ঘুম থেকে উঠেই জানতে পারি, আজ সারাদিন রিমঝিম দারুণ সব ইভেন্ট। প্রাতঃরাশ সেরে গাড়িতে উঠে ১৪ কিলোমিটার দূরে দলমা পাহাড়ের অংশে ২০০০ ফিট উচ্চতায় অযোধ্যা পাহাড়ে অবস্থিত রাঙাগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নামটা ভারি মিষ্টি! গাড়ির স্পিডমিটারের কাঁটা তথৈবচ কারণ পুরুলিয়া সমতল নয়। অনেকটা মানুষের মনের মতো উঁচুনীচু। উত্তল-অবতল পথ এখানে নিত্যসঙ্গী।

জনপদ আসে, রাস্তায় গাড়ির জ্যাম, রিকশার প্যাঁকপ্যাঁক আওয়াজ, বাজারে মানুষের ঢল, বাসের হর্ন, নগরকেন্দ্রিক ব্যস্ততা— সব ঠেলে সরিয়ে এগোতেই আবার নীলচে পাহাড়। এই পাহাড়ের নাম অযোধ্যা। ডিনামাইটের বিস্ফোরণে অযোধ্যার পাথুরে বুকে রক্ত ঝরিয়ে রাস্তার প্রতিটি বাঁক মসৃণ করে এক তুমুল জলপ্রকল্প তৈরি হয়েছে। তাই আজ বাস্তবিক-ই খোলা পাতার মতো অবিরল পড়ে নেওয়া যায় পাহাড় পাঠের শিলালিপি।

পাহাড়ের মাথায় রাঙাগ্রাম-কে দেখে মনে হল এ যেন পুরুলিয়ার শেষের কবিতা। অল্প সময়ের মধ্যেই মেন্টর আদিবাসী নাচের দল জোগাড় করে ফেলল। বিস্ময়ে দেখি দাক্ষিণাত্যের ভগ্নাংশে ছিন্ন আগ্নেয় আত্মা বাংলার শালতরুর লাবণ্যে বিকশিত উচ্ছ্বসিত মঞ্জরিত। তারই মাঝে মাদলের দ্রিমদ্রিম, মন পাগল করা বাতাসিয়া সাঁওতালি সুর লাল পেড়ে হলুদ শাড়িতে দুলে দুলে নেচে বেড়াচ্ছে। পলাশের ফোঁটা ফোঁটা লাল তাদের শাড়ির পাড়কে বেড় দিয়ে রেখেছে; চলকে যেন না পড়ে! কিছু অর্থের বিনিময়ে এই নৃত্য পরিবেশনের ব্যবস্থা ও চিত্রগ্রহণ। নাচের শেষে চকোলেট, বিস্কিট, লজেন্স — সব বিলি করা হল।

আজ বিকেলের পাঠে রয়েছে আদি নৃত্যশৈলী ছৌ নাচ প্রদর্শন। পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত খ্যাতনামা শিল্পী শ্রীগম্ভীর সিং-এর তত্ত্বাবধানে ও পরিবেশনায় এই অনুষ্ঠান হবে ছাতাটাঁড় নামে এক মাঠে। গাড়ি করে পৌঁছে দেখি চৈত্রের অস্তমিত সূর্যের আলো মাঠের একলা পলাশ গাছকে আগলিয়ে রেখেছে। ছাতাটাড়ের একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। প্রাচীনকালে রাজারা নিজের ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তি দেখানোর জন্য এই মাঠে রাজছত্র লাগাতেন এবং প্রজাসাধারণ এসে ওই ছাতার তলায় প্রণাম করে আনুগত্য প্রকাশ করত। এখনও বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে এই মাঠে বিশাল পরব হয় এবং এই উপলক্ষ্যে মেলা বসে।

যথাসময়ে ছৌ নাচ শিল্পীরা এসে ওই পলাশ গাছের গোড়ায় জড়ো হয়ে অঙ্গসজ্জা শুরু করলেন। আস্তে আস্তে প্রচুর স্থানীয় লোকের সমাগম হতে লাগল। গাছের তলায় বসে শিল্পীরা তাদের মেকওভার করলেন। কিছু পুরুষ শিল্পী আব্রু রেখে একটু একটু করে পূর্ণাঙ্গ রমণীতে পরিণত হলেন। অদ্ভুত! খুব কাছ থেকে দেখলাম যারা রমণী হলেন মেকআপ পরবর্তীকালে তাদের চলন বলন একেবারে পালটে গিয়ে তারা যেন সত্যি সত্যিই রমণী হয়ে উঠলেন। চিত্রগ্রাহক বন্ধুরা হুমড়ি খেয়ে ছবি তুলছে।

একটু গুছিয়ে বসতেই শুরু হল নাচ। মেঠো এই মঞ্চসজ্জায় ক্রমশ ধুলোর ঝড় উঠল। মল্ল রাজাদের ভূমি যার ব্যাকড্রপে আগুনে পলাশ আর দৃশ্যত কিছু সৈনিক যারা শারিরীক নিপুণতায় দর্শকের চোখের বলয়ে উড়িয়ে আনল আস্ত এক যুদ্ধেক্ষেত্র। সেই ভয়ংকর ছৌ নাচের যুদ্ধের শেষে শিব এসে বলে গেলেন পুরুলিয়ার আদি ইতিহাস। আমাদের কপালে পরিয়ে দিলেন রাঙামাটির টিপ। সেই টিপ পড়ে আমরা বন পলাশী হলাম!

সূয্যি গেছে পাটে। সন্ধ্যার নিমন্ত্রণ ছাড়াই রুপোলি চাঁদ মুখ বাড়িয়েছে আকাশের আয়নায়। রাতের নীহারিকায় আমরা কতিপয় মানুষ ঝিরিঝিরি দক্ষিণা বাতাসের পরশে পরিতৃপ্ত হয়ে হোটেলমুখো। পথে খয়েরাবেড়া ড্যামের জঙ্গল ঘেঁষে গাড়ি দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে চলে গেলাম পলাশের কাছে। বনজোৎস্না না চাঁদের মিতালিকা— কোন নামে ডাকব পলাশ? প্রাক দোল পূর্ণিমার চাঁদকে সঙ্গী করেই আজ রাতের মতো লালমাটির গল্পগাছা শেষ হল।

আজ ফিরতে হবে তাই মন শরীর দুই বিষণ্ণ, ক্লান্ত! সকালে গিয়েছিলাম শাড়ির পাড়ের মতো বান্দুদি গ্রাম দেখতে। এই গ্রাম বাস্তবিকই রঙিন চিত্রপট, শুধু চিত্রনাট্যের অপেক্ষা। তবে গ্রামের আদিবাসীরা ছবি তোলার ব্যাপারে খুব রক্ষণশীল। রঙিন শাড়ির পাড়ের মতো এই রমণীয় গ্রাম দেখে মনে হল এদের জীবনধারা জীবনমুখী গান না গীতবিতান! শেষবেলায় ফোটোগ্রাফার বন্ধুরা যাদেরকে ছবি তোলার বিষয় হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে, তাদের অনেক কিছুই আজ বিশ্বের দরবারে উন্মোচিত। ফেরার তাগিদে পেছন ফিরে দেখি দিনশেষের কাজ সেরে মুচকি হেসে নীল পাহাড়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্যানভাস গ্রাম বান্দুদি!

কী হবে এখানে এসে? কি পাব? পাওয়ার পাল্লা যে অনেক ভারি হয়ে গেল। সময়বিধি মেনে পুরুলিয়া স্টেশনে ‘রূপসি বাংলা’ ট্রেন অপেক্ষারত কলকাতাগামী হবে বলে। ট্রেনের কামরা থেকে আমার চোখের শেষ পরশ— যদি তুমি ডাকো অথবা না-ই ডাকো, আবার আসব আমি বনপলাশী হতে। একমুঠো পলাশের আবীর তোমায় মাখিয়ে দিলাম এবারের মতো।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...