মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৪০ টাকা। এখানে নিওলিথিক যুগের মৃৎপাত্র, অস্ত্রশস্ত্র থেকে শুরু করে কৃষ্ণ দেবরায়ের সময়কালের ব্যবহৃত বাসনপত্র, অস্ত্র সংরক্ষিত আছে। এছাড়া, হাম্পির একটা থ্রিডি ম্যাপ, প্রত্যেকটা স্থাপত্য এলাকার বৈশিষ্ট্য। সবচেয়ে অবাক করেছে শরীরচর্চার জন্য ব্যবহার হওয়া বড়ো আকারের পাথরের ডাম্বেল। কতখানি শারীরিক সক্ষমতা থাকলে ওই ডাম্বেল ব্যবহার করা যায়, তা ভেবে অবাক হয়েছিলাম৷ প্রত্যেকটা নতুন গন্তব্যে থাকা চিড়িয়াখানা অবশ্যই দেখি। চিড়িয়াখানার প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৭৫ টাকা, পার্কিংয়ের চার্জ ৫০ টাকা। তবে কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানায় যেমন ঢুকেই আমরা প্রাণীদের দেখতে পাই, এখানে সেরকম নয়। একটা বড়ো জঙ্গলকে চিড়িয়াখানায় রূপান্তরিত করা হয়েছে।

আসা যাওয়াতে দুই দুই চার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বেশ খারাপ অবস্থা হয়েছিল। জনপ্রতি ১৫০০ টাকায় সাফারির আলাদা ব্যবস্থা আছে। আমরা ওই হাঁটাপথেই চিড়িয়াখানায় ঘুরলাম। ভারতীয় নেকড়ে, নীল নেকড়ে, কাকাতুয়া, ময়ূর, জলহস্তী, জিরাফ, কচ্ছপ, কুমির, বাঘ ছাড়াও যাদের দেখে আনন্দ পেয়েছি, তারা হল কালো রাজহাঁস। কুচকুচে কালো শরীরে টকটকে লাল ঠোঁট ওদের দারুণ আকর্ষণীয় করেছিল। রোদের তাপ থেকে বাঁচতে প্রায় সব পশুপাখিই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। ফেরার পথটা যখন মনে হচ্ছিল শেষ হওয়ার নয়, তখন চিড়িয়াখানার এক কর্মী তার জিপে উঠিয়ে গেট পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে অশেষ উপকার করলেন। সময় যেহেতু বাঁধা, তাই হাম্পি বাজারের উদিপি হোটেলে দক্ষিণ ভারতীয় থালি খেয়ে আবার আমাদের গাড়ি ছুটল রাজা ও রানিদের রেখে যাওয়া ভগ্ন স্থাপত্যের দিকে। আনজান্যা পর্বতের শীর্ষে অবস্থিত হনুমানমন্দির হিন্দুদের একটা বিখ্যাত মন্দির। পাঁচশো সিঁড়ি চড়ে এই যাত্রায় ওই মন্দিরটাতে পৌঁছাতে পারিনি।

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে ১৯৭৬ থেকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে হাম্পির বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে। এরমধ্যে ছিল রয়াল এনক্লোজার, বিতালা বাজার, জৈন মন্দির, পান সুপারি বাজার, রক কাট মন্দির, অষ্টভূজাকার স্নানাগার। এই খননে উঠে আসে পাথরের স্থাপত্য, টেরাকোটার কাজ, স্টুকো মূর্তি, মুদ্রা, মাটির বাসন, লোহার অস্ত্র, পুঁতি, গয়না, সিরামিক, চিনের পোর্সেলিন পাত্র এবং দ্বিতীয় শতক থেকে পাওয়া বিভিন্ন শিলালিপি। এই সমস্ত খনন হাম্পির ইতিহাস বুঝতে সহায়ক হয়েছে।

এবারে জানাব রয়াল এনক্লোজারের বিষয়ে। রাজা দ্বিতীয় হরিহর ১৩৭৭ থেকে ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে রাজত্ব করেছেন। এখানে রাজসভা, রাজার বাসস্থান, সুদৃশ্য বাগান, জলাধার ও নিকাশি ব্যবস্থা ও পুরো ঘেরা এলাকার একটা বিশেষ মহাদ্বারের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষিত আছে। এখানে প্রাসাদের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখলাম। এই চত্বরে সবাই সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে একটা প্ল্যাটফর্মে উঠে যাচ্ছে দেখে আগ্রহী হয়ে আমরাও পৌঁছালাম দেখতে। চারদিক দিয়ে সিঁড়ি চড়ে একটা বাঁধানো জায়গায় উঠলাম। এর নাম হল মহানবমী দিব্যা। নীচে দাঁড়িয়ে দেখলে সিঁড়িসহ পিরামিডের মতো দেখতে। এই সমতলে বসে রাজা ও পারিষদেরা নীচে ঘটে চলা উৎসব অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করতেন।

দশদিনের দশেরা উৎসব এখানে হতো, তাই একে মহানবমী উৎসব বলা হয়ে থাকে। একটা বিশাল উঁচু বিস্তৃত অংশ থেকে বিভিন্ন উৎসবের শোভাযাত্রা দেখা হতো। সমতলের উপর একটা কাঠের কাঠামো ছিল, যা আজ আর নেই। শুধু ক্ষয়ে যাওয়া ও ভেঙে পড়া স্তম্ভগুলো টিকে আছে। পশ্চিমদিক ছাড়া বাকি অংশ খোলা, সম্ভবত ওইদিকটা রাজার প্রবেশের জন্য সংরক্ষিত ছিল। গ্রানাইট ও মার্বেল পাথর নির্মিত দেয়ালে বিজয়নগরের তৎকালীন দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্ম খচিত আছে। যেমন রাজাদের জীবনযাপন, শিকার, পর্যটক ও বন্যপ্রাণীদের চিত্র। এই চত্বরেই আছে ১৩৭৭ থেকে ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করা রাজা বীর হরিহরের রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ। রাজসভা, বাসভবন, বাগান ও জল সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চল।

রাজকীয় স্নানাগারটি কালো পাথরে বিশেষ ভাবে নির্মিত ধাপ। সেখানে জলের প্রবেশ ও নির্গমনের কৌশল আমাকে অবাক করল। এছাড়া জনগণের ব্যবহারের জন্যও আয়তাকার পাথর দিয়ে সাজানো বৃহৎ জলাধার দেখলাম। কৃষ্ণ দেবরায় আর দুই রানির বাসস্থানও এখানে নির্মিত হয়েছিল। বাসস্থান ও বিভিন্ন মণ্ডপ, প্রাচীরের খসে পড়া পাথর অতীতের সমস্ত নির্যাস নিয়ে ধ্বংসাবশেষ হয়ে রয়ে গেছে। অতীত থেকে মন যখন বর্তমানে ফিরব ফিরব করছে, তখন তুঙ্গভদ্রা ড্যাম দেখার প্রস্তাব দিল আমাদের ড্রাইভার ওয়াসিম। যেহেতু আমরা পরেরদিন যে পথে ফিরব সেই পথে ১৫ কিলোমিটার গিয়ে আরও ১০ কিলোমিটারের বাঁক নিতে হবে, তাই ভাবলাম ব্যাপারটা পরেরদিন দেখাই ভালো। ড্যামের সান্ধ্যকালীন আলোকসজ্জা আকর্ষণীয়। এই কারণে ভ্রমণপিপাসুরা সন্ধেতেই এখানে যায়।

দু-কিলোমিটার পথ হয় হেঁটে বা বাসে যেতে হয়। যেহেতু সন্ধেবেলায় লোক থাকে, তাই তখন বাস ঘন ঘন ছাড়ে। আমরা পরদিন সকালে অতটা পথ গিয়েও, শারীরিক ক্লান্তি ও বেঙ্গুলুরু ফেরার তাড়া থাকায়, ড্যামের গেট থেকেই ফিরে আসতে হল।

সকালে গেস্টহাউসে ধোসা দিয়ে জলযোগ করলেও, বেলা বাড়তেই, রাস্তার ধারে একটা দক্ষিণ ভারতীয় দোকানে খেলাম কলাইয়ের ডাল দিয়ে তৈরি করা স্থানীয় খাবার পাড্ডু। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন মনের মণিকোঠায় ঠাঁই পাবে। কারণ কত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও নান্দনিক অনুভূতি নিয়ে স্থপতিশিল্পীরা ওই অপূর্ব নগরী গড়ে তুলেছিল, তা ভাবলেও বিস্ময়বোধ হয়। যাইহোক, স্মৃতির ঝাঁপি ভরে ফিরে এলাম নিজের শহরে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...