গোস্বামীবাবু কিছু সময় চুপ থেকে বলে ওঠেন, ‘দ্যাখ আমাদের গ্রামে কীর্তন হয়, কবিগান হয়। এবছর থেকে বাইরের শিল্পীদের দিয়ে আরেকটা বড়োরকমের প্রোগ্রাম করাব, এতদূর পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু ওই চটুল নাচ হবে না।’
—চটুল নাচ কেন বলছ কাকা, এমনিই তো নাচ হয়। একজন বলে উঠল।
—মুখে এমনি, তারপর দেখব….
গোস্বামীবাবুকে থামিয়ে মাঝপথে একজন বলে উঠল, “তাহলে কাকা এবার থেকে আমরা আর মেলাতে থাকব না। তুমি বাকিদের নিয়ে মেলা চালাওগে। তোমার ওই প্যানপ্যানে কীর্তন আর কবিগানের জন্য অন্যান্য গ্রামে আমাদের সবাই খ্যাপায়। বলে আমাদের গ্রামটা বুড়োদের গ্রাম। আমাদেরও একটা মানসম্মান আছে।’
আচমকা মেলাটার শুরু হওয়ার আগেই যেন দু’ভাগ হয়ে যায়। আশপাশের গ্রামে পার্টির সব দুটো তিনটে করে নেতা৷ কেউ কারওর কথা মানে না, শোনে না৷ কিন্তু গোস্বামীবাবু এই গ্রামে আর কাউকে মাথা তুলতে পর্যন্ত দেননি। কথা বলা তো অনেক দূরের কথা। তার মনে পড়ে যায়, যে-বছর প্রথমবার ছেলের কাছে আমেরিকায় তিনমাসের জন্য ঘুরতে গিয়েছিলেন, একজনকে রাতে থাকতে দিয়ে গেলেও সব চুরি হয়ে যায়। ব্যাপারটা নিয়ে নিচুতলাতে সেরকম কিছু না হলেও উপরতলাতে একটা চাপা উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়। বেশ কিছুদিন চারদিকের পরিবেশ গুমোট হয়ে ওঠে। এর মাঝেই একদিন ব্লক অফিসে বিডিও এবং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির উপস্থিতিতে, পার্টির জেলা সভাপতি থানার বড়োবাবুর দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলে ওঠেন, ‘আপনাকে তিন মাস সময় দিচ্ছি। গোস্বামীবাবুর চুরি যাওয়া জিনিসের সব টাকা ওনাকে ফিরিয়ে দেবেন।’
ব্যাপারটা শোনার পর সেখানে বসে থাকা গোস্বামীবাবুরও খুব খারাপ লাগে। একরকম চমকে ওঠেন। একটু আমতা আমতা করে জেলা সভাপতির মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘মানে বলছিলাম…’
—না গোস্বামীবাবু, আপনাকে আর কিছু বলতে হবে না। আমরা সবাই এই পার্টিতে আপনার কাজ মনে রেখেছি। আপনার বাড়িতে চুরি হয়েছে অথচ এই পেটমোটা পুলিশগুলো এখনও পর্যন্ত কিছুই করতে পারেনি। জিজ্ঞেস করুন তো এদের কারও-র মাসের বেতনের টাকাতে হাত পড়ে কিনা! তারপর জেলা সভাপতি আবার বড়োবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন, ‘আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। আপনাকে যেটা দিতে বলেছি সেটা দিয়ে দিন। পাঁচ লাখের এক পয়সা যেন কম না হয় এবং সেটা তিন মাসের মধ্যে।’
এবার বড়োবাবুর মুখটা ছোটো হয়ে যায়। সেখানে বসে থাকা বিডিও সাহেব পর্যন্ত কোনও কথা বলেননি। বড়োবাবু জোরে জোরে শ্বাস নিতে আরম্ভ করেন। সেদিন অবশ্য ব্যাপারটা সাড়ে তিন লাখে রফা হয়। আর যে লোকটা রাতে গোস্বামীবাবুর ঘর পাহারা দিচ্ছিল, তাকে অ্যারেস্ট করতে বলেন জেলা সভাপতি। এতেও গোস্বামীবাবুর মত না থাকলেও তিনি কিছু বলেননি। মিটিংয়ের সময় সেই কথাগুলো মনের ভিতরে চলে আসতেই গোস্বামীবাবু মুচকি হেসে ওঠেন।
—এইসব আজকের ছেলে আমাকে চোখ রাঙাচ্ছে! একবার পুলিশে… পরক্ষণেই অবশ্য নিজেকে সামলে নেন। এরা সব নিজের গ্রামের ছেলে, এদেরকে এভাবে বকলে হয় কি? তারপরেই খুব শান্ত ভাবে বলে উঠলেন, ‘বলছিলাম আমি যতদিন এখানে আছি, ততদিন এই কীর্তন আর…।’
—না কাকা, এবারে আমাদের জন্যে বুগিবুগি করাতেই হবে। না হলে আমাদের ব্যাচের কেউই মেলাতে থাকবে না। শেষের কথাগুলো শেষ হবার আগেই আরও কয়েকজন বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক। আমরা কেউই থাকব না।’
গোস্বামীবাবু একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর বলে ওঠেন, ‘ঠিক আছে, বুগি বুগি নাচ হবে কিন্তু এত কম সময়ের মধ্যে…।’
—তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। ওই রোলের দোকানের লোকটাকে বললে সব ব্যবস্থা করে দেবে। কয়েক বছর ধরেই ও বুগিবুগি নাচের কথা বলছে। তোমার পারমিশনের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।
—করবি কোথায়? মেলাতে তো আর জায়গা নেই? গোস্বামীবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
—সে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, পাশের ডাঙাটাতে বসবে। ওরাই পরিষ্কার করে নেবে বলেছে। খুব বেশি আলোও বাইরেটাতে দিতে হবে না। ভিতরের ব্যবস্থাও ওরা করে নেবে, প্রশান্ত উত্তর দিল।
—বাবা! সব কিছু একেবারে পাকা করেই এসেছিস। কিন্তু তোদের কথা দিতে হবে, যদি কোনওরকম ঝামেলা হয়, পরের বছর থেকে পুরো মেলা বন্ধ করে দেব।
এবারের মেলাতে শুরু থেকেই সমস্যা হচ্ছে। গ্রামের ধর্মরাজ পুজো উপলক্ষ্যে হলেও মেলাটা বসে একটা বড়ো মাঠে। বুগিবুগি নাচটা বসছে সেই বড়ো মাঠের সঙ্গে লেগে থাকা আরেকটা ছোটো এবং পড়ে থাকা জমিতে। সেটা মেলার মূল মাঠ থেকে একটু আলাদা। একটু আলো-আঁধারি পরিবেশে। বুগিবুগি নাচের তাঁবুটা ইচ্ছে করেই এমন জায়গাতে করা হয়েছে। এই তাঁবুতে ঢোকার জন্যে মানুষ একটু অন্ধকার খোঁজে। সেখানকার যাতায়াতের রাস্তাটা প্রথম দিকে খুব খারাপ হলেও পরে নাচের তাঁবুর লোকেরাই গ্রাম থেকে লোক লাগিয়ে রাস্তাটা পরিষ্কার করে নেয়।
গ্রামের একেবারে ছোটো ছেলে আর বাড়ির মা-বোন-কাকিমা-জেঠিমাদের ওই নাচের তাঁবুতে ঢোকার কোনও অনুমতি না থাকবার জন্য একমাত্র তাদেরকেই নাগরদোলা চড়তে বা এগরোল ও আইসক্রিমের দোকানের সামনে দেখা যাচ্ছে। বাকি ভিড়টা সেই নাচের তাঁবুর সামনেই ঘোরাঘুরি করে। শোনা যাচ্ছে, বয়সে যেসব পুরুষের শীতের গন্ধ লেগে গেছে, তারাও নতুন রহস্যের সন্ধানে একটু রাত বাড়তেই এদিক ওদিক ঘুরে টুক করে ঢুকে পড়ছে নাচের তাঁবুতে। বাইরে একটা বুড়ো লোক প্রতিদিনই চিৎকার করছে, ‘একটুকুন হিলি নেন, একটুকুন হিলি নেন।’
(ক্রমশ…)





