আমরা হাঁসফাঁস করে বিশ্রাম নিতে নিতে ভাবছি, একেবারে কাছেই তো টিকিট কাউন্টার, ৩টের আগে গিয়ে লাভ কী। আমার বর ৩:১৫ নাগাদ ফোন করে জানালেন ২টোর সময় কাউন্টার খুলেই শেষ ট্রিপের টিকিটও শেষ। দৌড়ালাম বাজারে, সেখানে ওয়াচ টাওয়ারগুলোর না হোক, জঙ্গল সাফারির টিকিট পাওয়া যায়। এমন কপাল, জঙ্গল সাফারির জন্যও গাড়ি ও গাইড দুই-ই সেদিন পাওয়া গেল না। অগত্যা গেলাম জল্পেশ্বর মন্দির দর্শনে, যেটা আমাদের ভ্রমণসূচিতে ছিল না।

জল্পেশ্বর

উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাচীনতম শিব মন্দির বলে দাবি করা হয়। রাজা জল্পেশ্বর বর্মন প্রথম এই মন্দিরটি নির্মাণ করান। পরে কোচবিহারের রাজা প্রাণ নারায়ণ ও তাঁর পুত্র মোদ নারায়ণ ১৬৬৫ সালে বর্তমান কাঠামোটি নির্মাণ করান। উচ্চতায় ১২৭ ফুট এবং দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ১২৪ ফুট। এই মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হল— এখানকার শিব নাকি অনাদি ও স্বয়ম্ভূ। কোনও মানুষ শিবলিঙ্গের স্থাপনা করেনি। গর্ভগৃহে একটা গর্তে উঁকি দিয়ে শিবলিঙ্গ দেখা যায়। ময়নাগুড়ি শহর থেকে এর দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তর। আমরা বৈশাখের বিকেলে গিয়ে বেশ শান্ত মনোরম পরিবেশ পেয়েছি। কিন্তু শ্রাবণ মাসে ভক্তদের ভিড়ে মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখা যায় না।

সন্ধের আগেই ফিরে এলাম। গাড়ি ভাড়া নিয়ে বেরোলে আরও একটু এদিক সেদিক ঘোরা যেত। চা-বাগান আর জঙ্গল চিরে পিচ রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে ছোটা কখনও একঘেয়ে লাগে না। ডেরায় ফিরে কফির বরাত দিলাম। সঙ্গে চিকেন পকোড়া শুনে কফি তেষ্টা বেড়ে গেল। এদের বৈকালিক জলখাবারে যে পেঁয়াজি আর চিকেন পকোড়া মিলিয়ে চার প্লেট ভাজাভুজির আয়োজন থাকে, জানতাম না। বিনা পরিশ্রমের খাদ্য একটু বেশিই সুস্বাদু লাগে। সব ফাঁকা হয়ে গেল। রাতে মুরগির মাংস, ডাল, আলুভাজা, স্যালাড। ভ্রমণকাহিনিতে এত ফলাও করে খাবারের ফিরিস্তি দেওয়ার একটা কারণ আছে, যেটা ক্রমশ-প্রকাশ্য। খেতে খেতে দেখলাম, দামি গাড়ি চেপে একটি পরিবার এসি ঘরের খোঁজে এসে ফিরে গেল।

রিসর্টে এসি কামরা দুটি, দুটিই আমাদের দখলে। আমার মনে হল বলি, আমাদের এসি না হলেও চলবে, ওদের ফেরাবেন না। কিন্তু ভাড়াটা অপরিবর্তিত থেকে যাবে কিনা ভেবে ও আমার বরের ভয়ে কিছু বলতে পারলাম না! লাটাগুড়িতে বাতানুকূল ঘর মোটেই খুব একটা জরুরি নয়। দুপুরের দিকে রোদে গরম লাগলেও, শেষরাতে পাখার হাওয়াতেও শীত শীত করে। পরেরদিন একটা গাড়ি ভাড়া করে গেলাম ঝালং ও বিন্দুর দিকে।

ঝালং

২২ তারিখ ঝালং বিন্দু যাওয়ার পথে পড়ে ছোট্ট পাহাড়ি জায়গা। সেভাবে আকর্ষণ করার মতো কিছু চোখে পড়ল না। এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে চালক বলল এটা একটা ভিউ পয়েন্ট। একটা খাবারের দোকান আছে। প্রাতরাশ না করে বেরিয়ে চায়ের দোকান থেকে কেবল চা বিস্কুট খেয়েছি। সাড়ে আটটা বাজে। তাই বহুবার দেখা পরিচিত পাহাড়ি দৃশ্যর আগে সামনে বসা নেপালি মেয়েটির মোমো বেলার দিকেই আগে চোখ পড়ল। একটা উর্দু কিংবা আরবি সংবাদপত্রের উপর ময়দা ও চাকি বেলনা রাখা।

দোকানটার বাইরেই কিছু ভাঙা ছাতার তলায় এলোমেলো টেবিল, চেয়ার, বেঞ্চ। আমরা নীচের দিকে জলঢাকা নদীকে বইতে দেখলাম। এই নদীটিকেই অনুসরণ করে ভারতের শেষ বিন্দু ‘বিন্দু’তে পৌঁছানো যাবে। মোমো খাওয়া, ছবি তোলা সেরে আবার গাড়িতে। জীবনে এতবার পাহাড়ে গেছি এবং এত বেশি উচ্চতায় থেকেছি যে, নতুন করে নিসর্গের বর্ণনায় গদগদ হওয়া সম্ভব নয়। তবে হাতে অল্প সময় থাকলে এই পাহাড়ি অঞ্চলটা মন্দ নয়। একটা ভৌগোলিক গুরুত্বও তো আছে।

বিন্দু

বিন্দুতেই ভারতের জমি শেষ। সশস্ত্র সীমা সুরক্ষার জওয়ানরা বেশ উদার গলায় আমাদের বলল, ‘যাইয়ে নদীকে উস পার, ভুটান ঘুমকে আইয়ে।’ নদীতে জলের পরিমাণ বেশি ছিল না বলেই হয়তো সাবধানতাও ছিল না। ঝালং-এ পায়ের পাতায় চোট পেয়ে মায়ের হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। পাতাটা ফুলেও গেছিল। রক্ষীদের আতিথেয়তায় মা বসে রইলেন। আর আমরা তিনজন নদী না পেরোলেও, এবড়ো-খেবড়ো পাথর পেরিয়ে নদীর তীর পর্যন্ত গেলাম। একদিকে ভুটান পাহাড় আর একদিকে জলঢাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লক গেট। বাঁধটার রিজার্ভার চোখে পড়ল না। লকগেট দিয়ে যে ক্ষীণ ধারা বেরিয়ে আসছিল, তাতে মনে হল জলঢাকার জল সত্যিই ঢাকা পড়েছে! তবু প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের তৈরি নির্মাণ অনেক সময় বেশ বাড়তি সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। তাই জায়গাটা ভালোই লাগল। দুপুর ১২টার মধ্যেই আমরা ফিরে এলাম।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...