ক্লিনিক্যাল গবেষণা স্পষ্ট ভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, সিস্টিক ফাইব্রোসিস কোনও বিরল কিংবা পশ্চিমী দেশের রোগ নয়, এটি ভারত জুড়েও বিদ্যমান এবং প্রায়ই এই রোগটিকে উপেক্ষা করা হয়। যেসব দেশে জেনেটিক স্ক্রিনিং করা হয় গুরুত্ব সহকারে, সেখানে শৈশবে সিস্টিক ফাইব্রোসিস শনাক্ত করা যায়, যার ফলে রোগের প্রাথমিক স্তরে চিকিৎসা শুরু করে রোগীকে সুফল দেওয়া যায়। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডা. শিভারেশমী উন্নিত্থান।
সিস্টিক ফাইব্রোসিস কী?
সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা সিএফটিআর (সিস্টিক ফাইব্রোসিস ট্রান্সমেমব্রেন কন্ডাকট্যান্স রেগুলেটর) জিনের মিউটেশনের ফলে সৃষ্ট একটি বংশগত মাল্টিসিস্টেম ডিসঅর্ডার। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি অস্বাভাবিক অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে, ক্লিনিক্যাল গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, এই রোগটি উল্লেখযোগ্য ভাবে কম নির্ণয় করা হয়, প্রায়ই সাধারণ অসুস্থতা হিসাবে ধরে নেওয়া হয় এবং আড়াল করা হয়। রোগটির বিষয়ে সচেতনতাও সীমিত।
রোগটির প্রভাব
কোষের ঝিল্লি জুড়ে লবণ এবং জলের চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী ত্রুটিপূর্ণ প্রোটিনের কারণে সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগটি মূলত ফুসফুস, অগ্ন্যাশয়, পাচনতন্ত্র এবং ঘাম গ্রন্থিগুলিকে প্রভাবিত করে। এই ত্রুটির ফলে ঘন, আঠালো শ্লেষ্মা তৈরি করে, যা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করে এবং বারবার সংক্রমণ, পুষ্টির ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদী জটিলতাগুলিকে আমন্ত্রণ জানায়, যা জীবনের মান এবং আয়ুষ্কালের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু ভারতে শিশুদের খুব বেশি জেনেটিক স্ক্রিনিং করা হয় না এবং কেবল তখনই শনাক্ত করা হয়, যখন লক্ষণগুলি গুরুতর হয়ে ওঠে কিংবা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
রোগের লক্ষণ
অনেক শিশু দীর্ঘস্থায়ী কাশি, বারবার বুকে সংক্রমণ, ব্রঙ্কাইটিস, শারীরিক বিকাশে অন্তরায় কিংবা ক্রমাগত হজমের সমস্যায় ভোগে এই রোগে আক্রান্ত হলে। তবুও ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই লক্ষণগুলিকে প্রায়ই হাঁপানি, বারবার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, যক্ষ্মা কিংবা পুষ্টির ঘাটতির মতো আরও প্রচলিত রোগ বলে ভুল করা হয়। যেহেতু এই ধরনের অসুস্থতা সাধারণ এবং পরিচিত, তাই চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক ভাবে সিস্টিক ফাইব্রোসিসের মতো জিনগত ব্যাধি সন্দেহ করতে পারেন না, যার ফলে উপযুক্ত পরীক্ষা এবং চিকিৎসায় বিলম্ব হয়।
সঠিক পরীক্ষা–নিরীক্ষা
এই রোগের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয় ডায়াগনস্টিক সুবিধা পাওয়ার সীমিত সুযোগ। তাই, সিস্টিক ফাইব্রোসিস-এর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য গোল্ড-স্ট্যান্ডার্ড সোয়েট ক্লোরাইড পরীক্ষা করা উচিত। তুলনামূলক ভাবে অল্প সংখ্যক চিকিৎসা কেন্দ্রের মধ্যে এই টেস্ট সীমাবদ্ধ এবং যার বেশিরভাগই বড়ো শহরগুলিতে কেন্দ্রীভূত।
সচেতনতার বিষয়
গ্রামীণ কিংবা আধা-শহুরে পরিবারগুলি প্রায়ই সঠিক স্ক্রিনিং এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই জেনেটিক স্ক্রিনিং-এর বিষয়ে যেমন সচেতনতা জরুরি, ঠিক তেমনই জেনেটিক স্ক্রিনিং-এর সুযোগ-সুবিধে বাড়ানো উচিত। ক্লিনিক্যাল তথ্য থেকে দেখা যায় যে, সিস্টিক ফাইব্রোসিস-এ আক্রান্ত শিশুরা সাধারণত শ্বাসকষ্টের লক্ষণ, ঘন ঘন নিউমোনিয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা না করা হলে, ফুসফুসের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। এর ফলে অপুষ্টিতে ভোগা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসাবে দেখা দেয়। এক্ষেত্রে যেহেতু অগ্ন্যাশয় কার্যকর ভাবে হজম এনজাইম তৈরি করতে অক্ষম হয়, তাই শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, চর্বিযুক্ত মল এবং পুষ্টির ঘাটতিতে ভুগতে পারে, যার ফলে পর্যাপ্ত খাবার খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কম হয়।
ভারতের অনেক অঞ্চলে যেখানে শৈশবেই অপুষ্টির মতো সমস্যা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এই লক্ষণগুলি সহজেই অন্তর্নিহিত জেনেটিক রোগের পরিবর্তে আর্থসামাজিক সমস্যাকে দায়ী করা হয়। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, তীব্র গরম কিংবা আর্দ্র জলবায়ুর পরিস্থিতি রোগের লক্ষণগুলিকে আরও জটিল করে তোলে। ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণের ক্ষয় শিশুদের ডিহাইড্রেশন এবং ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকিতে ফেলে, যা অনেক সময় হঠাৎ ক্লিনিক্যাল অবনতির কারণ হয়।
তবে, বিশ্বব্যাপী চিকিৎসার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হলে, সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্তের সংখ্যা খুব স্বাভাবিক ভাবে কমে যাবে। বিশেষকরে রোগের মূল কারণ মোকাবিলা করে এমন CFTR মডুলেটর থেরাপির মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। সেইসঙ্গে, সঠিক ওষুধের প্রয়োগে ফুসফুসের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, পুষ্টির জোগান প্রভৃতির মাধ্যমে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আর ভারতীয় জেনেটিক প্যাটার্ন অনুসারে গবেষণা জরুরি ভাবে প্রয়োজন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল – – একটি জাতীয় সিস্টিক ফাইব্রোসিস রেজিস্টার তৈরি করা। রেজিস্টারযুক্ত দেশগুলি ক্লিনিক্যাল ফলাফল উন্নত করতে, গবেষণার অগ্রাধিকার নির্দেশ করতে এবং নীতিগত সিদ্ধান্তগুলিকে কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছে। এই ধরনের তথ্য ভারতেও নির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকা তৈরি করতে, প্রাথমিক শনাক্তকরণ কৌশলগুলিকে কার্যকর করতে এবং নতুন থেরাপির জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলিকে সহজতর করতে সক্ষম করবে। জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ, যার মধ্যে রয়েছে সোয়েট ক্লোরাইড পরীক্ষা, চিকিৎসা পাঠক্রমের মধ্যে সিএফ অন্তর্ভুক্তি এবং গ্রামাঞ্চলেও নবজাতকদের জন্য জেনেটিক স্ক্রিনিং জরুরি।
সিস্টিক ফাইব্রোসিসের উল্লেখযোগ্য আর্থ-সামাজিক প্রভাব রয়েছে। ওষুধ, ফিজিওথেরাপি, পুষ্টিকর পরিপূরক এবং বারবার হাসপাতালে যাওয়ার খরচ পরিবারগুলির উপর দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক কষ্ট চাপিয়ে দিতে পারে। জিনগত সমস্যার ক্ষেত্রে আরও বেশি সচেতনতা জরুরি।
উপযুক্ত চিকিৎসা
বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, সিস্টিক ফাইব্রোসিসের কার্যকরী চিকিৎসা সম্ভব। আর এই চিকিৎসার মূল মাধ্যমগুলির মধ্যে রয়েছে এয়ারওয়ে ক্লিয়ারেন্স থেরাপি, অগ্ন্যাশয় এনজাইম পরিপূরক, পুষ্টি সহায়তা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশিক্ষিত পেশাদারদের দ্বারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
বুকের ফিজিওথেরাপি, যার মধ্যে রয়েছে পারকাশন থেরাপি, পোস্টারাল ড্রেনেজ এবং নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল, ফুসফুস থেকে শ্লেষ্মা সংগ্রহ করতে সাহায্য করে এবং সংক্রমণের ফ্রিকোয়েন্সি হ্রাস করে। হজম এবং পুষ্টির ঘাটতি উন্নত করার জন্য অগ্ন্যাশয় এনজাইম প্রতিস্থাপন থেরাপি অপরিহার্য। সিস্টিক ফাইব্রোসিস আক্রান্ত শিশুদের উচ্চ ক্যালরি এবং প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় খাদ্যই যথেষ্ট। নিয়মিত মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পর্যবেক্ষণ এবং অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি রোধ করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদান, স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত দূষণ এড়ানো সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক চিকিৎসার জন্য পালমোনোলজিস্ট, শিশু বিশেষজ্ঞ, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ডায়েটিশিয়ান, নার্স এবং কাউন্সেলর চাই। যদিও এই ধরনের সমন্বিত চিকিৎসা মডেলগুলি এখনও নির্দিষ্ট কিছু শহরের হাসপাতালে সীমাবদ্ধ, কিন্তু চিকিৎসায় সুফল পাওয়ার জন্য এসব অপরিহার্য। অনেক পরিবার দৈনন্দিন চিকিৎসায় মানসিক, আর্থিক এবং লজিস্টিক চাহিদার সঙ্গে লড়াই করেন, যার ফলে ভারতে সিস্টিক ফাইব্রোসিস চিকিৎসা বিঘ্নিত হয়।
ফুসফুসের অপূরণীয় ক্ষতি, গুরুতর অপুষ্টি এবং আরও নানারকম জটিলতা প্রতিরোধের জন্য প্রাথমিক শনাক্তকরণ সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ভারতে সিস্টিক ফাইব্রোসিসকে কার্যকর ভাবে প্রতিরোধ করার জন্য উন্নত রোগ নির্ণয়, আর্থ-সামাজিক সমস্যা দূর করা এবং মানসিক শক্তি জোগানো ভীষণ প্রয়োজন। এই ধরনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে, সিস্টিক ফাইব্রোসিসের নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে লড়াই করে সুফল পাওয়া সম্ভব।
(তথ্য দিয়েছেনঃ ডা. শিভারেশমী উন্নিথান, কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট, ফর্টিস হাসপাতাল, আনন্দপুর)





