গে ছোটোবেলায় স্কুলে গেছি। পুতুল খেলেছি। পুতুলের বাবা মা সাজার সময় আমি বাবা হয়েছি ও মা হয়েছে। কখনও আবার বর-বউ খেলেছি। ওদের বাড়িতে গেলে নন্দিনীর মা আমাকে খুব আদর যত্ন করতেন। স্কুল ছুটি থাকলে দুপুরবেলা প্রায়ই ডেকে নিয়ে খাওয়াতেন এবং দস্তুর মতো দুজনকে পাশে বসিয়ে হাত দিয়ে ভাত মেখে খাইয়ে দিতেন। আবার আমাদের দুজনকে একসাথে দাঁড় করিয়ে আপনা-আপনি বলাবলি করতেন, আহা, বেশ মানিয়েছে দুটিকে।

তখন ক্লাস টু-তে পড়ি। অনেক ছোটো ছিলাম তাই হয়তো কথাটার মানে বুঝতে পারতাম না। শুধু এটুকু বুঝতাম আমাদের দুজনকে ওনারা খুব পছন্দ করতেন। নন্দিনীর প্রতি আমার একটু বেশিই দাবি ছিল অন্যান্য বন্ধুবান্ধব বা ওর আত্মীয়স্বজনের থেকে এবং সেই ধারণা ক্রমশই বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছিল আমার মনের মধ্যে। সেই অধিকারে আমি কখনও তাকে শাসন করতাম এবং সেও আমার সব শাসন মাথা পেতে নিত সহিষ্ণু ভাবে।

মাঝে মাঝে তাকে উপদ্রব করতাম, শাস্তি দিতাম কিন্তু কোনওদিন টুঁ-শব্দটি করেনি। নির্দ্বিধায় সব মাথা পেতে নিত। খুব সুন্দরী বলব না তবে বেশ ভালোই দেখতে ছিল। পাড়ার বখাটে ছেলেদের কাছে সে সৌন্দর্যের কোনও দাবি ছিল না। তবে আমি জানতাম আমার আদেশ পালন করার জন্যেই তার জন্ম এবং হয়তো সেই কারণে আমি অনেকটাই তাকে অবহেলা করতাম।

বাবাকে হারিয়েছি বছর দুই আগে। শুনেছি বাবা বলতেন, বাড়ুজ্জ্যে মশাই ওর হাত দেখে বলেছেন আমার রাজা একদিন সত্যি-সত্যিই দেশের রাজা হবে। বাবার ইচ্ছা আমি পড়াশোনা করে অনেক বড়ো হই। তাঁর মতো কলমপেশার চাকরি যেন না করি। ছোটোবেলায় আমি কিন্তু মনে মনে তা, কোনওদিন চাইতাম না। আমি চাইতাম সারাদিন ধরে শুধু খেলাধুলা করব। তাই জীবনে আমি হয়তো কোনও খেলাই বাদ দিইনি।

মার্বেলগুলি, ডাংগুলি, সিগারেট-এর প্যাকেট কেটে তাস, পিট্টু ছাড়াও মেয়েদের সঙ্গে গোল্লাছুট, আরও কত বলব। ফুটবল, ক্রিকেট তো একটা ইতিহাস। দুপুর রোদে ঘর থেকে পালিয়ে যেতাম ক্রিকেট ম্যাচ খেলার জন্যে। মা আবার আমাকে খোঁজ করে ঘরে এনে বেঁধে রাখতেন। কখনও মার সবে একটু তন্দ্রা এসেছে, সেই ফাঁকে বাঁধন খুলে, দরজার খিল খুলে আবার পালিয়ে গিয়েছি। পরে দাদাদের হাতে মার খেয়েছি কিন্তু খেলা থেকে কখনও পিছপা হইনি।

প্রতিদিন বিকালে স্কুল থেকে ফিরে এসে কোনওমতে নাকেমুখে গুঁজে সোজা অরবিন্দ স্কুলের মাঠে। আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। এদিকে মা ছাতা নিয়ে যখন আমাকে মাঠে খুঁজতে গেছে তখন আমি স্ট্রাইকার রোলে সররা খাচ্ছি।

যাইহোক ধীরে ধীরে খেলাধুলার জগৎ থেকে ইতি টানলাম। শৈশব থেকে কৈশোরে পা বাড়াতেই দেখলাম আমার বন্ধু রঞ্জন ডাক্তার হওয়ার বাসনায় তেড়েফুঁড়ে লেগেছে। হঠাৎ একদিন এও শুনলাম যে, সে কলকাতায় পালিয়ে গেছে। উঠেছে কোনও এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখানে থেকে সে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন সফল করবে।

আমার জীবনেও সেরকম অনেক উচ্চাশা ছিল। ওর মতো ডাক্তার না হতে পারি (যদিও মনে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার বাসনা ছিল) নিদেনপক্ষে একটা সরকারি চাকুরে অর্থাৎ সরকারি অফিসের বড়োবাবু হওয়ার জন্য মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম।

ছোটোবেলার কথা আবছা মনে পড়ে। বাবাকে দেখতাম হাওড়া ব্রিজের নির্মাণ পদ্ধতি কত সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতেন। তাছাড়া বাবার আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই উঁচু পোস্টের ইঞ্জিনিয়ার। বাড়িতে তাঁরা এলে বাবা তাঁদের অনেক সম্মান করতেন। সেদিন যেন বাড়িতে উৎসব আনন্দের ঢেউ উঠত। কত পদ যে-মাকে রান্না করতে হতো তার হিসাব নেই।

আমিও শিশুকাল থেকে সেই ইঞ্জিনিয়ার আত্মীয়দের হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে সম্ভ্রমের আসন দিয়েছিলাম। যেন আমার ভারতবর্ষের পূজ্য দেবতা। তেত্রিশ কোটি দেবতার ছোটো ছোটো সংস্করণ। যেন বাবা বিশ্বকর্মার সন্তান, নাতি, পুতি এঁরা। বাবা বিশ্বকর্মা কী কী খেতে ভালোবাসতেন জানি না, তবে এদের খাতির আরও বেশি ছিল।

আমিও রঞ্জনের মতো একবার বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলাম কলকাতায়। যাই হোক বালিগঞ্জে একটা চেনা লোক পেয়ে গেলাম। তার বাড়িতেই উঠলাম। ভদ্রলোকের নাম বীরেন দাস। তাঁর আবার তিন মেয়ে, বড়োজন ভালো গান গাইতে পারে অনেক মেডেলও পেয়েছে। সে আমার চেয়ে বছর দু-তিনেক বড়ো। আবার প্রেমও করে। ছেলে সাধারণ কারখানায় কাজ করে।

বীরেনবাবুর আপত্তি ওই ছেলের সঙ্গে বড়ো মেয়ের বিয়ে দিতে। সেই দুঃখে বড়ো মেয়ে কন্টিনিউয়াস সাতদিন অনশনে। বীরেনবাবু অনেক কষ্টে বিয়েতে রাজি হলেন এবং তারপর বড়ো মেয়ে অনশন ভঙ্গ হল। মেজটার বিয়ে হবে হবে করছে। ছেলে আর্মিতে চাকরি করে। ছোটোটা স্কুলে পড়ে। আমার উপর দায়িত্ব পড়ল ছোটোটাকে পড়ানোর।

মাথায় গোবর আছে বললেও বেশি বলা হবে। আমি পড়াব কী, সে উলটে আমায় পড়িয়ে দেয়। জানি না ওনারা কী ভেবেছিলেন বা আমার ছাত্রীর মনে কী মনোভাব ছিল। তবে ওদের পাড়ায় কানাঘুষো চলত আমি ওই বাড়ির ছোটো জামাই। যাই হোক মা কেঁদেকেটে যখন খবর পেলেন যে, আমি কোথায় আছি তখন দাদাদের হাত দিয়ে পড়াশোনার জন্য কিছু কিছু দক্ষিণা পাঠাতে লাগলেন।

পড়াশোনাও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। আর টিউশানির পয়সা আমি নিতাম না, ওটা বীরেনবাবুর কাছে জমা থাকত। ওনার রেফারেন্সে গ্রাজুয়েশনের পরে ম্যানেজমেন্ট পড়তে গেলাম। কারণ উনি বলেছিলেন সাধারণ গ্রাজুয়েট হয়ে কিচ্ছু হবে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই শুধু বাড়বে। খরচা ম্যানেজ করেছিলাম ওই জমা টিউশানির পয়সা আর ওনার সামান্য কিছু সাহায্য দিয়ে। বীরেনবাবুকে কোনওদিন ভুলব না!

মাঝে মাঝে কলকাতার মিছিল-মিটিং-এ যোগ দিতাম। সেই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভযংকর ছিল। দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা অবিলম্বে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল এবং সে সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। সেই দুঃসাধ্য কাজটা কীভাবে করব, লোকে উপদেশ দিত কিন্তু দৃষ্টান্ত কেউ দেখাত না।

সেই শহরে তখন নীলুদা, রূপকদার পাল্লায় পড়ে দেশের কাজে লেগে পড়লাম। বদমাস ছিলাম ঠিকই, তবে সেই কাজে উৎসাহের কোনও ঘাটতি ছিল না। আমরা পাড়াগাঁয়ের ছেলে হতে পারি, কলকাতার ওই ইঁচড়ে-পাকা ছেলেদের মতো সব জিনিস নিয়ে পরিহাস করতে শিখিনি। সুতরাং আমাদের নিষ্ঠা অত্যন্ত দৃঢ় ছিল।

আমাদের সভায় নেতা-নেত্রীরা বক্তৃতা দিতেন, আর আমরা চাঁদার বই হাতে নিয়ে না-খেয়ে দুপুর-রৌদ্রে টো-টো করে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে বেড়াতাম। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে লিফলেট-পত্রিকা বিলি করতাম। সভার জন্য চেয়ার-বেঞ্চি সাজাতাম। আমাদের নেতার নামে কেউ একটা খারাপ মন্তব্য করলে মারামারি পর্যন্ত করতে এগিয়ে যেতাম। শহরের ছেলেরা এসব দেখে আমাদের নিয়ে মজা করত।

আসলে পার্টির লোকেরা যে আমার ব্রেন ওয়াশ করে রেখেছে। দেশের এখন দুরবস্থা, তাই দেশের জন্য লড়তে হবে। মনে মনে আমি প্রতিজ্ঞাও করেছিলাম, আজীবন বিয়ে না করে দেশের জন্য লড়ে যাব। মাকেও তাই বললাম, পড়াশোনা শেষ না করে আমি বিয়ে করব না।

এসব ভাবনা যখন চলছিল, তার ঠিক ছমাস পরেই খবর পেলাম, এলআইসি-তে কর্মরত অবিনাশবাবুর সাথে নন্দিনীর বিয়ে হয়ে গেছে। রাজনৈতিক ডামাডোলে অসহায় ভারতের চাঁদা-আদায়ের কাজে ব্যস্ত ছিলাম, নন্দিনীর বিয়ের খবর তখন অত্যন্ত তুচ্ছ বলে মনে হয়েছিল। পরে শুনেছিলাম দুজনের বয়সের অনেকটাই পার্থক্য, বছর পনেরো তো হবেই।

বন্ধুরা বলেছিল বিয়ের দিন নন্দিনী নাকি খুব কান্নাকাটি করেছিল। বারবার বলছিল রাজা আমাকে ভীষণ ঠকাল। সেই ছোটোবেলা থেকে ওকে আমি ভালোবাসি। সে কথা শুনে আমার চোখের কোণাটা একটু ভিজেছিল ঠিকই আর ঠিক সেই সময়ে রবিঠাকুরের কবিতাটা কোথা থেকে যেন উড়ে এসে আমার দিকে বুকের মধ্যে তার তির নিক্ষেপ করে বলতে চাইল, যে আছে অপেক্ষা করে তার পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর।

ম্যানেজমেন্ট পড়া সবে শুরু করেছি এমন সময় দাদা বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা হয়ে গেল। সংসারে আমি আর মা। কলেজ থেকে ফিরে রাত্রে দুটো টিউশানি ধরলাম। এর ফাঁকে চাকরির সন্ধানও চলতে লাগল। ম্যানেজমেন্ট পড়ার পাঠ অনেক লড়াই ও কষ্টে শেষ হল। রেজাল্ট ভালোই করলাম। অনেক ইন্টারভিউ দেওয়ার পর একটা বিদেশি কোম্পানিতে ট্রেনিং অফিসার-এর কাজ পেলাম। মনে মনে ভাবলাম মাঠে-ঘাটে পার্টির জন্য লেকচার দেওয়াটা এখন বেশ কাজে লাগবে। কাজও যেমন শেখাতে পারব, উপদেশ আর উৎসাহ দিয়ে এক একটা ছাত্রকে আগামী ভারতবর্ষের সৈনিক করে গড়ে তুলতে পারব।

ট্রেনিং শুরু হয়ে গেল। দেখলাম আগামী ভারতবর্ষের চেয়ে প্রোজেক্ট-এর কাজের ধারণা ও প্রোগ্রেস নিয়ে তাদের তাড়া বেশি। প্রোজেক্ট-এর সিলেবাসের বাইরে কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা হলে ম্যানেজারবাবু রাগ করেন। ধীরে ধীরে আমারও উৎসাহ নিস্তেজ হতে লাগল।

আমাদের বেশির ভাগ লোকেদেরই বোকা বুদ্ধি বেশি, আর কাজের বুদ্ধি কম। তাছাড়া বেশির ভাগই প্রতিভাহীন। ঘরে বসে নানান কল্পনা করতেই ব্যস্ত। কার্যক্ষেত্রে নেমে ঘাড়ে লাঙল নিয়ে পশ্চাত্দেশে ল্যাজমলা খেয়ে নতশিরে সহিষ্ণু ভাবে প্রত্যেকদিন মাটি-ভাঙার কাজ করে, সন্ধ্যাবেলায় একপেট জাবনা খেতে পারলেই সন্তুষ্ট থাকে। লম্ফেঝম্ফে আর উৎসাহ থাকে না।

যাই হোক প্রোজেক্ট শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ট্রান্সফার হয়ে গেলাম ভুবনেশ্বর। যে-গ্রামের মধ্যে আমাদের প্রোজেক্ট শুরু হবে তার প্রায় কাছাকাছিই সমুদ্র। ওখানেই একটা গ্রামে মেস ভাড়া করে থাকলাম। চারিদিকে সুপুরি, নারকেল এবং মাদারের গাছ। মেস-বাড়িটার প্রায় গায়ে দুটো প্রকাণ্ড বৃদ্ধ নিমগাছ গায়ে গায়ে সংলগ্ন হয়ে ছায়া দান করছে।

অনেকদিন ধরে একটা কথা বলব বলব করে আর বলা হয়ে ওঠেনি। আসলে আমি নিজেই সেই কথাটাকে বেশি প্রাধান্য দিতে রাজি ছিলাম না। সেই যে অবিনাশবাবু, এলআইসি-তে চাকরি করেন, যার সঙ্গে আমার ছোটোবেলার বান্ধবী নন্দিনীর বিয়ে হয়েছিল তিনিও এই সুদূরে ভুবনেশ্বরে আমাদের পাশের বাড়িতে ভাড়া থাকেন।

অবিনাশবাবুর সঙ্গে দেখা হল, আলাপ হল। আসলে আমরা দুই বাঙালি কলকাতা থেকে এসেছি। আশেপাশের বাড়িতে উড়িষ্যাবাসীরাই বেশি থাকেন। ভাষার অজ্ঞানতায় তাই কথা বলতে একটু অসুবিধা হয়। নন্দিনীর সাথে ছোটোবেলায় আমার যে জানাশোনা ছিল সেটা অবিনাশবাবু জানতেন কি না জানি না, তবে আমিও নতুন পরিচয়ে সে সম্বন্ধে কোনও কথা বলা উচিত হবে বলে মনে করলাম না। এবং নন্দিনী যে কোনওদিন আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল, সে কথাগুলোও আমি ভাবতে চাইছিলাম না। যাই হোক উনি সস্ত্রীক এখানে আছেন আমাকে বললেন, নিমন্ত্রণও জানালেন ওনার বাড়িতে যাওয়ার জন্য।

এক রবিবার প্রোজেক্টে না গিয়ে অবিনাশবাবুর বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। অনেকরকম বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হল। আলোচনার ইতি টানা হল বর্তমান ভারতবর্ষের দুরবস্থা প্রসঙ্গে। তিনি যে সেজন্য বিশেষ চিন্তিত এবং ম্রিয়মান সেটা কিন্তু নয়। কিন্তু বিষয়টা এমন যে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এ সম্বন্ধে ঘন্টাখানেক অনর্গল শখের দুঃখ করা যেতেই পারে।

আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে শুনতে পাই পাশের ঘরে অত্যন্ত হালকা বাসন পড়ার আওয়াজ, দরজা খোলা-বন্ধের শব্দ, আর হাওয়াই চটির খসখস। বুঝতে দেরি হল না, জানলার ফাঁক দিয়ে কোনও কৌতূহলী চোখ আমার দিকে ইশারা করছে।

সেই মুহুর্তে চোখে চোখ পড়তেই আমার মনে পড়ে গেল সেই সরলতা, সেই নিবেদিত প্রাণ এবং শৈশবের প্রেমের ঢলঢল দুটো বড়ো বড়ো চোখ, কালো কালো তারা, ঘনকৃষ্ণ পল্লব, স্থিরস্নিগ্ধ দৃষ্টি। হঠাৎ আমার হৃদপিণ্ডটাকে কে যেন তার ডান হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল আর অব্যক্ত বেদনায় বুকের ভিতরটা টন টন করে উঠল।

সেই বুকের ব্যথা সঙ্গে নিয়ে অবশেষে মেসে ফিরলাম। রাত্রে যখন লিখতে বসি কিংবা কোনও ম্যাগাজিন পড়তে বসি সেই চিন চিন ব্যথাটা শরীরটাকে কেমন যেন অবসন্ন করে রাখে। মনের মধ্যে একটা ভারী বোঝার সঙ্গে শিরা-উপশিরার রক্তগুলো দ্রুতলয়ে ছুটতে থাকে। গভীর রাতে একটু স্থির হয়ে বসে ভাবতে লাগলাম এমনটা কেন হল? বিবেক যেন জিজ্ঞেস করল, তোমার নন্দিনী কোথায় গেল?

বিবেকের প্রশ্নে আমার মনের ভেতর থেকে উত্তর এল, কই তাকে তো আমি ভালোবাসিনি। কবেই তো তাকে মন থেকে মুছে দিয়েছি। সে আমার জন্য অপেক্ষা করবে কেন? বিবেক আবার প্রত্যুত্তরে বলল, নন্দিনীকে তুমি ইচ্ছা করলেই পেতে পারতে। আজ শত চেষ্টা করলেও, মাথা খুঁড়ে মরলেও তাকে আর দেখতে পাবে না।

সেই ছোটোবেলার নন্দিনী যতই তোমার চারপাশে ঘুরে বেড়াক, আজ হয়তো তুমি দূর থেকে তার পায়ের নুপূরের ধ্বনি শুনতে পাবে, দূর থেকে তার শরীর থেকে মিষ্টি সুগন্ধ অনুভব করতে পারবে কিন্তু মাঝখানে চিনের প্রাচীরের মতো একটা দেয়াল থাকবে বরাবর।

মনের অব্যক্ত বেদনাকে চেপে রেখে বিবেককে উত্তর দিলাম, তা থাক না, নন্দিনী আমার কে? প্রত্যুত্তরে বিবেক বলল, নন্দিনী আজ হয়তো তোমার কেউ নয়, কিন্তু এই নন্দিনী তোমার মনের অনেক কিছু হতে পারত।

কথাটা হয়তো সে সত্যি বলেছে। নন্দিনী আমার জীবনে, মননে অনেক কিছুই হতে পারত। আমার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ, আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী, আমার সমস্ত জীবনের সুখদুঃখের অংশীদার ছিল সে। আজ অনেক দূরে, কত আপন ছিল, আজ পর হয়ে গেছে, আজ তাকে দেখার অবকাশ নেই। একটু দেখার চেষ্টা করলে লোকে পরকীয়ার বদনাম দেবে। সেটা হয়তো নন্দিনীর শান্তির জীবনে অশান্তি ডেকে আনবে। আর আমিও সেটা চাই না। তার সঙ্গে কথা বলা তো দূর অস্ত, তাকে নিয়ে চিন্তা করাও পাপ। আর ওই ভদ্রলোক, কোথা থেকে যে উড়ে এসে জুড়ে বসল, শুধু কটা মন্ত্র উচ্চারণ করে নন্দিনীকে আমার কাছ থেকে চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে পালিয়ে গেল।

তবু স্বামীর সুখের সংসারে যে-নন্দিনী বিরাজ করছিল সে যে ওই মানুষটার চেয়ে বেশি করে আমার, এ কথা আমি কিছুতেই মন থেকে উড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। জানি এরকম চিন্তা করা নিতান্ত অন্যায় এবং সেটা আমি স্বীকার করি। তবে নিজের মনের কাছে সেটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। তারপর থেকে আর কোনও কাজে মনঃসংযোগ করতে পারছিলাম না। লাঞ্চের পরে যখন সুপারভাইজাররা ট্রেনিং-এর ক্লাসে বসে সোরগোল করতে থাকত, বাইরে প্রখর রোদ ঝাঁ ঝাঁ করত, গরম বাতাস নিমগাছের ফুলের গন্ধ বহন করে আনত, তখন ইচ্ছা করত… জানি না কী ইচ্ছা করত! এই পর্যন্ত বলতে পারি, ভারতবর্ষের শিল্পের এই সমস্ত ভাবী অফিসারদের প্রযুক্তিগত উপদেশ দিয়ে এই ইট-কাঠ-বালির জীবনযাপন করতে ইচ্ছা করত না।

অফিসের ছুটি হয়ে গেলে আমার ছোট্ট ওই মেসবাড়িতে একলা থাকতে মন টিকত না, অথচ কোনও অফিসের স্টাফ দেখা করতে এলেও অসহ্য লাগত। রাত্রে যখন পাশের একটা পুকুর ধার দিয়ে হাঁটতাম, তখন সুপারি-নারকেলের হেলেদুলে ওঠা অর্থহীন মর্মরধ্বনি শুনতে শুনতে ভাবতাম, মানুষ জাতটা মাকড়সার জালের মতো ভুলগুলিকে বুনতে থাকে। আবার ঘুরে ঘুরে ফিরে এসে কবে যে তাকে শোধরাবে সে নিজেই জানে না। ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করতে মনে পড়ে না, তার পরে প্রয়োজনে মনের বাসনা চরিতার্থ করতে টেনশন নিয়ে মরে।

অবচেতন মনে বিবেকের খোঁচা মারা ভাষণ শুনতে পাই, তুমি নন্দিনীর স্বামী হয়ে বুড়ো বয়স পর্যন্ত বেশ সুখে থাকতে পারতে, আর তুমি কিনা প্রথমে হতে গেলে দেশপ্রেমী এবং শেষে ইট-বালি-চুন-সুরকি কোম্পানির ট্রেনিং অফিসার। আর, অবিনাশবাবু একজন অফিসার, আর তার কি বিশেষ করে নন্দিনীর স্বামী হবার কোনও জরুরি আবশ্যকতা ছিল? বিয়ের আগে পর্যন্ত তার কাছে নন্দিনীও যেমন, রানী লক্ষ্মীবাঈও তেমন। সে কিনা কিছু না ভেবে না চিন্তা করে বিয়ে করে বসলেন আর সরকারি কর্মচারী হয়ে হাজার হাজার টাকা কামিয়ে যাচ্ছেন। যেদিন তরকারিতে বেশি নুন পড়ে যায় সেদিন তিনি নন্দিনীকে গালিগালাজ করেন, আর যেদিন মন প্রসন্ন থাকে সেদিন নন্দিনীর জন্য উপহার কিনে আনেন। গোলগাল শরীর, সু্ট-টাই পরেন, মনের মধ্যে কোনও টেনশন নেই। যাকে পুকুরের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আকাশের তারা গুনতে গুনতে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অবসর সময় কাটাতে হয় না।

যাই হোক, ভদ্রলোক অফিসের কাজে কয়েকদিনের জন্য কলকাতায় গেছেন। অবশ্য যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেছেন। আমি হাঁটছি আর ভাবছি, এই মেসবাড়িতে আজ আমি যেরকম একা আছি নন্দিনীও সেরকম বোধহয় তার ঘরে একাই আছে।

মনে পড়ে, সেদিনটা ছিল মঙ্গলবার। সকাল থেকেই আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে আছে। সকাল আটটা থেকেই টুপটুপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিভির খবরে বলছে ভযংকর এক ঘুর্ণিঝড় ফণী, উড়িষ্যার উপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে। আকাশের ভাবগতিক দেখে আশেপাশের সব স্কুল ছুটি ঘোষণা করে দিয়েছে। প্রোজেক্টের কাজও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। খণ্ড খণ্ড কালো কালো মেঘগুলো যেন আকাশের বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিকালের দিকে মুষলধারে বৃষ্টি এবং সঙ্গে সঙ্গে ঝড় আরম্ভ হল। যত রাত বাড়ছে বৃষ্টি আর ঝড়ের বেগ ভযংকর ভাবে বাড়তে লাগল। প্রথমে পূর্ব দিক থেকে বাতাস বইছিল, ক্রমে উত্তর এবং উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বইতে লাগল।

ওই দুর্যোগের রাতে ঘুমোবার চেষ্টা করা বৃথা। মনে পড়ল, এই দুর্যোগে নন্দিনীও ঘরে একলা আছে। আমাদের মেসবাড়ি তাদের একতলা ঘরের থেকে অনেক মজবুত। কতবার মনে করলাম, তাকে মেসবাড়িতে বসিয়ে রেখে আমি না হয় পুকুর পাড়ে গ্রামের কোনও চালাঘরের নীচে দাঁড়িয়ে বিধ্বংসী ঝড়ের রূপ উপভোগ করব। কিন্তু কিছুতেই মন স্থির করে উঠতে পারলাম না। অনেকটা মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আটকে গেলাম।

রাত যখন একটা-দেড়টা হবে হঠাৎ আরও প্রবল বেগে ঝড়ের সোঁ সোঁ ডাক শোনা গেল। সমুদ্র যেন উথাল পাতাল হয়ে ছুটে আসছে। ঘর থেকে ছাতা হাতে বাইরে বেরোলাম। দেখি একটা রক্তকরবী গাছ ঝড়ের দাপটে একদম শিকড় থেকে উপড়ে পড়েছে। আমার খুব পছন্দের ফুল। মনে পড়ে কতদিন নন্দিনী তার ওড়নায় বেঁধে আমার জন্য নিয়ে এসেছে। সে কথা মনে পড়তেই কটা ফুল কুড়িয়ে নিলাম। নন্দিনীর বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। পথে যে-পুকুরের পাড়, সে পর্যন্ত যেতে না যেতেই দেখি হাঁটুজল হয়ে গেছে। পুকুরের পাড়ের উপর যখন উঠে দাঁড়ালাম তখন দ্বিতীয় আর একটা জলের স্রোত এসে আছড়ে পড়ল।

পুকুর পাড়ের একটা অংশ প্রায় দশ-এগারো হাত উঁচু। পাড়ের উপর আমি যখন উঠে দাঁড়ালাম, বিপরীত দিক থেকে আরেকজন লোকও উঠে দাঁড়াল। লোকটা যে কে সেটা আমার সমস্ত অন্তরাত্মা, মাথা থেকে পা পর্যন্ত আমার সমস্ত শরীর অনুভব করতে পারল। এবং সেও যে আমাকে চিনতে পারল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শুধু একটা কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম রাজা, তুমিও এখানে?

সমস্ত জলমগ্ন হয়ে গেছে কেবল হাত-পাঁচ-ছয় দূরত্বে দ্বীপের উপর আমরা দুটি প্রাণী এসে দাঁড়ালাম। তখন প্রলয় চলছে, আকাশে তারার আলো ছিল না এবং পৃথিবীর সমস্ত প্রদীপ যেন নিভে গেছে। তখন একটা কথা বললেও বলতে পারতাম। হাতে ধরা সিক্ত রক্তকরবী ওর পায়ের কাছে পড়ে গেল কিন্তু একটা কথাও বলা গেল না। কেউ কাউকেও একটা কুশল প্রশ্নও করল না। শুধু দুজনে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে মনে রবিঠাকুরের গান গেয়ে উঠলাম, আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার।

আজ সমস্ত বিশ্বসংসার ছেড়ে নন্দিনী আমার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আজ এই বিপদের দিনে আমি ছাড়া নন্দিনীর পাশে কেউ নেই। সেই কবে শৈশবে, কোন এক জন্মান্তর, কোন এক পুরোনো রহস্য অন্ধকার থেকে ভেসে, এই সূর্য‌্য আর চন্দ্রের আলোকে আলোকিত হয়ে এই পৃথিবীর কোলে আমারই পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল; আর, আজ বহুদিন পরে সেই আলোকিত পৃথিবী ছেড়ে এই ভযংকর জনশূন্য প্রলয় অন্ধকারের মধ্যে নন্দিনী একাকিনী আমারই পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে। জন্মের পরে সেই ফুলের কলিকে যেমন বিধাতা আমার হাতে সমর্পণ করেছিল, আজও প্রকৃতির তাণ্ডবে জীবনমৃত্যুর মাঝখানে সেই বিকশিত পুষ্পকে আমারই কাছে এনে দাঁড় করিয়েছে। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে আর একটা ঢেউ আসলেই পৃথিবীর এই সীমানা থেকে বিচ্ছেদের শেষ বৃন্তটুকু ছিঁড়ে, আবার আমরা দুজনে এক হয়ে যেতে পারি।

ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি সে ঢেউ যেন আর না আসে। স্বামী সংসার নিয়ে নন্দিনী যেন বাকি জীবন সুখে থাকে। ওই রাতে ফণীর তাণ্ডবে হয়তো অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তবু এই মহাপ্রলয়ের তীরে দাঁড়িয়ে নন্দিনীকে ফিরে পেয়ে এক অনন্ত আনন্দের আস্বাদ পেয়েছি।

রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। ঝড় থামল, জলও নেমে গেল। নন্দিনী কোনও কথা না বলে বাড়ির পথে পা বাড়াল। তার পায়ের সামনে পড়ে থাকা রক্তকরবী ফুলগুলো কি বলল জানি না, তবে আমিও কোনও কথা না বলে মেসবাড়ির দিকে রওনা হলাম। কোনওদিন কবিতা লিখিনি, কিন্তু আজ বিবেকের দংশন খেয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে কয়েকটা লাইন লিখে ফেললাম,

আজ এই প্রলয়ে দিনে,

মেঘে মেঘে গুরু গর্জনে

ধেয়ে আসে ঘুর্ণিঝড় ফণী,

তুমি এসে দাঁড়ালে নন্দিনী।

নূপুর ছিল না ওই পায়,

এভাবে কেউ অভিসারে যায়?

পায়ে পায়ে বাজে না কিঙ্কিণী,

কেন এসে দাঁড়ালে নন্দিনী?

এলে যদি কেন গেলে একা?

আর কি হবে না তবে দেখা?

শৈশবের কৈশোরের রানি

সব ভুলে গেলে নন্দিনী?

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। মেসে ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, আমি একজন সাচ্চা দেশপ্রেমীও হতে পারলাম না, ইঞ্জিনিয়ারও হতে পারলাম না, আমি সামান্য এক ইট-বালি-চুন-সুরকি কোম্পানির ট্রেনিং অফিসার। সাধারণ মেস বাড়িতে থাকি। শুধু ক্ষণিকের অবকাশে এক প্রলয়রাত্রির উদয় হয়েছিল আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে। সমস্ত দিনরাত্রির মধ্যে, একমাত্র সেই প্রলয়রাত্রিতে আমার তুচ্ছ জীবনে নন্দিনীকে ফিরে পাওয়াই আমার জীবনের চরম সার্থকতা।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব