ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির কাছে অনেক সময় লক্ষ্যের উপলক্ষ্য বড়ো হয়ে দাঁড়ায়। কর্মসূত্রে যদি এমন জায়গায় বদলি হয়, যা জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম হয়, তাহলে নিজের পরিবার তো বটেই, দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনদেরও আশ্রয় ও আথিতেয়তা দিতে হয় বেচারা চাকুরিজীবীকে। যাইহোক, বন সংলগ্ন সবুজ ঘেরা ক্যাম্পের মধ্যে নিঝুম কোয়ার্টারে থাকাতেও যা আনন্দ, তাতে শহুরে জীবনের নাগরিক ব্যস্ততা ও বিনোদন দুটোই ভুলে থাকা যায় বেশ কিছুদিন। অবশ্য শিলিগুড়ি শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ‘সেবক মিলিটারি স্টেশন’। প্রায়ই সেবক রোডের ‘কসমস’ মলে গিয়ে সবকিছু একটু চেখে আসি বা আসতেও হয়। দু’কেজি আলু কিনতে হলেও অনেক সময় ৬ কিমি বাইক চালিয়ে শালুগড়া বাজার যেতে হয় আমাদের হেল্পিং হ্যান্ড চাটুজ্জে মশাইকে।

শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে আমার সবচেয়ে স্বপ্নের ভ্রমণ পরিকল্পনা ছিল সান্দাকফু ট্রেকিং আর তিস্তার বুকে র‍্যাফটিং। দুটোর কোনওটাই হয়নি। তার বদলে তিন-তিনবার অরণ্য থেকে অরণ্যে ছোটোছুটি হয়ে গেল। জলদাপাড়া, বক্সা, কোচবিহার ও ভুটান সীমান্ত ফুন্টশোলিং গিয়েছি যখন যেমন সময় পেয়েছি। অবশ্য শালুগড়া মিলিটারি ক্যাম্পের একপাশে পুরো জঙ্গল। কপাল ভালো থাকলে হাতি, চিতা, বুনো শুয়োর, বাইসন এসবের দেখা মিলতে পারে। ওখানকার বাসিন্দারা অবশ্য উক্ত প্রাণীগুলোর একটারও মুখোমুখি হওয়া সৌভাগ্য মনে করে না, বরং আতঙ্কে থাকে। তবে আমি ও আমার কন্যা যে ক’দিন ছিলাম, ততদিন গরু ও বাঁদর ছাড়া আর কিছু পাইনি। তাই এক বন থেকে উজিয়ে আরও আরও বনের দিকে যাত্রা।

ইংরেজিতে Dooars নামটাই সর্বাধিক প্রচলিত। অথচ এর উৎপত্তি বাংলার ‘দুয়ার’ শব্দ থেকে, যে শব্দটি একই অর্থে অসমিয়া, নেপালি, হিন্দি, মৈথেলি, ভোজপুরি, মগধি ও তেলুগু ভাষাতেও প্রচলিত। এই দুয়ার বা দরজা হিমালয় পর্বতে প্রবেশদ্বার নাকি বিশেষ করে ভুটান যাওয়ার প্রবেশ পথ (ভুটান থেকে সমতলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ১৮টি প্রণালী এই অঞ্চলে) তা নিয়ে একাধিক মত থাকতে পারে। তবে, স্বর্গের দুয়ার বললে বোধহয় অতিশয়োক্তি হবে না। নেপাল ও উত্তর ভারতের ‘তরাই’ অঞ্চলের সমতুল্য বাংলার ডুয়ার্স। ৮,৮০০ বর্গ কিলোমিটারের বিস্তীর্ণ এই সমভূমিকে সংকোষ নদী পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত ‘পশ্চিম ডুয়ার্স” ও আসামের অন্তর্গত ‘পূর্ব ডুয়ার্স”-এ ভাগ করেছে। এক সময় কোচ রাজবংশের কামতা রাজ্যের অধীন এই অঞ্চলটির দখল নিয়ে ভুটানের সঙ্গে একাধিক সংঘর্ষ হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার ভুটানের কাছ থেকে ১৮৬৫ সালে ডুয়ার্স পুনরুদ্ধার করার পর পূর্বভাগ জুড়ে যায় আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় আর পশ্চিম ডুয়ার্স কালক্রমে ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা হিসাবে পরিচিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৪৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গরাজ্যের একটি জেলা হিসাবে জলপাইগুড়ির অন্তর্ভুক্তি ঘটে। খানিকটা এই ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখেই হয়তো আমার ভ্রমণসূচিতে নিসর্গ দর্শনের পাশাপাশি, ইতিহাস দর্শনটাও শামিল থাকে।

সত্যি বলতে আমার জীবনসঙ্গীর খুচরো ছুটিছাটা অনুযায়ী ছোটো ছোটো কিস্তিতে জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলাটার কিছু কিছু ঘুরে নিই। ২১ মে শনিবার সকাল ৯টা নাগাদ একটা গাড়ি নিয়ে শালুগড়া থেকে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে লাটাগুড়ির পথে। শুধু এক পিঠ যেতেই ১৬০০ টাকা দিতে হল গাড়িওয়ালাকে।

গজলডোবায় তিস্তা ব্যারেজ

গজলডোবায় বন্য পাহাড়ি তিস্তার উচ্ছ্বাসকে বাগে আনতে নদীর উপর রয়েছে ব্যারেজ বা বাঁধ। মাইথন ও পাঞ্চেতের ড্যাম ও তার গা ছমছম করা বিশাল জলাধার দেখেছি। ৮০০ ফুট গভীর জলের উপর দুরুদুরু বক্ষে বোটিংও করেছি। তাই তিস্তার ব্যারেজ তেমন রোমাঞ্চকর মনে না হলেও, ব্যারেজের একদিকে তিস্তা ক্যানেলটা দেখতে ভারি চমৎকার লাগে। বেলা ১১টা নাগাদ আংশিক মেঘলা আকাশটা দেখতে ভালোও লাগছিল। শীতকালে পরিযায়ী পাখি আসে। জায়গাটা শীতকালে হয়ে ওঠে জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। এই মে মাসেও ইতস্তত পর্যটক ছিল। বেশিরভাগই স্থানীয়।

তিস্তা খালের পাশের রাস্তায় আমি জীবনে প্রথম মরীচিকা দেখলাম। দূর থেকে মনে হচ্ছে রাস্তা বৃষ্টি পড়ে ভিজে চকচক করছে, গাড়ি কাছে আসতেই দেখি জলের লেশমাত্র নেই। আসলে উত্তাপ বাড়লে ও বাতাসে ভিন্ন ভিন্ন ঘনত্বের স্তর সৃষ্টি হলে যে-কোনও পথেই এই দৃষ্টিভ্রম হয়। কিন্তু আমি আমার চল্লিশোর্ধ্ব জীবনে প্রথমবার এমন আলোর মায়া দেখে বাচ্চা মেয়ের মতো উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম! একবার নয়, বেশ কয়েকবার। আর একটা মজার জিনিস আছে এই রাস্তায়— ‘কজ-ওয়ে’ (cause way)। বৃষ্টি পড়লে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আসা জল বেশ শৃঙ্খলা মেনে নির্দিষ্ট পথ দিয়ে রাস্তা পেরোয়। একে পাহাড়ি ঝোরা বা বৃষ্টিধারার জেব্রাক্রসিং বলা যায়!

বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে জঙ্গল ভ্রমণের টিকিট পাওয়া যাবে। তাই খেয়েদেয়ে সবাই কটেজে বিশ্রাম নিচ্ছি। আমরা উত্তরবঙ্গের বিশেষত্ব বোরোলি মাছ খেতে চেয়েছিলাম। এই মে মাসে বোরোলি বড়ো হয় না, হয় পুজোর সময় থেকে। তবে রাঁধুনির হাত বেশ ভালো। আয়োজনও একটু বাহুল্যের দিকেই। আলু পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করা খান ছয় বোরোলি মাছের এক প্লেট করে শেষ করতে না করতে, কাতলার কালিয়া এসে হাজির। দুটো তো ফিরিয়েই দিলাম।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...