সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণত ১০-১৫ বছর বয়সিদের মধ্যে অনেকেই এখন একাকিত্বের শিকার হচ্ছে। আর এই একাকিত্ব বলতে বোঝায়, যখন কেউ নিজেকে একা বা বিচ্ছিন্ন মনে করে, সামাজিক সংযোগের অভাব অনুভব করে এবং ধীরে ধীরে অবসাদের শিকার হয়। লেখাপড়ার অতিরিক্ত চাপ, খেলাধুলার অভাব, পারিবারিক সমস্যা এবং বাবা-মায়ের ব্যস্ততা এই সমস্যার প্রধান কারণ হতে পারে। এর লক্ষণগুলি হল— সর্বদা বিষণ্ণতা, খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত রাগ, খাওয়া কমিয়ে দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে না পারা, সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে অনীহা এবং একান্তে কান্নাকাটি।
কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একাকিত্ব বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়। এই একাকিত্ব মানসিক স্বাস্থ্য উদ্বেগগুলির মধ্যে অন্যতম। আর এই একাকিত্ব বেশিরভাগই গোপন থাকে, কিন্তু গভীর সংক্রমণ ঘটায় কিশোর-কিশোরীদের মন-মস্তিষ্কে এবং যা ক্রমশ চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আজকের কিশোর-কিশোরীরা এমন এক পৃথিবীতে বেড়ে উঠছে, যা তাদের আবেগের জগতকে সঙ্কুচিত করে দিচ্ছে। কিন্তু মনে রাখবেন, একাকিত্ব কেবল একা থাকা নয় বরং সবার মধ্যে থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া-ই আসলে একাকিত্ব। এই একাকিত্বকে ক্ষুধা কিংবা তৃষ্ণা না মেটার কষ্টের সমতুল্য হিসাবে বর্ণনা করেছেন মনোবিদরা।
বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ
সমবয়সিদের সঙ্গে মেলামেশা, খেলাধুলা, হইহুল্লোড়ের ফলে একাকিত্ব মন-মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারী একাকিত্বের এই বিপর্যয়ের এক মহাপর্ব ছিল। স্কুল বন্ধ, অনলাইন ক্লাস এবং মাসের পর মাস সামাজিক দূরত্ব শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করেছিল। শ্রেণিকক্ষের হাসি-আনন্দ, অবসর সময়ে খেলাধুলা এসব থেকে বঞ্চিত ছিল কিশোর-কিশোরীরা। আর এই সুযোগে প্রযুক্তি সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিয়েছে খুব সহজে।
সোশ্যাল মিডিয়া আধুনিক কিশোর-কিশোরীদের খেলার মাঠ হয়ে উঠেছে এখন। আর এই মাঠ রঙিন এবং তাৎক্ষণিক বিনোদনের ক্ষেত্র। কিন্তু এই ক্ষেত্র অতি-ব্যবহারে মহামারীর রূপ নিতে পারে। আসলে, প্রকৃত সান্নিধ্য যে মানসিক গভীরতা প্রদান করে, তা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। কারণ, এই ভার্চুয়াল দুনিয়া ক্রিয়েটেড এবং কৃত্রিম চমকে ভরপুর এবং এই দুনিয়া থেকে অনেক দূরে রয়েছে বাস্তব।
পরিস্থিতির প্রবল চাপ
আধুনিক ভারতীয় পারিবারিক জীবনও বদলাচ্ছে। যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারে রূপান্তর, অভিভাবকদের দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা, অতিরিক্ত চাহিদার ফলে অর্থনৈতিক চাপ প্রভৃতি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক দৃশ্যপটকে বদলে দিয়েছে। বাবা-মা যদিও সন্তানের জন্য গভীর ভাবে নিবেদিতপ্রাণ, কিন্তু তারা অনেক সময় সন্তানের মনের খবর নিতে ভুলে যান। সময়াভাবে পারিবারিক আড্ডা কমেছে, ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ কমেছে। অর্থাৎ, স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিক সংযোগের মুহূর্তগুলি অদৃশ্য হয়ে গেছে। ল্যাপটপ থেকে স্মার্টফোন এখন প্রাধান্য পাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়েই চলেছে।
এমনকী যখন কিশোর-কিশোরীরা অনেকের মধ্যেও থাকে, তখনও তারা মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যা তাদের ধীরে ধীরে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে এবং একসময় তারা একাকিত্বের শিকার হয়ে যায়।
স্কুল, যা বন্ধুত্ব এবং আনন্দের উপযুক্ত ক্ষেত্র ছিল, তা আজ শিক্ষাগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পাঠ্যক্রমের বোঝায় ভারাক্রান্ত পড়ুয়ারা ক্রমশ এক স্বার্থপর দৈত্যের মতো হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, ঘরে-বাইরে তারা ক্রমশ শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিকতা হারাচ্ছে।
একাকিত্ব এবং পরিণতি
একাকিত্ব কেবল একটি আবেগগত অবস্থা নয়, একাকিত্ব আসলে মন-মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ না হওয়ার এক চরম বিপর্যস্ত অবস্থা। দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মন-মস্তিষ্কের ব্যাপক ক্ষতি করে, কর্টিসলের মাত্রা বৃদ্ধি করে। ফলে ঘুম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, একাগ্রতা প্রভৃতি ব্যাহত হয়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে, একাকিত্ব আত্মসম্মান হ্রাস করে, উদ্বেগকে ইন্ধন দেয় এবং বিষণ্ণতাকে প্ররোচিত করতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, একাকিত্ব কেবল মানসিক বিকাশকেই নয়, বুদ্ধি, একাগ্রতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস করে। তাই, সবকিছুর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়। আর এই আগ্রহ হারিয়ে যাওয়ার ফলে, ধীরে ধীরে সবকিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অবশেষে অবসাদের শিকার হয়।
আরোগ্যের পথ
সুসংবাদ হল, একাকিত্ব প্রতিরোধ করা যেতে পারে এবং প্রাথমিক পর্বে সতর্ক থাকলে একাকিত্বের সমস্যা থেকে তৈরি হওয়া অবসাদও কাটানো যায়। তবে, একাকিত্বের সমস্যা দূর করতে হলে শুধু ক্লিনিক্যাল কেয়ার নিলে চলবে না, পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনদেরও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
কগনিটিভ-আচরণগত থেরাপির মতো থেরাপিউটিক পদ্ধতিগুলি কিশোর-কিশোরীদের একাকিত্বের সমস্যা মোকাবিলায় খুবই উপযোগী। এক্ষেত্রে স্কুলগুলিরও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া উচিত। পড়ুয়াদের সহানুভূতি, সহযোগিতা এবং প্রেরণা জোগানো আবশ্যক। এক্ষেত্রে পড়ুয়াদের মানসিক যন্ত্রণা বুঝে উঠতে পারেন, এমন প্রশিক্ষিত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করা একান্ত জরুরি। একাকিত্ব ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতায় পরিণত হওয়ার আগে, যত দ্রুত সম্ভব সন্তানের একাকিত্ব কাটিয়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত অভিভাবকদের।
মনে রাখবেন, একাকিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষেধক হল রোগীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার। খোলা মনে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, আড্ডা দেওয়া, বেড়ানো, একসঙ্গে খাওয়া-শোওয়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা প্রভৃতি একাকিত্বের প্রতিষেধক হিসাবে নিশ্চিত ভাবে কাজ করবে।
এক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় মনে রাখবেন, একাকিত্বে ভোগা মানুষটিকে যত বেশি কোয়ালিটি সময় দেবেন, তার মানসিক কষ্ট তত তাড়াতাড়ি কমবে এবং সে ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকেও নিজেকে অনেকটাই দূরে রাখবে। আসলে, একাকিত্ব কেবল নির্দিষ্ট কিশোর- কিশোরীর সমস্যা নয়, এটি একটি পারিবারিক এবং সামাজিক সমস্যা। এর সমাধানের জন্য শিক্ষক থেকে শুরু করে অভিভাবক, সমাজ সবারই সমান ভাবে দায়িত্ব নেওয়া উচিত। স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, মানসিক যন্ত্রণার জন্য প্রাথমিক স্ক্রিনিং এবং সহজলভ্য কাউন্সেলিং পরিষেবাগুলি পড়ুয়াদের একাকিত্ব দূর করতে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে।
দেবশীলা বোস, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, ফর্টিস হাসপাতাল, আনন্দপুর, কলকাতা।





