একজন ব্যক্তি যদি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হন, তাহলে তিনি হয়তো সবকিছু হালকা ভাবে আন্দাজ করতে পারেন। কিন্তু ‘ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন’ চোখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অসুখ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে চোখের এই অসুখটিকে বলা হয়— চার্লস বনেট সিন্ড্রোম। এই প্রসঙ্গে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুবি মিশ্র জানিয়েছেন বিস্তারিত।

বাইলেটাল অ্যাডভান্সড ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা আক্রান্ত ৭০ বছর বয়সি এক মহিলা নিয়মিত চেক-আপের জন্য হাসপাতালের বহির্বিভাগে যেতেন। তিনি কোনও স্নায়বিক বা মানসিক অক্ষমতা ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। গত পাঁচ বছর ধরে তার উভয় চোখেই দৃষ্টিশক্তি কম ছিল। তার অ্যাপয়েন্টমেন্টের কয়েক সপ্তাহ আগে, তিনি আলোর ঝলক দেখতে শুরু করেন। কয়েক দিন পরে, তিনি তার ঘরের সোফায় বসে ধূসর মানব মূর্তি দেখতে পান। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত চোখের সামনে এবং তারপর বাতাসে মিলিয়ে যেত— এমনটাই জানিয়েছেন ওই রোগী। তিনি এও জানিয়েছেন যে, পাগল বলে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে তিনি কাউকে এই কথা বলতে পারেননি। কিন্তু তিনি ডা. রুবি মিশ্র-র কাছে এসে স্বীকার করেছিলেন তার সমস্যার কথা। আসলে, স্নায়বিক এবং মানসিক কারণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিপাকীয় সমস্যার কারণে তিনি চার্লস বনেট সিন্ড্রোম-এ (সিবিএস) ভুগছেন বলে নির্ণয় করা হয় ফাইনালি৷

চার্লস বনেট সিন্ড্রোম, যাকে ‘ফ্যান্টম ভিশন’ও বলা হয়, এমন একটি অবস্থা, যেখানে রোগীর দৃষ্টিপথের ক্ষতির ফলে দৃষ্টিভ্রম হয়। অর্থাৎ রোগী হ্যালুসিনেশন-এর শিকার হন।

১৭৬০ সালে, চার্লস বনেট প্রথম তার নব্বই বছর বয়সি দাদার দুর্বল দৃষ্টিশক্তির অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন বর্ণনা করেছিলেন। তাই এই ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন-কে ‘চার্লস বনেট সিন্ড্রোম’ বলা হয়।

চার্লস বনেট সিন্ড্রোম-এর ক্রমবর্ধমান সমস্যা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ডা. রুবি মিশ্র জানিয়েছেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত বিরল দৃষ্টি-ব্যাধি এবং চোখের গুরুতর সমস্যা বলা যায়। এই সমস্যা বা রোগের প্রধান কারণ হল— বয়স্কদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং সমস্যা লুকিয়ে রাখার কুঅভ্যাস। আমরা নিশ্চিত যে, যদি ম্যাকুলার অবক্ষয়ের রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সঠিক মাধ্যম স্থাপন করা যায়, তাহলে সঠিক সময়ে রোগী চিকিৎসা পাবেন এবং স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে পাবেন।”

ডা. রুবি মিশ্র প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন, একটি প্রতিবেদন অনুসারে, চার্লস বনেট সিন্ড্রোম বা CBS-এর সামগ্রিক প্রকোপ ০.৫ শতাংশ (৫/১০০০), কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে ০.৮ শতাংশ (১/১২০), বয়স্কদের মধ্যে ০.৬ শতাংশ (২/৩৪৬), বয়স্ক এবং কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে ০.৮ শতাংশ (১/১২০) পাওয়া গেছে। ম্যাকুলার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যারা ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ গ্লুকোমা আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ সমস্যা রয়েছে।

চার্লস বনেট সিন্ড্রোম বা CBS-এর ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন থিওরি রয়েছে। এর মধ্যে ‘ডিঅ্যাফারেন্টেশন থিওরি’ অন্যতম। এই থিওরি অনুসারে জানা যায় যে, চোখের সংবেদনশীল ইনপুট হ্রাসের কারণে অক্সিপিটাল কর্টেক্সে বর্ধিত কার্যকলাপের কারণে হ্যালুসিনেশন হয়। সাধারণ কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, গ্লুকোমা, ছানি, রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা, উচ্চ মায়োপিয়া, সেরিব্রাল ইনফার্কশন, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি এবং শিরাস্থ অবক্লুশন।

CBS-এর প্রাদুর্ভাব ৬.৭ শতাংশ থেকে বর্তমানে ৮.১ শতাংশ-এ পৌঁছেছে। হ্যালুসিনেশনগুলি সাধারণ ফটোপসিয়া, গ্রিডের মতো প্যাটার্ন এবং শাখা-প্রশাখা আকারে হতে পারে— যা মানুষ, যানবাহন এবং ক্ষুদ্র বস্তুর জটিল চিত্রের হ্যালুসিনেশন হতে পারে। এগুলি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।

সাধারণত রোগীরা এই সমস্যায় জর্জরিত হন সচেতনতার অভাবে এবং মনগড়া ভয়ের কারণে। মানসিক ভাবে অসুস্থ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন— এই ভয়ে বেশিরভাগ রোগী সিবিএস-এর শিকার হয়ে থাকেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, মোট রোগীর মাত্র ৪৭ শতাংশ রোগী তাদের হ্যালুসিনেশন সম্পর্কে রিপোর্ট করেছেন এবং এক-তৃতীয়াংশ চিকিৎসক এই অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না বা অনিশ্চিত ছিলেন।

আসলে, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন বা চার্লস বনেট সিন্ড্রোম চোখের সমস্যার একটি পর্যায়, যা চোখের নানারকম সমস্যার কারণে তৈরি হয়। তাই ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন-এর সমস্যা দূর করতে হলে চোখ পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং সেইমতো চিকিৎসা করতে হবে। তাই, রোগীকে আশ্বস্ত করা উচিত যে, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন আসলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটেছে, তবেই রোগীর উদ্বেগ এবং মানসিক যন্ত্রণা কমতে পারে।

হ্যালুসিনেশন-এর সমস্যা কমানোর কয়েকটি কৌশলের মধ্যে রয়েছে— দ্রুত চোখের পলক ফেলা, পর্যাপ্ত আলোয় থাকা, পর্যাপ্ত আলোয় টিভি দেখা। ধ্যান এবং অন্যান্য শিথিলকরণ পদ্ধতিও রয়েছে এক্ষেত্রে। আর সবার আগে যা প্রয়োজন তা হল— সমস্যার বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে, দ্রুত চোখের চিকিৎসককে বলে, চোখের চিকিৎসা করানো। উল্লেখ্য, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন-এর জন্য তৈরি হওয়া মানসিক সমস্যা দূর করার জন্য মনরোগ বিশেষজ্ঞরা অনেক সময় ওলানজাপাইন, প্রেগাবালিনের মতো ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন।

ডা. রুবি মিশ্র প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘ভিস্যুয়াল কর্টেক্স’-এ ‘ট্রান্সক্র্যানিয়াল ডাইরেক্ট কারেন্ট স্টিমুলেশন’ (TDCS), হ্যালুসিনেশনের ফ্রিকোয়েন্সি কমাতে পারে। তাই, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন বা চার্লস বনেট সিন্ড্রোম-এর রোগীদের সচেতনতা অপরিহার্য। সেইসঙ্গে, এক্ষেত্রে চক্ষু বিশেষজ্ঞদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ, শুধু চোখের রোগের চিকিৎসা-ই নয়, চোখ পরীক্ষা করার পর, রোগীকে রোগের আসল কারণ ব্যাখ্যা করে, রোগীর ভুল ধারণা দূর করতে হবে। তবেই রোগীর মানসিক বিকার দূর হবে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...