একত্রিত হওয়ার আগে, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর পাঁচজন র্যাপার বিভিন্ন উপায়ে তাদের প্রতিভা আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের প্রায় সকলের জন্যই এটি ছিল তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর এবং পরিচয় খুঁজে পাওয়ার একটি উপায়। ক্রান্তিনারীর শৈশব প্রায়ই হাসপাতালে কেটেছে বলে জানিয়েছেন। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া এবং নির্যাতনের শিকার হওয়া নাকি ছিল তাঁর নিত্যদিনের ঘটনা। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়, তিনি তাঁর মা, যিনি নিজেও একজন রাজ্য মহিলা ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় ছিলেন, তাঁর উৎসাহে বাস্কেটবল খেলা শুরু করেন। এই খেলা ক্রান্তিনারীকে স্কুলের বাইরে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল বলে জানিয়েছেন।
কিন্তু অন্যান্য খেলোয়াড়রা প্রায়ই ক্রান্তিনারীর ভাঙা ও বিকৃত ইংরেজি নিয়ে মজা করত। ‘আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব। যেহেতু আমি বাড়িতে বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইংরেজি বলতে পারতাম না, তাই সেই ভাষা আমার জগতের অংশ ছিল না। একজন সিনিয়র আমাকে সাহায্য করেছিলেন এবং আমেরিকান র্যাপার এমিনেমের ‘বিউটিফুল’ গানটি আমাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।” আসলে, এমিনেমের ‘বিউটিফুল’ গানের কথাগুলো এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, আমি প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন ভেদ করে এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করতাম’ —জানান ক্রান্তিনারী।
শব্দ বোঝার আগেই তিনি উচ্চারণ অনুশীলন করে ফেলেন এবং তাঁর পছন্দের গানের কথা দিয়ে নিজের ডায়েরি ভরে ফেলেন। ধীরে ধীরে সংগীত তাঁকে ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে সাহায্য করে। এই সময়ে, কিছু হিপ-হপ শিল্পীর সঙ্গে তাঁর আকস্মিক সাক্ষাতের ফলে তিনি ব্রেক ড্যান্সিংয়ে প্রবেশ করেন। এখান থেকেই তিনি তার প্রথম মঞ্চ নাম ‘বি পজিটিভ গার্ল’ পেয়েছিলেন।
ক্রান্তিনারী মুম্বই ছেড়েছিলেন ডিজাইন নিয়ে পড়াশোনা করতে। পরে তিনি আইআইটি মুম্বইয়ের ডিজাইন সেন্টারে স্কলার হিসেবে ফিরে আসেন এবং তারপর আবার হায়দরাবাদে ‘মাইক্রোসফট’-এর সঙ্গে কাজ করার জন্য চলে যান। এই সময়, তিনি নিজের মধ্যে একটি শূন্যতা অনুভব করতেন, তাই তিনি র্যাপ করা শুরু করেন। তবে, মুম্বইয়ের অন্যান্য র্যাপারদের মতো তিনিও তাঁর কেরিয়ার গড়তে চেয়েছিলেন। তাই, তিনি এমন একটি চাকরি বেছে নিয়েছিলেন, যা তাঁকে মুম্বইতে ফিরে আসতে সাহায্য করেছিল।
আবেগ এবং উদ্দীপনা
এই সময়েই ক্রান্তিকারী প্রথম ‘স্বদেশী” দলটিকে দেখেন, যা মুম্বই-ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক র্যাপ দল। তিনি কেরিয়ার গড়ার জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লাব এবং বিভিন্ন ইভেন্ট-এ যেতে শুরু করেন। সেইসব জায়গায় গিয়ে তিনি পারফর্ম করতেন। তাঁর বাবা-মা তিন বছর ধরে এই বিষয়ে অবগত ছিলেন না। এমনকী যদি তাঁরা কখনও জিজ্ঞাসা করতেন, ক্রান্তিনারী বলতেন যে, অফিসে কাজের প্রেসার ছিল।
এক পারিবারিক বন্ধু সংবাদপত্রে ক্রান্তিনারীর কথা উল্লেখ করা একটি নিউজ দেখেন। এরপর তাঁর মা তাঁকে স্পষ্ট করে জানান যে, হয় র্যাপ করা ছেড়ে দেবে, নয়তো তিনি আত্মহত্যা করবেন। ক্রান্তিনারী স্মরণ করেন যে, তিনি তাঁর বাবা-মাকে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি।
একবার এক আত্মীয় তাঁর র্যাপের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন, যা তাঁর নারী স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করে। এমনকী কিছু পরিবারের অনেকে তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছিল। এই প্রসঙ্গে ক্রান্তিনারী জানিয়েছেন, ‘এটা আমাকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল, তবুও আমি অবিচল ছিলাম।’
ক্রান্তিনারীর মতো, লেডি এমসি ও পারিবারিক চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন। যে পাড়ায় তিনি বড়ো হয়েছেন, সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ তাদের সন্তানদের জন্য একটি স্থায়ী চাকরি এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ভালো মনে করতেন। ‘সেখানকার পরিবেশটা খুবই আলাদা ছিল। তাই কেউ ভাবতেও পারেনি যে, একজন মেয়ে গান করবে!’ যখন তিনি র্যাপ করা শুরু করেন, তখন তাঁর বাবা-মা-ও এর বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু লেডি এমসি যখন ভালো পারফর্ম করতে শুরু করেন, জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন, তখন তাঁর বাবা-মায়ের রাগ গর্বে পরিণত হয়, বলে জানিয়েছেন লেডি এমসি।
মঞ্চে, লেডি এমসি আগুনের গোলার মতো উৎসাহে পূর্ণ। কিন্তু মঞ্চ থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি শ্রোতা হয়ে থাকতে পছন্দ করেন। তাছাড়া, তিনি খুব কম কথা বলেন, কিন্তু স্পষ্টবাদী।
‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর অন্যান্য র্যাপারদের থেকে প্রতীকা-র কাজকে আলাদা করে তোলে তাঁর কেরিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড। প্রতীকার নিজের অভিজ্ঞতা তাঁর পরিবারের আর্থিক অস্থিরতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যার ফলে শৈশবে তাঁকে ঘনঘন মুম্বইয়ে বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। তাঁর জীবন কঠিন ছিল এবং শুরুতে সবকিছুই সংগ্রামের মতো মনে হয়েছিল। এটি তাঁর চিন্তাভাবনা এবং লেখার ধরনকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল বলে মনে করেন প্রতীকা।
প্রতীকার জীবনের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংগীত তাঁর জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে। ১২ বছর বয়সে তিনি ‘বেক্রোনিক ফোবিয়া’ নামে একটি ব্যান্ড-এ বেস গিটার বাজাতেন। তিনি গির্জার গায়কদলের সঙ্গেও কয়েক বছর কাটিয়েছিলেন। টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে যখন তিনি হিপ-হপের সঙ্গে পরিচিত হন, তখন তিনি এমন দলগুলির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যারা দক্ষতার সঙ্গে র্যাপের সমন্বয় ঘটায়, যেমন আমেরিকান ব্যান্ড ‘লিংকিন পার্ক”।
সংগীতের সঙ্গে প্রথম পরিচয়
মাস কমিউনিকেশন-এ ডিগ্রি অর্জনের পর, প্রতীকা এমন একটি চাকরি খুঁজতে শুরু করেন, যা তাঁকে আয়ের সুযোগ করে দেবে। তিনি যন্ত্র বিক্রেতা, একটি ইভেন্ট কোম্পানি এবং একটি রেকর্ডিং স্টুডিয়োতেও কাজ করেছেন। মহামারী আঘাত হানার সময় তিনি যে রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে কাজ করছিলেন, তা আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতীকা অন্য চাকরি নেন। কিন্তু, যখন দিল্লির একটি হিপ-হপ দলের এক সদস্যের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন, তখন তাদের সামনে বসে আধ ঘণ্টার মধ্যে একটি র্যাপ লিখে ফেলেন প্রতীকা এবং গেয়ে শোনান। এরপর তাঁর জীবন অন্যপথে চালিত হয়।
(ক্রমশ…)





