মেয়েটি এতক্ষণে আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল, তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘বসার দরকার হবেক নাই বাবু, তুমার চেয়ারও ভিজে যাবেক।’ কথাগুলো বলতে বলতে আঁচলের ভিতর থেকে দুটো ছোট্ট পাখির বাচ্চা বের করল। বাচ্চা দুটো এখনও উড়তে শেখেনি। বৃষ্টিতে পুরো ভিজে গেছে। ‘বিষ্টিতে বাসা থেকেন পড়ে গ্যাছিল, শিয়াল কুকুরে খেয়ে লিতক, তাই তুলে লিয়ে এলাম।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী পাখি এগুলো?’

‘তিতির পাখির বাচ্চা বটে।’

‘বাড়ি নিয়ে গিয়ে বড়ো করবে এগুলোকে?’

‘না, তা হবেক নাই বাবু, বাড়ি নিয়ে গেলেই এ গুলানকেই আমার বাপ মেরে খেয়ে লিবেক। উ রাক্ষস আছে। কুনো মায়া নাই। ইটা লিয়েই চিন্তায় আছি। ছেড়ে দিলেও মইরা যাবেক, আর বাড়ি লিয়ে গেলেও…!’

‘সেই তো, তাহলে তুমি তো খুব মুশকিলে পড়েছ। কী করবে এবার?’

হঠাৎ মেয়েটার মুখে একটা উপায় পাওয়ার আনন্দের আলো ছড়িয়ে পড়ল যেন। ‘তুমি লিবে বাবু? ইয়াদের বড়ো করবো, তারপর ইয়ারা উড়তে শিকে যাবেক যখন, তখন উই নীল আকাশে উড়াই দিবে।”

‘আ… আমি! আমি যত্ন করার সময় পাব কখন?”

“উ সব লিয়ে ভাইব না গো, আমি রোজ আইসা উয়াদের ঠিক খাইয়ে যাব।’

হেসে বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তাই হবে।’

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। মেয়েটি পাখির বাচ্চা দুটি আমার কাছে রেখে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য বাইরে বেরিয়ে পড়ল। বৃষ্টির পরে এক অপরূপ আলোয় এই জঙ্গলকন্যাকে আমার মনে হল বোধহয় কোনও বনদেবী। এমন রূপ! এমন মায়া! এই ছাব্বিশ বছরের জীবনের অভিজ্ঞতায় প্রথম দেখলাম।

“তোমার নাম জানা হল না তো। নাম বলে যাও।’ মেয়েটি বৃষ্টি ভেজা নরম মাটিতে পায়ের ছাপ ফেলে চলে যেতে যেতে বলল, “ফুলমনি সরেন, সবাই ফুলি বুলে ডাকে…।’

এখন আমার নতুন সঙ্গী ফুলির দেওয়া দুটো তিতির ছানা আর সকাল-বিকেল তাদের যত্নের জন্য আমার বাসায় আসা ফুলি। প্রথমদিন ফুলিকে যেমনটা লাজুক মনে হয়েছিল, এই দু’দিনে বুঝলাম ও ঠিক তার উলটো। দু’দিনেই এত কথা বলেছে আমার সঙ্গে যে, এখন মনে হয় দু’দিন না, ওকে আমি দু’জন্ম চিনি! আজ সকালে এসেছিল, বিকেলেও আসবে বলেছিল। অথচ আজই ওর জেঠু মানে সনাতনবাবুর মেয়ের বিয়ে। তবুও ওই দুটো পাখির কথা ভোলেনি।

আমি ওকে বারণ করলাম। কিন্তু কিছুতেই শুনবে না। শেষে বললাম, “আমিও তো ওদের খাওয়াতে শিখে গেছি। জল দিয়ে আটা গুলে পালক ডুবিয়ে সেটা তুলে ওদের মুখে দেব। ব্যস, এই তো।’ তারপর ও রাজি হয়েছে। আমিও সন্ধের দিকে সনাতনবাবুর মেয়ের বিয়েতে যাব বলে ভেবে রেখেছি। সহজ সরল মানুষটার আন্তরিক আমন্ত্রণ আর ওনাদের বিবাহ অনুষ্ঠান দেখার ইচ্ছে আমাকে টানছিল।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ সনাতনবাবুর বাড়িতে এসে পৌঁছালাম। আমার গাড়ির ড্রাইভার বনমালী লোকাল ছেলে। সে লালরাস্তা দিয়ে একেবারে সনাতনবাবুর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করল। কী সুন্দর মাটির বাড়ি! দেয়ালে কালো রঙের উপর নানা রঙের ছবি। পাশাপাশি সব বাড়িগুলোই একইরকম সুন্দর। ভিতরে ঢুকে দেখলাম বিয়ের মণ্ডপ বানানো হয়েছে। মণ্ডপ বলতে উঠোনের মাঝে গর্ত করে একটি মহুয়া গাছের ডাল পুঁতে খড়ের গাছি দিয়ে গাছটিকে জড়ানো আছে। আর গাছের গোড়ার মেঝেতে নানারকমের সুদৃশ্য আলপনা দেওয়া হয়েছে। গাছের দু’পাশে দু’টো জলভর্তি কলসি। প্রকৃতি আর মানুষ কীভাবে একাকার হয়ে গেছে, তা এদের না দেখলে কখনও জানতেই পারতাম না।

আমার আসার খবর পেয়ে সনাতনবাবু কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে এসে খুব আনন্দে বলতে থাকেন, “বাবু আইচেন, আমার কী সুভাগ্যি! চলেন বাবু ইদিকটায় আমার বাড়ির হুই চাথালটায়, উত্থানে চেয়ারটায় বইসবেন।’ তারপর আমাকে প্রায় টেনে নিয়ে গিয়ে সেখানে বসিয়ে, এক ভদ্রমহিলাকে জল মিষ্টি আনতে বললেন। তিনি এক মিনিটের মধ্যেই একটি কাগজের প্লেটে মিষ্টি আর কাঁসার গেলাসে জল নিয়ে এসে আমাকে দিলেন।

আমি বসে বসে চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে ফুলিকেই খুঁজছিলাম। গেল কোথায় মেয়েটা! মিনিট দশেক পর ফুলির দেখা পেলাম। কোমরে কলসি, লাল রঙের একটা জরির কাজ করা শাড়ি পরেছে। ওর সঙ্গে ওর বয়সি আরও কয়েকটি মেয়ে। আরও একজন এমন কলসি নিয়ে আছে। কাড়ানাকাড়া আর ঢোলুক প্রথম থেকেই বাজছিল, কিন্তু এখন তার আওয়াজটা আরও বেড়ে গেল। অনেকের চিৎকারে বুঝলাম বর এসে গেছে। ফুলিকেও আর দেখতে পাচ্ছি না।

এদের বিয়ের নিয়মকানুন বেশ মনোরঞ্জক, আমার ভীষণ ভালো লাগছিল। এমন সময় হঠাৎ পিছন থেকে ফুলির ডাক, “ই বাবা! বাবু ইকা ইকা বইসা আচে, কতখন আইচ? কিছু খেয়েচ?’

—হ্যাঁ, খেয়েছি। তুমি তো আজ খুব ব্যস্ত। খুঁজেই পাচ্ছি না, খবরও নিচ্ছ না।’

‘হ বাবু, ইটা উটা কাজ কইরতে হচ্চে, আর ইখন কুনো কাজ নাই। তুমার কাছে বুসে ইবার আমাদের ই বিয়ার সব বুঝাই দিব’। এরপর মণ্ডপে অনুষ্ঠিত রীতিগুলোকে দেখতে দেখতে আমাকে ফুলি বর্ণনা করে বুঝিয়ে দিতে লাগল— কোন অনুষ্ঠানটার কী নাম। আর জানতে পারলাম ওদের বিয়ে বাড়িতে হাঁড়িয়ার খুব কদর, সবাই খায়। এর মধ্যেই ফুলি আমাকে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে রাতের খাবার নিজে বসে থেকে খাওয়াল। তারপর আরও কিছুক্ষণ সেখানে থেকে প্রায় মধ্যরাতে বন-বাংলোয় ফিরলাম।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...