চৌকির একদিক থেকে বয়ে আসছে ভিলাঙ্গানা, অন্যপাশে দুধবামক হিমবাহ থেকে নেমে আসা উচ্ছল দুধগঙ্গা। সামনে বাঁদিকে (উত্তরে) দেখা যাচ্ছে খাটলিং হিমবাহ। থলায়সাগর বা ফাটিং পিয়ার শৃঙ্গ। আমাদের যাত্রার সমাপ্তি ঘটল বিকাল ৩.৪৫ মিনিটে।
ক্লান্ত শরীরে অপেক্ষা রাতের খাবারের। হঠাৎ স্বরূপের চিৎকার, তোমরা বাইরে এসো! আমরা ধড়মড়িয়ে বাইরে এলাম। দেখলাম, একটা জন্তু দৌড়ে পালাচ্ছে। টর্চের আলোতে চোখ জ্বলজ্বল করছে। গাইড ও কুলিরা সবাই দৌড়ে এল। কী ছিল জন্তুটা? প্রশ্ন করতে উত্তর মিলল—লমড়ি সাব। অর্থাৎ আইস ফক্স।
চাঁদের পাহাড়ে শংকরকে কোয়োটরা ঘিরে ধরেছিল। এখানে আমাদের ঘিরে রয়েছে বরফ শৃগাল। খাবারের লোভে এরা দল বেঁধে আক্রমণ করতে পারে। টর্চের আলোতে এদের জলন্ত চোখ ভয়ের সৃষ্টি করছে। একটা নয়, একাধিক লমড়ি দেখা যাচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত মতামত অবশ্য বেশ বড়ো আকারের শিয়াল। যাইহোক, সবাইকে সাবধানে থাকতে হবে। রাতে তাঁবুর বাইরে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হল। এই পাথর-বরফের রাজ্যেও হিংস্র প্রাণী।

আজ আমাদের বিশ্রামের দিন ছিল। উচ্চতার সঙ্গে শরীর খাপ খাইয়ে নেওয়া খুব জরুরি। পরবর্তী রাস্তার দূরত্ব ও উচ্চতার কথা ভেবে কিছুটা পথ এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলের ঢেকে থাকা তুষারমৌলি শৃঙ্গ দৃশ্যমান। গাইডের তাড়া সত্ত্বেও আমরা ৮.৪৫ মিনিটের আগে যাত্রা শুরু করতে পারলাম না। শুরুতেই প্রবল গতির বহমান দুধগঙ্গাকে দড়ির সাহায্য নিয়ে পেরিয়ে এলাম। সকালে নদীতে জলের পরিমাণ ও তোড় দুটোই তুলনামূলক কম থাকে। খালি পায়ে অর্ধ নগ্ন হয়ে পেরোতে হল নদী! বরফগলা জলে হাঁটুর উপর পর্যন্ত অসাড় হয়ে গেল। পিঠে বোঝা নিয়ে সর্পিল পথ বেয়ে চলেছি। যত উঠছি, শৃঙ্গগুলি ততই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। পথের ক্লান্তি ঘুচিয়ে দিচ্ছে অনুপম প্রকৃতি।
গাইড রঘুবীর বলল, কয়েকদিন আগে যোগীন-১ শৃঙ্গ জয় করে এসেছে বাঙালি অভিযাত্রী দলের সঙ্গে। বীরদর্পে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যোগীন-১, একটু পিছনে যোগীন-৩। আরও পিছনে থলায়সাগর। সবাই ধীর গতিতে পৌঁছালাম আজকের গন্তব্য কুণ্ডলী বা ছোটো মশারতালে। উচ্চতা ১৪০০০ ফিট। ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডের পাশে ঝরনার জল পেয়ে সবার স্নান করার ইচ্ছে হল। সবাই দৌড়ে গেলেও বরফ গলা জলের শীতলতা সবার ইচ্ছে শুষে নিল।

আজ আমাদের গন্তব্য মাশারতাল। সকাল ৮.৩০ মিনিটে সবজি ও রুটি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। একটানা চড়াই ভেঙে যত উপরে উঠছি, সামনের শৃঙ্গগুলি আরও উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। একই ছবি বারবার ক্যামেরাবন্দি করছি। থলায়সাগর আস্তে আস্তে চোখের আড়ালে চলে গেল। এই থলায়সাগর শৃঙ্গ জয় করে রাতারাতি প্রচারের আলোয় এসেছিল প্রয়াত ছন্দা গায়েন। যোগীন শৃঙ্গগুলি আরও বেশি করে অহং প্রকাশ করছে। গঙ্গোত্রী শৃঙ্গগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাওনলি শৃঙ্গকে বিপুল মনে হচ্ছে। বামদিকের খাড়া ঢালে ঝুলে রয়েছে দুধগঙ্গার জন্মদাতা দুধগঙ্গা বামক হিমবাহ।
-পাকড়ো, পাকড়ো! হঠাৎ তাকিয়ে দেখি মালবাহক মুকেশ ও রতন সিং খাড়া ঢালে তীব্র গতিতে একটা পাখির পিছনে ছুটে চলেছে। পাখিটি লাফিয়ে লাফিয়ে ক্রমাগত উপরে চড়ছে। পিছনে লাঠি ও পাথর হাতে দু’জন বিপজ্জনক ভাবে দৌড়ে চলেছে। মনে হচ্ছে দুটি বানর পাহাড়ে লাফিয়ে চড়ছে। পাখি তাড়া খেয়ে খাড়া ঢালে নেমে যাওয়ায় দু’জন হতাশ হয়ে ফিরে এল। দেখে মনে হল pheasant জাতীয় পাখি!
আমরা মশারতালের কাছাকাছি জায়গায় তাঁবু খাটালাম। পোশাক পরিবর্তনের সুযোগ পেলাম না, আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। শুরু হল প্রবল তুষারপাত, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। দমকা হাওয়ায় তাঁবু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ভিতরে চারজন তাঁবুর রড ধরে বসে আছি। তুষারভারে তাঁবু ঝুলে পড়েছে। ভিতর থেকে আইস এক্স দিয়ে বরফ ফেলার চেষ্টা করছি। ভয় হচ্ছে, টেন্ট ভেঙে না যায়। মনে মনে প্রার্থনা করছি— ‘থেমে যাক এই তুষারঝড়’। অবশেষে ৫.৪০ মিনিট নাগাদ ঝড় থামল। চারিদিকে বরফ জমে গেছে। প্রবল ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। প্রার্থনা করতে লাগলাম, আগামীকালের আবহাওয়া যেন ভালো থাকে!
আগামীকাল আবহাওয়া ভালো থাকা খুব জরুরি। বিপজ্জনক ঢালে ১৭০০০ ফিটের বেশি উচ্চতার খাড়া গিরিবর্ত অতিক্রম করতে হবে। সকাল ৬টার মধ্যে আমাদের সফর শুরু হবে। তারও আগে ৫.৩০ মিনিটের মধ্যে মাশারতালে পুজো দিতে যেতে হবে। ঠিক হল, প্রাতরাশের আগে আমি আর স্বরূপ রঘুবীরের সঙ্গে যাব।
(ক্রমশ…)





