আমার গোটা জীবনটা চোখের জলে ভেসে যায়নি। আমাদের বয়সের অনেকটা ব্যবধান সত্ত্বেও আমি আস্তে আস্তে তাঁকে ভালোবাসতে শুরু করলাম। আর আস্তে আস্তে তোমাকে আমি আমার মনের গোপন কুঠুরিতে সযত্নে বন্দি করে শিকল তুলে দিলাম।
বিয়ের পর এই গ্রামের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল মাত্র চারবছর। বছরে দু’বার করে আসতাম এই গ্রামে। তোমার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখাও হয়েছিল। জানি না কেন, আমার চোখে তুমি চোখ রাখতে পারোনি কখনও। ইতস্তত করে মাথা নামিয়ে চলে যেতে প্রতিবার। কেন বলো তো? কীসের লজ্জা? তোমার তো কোনও দোষ ছিল না। আমি তো অন্তত কোনওদিন তোমাকে দোষ দিইনি। শেষবার যখন এসেছিলাম গ্রামে, তখন শুনলাম বিয়ে করেছ। বিশ্বাস করো, শুনে খুশিই হয়েছিলাম।
অতীতকে পিছনে ফেলে তুমিও যে এগিয়ে যেতে পেরেছ জেনে ভালো লেগেছিল। মন থেকে চেয়েছিলাম তুমি সুখী হও। তোমার বউকে দেখার খুব সাধ হয়েছিল, কিন্তু আর দেখা হয়ে ওঠেনি। তারপরই বাবা মারা গেলেন। মাকে নিয়ে আমি আমার শ্বশুরবাড়িতে চলে গেলাম। বছরখানেক বাদে কাকারাও এখানকার সব জায়গা-জমি বিক্রি করে চলে গেলেন অন্যত্র। ব্যস, আমার জন্মভিটের সঙ্গে সরু সুতোর মতো ঝুলে থাকা সম্পর্কটুকুও চুকে গেল।
তারপর থেকে এতগুলো বছরে আর কোনওদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আসলে দেখা করার কথা ভাবিওনি কখনও। আজ এত বছর বাদে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি এই গ্রামে আসিনি। এসেছিলাম আমার শৈশবের টানে। বার্ধক্যের জরাজালে জীর্ণ এই শরীরটা যখন চিরমুক্তির জন্য দিন গুনছে, তখন বড্ড ইচ্ছে করছিল আবার ছোটোবেলায় ফিরে যেতে। ছোটোবেলার সেই চেনা জায়গা, চেনা পরিবেশ, চেনা গন্ধ, সব কিছুকে আমার সমস্ত শরীর, সমস্ত মন দিয়ে জাপটে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম শেষবারের মতো। শুষে নিতে চেয়েছিলাম আমার ছোটোবেলার সেই ঘ্রাণ। আর তাই এসেছিলাম এখানে। কিন্তু এখানে আসার পর তোমার সঙ্গে কাটানো পুরোনো সব স্মৃতিগুলো দমকা হাওয়ার মতো মনের সেই গোপন কুঠুরিতে গিয়ে ধাক্কা দিল। আবার এক ঝড় উঠল আর সেই ঝড়ে এত বছর ধরে আটকে রাখা শিকলটা নিমেষে খুলে পড়ে গেল।
আচ্ছা, কাজের ফাঁকে কিংবা অবসরে তোমার কি কখনও মনে পড়ে আমার কথা? এতগুলো বছরে একবারও কি ভেবেছ আমার কথা? একবারও কি আমার মুখটা ভেসে উঠেছে তোমার চোখের সামনে? আচ্ছা, এই চল্লিশ বছর বাদে আজ যদি হঠাৎ করে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াও, আমি কি পারব তোমাকে চিনতে? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তোমার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে নিশ্চয়ই। মাথাভর্তি সেই ঝাঁকড়া কালো চুল নিশ্চয়ই আর নেই। হয় সেগুলো সাদা বর্ণে রূপান্তরিত হয়েছে আর নয়তো দেখা দিয়েছে ইন্দ্রলুপ্ত। সুন্দর মুখটাতে নিশ্চয়ই দেখা দিয়েছে বলিরেখা।
আমার নিজের চেহারারই কত পরিবর্তন হয়েছে এত বছরে। স্বামীর মৃত্যুর পর কম ঝড়ঝাপটা তো সামলাতে হয়নি আমাকে। তখন আর আমার কতই বা বয়স। ছোটো ছেলেটাকে নিয়ে অনেক লড়াই করে অনেক পথ পেরোতে হয়েছে। সেসব কথা আজ থাক। আজ অবশ্য ছেলেটা প্রতিষ্ঠিত। আজ আর কোনও চিন্তা নেই আমার। তবে হ্যাঁ, বয়সজনিত কারণে পায়ে ব্যথা, চোখে চালশে এলেও এখনও বেশ শক্ত সমর্থই রয়েছি। তুমিও কি এমনই আছো, নাকি বয়স একটু বেশিই থাবা বসিয়েছে তোমার উপর? আজ চেহারার পরিবর্তন ছাপিয়ে মনের চোখ দিয়ে কি চিনে নিতে পারব তোমাকে? তুমিও কি পারবে চিনতে আমায়?
সন্ধে হয়ে আসছে। এবার ফিরতে হবে। ছোটো ছোটো পায়ে হেঁটে স্টেশনে এসে ছোটো বেঞ্চটায় বসলাম ট্রেনের অপেক্ষায়। মনের মধ্যে এখনও পুরোনো স্মৃতিরা ভিড় জমাচ্ছে। হঠাৎ ট্রেনের বাঁশির শব্দে চমক ভাঙল। স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে। ছোটোবেলার স্মৃতিমাখা এই গ্রামকে চির বিদায় জানিয়ে ফিরে যেতে হবে আমাকে। আর সময় নেই। আর কখনও আসা হবে না জানি। জীবননদী যে প্রায় সাগর কিনারে এসে গেছে। এখন শুধুই সাগরে মিশে বিলীন হওয়ার অপেক্ষা। শেষবারের মতো একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম। চোখটা একটু ঝাপসা হয়ে এল। আর এখানে থাকা যাবে না। তারপর আস্তে আস্তে উঠে এগিয়ে গেলাম। ট্রেন এসে সামনে দাঁড়াল।
ট্রেনের দরজায় পা দিতে যাব এমন সময় হঠাৎ কানে এল— সাবধানে থেকো মা, আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না। আবার সামনের মাসে আমি আসব তো। বাবার খেয়াল রেখো। গলাটা যে ভীষণ চেনা আমার। চমকে উঠে পাশে তাকালাম। দেখি চল্লিশ বছর আগের তুমি পাশের কামরার দরজা থেকে হাত নাড়ছ। একটা ঘোরে চলে গেছিলাম। সেই এক চেহারা, এক কণ্ঠস্বর। আশ্চর্য হয়ে গেলাম। চল্লিশ বছরে তোমার এতটুকু বয়স বাড়েনি! এ কী করে সম্ভব! ঘোর কাটল। তাকিয়ে দেখি স্টেশনে দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ় দম্পতি।
ভদ্রমহিলা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে হাত নাড়ছেন। আর তাঁর পাশে তাঁরই কাঁধে হাত রেখে মুখে হাসি ধরে রেখে হাত নাড়ছেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক। তাঁর গায়ে জড়ানো একটা শাল। সেই শালটা আমার বড্ড পরিচিত। শালটার কোণের কাজগুলো আমার নিজের হাতের সৃষ্টি। নিজের বোকার মতো ভাবনায় নিজেরই হাসি পেল। আনমনে একটু হেসে ট্রেনে উঠে পড়লাম। জানলার ধারে একটা সিট খালি ছিল। গিয়ে বসলাম। আবার ট্রেনের বাঁশি শোনা গেল।
এক পা, এক পা করে গড়াতে শুরু করল ট্রেনের চাকা। স্টেশনে যে বেঞ্চটায় আমি বসেছিলাম, সেই বেঞ্চটা, স্টেশনের দোকানটা একটু একটু করে পিছাতে শুরু করল। তারপর তোমাদের সামনে এসে গেল আমার পাশের জানলাটা আর সঙ্গে আমিও। তোমরা তখনও হাত নেড়ে চলেছ। জানি আমাকে না, তোমাদের ছেলেকে। কিন্তু আমার যে ভীষণ বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল যে, তুমি আমাকেই হাত নাড়ছ। চল্লিশ বছর বাদে বিদায় জানাচ্ছ আমাকে শেষবারের মতো, হাসিমুখে। নিজের অজান্তেই কখন যেন আমার হাতটাও উঠে গেল। হাত নাড়লাম আমি।
এতগুলো বছরে তোমার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে অনেক। তবু চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না। মনের চেহারার পরিবর্তন যে হয় না। তুমি কি চিনতে পারলে আমায়? জানি না, জানতে চাইও না। শুধু জানি, এ জীবনে আর কখনও দেখা হবে না তোমার সঙ্গে। এ আমাদের শেষ দেখা। চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। বাইরেটা আর পরিষ্কার দেখতে পারছি না। আমার শরীর ফিরে চলেছে আমার বর্তমান ঠিকানায়, আর আমি ফিরে যাচ্ছি অতীতের পাতায়।





