নিজের বুকের রক্তে / নক্ষত্রের উজ্জ্বল অক্ষরে / লিখে রেখো নাম / কালের রাখাল তুমি / তুমি ভিয়েতনাম।
ভিয়েতনাম নিয়ে বাঙালির মনে একটা সহজাত আবেগ এখনও কাজ করে। আমারও করেছিল, তাই সফর টিমে নাম লিখিয়ে অক্টোবরের শেষের দিকে ভ্রমণ শুরু করি। নিখাদ ভ্রামণিক হয়ে ভিয়েতনামের অতীত থেকে বর্তমান জীবনযাত্রার কোলাজ ছুঁয়ে আসতে পেরেছি।
কোলকাতা থেকে মাঝরাতের ভায়া ব্যাংকক-এর ফ্লাইট ধরে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় শহরে পা রাখলাম পরদিন সকালে। ভারতের সময়ের অঙ্কে ভিয়েতনাম দেড় ঘণ্টা এগিয়ে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, সম্পূর্ণ ভিয়েতনাম একবারের সফরে দেখে শেষ করা অসম্ভব। তাই মনস্থির করে পকেটের রেস্ত অনুযায়ী ভ্রমণসূচী তৈরি করা প্রয়োজন। এয়ারপোর্ট থেকে ডলার ভাঙিয়ে বেশ কিছু পরিমাণ ভিয়েতনামি কারেন্সি ডং সংগ্রহ করে নিলাম।

আজকের দিনে ভিয়েতনামি ডং বিশ্বের তৃতীয় নিম্ন মূল্যবান মুদ্রা। ইরান এবং ভেনেজুয়েলার পরে। মুদ্রাজনিত চাপ জেনে বুঝেই পর্যটকদের সফর করতে হয়। একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার, যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে ডং-এর মূল্য কম, তাই ভিয়েতনামে সমস্ত জিনিসের দাম ডং-এর হিসেবে খুবই বেশি। আপনাকে এক কাপ কফি খেতে গেলেও অনেকটা পরিমাণ ডং খরচ করতে হবে। যে-কোনও জিনিসে হাত দিলেই স্থানীয় মুদ্রায় দামের ছ্যাঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা। তাই এই সফরে প্রতিদিন জনপ্রতি কত ডং খরচ হতে পারে তার সম্যক ধারণা থাকা দরকার। প্রচুর হোম ওয়ার্ক করে গেলেও, মস্তিষ্কে স্থানীয় মুদ্রায় কনভার্ট করে ক্যালকুলেটরকে দাবিয়ে রাখাই ভালো।
এয়ারপোর্ট থেকে লটবহর সমেত বেরিয়ে দেখি কমলালেবু রঙের রোদ্দুর ভাসিয়ে দিয়েছে বিদেশি আকাশ, ঝাপসা সবুজ দিগন্ত। ইতস্তত মেঘ ছড়ানো আকাশের নীচে আনন্দে একপাক ঘুরেই দেখি সুন্দর এক টেম্পো ট্রাভেলার আমাদের অপেক্ষায়। পাইলট কোমর পর্যন্ত বো করে গাড়ির দরজা খুলে দিলে আমরা হই হই করে গাড়িতে উঠে হোটেলমুখো হলাম। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার। মসৃণ রাস্তা, তাই বাহনের গতি মসৃণ। বেশ কিছুক্ষণ টিপিক্যাল ভিয়েতনামি ল্যান্ডস্কেপ উপভোগ করার পর মূল পুরোনো শহরে প্রবেশ করলাম।
জানলা দিয়ে ইতিউতি নজর চালিয়ে দেখি রাস্তার দোকান-পাট খুলেছে। প্রচুর ছেলে মেয়ে সাদা ড্রেস পরে স্কুল যাচ্ছে। রাস্তায় চার চাকা নেই বললেই চলে, কিন্তু চাক ভাঙা মৌচাকের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে দু-চাকার বাহন রাস্তা ঢেকে রেখেছে। শুনেছি, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম গাড়ি শিল্পে নাকি স্বাবলম্বী নয়। আসলে উদার অর্থনীতির বাজারে গাড়ি শিল্পে বৃহৎ বিনিয়োগ এখনও সম্ভব হয়নি। তাই বিদেশি গাড়ি ব্যবহার না করে তারা যে-কোনও টু-হুইলারেই স্বচ্ছন্দ।
ভিয়েতনাম স্বাধীনতা অর্জন করতে যে মূল্য চুকিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে অল্প দেশেই তার তুলনা পাওয়া সম্ভব। বহু আগ্রাসন প্রতিহত করে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের শেষে ভিয়েতনাম কিছুটা শান্তির আলো দেখেছে। প্রায় বারোশো বছর পদানত থাকার পর খাপছাড়া ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটলেও, মুক্তি এসেছে অনেক পরে। ভিয়েতনামের ভূখণ্ডে প্রথম আস্ফালন ঘটায় চিন। তারপর আসে ফরাসিরা এবং মহাযুদ্ধের সময় জাপান ভিয়েতনাম দখল করে শোষণ নীতি চালায়। এর পরবর্তীতে হো চি মিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি সঙ্ঘবদ্ধ হতে শুরু করে৷ চূড়ান্ত শোষণ নীতির সূত্র ধরে আমেরিকা কমিউনিস্ট নিধনযজ্ঞের পীঠস্থান করে তুলেছিল ভিয়েতনামকে। যা দেখে পৃথিবীর মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। আমেরিকার ভ্রান্ত অক্ষম বিদেশনীতির সাক্ষী গোটা ভিয়েতনাম। আপাত শান্ত ছোটোখাটো চেহারার গোলগাল মুখের ভিয়েতনামিরা যে সাহস আর পরাক্রম দেখিয়েছে অমিত শক্তিধর আমেরিকার বিরুদ্ধে, তার নিদর্শন শহরের বুকে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে।
এরই মধ্যে আমরা হোটেলে পৌঁছে গেলাম। ওয়াই ফাই-সহ অন্যান্য ব্যবস্থা বেশ ভালোই। ফ্রেশ হয়ে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট খেয়ে ঘুরতে বের হলাম। প্রাচীন ও আধুনিকতার মিশ্র সংস্কৃতির স্থাপত্য হল হ্যানয়ের বিশেষত্ব। ইউনেস্কো তাই একে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করেছে। হ্যানয়ের আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ভিয়েতনামের ঔপনিবেসিক জীবনের ছোঁয়া।
হ্যানয়ের প্রকৃত অর্থ হল— নিরাপদ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। অতীতকালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বন্দর এবং চম্পা রাজত্বে এটি ছিল প্রধান বাণিজ্যনগরী। ছিমছাম পথঘাট, মধ্যযুগীয় ঘরবাড়ি, দোকান, সরাইখানা, ছাউনি দেওয়া জাপানি সেতু, চিনা মন্দির-সহ স্মৃতির সিন্দুক বুকে নিয়ে হ্যানয় আজও সময়কে বেঁধে রেখেছে।
(ক্রমশ…)





