গজল আলাঘ প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘যা আপনার পছন্দ নয়, এমন একটি ক্ষেত্রে যতই কঠোর পরিশ্রম করুন না কেন, আপনি খুব বেশি দূর এগোতে পারবেন না। অন্যদিকে, যদি আপনি এমন একটি ক্ষেত্রে থাকেন, যা আপনার খুব পছন্দ, তাহলে আপনি কম পরিশ্রম করেও খুব সফল হতে পারবেন। এই কারণেই আমি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইনাল পরীক্ষায় না বসে, কম্পিউটার- এর শিক্ষা নিয়েছিলাম।’

ব্যাবসা শুরু করার আগে

স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি, গজল NIIT থেকে ডিপ্লোমা কোর্সও করেন। সেই কোর্সটি করার সময়, তিনি প্রথমে চাকরি শুরু করেন। এটি পার্ট টাইম চাকরি ছিল, যা মূলত একটি সমবায় প্রশিক্ষণ শিবিরের কাজ ছিল এবং এই কাজটি উইকএন্ড-এ করতে হতো। এর পর অবশ্য গজল কর্পোরেট জগতে শুরু করেছিলেন তাঁর কর্মজীবন। সেখানে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে পেশাদার পরিবেশে কাজ করতে হয়, দলগত ভাবে কীভাবে একসঙ্গে লক্ষ্য অর্জন করতে হয় এবং প্রতিদিন নতুন কিছু শিখে কীভাবে এগিয়ে যেতে হয়।

গজল এও জানিয়েছেন যে, কর্পোরেট চাকরি তাঁকে ব্যবসায়িক কাঠামো এবং শৃঙ্খলা তৈরি করতে শিখিয়েছে। আর সেই শিক্ষা আজ ব্যাবসা পরিচালনায় তাঁকে অনেক সাহায্য করছে বলেও জানিয়েছেন। কর্পোরেট অভিজ্ঞতা তাঁকে সঠিক চিন্তাভাবনা করতে শিখিয়েছে এবং তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে যে, কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে যে-কোনও লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

এক মা থেকে কর্মজীবীমা হওয়ার সফর

গজল আলাঘ-এর কথায়, “এই সফর মোটেও সহজ ছিল না। যখন ‘মামাআর্থ” শুরু করি, তখন আমার ছেলে খুব ছোটো ছিল এবং ওই বয়সে সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একজন মায়ের। ২৪ ঘণ্টা কাজ করা এবং মায়ের দায়িত্ব পালন করা খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল তখন আমার কাছে। অনেক সময় অফিসের মিটিং-এও ছেলেকে নিয়ে যেতে হতো। কারণ অন্য কোনও উপায় ছিল না আমার। এমন সময় ছিল যখন আমি আমার সন্তানকে যতটা সময় দেওয়া দরকার ছিল, ততটা দিতে পেরেছি কিনা তা নিয়ে ভেবে অপরাধ বোধে ভুগতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পেরেছি যে, সন্তানদের অহেতুক বেশি সময় দেওয়ার চেয়ে, কোয়ালিটি টাইম দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’’

তিনি নিজেকে অনেক সেলফ-ডাউট থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং শিখেছিলেন যে, একজন ভালো মা হতে গেলে নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়, সন্তানদের সঙ্গে আন্তরিক ভাবে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এই সবকিছুতেই এক স্ট্রং সাপোর্ট সিস্টেম তাঁকে খুব সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছেন গজল। আর এই সাপোর্টার ছিলেন তাঁর স্বামী, পরিবার এবং সহকর্মীরা। তাঁর মতে, ‘কর্মজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা প্রথমে আমার লক্ষ্য ছিল না। এটি একটি ধারাবাহিক সফর ভেবে নিয়ে আমি যা সঠিক মনে করেছি, তার জন্য কাজ করে গেছি।’

পিতামাতার দেওয়া শিক্ষা সুফল দিয়েছে

গজল আলাঘ চণ্ডীগড়ের একটি যৌথ পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা ছিলেন গৃহিণী। গজল জানিয়েছেন যে, ‘বাবা সবসময় বলতেন যে, ব্যাবসা লাভজনক হলেই টাকা ঘরে ফিরে আসে। তাই ব্যাবসা করতে হলেও স্বাধীনতা চাই। আমার বাবা-মা সবসময় তাই আমাকে স্বাধীন এবং স্বাবলম্বী হতে অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁদের থেকে পাওয়া মূল্যবোধ-ই কঠিন সময়ে আমাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে চলেছে।’

কথা প্রসঙ্গে গজল আরও জানিয়েছেন যে, ‘আমার বাবা বলতেন, স্বপ্নের পিছনে ছুটবে নিশ্চয়ই, কিন্তু মূল্যবোধ ত্যাগ করে নয়। তিনি আমাকে কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং নিষ্ঠার মূল্য শিখিয়েছিলেন এবং এই তিনটি জিনিস আজও আমার প্রতিটি ব্যবসায়িক সাফল্যের রসদ। যখনই কোনও অসুবিধা হয়, তখন আমার পরিবারের সমর্থন এবং আমার বাবা-মায়ের শিক্ষা আমার সবচেয়ে বড়ো শক্তি হয়ে উঠেছে। আজ আমি যা কিছু করতে পেরেছি, আমার পরিবার এবং আমার বাবা-মায়ের চিন্তাভাবনা এতে বিশাল ভূমিকা পালন করে। যেমন— সর্বদা গ্রাহকদের জন্য এগিয়ে আসা, প্রোডাক্ট-এর গুণমানের সঙ্গে কখনও আপোশ না করা এবং প্রতিদিন সবার থেকেই নতুন কিছু শিখতে চেষ্টা করা।’

শিল্পকর্মের প্রতি আগ্রহ

বাণিজ্য হল গজলের পরিচয় এবং চিত্রকলা হল এমন একটি থেরাপি, যেখানে তিনি তাঁর চিন্তাভাবনা সৃজনশীল উপায়ে প্রকাশ করতে পারেন। এই প্রসঙ্গে গজল জানিয়েছেন, তিনি সবসময় ছবি আঁকতেন। কিন্তু একদিন তাঁর স্বামী তাঁকে না বলেই নিউ ইয়র্ক আর্ট আকাদেমিতে আবেদন করেন এবং তাঁর এই জীবন-সফর নতুন মোড় নেয়। আসলে গজলের বেশিরভাগ কাজই অ্যাবস্ট্রাক্ট, যেখানে তিনি বিভিন্ন রং এবং টেক্সচার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। ব্রাশের পরিবর্তে অনেক সময় তিনি ছুরি এবং রোলার দিয়েও চিত্রকলা তৈরি করেন।

যখন তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন, তখন তিনি জানেন না যে, এর শেষ পরিণতি কী হবে। এটি এমন একটি সফর, যা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। যখন মন খুব চঞ্চল থাকে, তখন একটি ফাঁকা ক্যানভাস তাঁকে শান্ত করে এবং নতুন ভাবে পথ চলতে অনুপ্রাণিত করে বলে মনে করেন তিনি।

সন্তানদের লালনপালন

গজলের দুই ছেলে— অগস্ত্য এবং আয়ান। অগস্ত্য বড়ো এবং আয়ান ছোটো। গজল জানিয়েছেন যে, তিনি এবং তাঁর স্বামী বরুণ মিলে কিছু মৌলিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়েছেন সন্তানদের। যেমন— সম্মান, সততা এবং দয়ার মনোভাব থেকে তাঁদের সন্তানরা যেন বিচ্যুত না হয়। তিনি আরও চান যে, তাঁর সন্তানরা স্বাধীন হোক, প্রশ্ন করুক এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারুক যে, তারা কী পছন্দ করে, কী তাদের আকর্ষণ করে। আর তিনি চান তাঁদের সন্তানরা যেন শিকড়ের সঙ্গে জুড়ে থাকে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...