কলকাতা, বাংলা তথা দেশের নাম উজ্জ্বল করার প্রয়াস জারি রেখেছে সে। এবার তার লক্ষ্য— অলিম্পিক্স-এ স্বর্ণপদক। কিন্তু ধাপে ধাপে সাফল্য অর্জন করে সেই স্তরে পৌঁছাতে চায় আত্মবিশ্বাসী মেয়েটি। তাই সে এখন চূড়ান্ত ব্যস্ত। তবে ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে তার স্বপ্ন এবং সাফল্যের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে ১৫ বছর বয়সি টেবল টেনিস তারকা সিন্ড্রেলা দাস।
তোমার কেরিয়ারে কোনও সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলে কখনও?
যে-কোনও খেলোয়াড়ের জন্য সবচেয়ে কঠিন লড়াই সবসময় মাঠে হয় না, বরং আঘাত থেকে সেরে ওঠার মধ্যে হয়। আমি এই অভিজ্ঞতাটি খুব অল্প বয়সেই অনুভব করেছি, যখন মাত্র ১১ বছর বয়সে ফিটনেস সেশনের সময় আমার ডান হাতের কবজি ভেঙে যায়। টেবল থেকে দূরে থাকাটা বেদনাদায়ক ছিল তখন আমার কাছে। শুধু শারীরিক ভাবে নয়, মানসিক ভাবেও। আমি মাঝেমধ্যে অস্থির, উদ্বিগ্ন এবং অসহায় বোধ করতাম। কিন্তু সেই পর্যায়টি আমাকে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং আরও কঠিন লড়াই করার গুরুত্ব শিখিয়েছে।

আজও, ছোটো ছোটো আঘাত আমাকে পরীক্ষা করে। মাঝেমধ্যে কিছুটা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয় ভালো পারফরম্যান্স দেওয়ার তাগিদ থেকে৷ সেই মুহূর্তগুলিতে, আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিই যে, বিপর্যয়গুলি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সেগুলি অতিক্রম করার ইচ্ছে স্থায়ী। প্রতিটি চ্যালেঞ্জ আমাকে কেবল আরও কঠোর, আরও আশাবাদী করে তোলে এবং আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য আরও দৃঢ় করে তোলে।
আমার কেরিয়ারে আমি সবচেয়ে বেশি যে চাপ অনুভব করি, তা হল— নিয়মিত আন্তর্জাতিক এক্সপোজারের প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো পারফর্ম করতে চাইলে অপরিহার্য। আর্থিক ভাবে, এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, ধানুকা ধুনসেরি গ্রুপ-এর সি কে ধানুকা এগিয়ে এসে আমাকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে সাহায্য করেছিলেন। উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য অস্ট্রিয়া পাঠানো হোক, আন্তর্জাতিক ইভেন্ট-এ অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হোক অথবা আমাকে সর্বশেষ প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহ করা হোক, সবটাই ব্যবস্থা করে দেন ধানুকা স্যার। এখন, OGQ (অলিম্পিক গোল্ড কোয়েস্ট)-এর জন্য আমি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী বোধ করছি। ধানুকা স্যার এবং OGQ উভয়ই আমার চূড়ান্ত স্বপ্নের কাছাকাছি যেতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

ভবিষ্যতে তুমি আর কী কী সাফল্য চাও?
আমার সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন হল, অলিম্পিক্স-এ স্বর্ণপদক জেতা। কিন্তু ধাপে ধাপে সাফল্য অর্জন করে আমি সেই স্তরে পৌঁছাতে চাই। আমার প্রথম লক্ষ্য হল— যুব এশিয়ান গেমস, আইটিটিএফ যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ এবং যুব অলিম্পিক্স-এ পদক জয় করা। সেখান থেকে আমি এশিয়ান গেমস এবং অলিম্পিক গেমসে পডিয়াম ফিনিশিং করার লক্ষ্য রাখি এবং শেষ পর্যন্ত, আমি বিশ্বে ১ নম্বর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখি। পাশাপাশি, আমি যতবার সম্ভব সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হতেও চাই।
তোমার আসন্ন টুর্নামেন্টগুলি কী কী?
হোম ফ্রন্টে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের পাশাপাশি, চারটি জাতীয় র্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। তিনটি বিভাগেই অংশগ্রহণ করব— অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং মহিলা দলে।
আন্তর্জাতিক সময়সূচী মতো আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করব, তারপরে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বাহরাইনে তৃতীয় যুব এশিয়ান গেমস-এ অংশ নেব। নভেম্বরের শেষে রোমানিয়ায় বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপের মাধ্যমে বছরটি শেষ হবে। আমি অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে মন্টিনিগ্রোতে দুটি WTT ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতে পারি, যা দেশীয় ক্যালেন্ডারের উপর নির্ভর করে। তোমার প্রজন্মের যারা বর্তমানে খেলা শুরু করেছে, তাদের জন্য তুমি কী বার্তা দেবে?
সাফল্য রাতারাতি আসে না। কেউ না দেখলেও, আপনি যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রশিক্ষণে থাকেন, অন্যরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছেন তখন আপনার ত্যাগস্বীকার থেকে এবং প্রতিটি ছোটো পদক্ষেপ আপনাকে আপনার স্বপ্নের কাছাকাছি নিয়ে যাবে, এই বিশ্বাস রাখতে হবে। আর কেবল পদক নয়, খেলাপ্রেমী হয়ে উঠুন। সেইসঙ্গে জানাই, ব্যর্থতা মানে সমাপ্তি নয়, বরং মনে রাখবেন, ব্যর্থতা এমন শিক্ষা দেয়, যা আপনাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল – আপনার দেশের প্রতিনিধিত্ব করা সবচেয়ে বড়ো সম্মান এবং প্রতিটি প্রশিক্ষণ অধিবেশন সেই স্বপ্নের অন্যতম পদক্ষেপ।
আর আমি মনে করি, খেলাধুলা সু-চরিত্র গঠন করতে পারে এবং জয় ও পরাজয় উভয়কেই সুন্দর ভাবে মোকাবিলা করতে শেখায়। তাই, এগিয়ে যান, শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকুন এবং নিজের উপর আস্থা রাখুন। সেইসঙ্গে, অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করুন। তোমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে তুমি কীভাবে উপকৃত হয়েছ বা সাহায্য পেয়েছ?
আমার পুরো পথচলায় আমার সবচেয়ে বড়ো শক্তি আমার বাবা-মা। শুরু থেকেই তাঁরা আমার স্বপ্নে বিশ্বাস করতেন এবং সম্ভাব্য সবরকম ভাবে আমাকে সমর্থন করতেন। এমন এক সময় ছিল, যখন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ত— সেটা আঘাত, কঠিন পরাজয় অথবা খেলাধুলার পাশাপাশি লেখাপড়ায় ভারসাম্য রাখা, তাঁরা সবসময় আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং কখনও আমাকে একাকিত্ব অনুভব করতে দেননি। আমি সত্যিই মনে করি, এখনও পর্যন্ত আমি যা কিছু অর্জন করেছি, তা আমার মা-বাবার নিরন্তর ত্যাগ, উৎসাহ এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার কারণেই।
খেলা এবং পড়াশোনা একসঙ্গে সামলাও কীভাবে?
৮ম শ্রেণি পর্যন্ত আমি টেবল টেনিস প্রশিক্ষণের পাশাপাশি, নিয়মিত স্কুলে যেতাম। কিন্তু আমার খেলার মাত্রা বেড়ে যেতেই উভয় ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবুও, আমি সবকিছু সামলে নিয়েছি টাইম ম্যানেজমেন্ট-এর মাধ্যমে। কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শিক্ষা সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমার চিন্তাভাবনাকে তীক্ষ্ণ করে তোলে এবং আমার সামগ্রিক সাফল্যকে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। আমি আরও মনে করি, শিক্ষা আমার দক্ষতা উন্নত করে, যা আমাকে আমার প্রতিপক্ষের খেলা আরও ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করতে এবং টেবলে পালটা কৌশল তৈরি করতে সহায়তা করে। তাই, টেবল টেনিস-এ জোরদার লড়াই জারি রাখার পাশাপাশি, আমি এখন একাদশ শ্রেণিতে মনযোগ সহকারে পড়ছি এবং এভাবেই লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই।
তুমি কী কী খেতে ভালোবাসো? বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পাও কতটা?
আমি ফুচকা খেতে ভালোবাসি। আর ঝোল-ঝোল মুরগির মাংস এবং চিকেন-স্টু খেতে আমার খুব ভালো লাগে। তবে বেশিরভাগ সময় আমি সেদ্ধ শাক-সবজি খাই। অনুশীলনের মাঝে অবশ্য ডিম, কলা এবং ড্রাই ফ্রুট খাই। আর ইচ্ছে থাকলেও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় খুব বেশি পাই না। O
জাতীয় সাফল্য
2025
ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, ভদোদরা: U-17 গার্লস সিংগলস— গোল্ড এবং U-19 গার্লস সিংগলস — গোল্ড।
জুনিয়র অ্যান্ড ইয়ুথ ন্যাশনালস: U-19 গার্লস টিম ইভেন্ট-2028 – 2025 গোল্ড।
ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, বেঙ্গালুরু: U-17 গার্লস সিংগলস – গোল্ড এবং U-19 গার্লস সিংগলস— ব্রোঞ্জ ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, গোয়া: U-17 গার্লস সিংগলস— গোল্ড।
ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, তিরুবনন্তপুরম: U-17 গার্লস সিংগলস — গোল্ড এবং U-19 গার্লস সিংগলস— গোল্ড সিনিয়র ন্যাশনাল: উয়োমেন’স সিংগলস— ব্রোঞ্জ।
2023-2024
জুনিয়র অ্যান্ড ইয়ুথ ন্যাশনালস: U-17 গার্লস সিংগলস — গোল্ড এবং U-19 গার্লস ডাবলস — সিলভার।
ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, হায়দরাবাদ: U-15 গার্লস সিংগলস— গোল্ড।
ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, পাঁচকুলা: U-15 গার্লস সিংগলস – গোল্ড।
ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, ভদোদরা: U-15 গার্লস সিংগলস — গোল্ড, U-17 গার্লস সিংগলস— গোল্ড এবং U-19 গার্লস সিংগলস — গোল্ড।
ন্যাশনাল র্যাংকিং টুর্নামেন্ট, বিজয়ওয়াড়া: U-17 গার্লস সিংগলস — গোল্ড।
আন্তর্জাতিক সাফল্য
2025
সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপস, কাঠমান্ডু: সিনিয়র টিম— গোল্ড।
WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার অ্যালমাটি: U-17 গার্লস সিংগলস — ব্রোঞ্জ।
WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার, মেজ: U-17 গার্লস সিংগলস — সিলভার।
WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার, প্রিস্তিনা: U-17 গার্লস সিংগলস — ব্রোঞ্জ এবং U-19 গার্লস ডাবলস— সিলভার।
2024
WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার, দামন: U-15 গার্লস সিংগলস — ব্রোঞ্জ এবং U-17 গার্লস সিংগলস — সিলভার WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার, লিগনানো: U-15 গার্লস সিংগলস— গোল্ড এবং U-17 গার্লস সিংগলস— ব্রোঞ্জ।
WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার, জোম্বাথেলি: U-17 গার্লস সিংগলস— ব্রোঞ্জ।
WTT ইয়ুথ স্টার কন্টেন্ডার, দোহা: U-19 গার্লস সিংগলস — ব্রোঞ্জ, U-15 গার্লস ডাবলস — সিলভার এবং U-15 মিক্সড ডাবলস— সিলভার।
সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ টেবল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ, শ্রীলংকা: U-15 গার্লস সিংগলস — গোল্ড, U-15 গার্লস টিম — গোল্ড এবং U-15 মিক্সড ডাবলস— গোল্ড।
WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার, আলজেরিয়া: U-15 গার্লস সিংগলস – গোল্ড, U-15 মিক্সড ডাবলস— ব্রোঞ্জ।
WTT ইয়ুথ স্টার কন্টেন্ডার, লিমা: U-15 গার্লস সিংগলস — সিলভার, U-15 গার্লস ডাবলস — সিলভার এবং U-15 মিক্সড ডাবলস— গোল্ড।
WTT ইয়ুথ কন্টেন্ডার, তিউনিসিয়া: U-15 গার্লস সিংগলস – সিলভার।
(সমাপ্ত)





