প্রবেশদ্বার পেরিয়েই মৈত্রেয় বুদ্ধের হাসিমুখ, শায়িত বুদ্ধের প্রশান্তি ও অমিতাভ বুদ্ধের আশীর্বাদী দৃষ্টি যেন মনে এক অদ্ভুত শীতলতা বয়ে আনল। স্বর্ণাভ মূর্তির দীপ্তি, ধূপের সুগন্ধ আর প্রার্থনার নীরবতা মন্দিরের ভিতরে এক পবিত্র আবহ সৃষ্টি করেছে।

পিছনের বাগানে ছোট্ট পুকুরের জলে কই মাছের খেলা আর বাতাসে ভেসে আসা ঘণ্টার ধ্বনি যেন সব দুশ্চিন্তা মুছে দিল। এখানে সময় যেন থমকে গেছে, অথবা হয়তো বয়ে চলেছে এক অনন্ত প্রবাহে, যেখানে জাগতিক ব্যস্ততার কোনও স্থান নেই। ভিন ট্রানগ প্যাগোডা শুধুমাত্র একটি দর্শনীয় স্থানই নয়, বরং এক অভিজ্ঞতা, এক অনুভূতি, এক নিরবধি শান্তির স্পর্শ!

আজ হো চি মিন সিটিতে আমাদের চতুর্থ দিন। বেশ কিছু জায়গা এখনও দেখা হয়নি। তাই সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম! আমাদের প্রথম গন্তব্য রি-ইউনিফিকেশন প্যালেস। এটি ভিয়েতনামের ইতিহাসের প্রতীক, এক অমর মুহূর্তের সাক্ষী। ভিয়েতনাম যুদ্ধের যবনিকা পতন এই প্যালেসেই হয়েছিল। এটি এখন ভিয়েতনামের ঐক্যের প্রতীক।

১৯৬৬ সালে তৈরি এই প্রাসাদ ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতির অফিস এবং বাসস্থান। তবে, সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ঘটে ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল, যখন উত্তর ভিয়েতনাম দক্ষিণ ভিয়েতনামকে পরাজিত করে এবং একটি উত্তর ভিয়েতনামি ট্যাঙ্ক এই প্রাসাদের গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল।

রি-ইউনিফিকেশন প্যালেসের স্থাপত্য নজর কাড়তে বাধ্য। কিউবান শৈলীতে তৈরি, সাদা দেয়াল, উজ্জ্বল রঙের টাইলস এবং বিশাল আঙিনা প্রাসাদটিকে একটি চোখধাঁধানো সৌন্দর্য দিয়েছে। প্রেসিডেন্সিয়াল কক্ষ এবং যুদ্ধ কক্ষ প্যালেসের প্রধান আকর্ষণ। এখানে যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা টেলিফোন এবং ম্যাপের সাহায্যে পরিকল্পনা করার স্মৃতিচিহ্ন এখনও রয়েছে। দোতলায় রয়েছে দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকারের অফিস এবং গেস্ট রুম। সবশেষে ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখান থেকে পুরো হো চি মিন সিটি দেখা যায়। এখান থেকে সাইগনের স্কাইলাইন এবং রাস্তাগুলির দৃশ্য যেন এক অন্য রূপে ধরা দিল!

অনেক ঘোরাঘুরি হয়ে গেছে! এবার বিশ্রাম নেওয়ার সময় এবং সঙ্গে লাঞ্চও সেরে নিতে হবে। তাই ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম সাইগনের প্রাণকেন্দ্র বেন থান মার্কেট। বেন থান মার্কেট হল হো চি মিন সিটির সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রাচীন বাজার। এখানে স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকরা কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া ও শহরের প্রাণবন্ত পরিবেশ উপভোগ করতে আসে। এখানে একাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে, তাই একটু দেখেশুনে খাবার খেলাম। তবে মনের মধ্যে তখন ছিল বেন থান মার্কেটের শপিং কমপ্লেক্স।

মার্কেটের ভিতরে ঢোকার পর বুঝতে পারলাম, এর থেকে পরিকল্পিত ও সংগঠিত বিশৃঙ্খল জায়গা আগে হয়তো দেখিনি। তবে জায়গাটা বেশ প্রাণবন্ত, রঙিন এবং স্থানীয় ভিয়েতনামিজ জীবনযাত্রার এক আদর্শ প্রতীক। বেন থান মার্কেট দর কষাকষির জন্য বিখ্যাত। এখানে ভিয়েতনামি সামগ্রী, স্যুভেনির, জামাকাপড়, খাবার এবং নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু পাওয়া যায়।

আমি আমার দর কষাকষির দক্ষতাটা একটু ঝালিয়ে নেব ভেবে কয়েকটি জিনিসের দাম জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু একদিকে ভাষার বিভ্রাট, অন্যদিকে দরদাম করতে আমার অপারদর্শিতা— দুইয়ের সমন্বয়ে আমার শপিং বেশিদূর এগোচ্ছে না দেখে, শেষ পর্যন্ত আমরা একটি বড়ো দোকানে গেলাম। এখানে দরদামের প্রয়োজন নেই। এখানে সবকিছু বাঁধা দামে বিক্রি হয়। এখান থেকেই কিছু জিনিসপত্র কিনে বাইরে বেরিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পালা।

আজ হো চি মিন সিটিতে আমাদের শেষ দিন। সন্ধ্যার পরিকল্পনাটা আগে থেকেই করে রেখেছিলাম। বিটেক্স কোফাই ন্যান্সিয়াল টাওয়ার, ২৬২ মিটার উচ্চতার ৬৮ তলা বিশিষ্ট টাওয়ার হো চি মিন সিটির অন্যতম আইকনিক স্থাপত্য। এটি শুধু একটি আকাশচুম্বী ভবন নয়, এটি ভিয়েতনামের দ্রুত নগরায়নের জীবন্ত প্রতীক। যখন আমরা বিকেলে এখানে পৌঁছালাম, তখন কাচের তৈরি টাওয়ারের বাইরের অংশ সূর্যের আলোতে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করছিল। চারদিকে সোনালি রঙের আভা ছড়াচ্ছিল, যেন এক সোনালি দিন!

এই টাওয়ার-এ অনেকগুলো দেখার জিনিস রয়েছে। তার মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় সাইগন স্কাইডেকের কথা। ৪৯তম তলার সাইগন স্কাইডেকে যাওয়ার যাত্রা শুরু হয় ভূমিতল লবি থেকে। মাত্র ৩৫ সেকেন্ডে দ্রুতগতির এলিভেটর পৌঁছে দিল আমাদের গন্তব্যে। দরজা খোলার পর প্রথমেই মুগ্ধ হলাম ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ দেখে।

উপর থেকে নীচে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে সাইগন নদী। সন্ধ্যার আলোতে সাইগন নদীকে যেন নব-বিবাহিতা বধূর মতো দেখাচ্ছে। ডেকের চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। পশ্চিমদিকে ডিস্ট্রিক্ট ৫-এর চায়নাটাউন, আর পূর্বদিকে দ্রুত উন্নয়নশীল থু থিয়েম নিউ আরবান এরিয়া দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও এখানে ডিজিটাল টাচস্ক্রিনের মাধ্যমে যেমন শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখা যায়, তেমনই তাদের সম্পর্কে নানারকম তথ্যও জানা যায়।

সাইগন স্কাইডেকে কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা আবার উপরে ৬০ তলায় গেলাম। এখানে রয়েছে সাইগনের বিখ্যাত হেইনেকেন বিয়ার কোম্পানির একটি ইন্টার্যাক্টিভ ব্রুয়ারি ট্যুর। এই ট্যুর থেকে হেইনেকেন বিয়ারের ইতিহাস, প্রস্তুত প্রক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। ১৮৬৭ সালে এই হেইনেকেন ব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে হ্যান্ডস-অন প্রদর্শনীর মাধ্যমে একটি মাল্টি-সেন্সরি ট্যুর উপভোগ করার পর, সাইগন শহরের সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা সন্ধ্যার আমেজটাকে যেন অনেকটা বাড়িয়ে দিল।

বিটেক্সকো টাওয়ারের ৫০ তলায় রয়েছে সাইগণ রেস্টুরেন্ট। এখানে ভিয়েতনামি এবং আন্তর্জাতিক খাবার পরিবেশন করা হয়। মার্জিত পরিবেশ এবং উচ্চমানের পরিসেবার জন্য এই রেস্তোরাঁ বিখ্যাত। এখানে ডিনার করার পাশাপাশি, এখান থেকে রাতের হো চি মিন সিটির অপরূপ রূপ উপভোগ করার অভিজ্ঞতা হল। দিনের ব্যস্ত হো চি মিন সিটির সঙ্গে রাতের আলো ঝলমলে রুপসি শহরের যেন কোনও মিল নেই। দিনের সব কালিমা মুছে দিয়েছে চারিদিকে হাজার হাজার আলোর রশ্মি! সারাদিনের ঘোরাঘুরি ব্যস্ততার শেষে এই অল্প কিছুটা সময় যেন মুঠোয় ভরে সঙ্গে নিয়ে যেতে মন চাইছে!

এখন ফিরে যাওয়ার সময়। কাল নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে। এবারের হো চি মিন সিটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল টক, ঝাল, মিষ্টির একটা সুন্দর মিশ্রণ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাসকে যেমন নিজের চোখে দেখলাম, তেমনই আবার মেকং নদীর বুকে ভিয়েতনামের সেই প্রাণভোমরাকেও খুঁজে পেলাম। কোনও বিদেশি শক্তি এত শক্তিশালী নয় যে, এই প্রাণভোমরাকে এদের কাছ থেকে নিয়ে যাবে। আমি স্যুভেনির ভরা একটি স্যুটকেস, হৃদয়ভরা স্মৃতি এবং ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলাম। সম্ভবত আরও ভালো দর কষাকষির দক্ষতা এবং রাস্তার খাবারের জন্য একটি শক্তিশালী পেট নিয়ে ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসব।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...