'থামলেন কেন, বলুন, আমি যদি একটু কী?'
'একটু আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করো, এই আর কী।'
'কী ধরনের সহযোগিতা আপনি আশা করছেন আমার কাছ থেকে?' ব্যগ্রতা বাড়ে সুবিমলের কণ্ঠে।
'ওই, ইলেকশানে যদি না দাঁড়াও আর কী,' তীব্র দৃষ্টিতে তাকান অমল সুবিমলের দিকে।
এতক্ষণে এদের এখানে আসার উদ্দেশ্য পরিষ্কার হল, বুঝতে পারলেন সুবিমল। মুখে কিছু বললেন না। এও বুঝতে পারলেন- এরা এখন চেয়ারে, মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতে বেশি সময় লাগবে না। তাতে মাস্টারি যাবে, সুনাম যাবে, হয়তো জেলে গিয়ে পচতে হবে বাকি জীবনটা। মাথা নিচু করে চা শেষ করলেন তিনি। তারপর এক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। ছোটোখাটো পাতলা চেহারার মানুষটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য যদি কিছু থাকে তো তার চোখ জোড়া। প্রখর দীপ্তিময়, জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় সমুজ্জ্বল। সেই চোখে বুঝি আজ অভিমন্যুর অসহায়তা ফুটে উঠল। তিনি বললেন, 'ভেবে দেখি, মনে হচ্ছে সরে দাঁড়ানোই ঠিক হবে।'
বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল অমলের চোখেমুখে। তিনি বললেন, 'জানতাম, তুমি চিরকালই বিচক্ষণ, ঠান্ডা মাথার মানুষ। তাছাড়া নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। তাহলে ওই কথাই রইল, কী বলো? হাতে তো মাত্র আর চারটে দিন। শুভস্য শীঘ্রম, আজ উঠি।' উত্তরের অপেক্ষা না করে অমল তার দলবল নিয়ে বিজয়গর্বে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
জড়বৎ স্থির হয়ে বসে রইলেন সুবিমল, পাশার এক দানে তিনি পুরোপুরি কাত। ভিতর থেকে স্ত্রীর সপ্রেম ডাক আসে, ‘কই গো খেতে এসো, স্কুলে যাবে না?'
চমকে উঠে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, এই যে যাই।’
সারাটা দিন স্কুলে বিমর্ষ চিত্তে কাটালেন সুবিমল। বেলা শেষে স্কুল-চত্বরে বুড়ো নিমগাছটার গোড়ায় চওড়া করে বাঁধানো গোলাকৃতি শানের উপর একা একা বসে উদাস মনে সিগারেটে টান দিচ্ছিলেন।
বিকেল প্রায় পাঁচটা। ঘড়ি দেখেন তিনি। দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে— দূরে দল বেঁধে মাঠ ভেঙে বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তার ছাত্ররা। স্কুল ইউনিফর্ম পরা, হাতে-পিঠে বইয়ের ব্যাগ। ওদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে এক ঝাঁক সাদা বক। দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন সুবিমল। সময়টা মাঘের শেষ, আঁধার নামতে আর একটু সময় নেবে।





