আজ আধবেলার একটু বেশি সময় হাতে রয়েছে। সকলে আবদার করে বসলাম আমরা সাইক্লো (cyclo) করে ঘুরব। গাইড বাবাজি একটু বিপদে পড়লেও রাজি হয়ে গেলেন। সাইক্লো অনেকটা আমাদের দেশীয় রিক্সার মতো বেশ মজাদার। এই বাহনে স্লিম দু’জন বসা যায়। প্রতিটা সাইক্লোতে নাম্বার প্লেট লাগানো।

অপরাহ্নে পদবাহী সাইক্লো

ইতিহাস সিম্ফনি,

বেঁকে যায় ছায়াপথ

ঝাঁপ দেয় ব্যালকনি।

সাইক্লো চেপে কাছাকাছি বাজার, দোকান ভিয়েতনামিদের রোজকার জীবনের পসরা ঘুরে ফিরে দেখে আমরা গেলাম হো চি মিনের স্মৃতিমন্দির দেখতে। সারাদিন এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। বেশ রাজকীয় স্মৃতিসৌধে চাচা হো চি মিনের দেহ শায়িত। এই স্মৃতিসৌধের একেবারে কাছে অতি আধুনিক স্থাপত্যে তৈরি রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ যা নয়নাভিরাম বিশাল উদ্যান বেষ্টিত।

এই উদ্যানের একেবারে কাছেই রয়েছে ওয়ান পিলার প্যাগোডা। গলিপথে পায়ে হেঁটে চলে এলাম। ফুট চারেক ব্যাসের পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক প্যাগোডা। ফরাসিরা ভিয়েতনাম ছেড়ে যাওয়ার আগে এই অতি প্রাচীন প্যাগোডাটির প্রভূত ক্ষতি করেছিল। কিন্তু কালের নিয়তি, স্থানীয় মানুষ ও সরকারের কনজারভেশন পলিসির যৌথ উদ্যোগে আজও কত পর্যটক এই প্যাগোডা দেখতে আসছে। জলাশয়ের কোনার দিকে প্যাগোডা দাঁড়িয়ে, বাকি অংশ শালুক পদ্মের লতানে সৈনিকে ভর্তি। প্যাগোডার একলা নির্বাক সিঁড়ি আচমকা ঘণ্টার ধ্বনি নির্জন সময়কে ছিন্ন করে এক গভীর অভিঘাতে আমার মনকে আচ্ছন্ন করে দিল। প্যাগোডার সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে ওল্ড কোয়ার্টার। একদা ফরাসিরা এখানে বাস করত। গলিপথ, সরু গলিপথে পুরোনো ভিয়েতনাম অতি প্রকট।

অসংখ্য ছোটো দোকানে ভিয়েতনামি এমব্রয়ডারি কাঠের কাজ, জুতো তৈরির কারুশিল্প, রকমারি খাবার দোকান প্রভৃতি নিয়ে ওল্ড কোয়ার্টার বহু আগের ফরাসি মেজাজ বহাল রেখেছে। ফুটপাতে ফলের পসরা নিয়ে যে দোকানি দাঁড়িয়ে, সেও দায়িত্ব নিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার রাখে। মানে আম খেয়ে নির্দিষ্ট প্যাকেটে আমের আঁটি ফেলা হয় এবং অন্য ফল খেলে তার বীজ এবং দোকানি খোসা-সহ অন্যান্য বর্জ্য ফেলবে অন্য প্যাকেটে। প্লাস্টিকের প্যাকেট এক্কেবারে নিষিদ্ধ। প্রতিদিন স্রোতের মতো মানুষ আসছে, বেড়াচ্ছে, খাবার খাচ্ছে, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বেরিয়ে যাচ্ছে— কোনও সমস্যা নেই। পুরো জায়গা নিট অ্যান্ড ক্লিন। সবদিকে মধ্যযুগীয় ঝিমধরা সময় নিয়ে একদম অন্যরকম পরিবেশ।

সার দিয়ে খাবারের দোকানে লোভনীয় সব আইটেম দেখে লাঞ্চের জন্য আমরা ভিয়েতনামি খাবারের দিকেই ঝুঁকলাম। আমি ভ্রামণিক, তাই সব জায়গার স্থানীয় স্পেশাল খাবার চেখে দেখাকে ভ্রমণেরই অঙ্গ ভাবি। বিশ্বায়নের বাজারে ভিয়েতনামি কুইজিনের যথেষ্ট সুনাম। পাক শিল্পে চূড়ান্ত সংযোজন স্কুইড ক্র্যাবের পুরভরা স্প্রিংরোল ময়দার আবরণে ফ্রাই করা নয়। এই স্প্রিং রোলের আবরণ তৈরি হয় রাইস পেপার দিয়ে। এই সুস্বাদু প্যালেটের আমদানি চিনের নাকি ভিয়েতনামের, সে তর্কে আমি যাচ্ছি না। দাম কিছু বেশি হলেও, রসনার তৃপ্তি মনকে আনন্দ দিল। সঙ্গে নিয়েছি অপূর্ব স্বাদের ফল, যার সাইজ আমাদের দেশের ফলের প্রায় দ্বিগুন। লাঞ্চের শেষে কফিশপের সম্মোহিত টানে এগিয়ে গেলাম। ধূমায়িত কফিতে সিপ মেরে মনে মনে লিখে রাখলাম—

কফির কাপে রইল পরিচয়

দুধেলা উষ্ণতা খরচের খাতায়

পকেটে রেখেছি খোঁজ

ঠিকানা কোথায় তোর?

হ্যানয়ের আসল সৌন্দর্য কিন্তু রাতের মালকোষে। নগরীর রাস্তাঘাট, রেস্তোরাঁ দোকানপাট সব কাগজের লণ্ঠনে সেজে উঠেছে। থু-বন নদীতে কাগজের ডোঙায় ভাসানো হয়েছে জ্বলন্ত মোমবাতি। পথেঘাটে গান-বাজনা, হুল্লোড়, নিষিদ্ধ পল্লীর যৌন জীবনযাপন, মশকরা— সবই জেগে উঠেছে জিয়নকাঠির ছোঁয়ায়। বিভিন্ন দেশের পর্যটক সমাবেশে প্রাণোচ্ছল হ্যানয়। আজ যত কথা লিখছি তা রাত ফুরোতেই মিলিয়ে যাবে অলিগলির হাওয়ায়। দ্বিতীয় দিনে নতুন শহরের আখর কী লেখাবে তা অজানা। তবে ঐতিহাসিক যুদ্ধবিদ্ধস্ত শহরের ইতিকথা স্লেট-পেন্সিল হাতে নিয়ে বসে পড়লেই লেখা যায় না। বিগত যুদ্ধের বারুদের গন্ধ নাকে নিয়ে তার ক্ষত বুঝতে হয়, একান্তে অনুভব করতে হয়। সদাব্যস্ত সমস্ত ট্যুরিস্টের সেই সময় কোথায়? আমিই বাউণ্ডুলে বেপথু পথিক অচিরেই মন দিয়ে বসি।

দ্বিতীয় দিন হোটেলের জমকালো ব্রেকফাস্ট শেষ করে চলে এলাম মিলিটারি হিস্ট্রি মিউজিয়াম দেখতে। মিউজিয়ামের সামনেই আছে কয়েকটি বন্দি বিমান এবং ফরাসি ও আমেরিকানদের যুদ্ধ বিমানের ধ্বংসাবশেষ। রয়েছে স্বয়ংক্রিয় এয়ার ডিফেন্স বন্দুক, স্বচালিত বন্দুক এবং আরও অনেক ধারার অস্ত্রসমূহ। ভিতরে রয়েছে চিন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নথিপত্রে পূর্ণ কক্ষ। দেয়ালে ঝোলানো সাদা কাপড়ের মধ্যিখানে রয়েছে সামরিক বিভাগের প্রধান ব্যক্তিত্বের আবছা অবয়ব। এইসব দেখে মনটা কেমন যেন অসহায় হয়ে গেল। এই ক্রমপরম্পরা যুদ্ধ সামলে ভিয়েতনাম এমন ভাবে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে!

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...