প্রতি বছর ভারত থেকে বহু মানুষ বেড়াতে আসেন অস্ট্রেলিয়াতে। তার মধ্যে বেশির ভাগ টুরিস্ট সাধারণত সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন বা গোল্ড কোস্ট দেখতে যায়। অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যেকটি শহরেই ঘুরে দেখার মতো অনেক কিছু আছে। তবে শহরের কংক্রিটের জঙ্গল, যানজট, আর ব্যস্ত জীবনযাত্রার থেকে একটু বাইরে বেরোলেই টুরিস্টদের জন্য অপেক্ষা করছে অন্য এক অস্ট্রেলিয়া। ইচ্ছে করলে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেমন সমুদ্র সৈকতে শুয়ে সূর্যস্নান করে অলস ভাবে দিন কাটানো যেতে পারে, তেমনি ভোরবেলা সমুদ্র সৈকতের বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাতভ্রমণটা সেরে নিয়ে, সকালের জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়া যেতে পারে সারাদিনের জন্য অস্ট্রেলিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে।

কর্মক্লান্ত ২০২২-এর শেষ সপ্তাহে হঠাৎ করেই মনে হল সিডনিতে আর ভালো লাগছে না। শরীর মন দুটোই যেন দৈনিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে পালাতে চাইছে। আগেই বলে রাখি, আমি কিন্তু সিডনিতে টুরিস্ট নই। গত পঁচিশ বছর হল এটাই আমার বাসস্থান। আর মনে যখন হয়েছে, তখন কোথাও তো যেতেই হবে। বাড়িতে আমি আর আমার হাজব্যান্ড। দু’জনে মিলে আলোচনা করে ঠিক হল সিডনির কাছেপিঠেই কোনও নির্জন জায়গায় এক সপ্তাহ ঘুরে আসা যাক। বেশ কয়েকটা জায়গা ভেবে শেষ পর্যন্ত স্থির হল পোর্ট স্টিফেন্স-এর নেলসন বে (Nelson Bay) । যতটা সহজে জায়গা নির্ধারণ করা গেল, একটা হোটেল বুক করা ঠিক ততটা সহজ হল না।

ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ার-এর সময় অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় দু-সপ্তাহ ছুটি থাকে। দেশ-বিদেশ থেকে লোকেরা এই সময় এখানে বেড়াতে আসে। তাই আগে থেকে সব ব্যবস্থা না করা থাকলে শেষ মুহূর্তে হোটেলে জায়গা পাওয়া একরকম অসম্ভব। তাও শেষ পর্যন্ত কপালের জোরেই হোক বা একজন কেউ তার বুকিং ক্যানসেল করেছে বলেই হোক, একটা হোটেলে জায়গা পেয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম আর কিছু না হোক, সমুদ্র সৈকতে বালির উপর শুয়েই সাতদিন কাটিয়ে দেব।

সিডনি থেকে ২১৫ কিলোমিটার উত্তরে, গাড়িতে মাত্র আড়াই ঘন্টার পথ এই পোর্ট স্টিফেন্স। অনেকগুলো ছোটো ছোটো উপসাগরের সমন্বয়ে তৈরি এই পোর্ট। নেলসন বে, সালামন্ডার বে, শোল বে, এনা বে আর ফিঙ্গাল বে— এরকমই কয়েকটি উপসাগর।

আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে অস্ট্রেলিয়াতে ব্রিটিশ উপনিবেশের শুরুর দিকে এই বন্দর তৈরি করা হয়। এখান থেকেই কাঠ আর উল রফতানি করা হতো। সে সব পার্ট অবশ্য অনেক আগেই ঢুকে গেছে। এখন পোর্ট স্টিফেন্স মূলত একটি পর্যটন শিল্প কেন্দ্র হিসেবেই বেশি পরিচিত। জায়গাটার একটা বিশেষত্ব হল এখানে সমুদ্র, বালিয়াড়ি, পাহাড় আর অরণ্যের খুব সুন্দর ভাবে মেলবন্ধন ঘটেছে। তাই নেলসন বে খুব সহজেই সবরকম ভ্রমণপিপাসু মানুষদের খুশি করতে পারে।

এই যেমন ধরুন যারা সমুদ্র ভালোবাসেন তারা সমুদ্রে মাছ ধরা, তিমি বা ডলফিন দেখা, এমনকী এদের সাথে একই সাথে জলে সাঁতার কাটা, স্নোরকেলিং এমনকী নৌকা ভাড়া করে সমুদ্র বক্ষে প্রমোদ ভ্রমণেও বেরোতে পারে। প্রমোদ তরণীতে চেপে ডলফিন দেখতে যাবার আনন্দ ছিল অকল্পনীয়।

পোর্ট স্টিফেন্সকে অস্ট্রেলিয়ার ডলফিন রাজধানিও বলা হয়ে থাকে। এখানে কয়েকশো ডলফিন স্থায়ীভাবে বাস করে। তাছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে অন্য জায়গা থেকেও আরও ডলফিন এখানে আসে। ডলফিন আমার মনে হয় কৌতুকপ্রিয় পশুদের মধ্যে অন্যতম। এখানকার ডলফিনদের দেখলে মনে হয় টুরিস্টদের মনোরঞ্জন করাই এদের একমাত্র কাজ। রোজ এত টুরিস্ট দেখতে দেখতে এরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাই ভয় পেয়ে পালিয়ে না গিয়ে টুরিস্টদের বিনোদনের জন্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি করে না। অনেকেই আবার ডলফিনের সাথে জলে নেমে সুইমিং করল।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...