আপনাকে আসতেই হবে যে করেই হোক। জানি না এরই নাম টেলিপ্যাথি কিনা! আপনি যে হঠাৎ আমার মুখোমুখি হবেন এটা কিন্তু আমি প্রতি মুহূর্তে আশা করছিলাম। আশ্চর্যের বিষয়, মনে মনে যা ভাবছিলাম সেটাই হয়েছে। আপনার কাছে আমার উপস্থিতি অপ্রত্যাশিত হলেও, আমার কাছে কিন্তু আপনার উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। আপনার আসার অপেক্ষায় আমি উন্মুখ হয়ে ছিলাম। আমি ছোটোবেলা থেকেই হই-হট্টগোলের চরম বিরোধী সেই কারণে লোকে আমাকে অসামাজিক বলতে দ্বিধা করে না।

কথাটা একবার ভেবে দেখুন, মেয়ে আমার পাশের বাড়ির প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও ওর বিয়েতে আমি যাইনি। অথচ মজার কথা এই যে, আজ মেয়েটির শ্বশুরমশাই আমার বাবাকে বউভাতে আসার নিমন্ত্রণ করতেই আমি এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কিন্তু সচরাচর কোনও অনুষ্ঠান বাড়ি যাই না। আরও মজার কথা এই যে, মেয়ের বাড়ির লোকেরা বউভাতে নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের যোগদান করার জন্যে বাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমাকে ওরা দলের সঙ্গে বাসে করে আসতে অনুরোধ করেছিলেন। আমি তাদের সঙ্গে দল বেঁধে আসতে অস্বীকার করেছিলাম।

ওদের বলেছিলাম, নাসিরপুর খুব দূরে নয় আমি হেঁটেই চলে যেতে পারব। আমার জন্যে চিন্তা করবেন না। তারপর আমি একাই হেঁটে চলে এসেছি এতটা পথ। এখন আমার নিজের কাছেই ব্যাপারটা কী রকম যেন অদ্ভুত লাগছে! এখন ভাবছি কেন এলাম? না এলেই হতো। আসার আগে একবারের জন্যেও কিন্তু মনে হয়নি যাব না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কেউ হয়তো আমাকে জোর করে এখানে টেনে এনেছে। নইলে এরকম হওয়ার তো কথা নয়।

সন্তোষবাবু অর্পণের কথায় সায় দিয়ে বলেন— এরকম হয় কখনও কখনও। ইচ্ছের বিরুদ্ধে এবং মনের তাগিদ না থাকলেও অনেক সময় কাজটা আমাদের করতে হয়।

—আমি স্বীকার করছি আপনার কথা। কিন্তু আমার জীবনে আজকের দিনের ঘটনাগুলো সব অন্যরকম। এর পেছনে আমি সঠিক কোনও যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। একটু থেমে অর্পণ আরও বলে, আমি প্রমাণ করে দেব যে আমার সেদিনের দেখা স্বপ্নের সাথে আজকের ঘটনাগুলোর কতটা সাযুজ্য। ভেতরে ঢুকলেই দেখবেন টেন্টহাউসের ভাড়া করা তিন-চারটি একুশ- বাইশ বছরের তরুণী সকলকে স্ন্যাক্স পরিবেশন করছে। তাদের পরনে কালো রঙের শাড়ি। তাদের মাঝ পিঠ অবধি সাবানে ফাঁপানো খোলা চুল। কপালে গাঢ় লাল রঙের টিপ। দেখবেন আমরা ভেতরে প্রবেশ করে একটু এগিয়ে যাওয়া মাত্র একটি মেয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে আমাদের স্ন্যাক্স খাওয়ার জন্যে অনুরোধ জানাবে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে যেই প্রশ্ন করব— আজকের এই শুভ সন্ধ্যায় তোমার অঙ্গে কালো পোশাক কেন? আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন, মেয়েটি একগাল হেসে আমার প্রশ্নের জবাবদিহি করবে এই বলে— অশুভ রঙের বিপরীত হল লাল সেই কারণে কপালে লাল টিপ এঁকেছি।

সন্তোষবাবু অতিশয় উত্তেজিত হয়ে বলেন— এবার ভেতরে চলো। তোমার কথার সত্যতা যাচাই করা যাক। গিয়ে পরখ করা যাক তোমার দেখা স্বপ্নের সাথে বাস্তবের কতটা মিল?

সিংহ দরজা দিয়ে প্রবেশ করে একটু এগিয়ে যেতেই অর্পণের কথা অনুযায়ী ত্রস্তপায়ে একটি মেয়ে কাছে এগিয়ে আসে। শামিয়ানার বাইরে দাঁড়িয়ে অর্পণ মেয়েটির সম্বন্ধে যা কিছু ভবিষ্যৎ বাণী করেছিল তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে যায়। অমাবশ্যার অন্ধকারের চেয়েও ঘন কালো রঙের শাড়ি পরা মেয়েটির কপালে জ্বলজ্বল করছিল সিঁদুর রাঙা লাল টিপ।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...