বেলা চারটের পর থেকে একটু একটু করে মেলায় লোক আসতে থাকে। পুতুলনাচের শো পাঁচটা থেকে এক ঘণ্টা অন্তর অন্তর। বেশ খাটুনি আছে এতগুলো শো পরপর করার। পুতুল নাচানোর ক্ষেত্রে হাত-বদলের দরকার আছে। ঠিক হল বিশু আর ভোম্বলদাও কিছুটা সাহায্য করবে। সময় যত এগিয়ে আসছে ইরফান চাচা যেন ততই চ্যাঁচামেচি করছে। তবে এটা সকলের গা সওয়া হয়ে গেছে।
সাড়ে চারটে থেকে টিকিটের লাইন। একসঙ্গে তিন-চারশোজন লোক বসতে পারবে তাঁবুতে। সামনের দিকে ত্রিপল পাতা আছে। তবে সাইডে সাইডে চেয়ারও আছে। লোক প্রায় ভর্তি। চাচা প্যান্ডেলের ফাঁক দিয়ে একটু উকি মেরে দেখে মুচকি হাসল। চাচার হাসি দেখে সকলের মুখেও চওড়া হাসি ফুটল। প্রথম শো বলে শুরু করতে করতেই আধ-ঘণ্টা দেরি হল। মাইকের একটু সমস্যা ছিল। সেটা ঠিক করা হল শেষ মুহূর্তে।
প্রথম শোতে বিশুর তেমন কাজ ছিল না। আদিলদা, মোহনদারা সামলে নিয়েছে। তবে ফাটিয়ে দিয়েছে ইরফান চাচা। অনেক দর্শক পেয়ে মেয়েদের গলায় কী দারুণ গান গাইল। তালে তালে নাচল নাচনি। সেও কি একটু বেশি ভালো নাচল? বিশু এই সময় মাঝে মাঝেই বাইরে বেরিয়ে এসে ভিড়ের পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রাণভরে নাচনির নাচ দেখে।
পালার একটা দৃশ্য আছে যেখানে নবাব নাচনির চুল ধরে টেনে আনবে রাজসভায়। এই অংশটুকু একেবারেই পছন্দ নয় বিশুর। নবাবের উপর খুব রাগ হয়। বিশু একবার চাচাকে বলেছিল, এই দৃশ্যটা না রাখলেই নয়!
ইরফান চাচা হেসে বলেছিল, 'ধুর পাগল! সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না না থাকলে পালা জমবে কেন!” বিশু বুঝেছিল নিতান্তই সহজ এই সত্যটা। তবে ইরফান চাচাও জানে, নাচনিকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসে বিশু।
প্রথম দু'দিন হইহই করে কেটে গেল। বৃষ্টিটা আর যেন এলই না। মেলাও ভালোই জমছিল। এখানে চারদিন থাকার কথা ছিল ওদের। কিন্তু মানুষের উৎসাহ দেখে মেলার দিন আরও বাড়ানো হয়েছে। পুতুলনাচও আরও দু'দিন বাড়ল। মেলা কমিটির লোক এসে এসবই বলে গেল৷ পেমেন্টও বেশি পাবে ভেবে সকলেই খুশি। শুধু রাজুদা মুখ ভার করে আছে। তার মন যেন এখানে আর নেই। সে তার প্রেমিকার সঙ্গে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেস্তনেস্ত করতে চায়। বিশুর কাছে গজগজ করতে থাকে।
মাঝখানে একদিন বিকেলের শো”টা হয়নি। মেলা কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল। ওরা সবাই গিয়েছিল। ইরফান চাচাকে ওরা কত্ত সম্মান করে স্টেজে নিয়ে গেল। একটা মানপত্র দিল আর একটা ইয়া বড়ো ট্রফি। কী যে আনন্দ হচ্ছিল বিশুর। বাবার কথা খুব মনে হচ্ছিল। ইরফান চাচা তো আনন্দে শুধুই কাঁদছে। এইরকম সম্মান আগে তো তাকে কেউ দেয়নি! তাকে দেখেই আদিলদা, মোহনদা, কুবেরদা সকলেরই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে।
সেদিনের শোগুলো স্পেশাল ছিল। এই সংবর্ধনার পর তারা যেন দ্বিগুন উৎসাহে পালা শুরু করল। কত মানুষ হাততালি দিচ্ছে। কেউ উকিঝুঁকি মেরে ভিতরটা একবার দেখতে চায়। খুব আনন্দ পাচ্ছিল বিশু।
শেষ শো হতে হতে ন'টা বেজে গেল। সকলে ক্লান্ত। বিশু উনুন জ্বেলে রান্না চাপাল। ইরফান চাচা আজ তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়িয়ে বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল ঠায়। কাউকে কি ‘শুকরিয়া’ জানাল? রান্না শেষ করে হাত-পা'র জড়তা ছাড়াতে বিশুও বাইরে এল। ইরফান চাচা বিশুকে কাছে টেনে নিল। হাতটা ধরে বলল, ‘নাচনিকে এবার তুই নাচাবি।”
বিশু যেন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ওর অনেকদিনের ইচ্ছে নাচনিকে ও-ই নাচাবে। আদিলদা আর রাজুদা না হয় অন্য পুতুলগুলো নাচাবে। কিন্তু একটা কথা সে বুঝতে পারছে না, হঠাৎ চাচা একথা বলল কেন? বিশু আকাশের তারাদের দিকে তাকাল। কী খুঁজছিল কে জানে? বাবা-কে কি?
রাজুদা রাতে চুপিচুপি বিশুকে বলল, 'আজ রাতে আমি পালাব। খবরদার কাউকে বলবি না।'
ধর্মসংকটে পড়ে গেল বিশু। আগেও এরকম ঘটনা ঘটেছে। রাজুদা শুধু তাকেই বলে পালায়। বিশুকেই শেষ পর্যন্ত ম্যানেজ করতে হয়। তবে একটা কথা ভেবে অবাক হল। চাচা তাকে নাচনির দায়িত্ব দিয়েছে, তার মানে চাচা কি জানত — রাজুদা পালিয়ে যাবে? তবে বিশুর একদিক থেকে ভালোই হল। তার অনেকদিনের ইচ্ছে অবশেষে সত্যি হবে। খাওয়ার পর সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, বিশু নাচনির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লাঠিটাকে উঁচু করে নাচনিকে কোলে নিল। সারা মুখে চুমু খেল খুব। মনে মনে বলল, আমি তোকে যেমন করে নাচাব এবার থেকে তেমন করে নাচবি।
গভীর রাতে ঝলমলে চাঁদ জ্যোৎস্নার আলো দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে মেলার মাঠ। সাদা তাঁবুকে দেখে মনে হচ্ছে যেন দুধের সাগর। রাত তখন শেষ প্রহরে। হঠাৎ যেন একটা পোড়া গন্ধ। ঠিক এই সময় দাউদাউ করে জ্বলে উঠল তাঁবু। প্রথমে শুধু আগুনের চড়চড় আওয়াজ। তারপর চারিদিকে কান ফাটানো আর্তনাদ। আগুনের শিখা যেন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর তেমনই বিভৎস কালো ধোঁয়া। মেলার অন্যদিকের দোকানগুলো থেকেও বেরিয়ে পড়েছে মানুষজন। সামনের পুকুর থেকে বালতি করে জল নিয়ে আসছে অনেকে। কিন্তু এই প্রবল আগুনের সামনে তা যেন নেহাৎ নগণ্য। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে এত বড়ো তাঁবুটা ছাই হয়ে গেল।
মেলা কমিটির কয়েকজন লোক এসেছে। তারা উদ্বিগ্ন। ধিকিধিকি ছাইয়ের মধ্যে বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছে। তারা কোথায়? পুতুলনাচের দল? এক অজানা আশঙ্কায় সকলেই তাকিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপের দিকে।
তাঁবুর পিছনদিকে দাঁড়িয়ে আছে ইরফান চাচা। ঠকঠক করে কাঁপছে। তাকে জড়িয়ে ধরে আছে আদিল আর কুবের। মোহনদা শুয়ে আছে একটু দূরে। তার একটা হাত জ্বলে গেছে। ছটফট করছে যন্ত্রণায়। ভোম্বলদাকেও পাওয়া গেল মোটামুটি অক্ষত অবস্থায়। ইরফান চাচা খোঁড়াতে খোঁড়াতে বলল, 'বিশু? বিশু কই?' বুক চাপড়াতে লাগল আর বিশুর নাম ধরে ডাকতে লাগল ইরফান চাচা। আদিলদা অবশ্য জানে। পুরোটাই দেখেছে সে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। চাচা সইতে পারবে না।
লোকজন ছাই ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছে। কিচ্ছুটি আর অবশিষ্ট নেই। চাচা চোখ মুছতে মুছতে দেখল তার হাতে গড়া পুতুলগুলো কেমন ছাই হয়ে গেছে।
পুলিশ এসেছে। তারা প্রথমে সবাইকে সরিয়ে দিল। মোহনদাকে নিয়ে গেল কাছাকাছি কোনও এক হাসপাতালে। রাজুদা ফিরে এসেছে। পালিয়েছিল রাতে। স্টেশনে খবর পেয়ে ফিরে এসেছে। তার কী কান্না। শুধু বিশুর নাম ধরে ডাকছে। আর হাউহাউ করে কাঁদছে।
তাঁবুর পিছনে একটা ঝোপের কাছে ওরা দাঁড়িয়ে দেখছিল ছাইয়ের স্তূপটাকে। হঠাৎ ইরফান চাচাই পাশে একটা ঝোপের মধ্যে কী যেন দেখতে পেল। একটু কাছে যেতেই ঠাওর করতে পারল। গোলাপি পোশাকে ঝলমল করছে নাচনি। গায়ে তার আগুনের আঁচড়টি পর্যন্ত নেই। কারওরই যেন বিস্ময় কাটছে না।
একমাত্র আদিলদাই দেখেছে বিশু কেমন দাউদাউ করে জ্বলতে জ্বলতে নাচনিকে ছুঁড়ে দিয়েছে ঝোপের আড়ালে, নিরাপদ জায়গায়।

आगे की कहानी पढ़ने के लिए सब्सक्राइब करें

ডিজিটাল

(1 साल)
USD10
 
সাবস্ক্রাইব করুন

ডিজিটাল + 12 প্রিন্ট ম্যাগাজিন

(1 साल)
USD79
 
সাবস্ক্রাইব করুন
আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...