মেলা কমিটির লোক এসেছিল। তাঁবুর মধ্যেই ওদের থাকার ব্যবস্থা। ভিতরে পুতুলনাচের ঘরটা অবশ্য খুব সুন্দর করে তৈরি করা। সামনের যে ঘেরা অংশটা থাকে, সেটা বেশ রংচঙে কাপড় দিয়ে সাজানো। ইরফান চাচা অবশ্য দুশ্চিন্তায় মুখ গম্ভীর করে আছে। মেলা কমিটির লোকগুলোকে বলল, “ছাই ফেলে মাঠটা ঠিক করতে হবে।”
সেদিন রান্নাবান্না করতে হয়নি। কমিটি-র লোকেরা খাবার দিয়ে গেছে। খেয়েদেয়ে ওরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিল। কাল সারাদিন অনেক কাজ। পুতুলগুলোকে যে করে হোক শুকোতে হবে। বিশু এসবই ভাবছিল। রাতের দিকে সকলেই ঘুমিয়ে কাদা। বিশুর ঘুম আসেনি। জেগে জেগে শুনল বৃষ্টির আওয়াজ। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে আবার। বৃষ্টির ছমছম আওয়াজে বিশুর মনে হচ্ছিল নাচনি যেন সারা তাঁবু জুড়ে নেচে বেড়াচ্ছে।
পরের দিন যেন ভোজবাজির মতো বৃষ্টি উধাও। সকলকে অবাক করে দিয়ে রোদও দেখা দিল। ইরফান চাচা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আল্লার মেহেরবানি।”
বিশুর অবশ্য কাজ অনেক। ভোর ভোর উঠে পুতুলগুলোর পোশাক খুলতে লাগল। শুকোতে দিতে হবে। নবাব, বেগম, বামুন— সমস্ত পুতুলের পোশাক জড়ো করে এক জায়গায় রাখল। মোহনদা নাচনির দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছু বলার আগেই বিশু বলল, ‘নাচনি ভেজেনি গো দাদা।”
পাশ থেকে কুবেরদা হাসতে হাসতে বলল, ‘ভেজেনি, না ভিজতে দিসনি?’ একথার উত্তর হয় না।
বিশু মনে মনে ভাবল, সে তোমরা যাই ভাবো, নাচনির পোশাক খুলতে আমি দেব না।
রোদ উঠতেই তাঁবুর বাইরে একটা লম্বা দড়ি টাঙিয়ে পোশাকগুলোকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। রোদ খুব কড়া। মনে হয় শুকোতে বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। এইসময় কমিটির একজন লোক এল। কিছু পেমেন্ট করে গেল। আদিলদা ওদিকে তাকাতেই ইরফান চাচা বলল, ‘দুপুরে তোদের পেমেন্টগুলো নিয়ে নিস।’
রান্না চাপানো হয়েছে তাঁবুর বাইরে। কমিটি আর খাবার দেবে না। গতকাল ঝড়-বৃষ্টি ছিল বলে কমিটি একবেলা খাবার দিয়েছে। রোজ দিতে পারবে না। ওরা অবশ্য সেটা জানে। বস্তায় কিছু সবজি আনাও হয়েছে। সেগুলো কাটছিল রাজুদা। তবে মন যেন তার অন্য দিকে। একটা মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার সঙ্গে কথা না বললে তার হয় না। ইরফান চাচা মাঝে মাঝে বকুনিও দিয়েছে। কিন্তু রাজুদার ফোন করা কমেনি। তবে সেই সম্পর্ক বুঝি তেমন সুমধুর নেই এখন। বিশু ফোনের কথা শুনেই বুঝতে পারে রাজুদা কী একটা ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করে। বিশু মনে মনে ভাবে, একদিক থেকে ভালো, নাচনি অন্তত তাকে ধোঁকা দেবে না। রান্না শেষ হতেই বিশু বাইরে এসে দেখল, একদল বাচ্চা ছেলে তাঁবুর বাইরে উঁকিঝুঁকি মারছে। বিশেষ করে রংচঙে পোশাকগুলোকে বাইরে দেখে তাদের কৌতূহল যেন বেড়ে গেছে। পুতুলগুলোকে তারা দেখতে চায়। ভোম্বলদা ওদেরকে প্রায় তেড়ে হটিয়ে দিল।
পুতুলনাচের তাঁবুটা মেলার একটা সাইডে। তাই এখানে অন্যান্য দোকানপত্তর তেমন নেই। কিন্তু কিছুটা দূরেই সারি সারি দোকান দেখা যাচ্ছে। ‘বেশ বড়োসড়ো মেলা, কী বলিস!’ রোদ পোহাতে পোহাতে বলল কুবেরদা। বিশু বলল, “জয়নগরের মেলাটার মতো।’ ইরফান চাচা ওদের কথা শুনতে পেয়ে বলল, “এ আর কী এমন মেলা! মেলা ছিল বনগাঁয়ের একটা গ্রামে। তা পঁচিশ বছর আগেকার কথা হবে। দু’হপ্তা ধরে পুতুলনাচ চলছিল। মেলা শেষ হয়ে গেলেও পুতুলনাচ চালিয়ে যেতে হয়েছিল। সে এক দিন ছিল!’ ইরফান চাচা মাঝে মাঝেই এরকম পুরোনো দিনের গল্প বলে। বিশুর শুনতে খারাপ লাগে না। আর শোনে ওর বাবার কথা। তখন এমনি এমনি চোখ ভরে যায় জলে।
সামনে একটা পুকুর আছে। মেলার সব লোক সেখানে চান করছে। একটু বেলা করে নাইতে গেল বিশু আর রাজুদা। জল তখন ঘোলা হয়ে গেছে একদম। উপায় নেই, বিশু ঝাঁপিয়ে পড়ল জলের উপর। তারপর চিতসাঁতার কাটতে কাটতে ভেসে থাকল অনেকক্ষণ। ভাসতে ভাসতে পেরিয়ে গেল পুকুরের এই দিক থেকে অন্য দিকে। নিজেকে যেন কেমন হালকা মনে হচ্ছে। যদি এরকম ভেসে থাকা যেত সারাজীবন, কেমন হতো? মনে মনে ভাবল, তার কোনও বাঁধন নেই। কিন্তু পুতুলগুলো কেমন বন্দি। লাঠি ধরে মানুষ যেমন নাচায় তারা তেমন নাচে। রাজুদার ডাকে চোখ গেল ঘাটের দিকে। রাজুদা উঠে পড়েছে জল থেকে। বিশুও আর দেরি করল না।
দুপুরে খাওয়া হল ভাত আর সবজি। বেশি কিছু করা যায়নি। কুবেরদা মুরগি নিয়ে এসেছে। ওটা রাতে হবে। খাওয়ার পর একটু জিরানোর জো নেই। পোশাকগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। বিশু সেগুলো এনে পুতুলগুলোকে পরিয়ে দিচ্ছিল। ইরফান চাচা ‘অন্নদামঙ্গল’ করবে ভেবেছিল, কিন্তু এখন মত বদলেছে। আগের মেলায় যেটা চলছিল ‘নবাবের কিসসা’, সেটাই চলবে। নতুন পালার গানগুলো এখনও ঠিকঠাক তোলা যায়নি। বিশু তাই পোশাকগুলোকে একইরকম ভাবেই পরাল। এ কাজটা বেশ ভালোই শিখেছে সে। বেশ কায়দা করে পোশাকগুলো পরাতে হয়। সবাই কিন্তু পারবে না। নবাবের পোশাক পরাতে গিয়ে বেশ মজা পাচ্ছিল সে। কত আড়ম্বর তার!
নাচনিকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। সে যেন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিশুর দিকে। বিশুর শুধু মনে হয় সারাদিন নাচনি বোধহয় তাকেই দেখে। পোশাক পরানো হয়ে গেলে, চাচা একবার এসে দেখে গেল। “বা! সুন্দর হয়েছে। গয়নাগুলো এবারে পরিয়ে দিস।’ গয়না বলতে কিছু পুঁতির হার আর ছোটো ছোটো রঙিন স্টোনের মালা। বেগমকে একটু বেশি পরাতে হয়। নাচনি পরে, তবে কম। সে তো রানি নয়, নাচনি। সাধারণত রাজুদা এই অলংকারের কাজটা করে। কিন্তু রাজুদার উপর কোনও কারণে সকাল থেকে খেপে আছে চাচা, তাই হয়তো তাকে বলে গেল।
(ক্রমশ…)





