মালয়ালম ক্যালেন্ডার-এর ‘চিংগাম মাস’ অনুযায়ী (অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর) দশ দিন ধরে উদযাপিত হয় ওনাম উৎসব। এই ফসল উৎসব আনন্দ ও উৎসাহে পরিপূর্ণ থাকে। চুলে জুঁইফুল শোভিত হয়ে এবং ঐতিহ্যবাহী কাসাভু শাড়ি পরে, মহিলারা উৎসাহের সঙ্গে যখন এই উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নেন— এমন দৃশ্য সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। আসলে, এই উৎসব জাতি ও ধর্মের বাধা অতিক্রম করে এবং আত্মাকে স্পর্শ করে। ওনাম কেবল সমৃদ্ধি এবং ঐতিহ্যের উদযাপনই নয়, বরং এটি মহিলাদের সাংস্কৃতিক চরিত্র গঠন, নেতৃত্ব এবং ঐক্যের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। এই উৎসব শুধু আজকের দিনেই নয়, ঐতিহাসিক ভাবেও নারীর কেন্দ্রীয় ভূমিকা উদযাপন করে চলেছে। এটি সৃজনশীলতা এবং ঐক্যে পূর্ণ একটি বর্ণিল উৎসব। শুধু কেরালায় নয়, অন্যান্য ভারতীয় এবং প্রবাসী মহিলাদের অংশগ্রহণও ওনামকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

পুকলম: ফুলের রঙ্গোলি
১০ দিনের উৎসবে কেরালার গ্রাম এবং শহরগুলি রঙিন ফুল এবং অন্যান্য উপকরণে সুন্দর ভাবে সেজে ওঠে। প্রতিটি পরিবার সবচেয়ে সুন্দর ‘পুকলম’ তৈরির জন্য প্রতিযোগিতা করে এবং ওনাম-কে স্বাগত জানাতে ঘরগুলি ফুল দিয়ে সাজানো হয়, পরিষ্কার করা হয় ইত্যাদি।
পুকলম বা আথাপুকলম হল ওনাম-এর সময় মাটিতে তৈরি রঙিন ফুলের একটি ঐতিহ্যবাহী রঙ্গোলি। এটি রাজা মহাবলীর আগমন এবং সমৃদ্ধির চেতনার প্রতীক।
পুকলম-এর নকশা সাধারণত হস্ত নক্ষত্র থেকে শুরু করে শ্রাবণ পর্যন্ত প্রতিদিন বাড়ানো হতে থাকে। এটি তৈরি করা একটি দলগত কার্যকলাপ, যেখানে পরিবার এবং প্রতিবেশীরা, বিশেষকরে শিশুরা একসঙ্গে অংশগ্রহণ করে। পুকলম তৈরিতে চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, জুঁই, পদ্ম, গাঁদা ইত্যাদি ফুল ব্যবহার করা হয়। আজকাল স্কুল, কলেজ এবং পাবলিক প্লেস-এও পুকলম প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

ওনাসাদ্যা: ওনাম উৎসব
সাদ্যা ছাড়া ওনাম অসম্পূর্ণ। কলাপাতায় পরিবেশিত ২৪ থেকে ২৮টি খাবারের একটি ঐতিহ্যবাহী নিরামিষ খাবার হল এই ওনাসাদ্যা। এতে রয়েছে প্যারিপু, সাম্বার, রসম, আভিয়াল, থোরান, ওলান, পাচাদি, পায়েস, কলার চিপস, চিনির পোরাথি ইত্যাদি। খাবার পরিবেশনের ক্রমও গুরুত্বপূর্ণ— প্রথমে লবণ, আচার, চিপস, হালকা সবজির খাবার পরিবেশন করা হয়। তারপরে পরিবেশন করা হয় সাম্বার, ওলান, রসমের মতো ভারী খাবার। প্রতিটি খাবার স্বাদ, হজম এবং স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে পায়েস, কুটকুকরি, থোরান, আভিয়াল, সাম্বার, ওলান, রসম, খিচুড়ি, আচার, ইঞ্জি থাইর, কলা, শরফোকরা পুরাথি এবং উল্গেরির মতো সুস্বাদু খাবার। প্রতিটি খাবারেরই সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
ওনাম শুরু হয় অথাচময়ম নামক একটি সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রার মাধ্যমে, যা ত্রিপুনিত্রা থেকে শুরু হয়। এতে সুসজ্জিত হাতি, লোকশিল্প, ফুলের মিছিল এবং পুলিকলি, থিরুবোতিরা এবং কাইকোত্তিকালীর মতো নৃত্য পরিবেশিত হয়।
ওনাম উৎসবে সরকার এবং পর্যটন বিভাগ রাজ্যজুড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কথাকলি, শাস্ত্রীয়-নৃত্য, লোকসংগীত, নৌকা বাইচ এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করে।
ওনাম-এর পরবর্তী আচার-অনুষ্ঠান, যেমন— অভিত্তম, চাথায়ম প্রভৃতিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে শোভাযাত্রা, রীতিনীতি পালন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং রাজ্য আয়োজিত উৎসবে সমৃদ্ধ থাকে।
ঐক্যের উৎসব
ওনাম এখন একটি বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে মালয়ালি সম্প্রদায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভোজ এবং খেলাধুলার আয়োজনের মাধ্যমে উৎসবের চেতনাকে জীবন্ত রাখে। প্রবাসীদের জন্য এটি আত্মীয়তা এবং সম্প্রদায়ের বন্ধনের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। এই ধরনের উৎসব মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। এগুলো আনন্দ ও শাস্তির মুহূর্ত প্রদান করে, মানসিক শান্তি এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে। এগুলো জীবনে সংযোগ এবং সুখস্মৃতির জন্য অবিস্মরণীয় উপলক্ষ্য হয়ে ওঠে।
সৌন্দর্য এবং হইহুল্লোড়
উৎসবের সময় সবাই নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শন করতে চায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফটোগ্রাফি এবং ভিডিওগ্রাফি করা এখন সহজ হয়ে ওঠায়, সৌন্দর্য প্রদর্শনের হিড়িক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষকরে যুবতিরা ফেসিয়াল, পেডিকিউর, ম্যানিকিউর, নেইলপলিশ এবং মেহেদি করাতে আগ্রহী। ত্বকের যত্নে পরিষ্কার, টোনিং এবং ময়েশ্চারাইজিং— এইসব শরীর এবং মন উভয়কেই প্রশান্ত করে। কলেজগুলিতেও ওনাম অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে উদযাপিত হয়। শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্য এবং অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার মিশ্রণ, যেমন— ডিজাইনার ব্লাউজ-এর সঙ্গে কাসাভু শাড়ি পরে ফ্যাশনকে এক নতুন রূপ দেয়। ওনাম শরীর ও মন উভয় ক্ষেত্রেই আনন্দ ও শক্তি ভরিয়ে দেয়।
স্ট্রেস–থেরাপি
উৎসবমুখর পরিবেশ স্ট্রেস হরমোন কমায়। ঘর পরিষ্কার করা, সাজসজ্জা, মেক-আপের জন্য কেনাকাটা করা, নতুন পোশাক পরা, মেহেন্দি লাগানো ইত্যাদি আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক ভারসাম্য উন্নত করে, ইতিবাচক শক্তি জোগায়। ঘর সাজানো এবং পূর্ণ আবেগের সঙ্গে উৎসবে অংশগ্রহণ করা এক ধরনের স্ট্রেস-থেরাপি। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, মেক-আপ বা সাজসজ্জা করলে উদ্বেগ কমে এবং মনে শান্তি আসে।
আশা এবং ইতিবাচক প্রভাব
উৎসব মনে আশা জাগায় এবং ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেইসঙ্গে, ব্যস্ত জীবন থেকে সরিয়ে কিছুটা বিশ্রাম দেয়। কিছু মানুষ সময়ের অভাবে একাকীত্ব বোধ করেন, এমন পরিস্থিতিতে উৎসব তাদের মানসিক শান্তি এবং সুখ দেয়। পারিবারিক মিলন সম্পর্ক মজবুত করে।
ঐতিহ্যে নতুনত্ব
সবসময় পুরোনো রীতিতেই উৎসব পালন করা জরুরি নয়। নতুন প্রজন্ম নতুন ভাবে উৎসব উদ্যাপন করতে প্রস্তুত। তারা জানে, নজর কাড়তে হলে নতুনত্ব আনতেই হবে সাজ-পোশাকে। বাড়ি ছাড়াও, আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া, বিশেষকিছু কেনা, নতুন বাড়ি কেনা অথবা অভাবীদের খাবার দান এবং উপহার দেওয়া প্রভৃতি ওনাম-এর মিষ্টতা দ্বিগুন করতে পারে।
ক্যাম্পাস ওনাম
স্কুল ও কলেজগুলিতে ওনাম খুব জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়— শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন, সাধারণ যুবকরা শার্ট বা কুর্তা পরে, মেয়েরা কাসাভু শাড়ি পরে। এখন তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক শৈলীর মিশ্রণে নতুন ফ্যাশন তৈরি করেছে।
ওনাকোডি: নতুন পোশাকের ঐতিহ্য
ওনাকোডি: মানে ওনামে নতুন পোশাক পরা। এই ঐতিহ্যটি পরিবারের বড়োদের দ্বারা ছোটোদের নতুন পোশাক দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। আসলে ওনাম-এ উপহার দেওয়া, সম্পর্ককে মজবুত করে। এটি বস্তুবাদের প্রতীক নয়, বরং প্রেম এবং আত্ম-উপলব্ধির এক অনন্য মাধ্যম। উৎসব প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানোর সুযোগ করে দেয়। ছোটো ছোটো উপহারও অমূল্য হয়ে ওঠে, যদি ভালোবাসার সঙ্গে কিছু দেওয়া হয় এবং যদি প্রাপকের তা পছন্দের উপকরণ হয়ে ওঠে, তাহলে আনন্দ আরও বেড়ে যায়।
ওনাম: ঐক্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক। এটি এমন একটি উৎসব, যা সকল শ্রেণীর, সমস্ত ধর্মের, সব বয়সি মানুষ উদ্যাপন করে। ‘সাদ্যা’-র স্বাদ, ‘পুকলম’-এর রং, পরম্পরাগত খেলা, সংগীত এবং নৃত্য— এই সব একসঙ্গে হৃদয়ের স্পন্দনকে ছন্দে রাখে। সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার, মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার এবং আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ করে দেয় “ওনাম’ উৎসব।
—এম কে গীতা, পৃথা কে জি।





