জীবনের প্রতিটি স্তরের নিজস্ব ছন্দ রয়েছে। কিন্তু অকালবার্ধক্য নানারকম চ্যালেঞ্জ নিয়ে উপস্থিত হয়। ভারতে, যেখানে জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখন ৬০ বছরের বেশি বয়সি এবং এই বয়সজনিত কারণে তাদের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। অনেক পরিবারে দেখা যাচ্ছে যে, বয়স্ক বাবা-মা জিনিসপত্র ভুল জায়গায় রাখছেন, একই কথা বারবার বলছেন অথবা নাম মনে রাখতে সমস্যা হচ্ছে। যদিও অনেকে এটিকে ‘স্বাভাবিক বার্ধক্য’ ভেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। আসলে, বয়স্ক নাগরিকদের সবচেয়ে সাধারণ উদ্বেগের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ভুলে যাওয়া।
পরিচিত মানুষ এবং লোকেশন চিনতে অসুবিধা হয় এদের। এটি মস্তিষ্কের বার্ধক্য প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু, কম বয়সি কিংবা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার রোগের মতো আরও গুরুতর অবস্থার সূচনার ইঙ্গিত দিতে পারে ব্রেন এজিং। অতএব, মস্তিষ্কের অকালবার্ধক্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সমস্যা প্রাথমিক অবস্থায় সমাধানের চেষ্টা করাই ভালো। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন ডা. অমিতাভ দাস।
ব্রেন এজিং বা মস্তিষ্কের বার্ধক্য কী?
বয়স বাড়লে যেমন হাড় দুর্বল হয়ে যায়, ত্বক কুঁচকে যায় এবং পেশি শক্তি হারায়, ঠিক তেমনই, বয়স বাড়লে মস্তিষ্কেও পরিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের কোষের (নিউরন) সংখ্যা হ্রাস পায় এবং মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ কমে গিয়ে কার্যকারিতাও হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু অনেক কারণে অকালে মস্তিষ্কের রাসায়নিক সংকেত (নিউরোট্রান্সমিটার) হ্রাস পায়, যার ফলে স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং সবকিছু থেকে মনোযোগ কমতে থাকে। আর এই অবস্থাটিকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় ব্রেন এজিং বা মস্তিষ্কের বার্ধক্য।
কিন্তু, মস্তিষ্কের বার্ধক্য বলতে সবসময় ডিমেনশিয়া বোঝায় না। বেশিরভাগ মানুষই বার্ধক্যে হালকা ভুলে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন, তবে এই সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকলে (যেমন নিকটাত্মীয়দের ভুলে যাওয়া বা পরিচিত পরিবেশে হারিয়ে যাওয়া), অ্যালঝাইমার রোগের মতো মস্তিষ্কের বার্ধক্য নির্দেশ করতে পারে।
মস্তিষ্কের বার্ধক্যের প্রাথমিক লক্ষণ
লক্ষণগুলি আগেভাগে চিনতে পারলে সময়মতো চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া সহজ হয়। কিছু সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:
- চাবি, চশমা কিংবা মোবাইল ফোন হারিয়ে ফেলা
- মাঝেমধ্যে নাম কিংবা শব্দ ভুলে যাওয়া
- নতুন গ্যাজেট ব্যবহার করতে কিংবা নতুন নির্দেশাবলী মনে রাখতে সমস্যা
- কথোপকথনের সময় কিংবা পড়ার সময় ট্র্যাক হারিয়ে ফেলা
- আর্থিক ব্যবস্থাপনা, রেসিপি অনুসরণ করা কিংবা ওষুধের সময়সূচী ভুলে যাওয়া
- তারিখ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভুলে যাওয়া, অথবা পরিচিত জায়গায় বিভ্রান্ত হওয়া
- বিরক্তি, সামাজিক কার্যকলাপ থেকে সরে আসা, অথবা শখের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
- শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হওয়া কিংবা একই প্রশ্ন বারবার করার সমস্যা।
বয়স বাড়লে হালকা ভুলে যাওয়া সাধারণ বিষয় হলেও, লক্ষণগুলি যদি আরও খারাপ হয় কিংবা দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত ঘটায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মস্তিষ্কের বার্ধক্য কীভাবে রোধ করা যায় কিংবা কমানো যায়?
মনে রাখবেন, বার্ধক্য অনিবার্য হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে পারলে এবং সুস্বাস্থ্য বজায় থাকলে মস্তিষ্কের বার্ধক্যের প্রভাবকে বিলম্বিত কিংবা কমানো যায়। পেশির মতো মস্তিষ্কও নিয়মিত ব্যায়াম এবং যত্নের মাধ্যমে সুস্থ থাকে।
শারীরিক ব্যায়াম
- হাঁটা, যোগব্যায়াম এবং হালকা অ্যারোবিক ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন এবং অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত করে
- ব্যায়াম এন্ডোরফিনও নিঃসরণ করে, মেজাজ উন্নত করে এবং চাপ কমায়।
মানসিক উদ্দীপনা
- বই পড়া, ধাঁধার সমাধান করা, দাবা খেলা অথবা সংগীত, চিত্রকলা, নতুন ভাষা শেখা প্রভৃতি মস্তিষ্ককে সতেজ রাখে
- নতুন কিছু রান্না করা কিংবা নতুন জায়গায় ভ্রমণের মতো বিষয়গুলিও মস্তিষ্কের সংযোগকে উদ্দীপিত করে।
পুষ্টি
- সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, গোটা শস্য, বাদাম এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে রক্ষা করে
- অতিরিক্ত চিনি, ভাজা খাবার এবং অ্যালকোহল সীমিত করাও সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক ঘুম
পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা) স্মৃতিশক্তি সঠিক রাখতে সাহায্য করে। কম ঘুম ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
চাপ নিয়ন্ত্রণ
ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখলে, মস্তিষ্ককে অকালবার্ধক্য থেকে রক্ষা করা যায়।
সামাজিক সংযোগ
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ এবং সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে মস্তিষ্কের বার্ধক্য রোধ করা যায়।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, থাইরয়েড এবং ভিটামিনের ঘাটতি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই অবস্থাগুলি স্মৃতিশক্তি হ্রাসকে আরও গুরুতর করতে পারে।
পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা
মস্তিষ্কের বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষটির যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে, পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা দরকার। তাদের আন্তরিক ভাবে ভালোবেসে যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি, সঠিক ভাবে চিকিৎসা করাতে হবে।
পর্যবেক্ষণ
ভুলে যাওয়া কিংবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার মতো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসা পরিসেবা দিন রোগীকে।
সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা
- গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র (চশমা, ওষুধ, চাবি) নির্দিষ্ট স্থানে রাখুন
- রিমাইন্ডার নোট, অ্যালার্ম এবং ওষুধের বক্স ব্যবহার করুন
- বাড়ির পরিবেশকে শান্ত এবং বিশৃঙ্খলামুক্ত রাখুন।
সহানুভূতি
- ভুলে যাওয়ার জন্য বয়স্কদের তিরস্কার বা বিব্রত করবেন না। পরিবর্তে, তাদের সব বিষয় মনে করিয়ে দিন
- ধৈর্য ধরে মানুষটির কথা শুনুন এবং তাদের অনুভূতি ভাগ করে নিতে উৎসাহিত করুন।
- মর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস বজায় রাখার জন্য বয়স্কদের পারিবারিক কাজের সঙ্গে যুক্ত রাখুন
- পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করুন বাগান করা, গান গাওয়া কিংবা গল্প বলায় উৎসাহিত করুন। এতে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকবে
- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা করান, সময়মতো ওষুধ খাওয়ান এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করুন
- রোগীকে মানসিক নিরাপত্তা প্রদান করুন।
পরিশেষে মনে রাখবেন, তীব্র স্মৃতিশক্তি হ্রাস কিংবা বিশৃঙ্খলাকে কখনওই ‘শুধুমাত্র বার্ধক্যের প্রভাব’ ভেবে উড়িয়ে দেবেন না। প্রাথমিক লক্ষণগুলি শনাক্ত করুন, লাইফস্টাইলকে স্বাভাবিক রাখুন এবং সহায়ক পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তুলুন। এসব উপায় অবলম্বন করতে পারলে দেখবেন, অকালবার্ধক্যের শিকার হওয়া ব্যক্তিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
ডা. অমিতাভ দাস, কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন, টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল, কলকাতা।





