রাজা: (রাজা আরও জোরে কেঁদে ওঠে) মিথ্যে সান্ত্বনা দিও না মা। কেসটা গেছে খুব পাকিয়ে। নতুন কিছু ভাবো। নাকি সোজা ভিয়েনা চলে যাব? সেখানে হয়তো আছে কোনও চিকিচ্ছে।

রাজমাতা: কী জানি, মা সন্তোষির কী ইচ্ছে। আমি তো নিয়মিত মা সন্তোষির ব্রত করি। কোনও শুক্কুরবার বাদ রাখি না। তবে কি কিছু ত্রুটি হল? দেবী সন্তোষির অসন্তোষেই কি তোর এই সর্বনাশ?

(রাজা ফের ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে)

রাজা: সে তোমার সন্তোষিমাকেই জিজ্ঞেস করো। তাকে কী করে সাইজ করে লাইনে আনা যায় দেখো।

রাজমাতা: দেবী সম্পর্কে অমন কথা বলিস নারে। দেবীই পারে এই অসাধ্য সাধন করতে। ওরে আমি দেবীর উদ্‌যাপন করব বেশ জাঁকজমক করেই। বালক ভোজন করাব। তুই খাজাঞ্চিবাবুকে বলে দে যেন আমায় লাখ পাঁচেক টাকা দেয়।

রাজা: লাখ পাঁচেক কেন?

রাজমাতা: পুজোর খরচ বাঁচিয়ে একটা বড়ো মাপের অ্যান্ড্রু টিভি কেনার ইচ্ছে আছে। রাজা: অ্যান্ড্রু টিভি কী?

রাজমাতা: ওই যে রে অ্যান্ড্রুট না কী টিভি বলিস তোরা? কী ডিজিটাল যেন!

রাজা: অ্যান্ড্রয়েড টিভি। স্মার্ট টিভি? ডলবি ডিজিটাল?

রাজমাতা: হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তার নাম দিয়েছি অ্যান্ড্রু।

রাজা: কথা হচ্ছিল মা সন্তোষি। চলে এল স্মার্ট টিভি! আমার মাথাটাই তো এখন টিভির স্ক্রিন। দেখবে কোনও স্যাটেলাইট চ্যানেলের ছবি এসে যাবে একদিন।

রাজমাতা: সত্যিই তো মা সন্তোষির মধ্যে বিষয়ি ভাবনা! দোষ নিও না হে মা সন্তোষি। ওরে এই শুক্কুরবারেই আমি উদ্‌যাপন করব। তোরা সব জোগাড়যন্ত্র কর।

দৃশ্যান্তর

উদ্‌যাপন চলবে। (রাজমাতা এয়োতিদের নিয়ে গান গেয়ে আরতি করবেন)

গান—

তোমার আরতি করি গো মা

সন্তোষি মা আমার

জয় জয় সন্তোষি মাতা জয় জয় মা…। (সান্ধ্য অনুষ্ঠানে ভাংরা নাচের দল গাইছে)

গান—

দুঃখহরণ তুমি, কষ্টহরণ তুমি

বিপদতারিণী তুমি মা

আমার সন্তোষি মা আমার সন্তোষি মা

জলে আছো আছো স্থলে

ফুলে ফলে শতদলে

আকাশে বাতাসে আছো মা

আমার সন্তোষি মা আমার সন্তোষি মা

দৃশ্যান্তর

মঙ্গল: না। রাজার মাথায় চুল গজানোর কোনও মহিমা দেখাতে পারলেন না মা সন্তোষি। রাজার হতাশা বেড়ে গেল দ্বিগুন। কী করলে, কাকে ধরলে ফলবে ফল। সে নিয়ে ভেবে ভেবে রাজার চোখে অবিরত ঝরছে জল।

রবি: মরাকান্না ভেউ ভেউ। যেন সমুদ্দুরের ঢেউ। একটা ঢেউ ভেঙে পড়লে যেমন আর একটা ঢেউ ধেয়ে আসে, তেমনই অবিরাম ঢেউয়ের মতোই চলছে রাজার ভেউ ভেউ।

সোম: বিরক্তির একশেষ। মাঝে মাঝে লাগছেও বেশ। কিন্তু এভাবে চললে তো রসাতলে যাবে দেশ।

মঙ্গল: যাবেই তো। একটা এত বড়ো রাজ্যের রাজা। বলিহারি তার বায়নাক্কা। তিনরানি। তাদের কী হয়রানি।

রবি: তা এখন রানিরা কী বলছে? তাদের কী ইচ্ছে?

মঙ্গল: রানিদের আবার ইচ্ছে! কে পাত্তা দিচ্ছে? মুখ খুলবার উপায় আছে? বড়ো রানি ছাড়া আর দুই রানি ঘেঁষছেই না রাজার কাছে।

সোম: তাদের অবস্থা তাহলে সত্যিই খুব করুণ?

মঙ্গল: আরে করুণ বলে করুণ? একেবারে নিদারুণ। সারারাত্তির বসে বসে তিন রানিতে শুধু জটলা। কী করলে রাজার এই মরাকান্না থামবে? কীভাবে ভোলানো যায় রাজার এই চুলের শোক? ভেবে ভেবে শেষপর্যন্ত বড়ো রানি বলল….

দৃশ্যান্তর
(রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল)

বড়ো রানি: রাজপ্রাসাদে নিশ্চয়ই কারও কুদৃষ্টি পড়েছে। নইলে এমন অলক্ষুণে কাণ্ড কেন ঘটবে বল। যমে মানুষে টানাটানি হল। যদিও বা রাজাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলুম, তো ঘটল এই বিপদ। (মেজোরানি, ছোটোরানি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে)। কাঁদিস নে। কাঁদিস নে তোরা। তোরা কাঁদলে আমি কী করি? কোথায় যাই? কাকে ধরি? (খানিক ভেবে নিয়ে) হ্যাঁ, আমার গুরুদেবের কাছেই যাব।

দৃশ্যান্তর
(রবি, সোম আর মঙ্গল নেচে নেচে গায়)

গান—

এই মরেছে, এই মরেছে রাজপ্রাসাদে কুদৃষ্টি পড়েছে

এতদিনে বড়োরানির টনক নড়েছে।

বিহিত কিছু না করলে কুদৃষ্টি কাটবে না

ধ্বংস হবে বংশ রাজার কিছুই বাকি থাকবে না বলব কী আর রাতদিন তাই

রানিমাকে সেই চিন্তাই পাগল করেছে। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি রাজার বাড়াবাড়িতে

বড়ো রানি ছুটে এলেন গুরুদেবের বাড়িতে

সপ্তগ্রামে খুব হইচই, সেপাই সান্ত্রী সব গেল কই?

দেখতে রানি ভিড় থইথই উপচে পড়েছে।

এই মরেছে এই মরেছে…

(গুরুদেবের বাড়ি)

গুরুদেব: মন গুরু নাম করো, গুরু নাম করো, গুরু নাম করো।

বড়ো রানি: গুরুদেব, বড়ো বিপদে পড়ে ছুটে এসেছি। আপনি দয়া না করলে পরিত্রাণ নেই গুরুদেব।

গুরুদেব: গুরুদেব দয়া করো দীনজনে… দীন অভাজনেরই তো দয়ার প্রয়োজন। কিন্তু, তুমি তো রাজমহিষী। তোমার একটু দয়া পেলে আমি বর্তে যাই। সেই আমারই দয়া চাই?

বড়োরানি: রাজপ্রাসাদে অলক্ষুণে সব কাণ্ড ঘটছে গুরুদেব।

গুরুদেব: মন গুরু নাম করো গুরু নাম করো গুরু নাম করো… জানি না? সেকি আমি জানি না? রাজার মাথা সাফ। ভাবছ কার পাপ? কার অভিশাপ? হে হে হে…(আচমকা মুড পালটে রাগত স্বরে) মাচণ্ডী হয়েছেন রুষ্ট। আগে দেবী চণ্ডীকে করো তুষ্ট। রাজপ্রাসাদে শান্তি সংস্থানের ব্যবস্থা করো। যাগযজ্ঞ, ব্রাহ্মণভোজনের ব্যবস্থা করো। আসছে বিষুদবারেই শুভদিন। যাও। বড়োরানি: আমি সব ব্যবস্থা করব। গাড়ি পাঠাব। আপনি সময় মতো চলে যাবেন।

গুরুদেব: সময়ের কথাই যখন তুললে, তখন বলি, ঘড়ি ধরে চলতে হয়। একটা এসমার্ট ওয়াচের বড়ো শখ ছিল। আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব। বিলিতি মদ, পমফ্রেট মাছভাজা আর মাটন বিরিয়ানি ছাড়া আমাকে অন্য কিছু খাওয়ার অনুরোধ কোরো না। সে অনুরোধ আমি রাখতে অক্ষম। আর একটা কথা রানিমা। কথাটা বলা কি সমীচীন হবে?

বড়োরানি: বলুন গুরুদেব। সংকোচ করবেন না।

গুরুদেব: রাজপুরোহিতের কার্য সমাধা করব। আমার অনামিকায় একটা হীরকখণ্ড বসানো সোনার অঙ্গুরীয় না থাকলে কি রাজার মান থাকবে?

বড়োরানি: বেশ তো৷ সেই অঙ্গুরীয় পরেই আপনি শুভকাজ করবেন।

গুরুদেব: বেশ বেশ। দক্ষিণা আর দানসামগ্রী ছাড়া আমাকে আর কিছু নেওয়ার অনুরোধ করতে পারবে না কিন্তু। মন গুরু নাম করো গুরু নাম করো গুরু নাম করো।

দৃশ্যান্তর

মঙ্গল: রাজবাড়িতে মহা ধুমধাম হল। ঢাক-ঢোল কাঁসরঘণ্টার সুতীব্র আওয়াজে রাজপ্রাসাদ গমগম করে উঠল। হাজার মানুষ পাত পেড়ে খেল। গুরুদেবের মন্ত্র উচ্চারণ মাইকে ছড়িয়ে পড়ল দূরদূরান্তে। দিনের শেষে পাঁচটি গাড়িভর্তি দানসামগ্রী নিয়ে টলতে টলতে গুরুদেব সপ্তগ্রামে ফিরে গেলেন। কিন্তু সবই বিফলে গেল। রাজার মাথার পিছন দিকে যে দু-চারগাছা চুল ছিল, তা-ও ঝরে পড়ে গেল। এদিকে রাজার চোখে যেন ভর করেছে ভারত মহাসাগর। লোনা জল ঝরছে তো ঝরেই চলেছে।

রবি: একেই বলে কারও পৌষমাস। কারও সর্বনাশ। কী বলো সোম, মঙ্গল?

সোম/মঙ্গল: কেন? হঠাৎ একথা কেন?

রবি: রাজার মন খারাপ। এই সুযোগে গরিবগুর্বো প্রজারা খাজনা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে কী বলো?

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...