ছোটোনাগপুর মালভূমি অধ্যুষিত এই অরণ্যের গড় উচ্চতা প্রায় ৯০০ মিটার। নদী, পাহাড়, মালভূমি, জলপ্রপাত, নিবিড় বনভূমি, কৃষিজমি সবই রয়েছে এই অরণ্যের ঝুলিতে। যদি কোনও অ্যানিম্যাল সাইটিং না-ও হয়, তবে শুধু ঢেউ খেলানো সবুজ ল্যান্ডস্কেপ আর শালের জঙ্গল দেখার জন্যও সিমলিপালে অনায়াসে দিন দুই কাটিয়ে দেওয়া যায়।

আমাদের যাত্রা শুরু ওড়িশার পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে। রিসর্ট থেকে সকাল সাড়ে ছ’টায় রওনা দিলাম। গ্রীষ্মের সকাল হলেও একটা শিরশিরানী অনুভূতি। গতকাল রাতে ঝড়বৃষ্টি হয়েছে ভালোই। তাই, আবহাওয়া আজ অনেকটা নরম। এবার দলে আছেন তিন প্রবীণ। সারাটা দিনের প্রোগ্রাম। রাস্তার ধকল আছে ভালোই। টিফিন ও চা-পর্ব মিটে গেছে। সঙ্গে রিসর্ট থেকে দুপুরের খাবার ও জল গাড়িতে তুলে দিয়েছে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ধুমা মুর্মু। অভিজ্ঞ ড্রাইভার। এই অরণ্যের পথঘাট সবই ওর নখদর্পণে। ওর সম্পর্কে আর আলাদা করে কিছু বলার নেই।

সিমলিপালে আমরা থাকব না। ডে ভিজিট করে ফিরে আসব। প্রথমে যাব পিথাবাটা চেকপোস্ট। যার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার। ওখান থেকে আবার জঙ্গলের ভিতরে ঢুকব ৭৫ কিলোমিটার মতো। ফিরে আসব আবার সম-দূরত্বের পথ। শহর ছাড়ার একটু পরেই হাই-রোডে উঠে পড়ি। চারপাশে সবুজের সান্নিধ্যে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। দূরে পাহাড়ি পটভূমি ছবি হয়ে ধরা দেয়। পেরিয়ে যায় নির্জন প্রান্তর, খাঁ খাঁ মাঠ। পথ মধ্যে বুড়িবালাম নদীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়। সবুজকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে চলা। মাঝেমধ্যে কিছু গঞ্জের দেখা মেলে।

সকাল সাড়ে ন’টায় এসে পৌঁছালাম পিথাবাটা চেকপোস্টে। সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভ-এর মেইন গেট পিথাবাটা। উলটো দিকে যোশীপুর দিয়েও প্রবেশ করা যায়। ভিতরে প্রবেশের জন্য প্রথমে ফর্ম ফিলাপ করতে হল এন্ট্রি পয়েন্ট-এর কাউন্টার থেকে। এবার ব্যক্তি প্রতি ও গাড়ির জন্য এন্ট্রি ফি জমা করতেই পারমিট মিলে গেল। তবে গাইড নেওয়া এখানে বাধ্যতামূলক। তাই গাইডের জন্য নির্ধারিত অর্থ পুনরায় কাউন্টারে জমা করা হল। আমাদের গাইড অশোক মাহাতো। আলাপকালেই বলল, তার বাড়ি কাছাকাছি। চেকপোস্ট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে, কোনও এক গ্রামে।

কথায় কথায় সে জানাল, তার কিছু খেতি জমি আছে। তবে চাষের কাজ করলেও, মন তার পড়ে থাকে অরণ্যে। তাই ঠিক পেশা নয়, নেশার টানেই জঙ্গল গাইড। ওর কাছেই অবশ্য আমরা থাকব না, ফিরে যাব। তাই বুকিং-এর প্রয়োজন নেই। জঙ্গলের ভিতর খাবারের জন্য এখানে অর্ডার করে পেমেন্ট মেটালে, লাঞ্চের জন্য আর ভাবতে হবে না। অবশ্য স্থানীয় জনজাতিদের উদ্যোগে একটা হোটেলও আছে শুনলাম। আমাদের সঙ্গে খাবার থাকায় তার অবশ্য প্রয়োজন পড়েনি।

গেট পার হয়ে গাড়ি যতই এগোচ্ছে, ছবির ট্রেলার নিয়ে প্রকৃতি যেন আসন পেতে বসেছে আমাদের চোখের সামনে। এখানকার সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে ছায়াঘন পাহাড়ি পথের প্রাকৃতিক রূপ। শালের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে লাল মাটির কাঁকুরে পাকদণ্ডি পথ, উঠে গেছে টিলার মাথায়। উঠতে উঠতে চোখে পড়ে দূরের পাহাড়শ্রেণি, নীচের মাঠঘাট আর ছোটো ছোটো জঙ্গলবস্তি। আমরা ছাড়া পর্যটক বলতে ধারেকাছে কেউ নেই। এক সময় এসে পৌঁছালাম লুলুং ব্রিজের কাছে। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে পলপলা নদী। পাহাড়, জঙ্গল ও নদীর সঙ্গমে জায়গাটার সৌন্দর্য ‘লা-জবাব’। শুনলাম পলপলা ছাড়া এই অরণ্যের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে থৈরি, সারাণ্ডি ও বুড়িবালাম নদী।

প্রায় ২,৭৫০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই জাতীয় উদ্যান আবার ইউনেস্কো স্বীকৃত বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। ১৯৭৯ সালে এই বনাঞ্চল জাতীয় উদ্যান হিসাবে স্বীকৃত হয়। প্রায় ৮৭ প্রজাতির অর্কিড-সহ প্রায় ১,৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪৩২টি হাতি, প্রচুর বুনো শুয়োর, গাউড়, ২৫০টি লেপার্ড, বিভিন্ন ধরনের হরিণ, মালাবার জায়েন্ট স্কুইরাল আর আছে ৩৫০ প্রজাতির পাখি। এই শতাব্দীর প্রথম দিকে বাঘশুমারি অনুযায়ী প্রায় ৯৬টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব মেলে। সেই সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২টি। সুতরাং ২,৭৫০ বর্গকিলোমিটারের এই জঙ্গলে বাঘ দেখা প্রায় দেবতা দর্শনের তুল্য! তাছাড়া যতদূর জেনেছি, কোর এলাকায় পর্যটকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।

২০ কিলোমিটার দূরে জঙ্গলের মধ্যে প্রথম চেকপোস্ট দেখলাম। জায়গাটার নাম ভাজাম। ফরেস্ট অফিসের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়ায়। পাটভাঙা প্রকৃতির মাঝে হঠাৎ করেই যেন অনাহূতের মতো আমরা হাজির হই। ড্রাইভার সঙ্গের কাগজপত্র নিয়ে অফিসে ছুটল। এখানে কয়েকজন বনকর্মীকে ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। অফিস ঘর আর রাস্তার মাঝে পরিখা কাটা। তাতে কাঠের পাটাতনের ব্রিজ। তবে পরিখা বা হাই ড্রেনে কোনও জল নেই। একটা বনমুরগি দেখি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। চেকিং-পর্ব শেষে বাঁশ দিয়ে আটকানো পথে প্রবেশাধিকার মেলে। পুনরায় চাকা গড়ায়।

সমতল ছেড়ে ক্রমশ চড়াইয়ে উঠতে থাকি। মোরাম রাস্তায় পাকদণ্ডি পথ বেয়ে ধীরে ধীরে আরও গহন অরণ্যে প্রবেশ করি। যতদূর চোখ যায় দু’পাশে ঘন সবুজের ঠাস বুনোট আর গাঢ় সবুজ পাহাড়। চারপাশের বন্য প্রকৃতি মায়াচ্ছন্ন করে ফেলেছে আমাদের। আমরা কেউ কথা বলছি না। দু’পাশের শাল, পিয়াশাল, সেগুন, আসানবনির কোলাজে অরণ্যে আলো-আঁধারি যে গীতি আলেখ্য রচনা করেছে, তাতে আমরা পুরোপুরি ফিদা।

এদিকে শালের জঙ্গল পেরোতেই দেখা গেল কয়েকটি আদিবাসী গ্রাম। তাদের যাপনচিত্র চলন্ত গাড়িতে বসেই নজর কাড়ে। এই দীর্ঘ সবুজ জঙ্গল ঘিরেই এখানকার প্রান্তভূমির সাধারণ মানুষের জীবনচরিত। প্রায় ৬১টি আদিবাসী গ্রাম আছে সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভে। এইসব গ্রামের আদিবাসীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বন দপ্তরের ইকো ট্যুরিজমের বিভিন্ন নেচার ক্যাম্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকা অক্ষুণ্ণ রেখেও বন সংরক্ষণের কাজ সম্পন্ন করা যায়। সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পের এই উদ্যোগ যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...