৮ মার্চ ২০২১, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’ তাদের প্রথম মিউজিক অ্যালবাম প্রকাশ করে। নাম ছিল ‘আই ডু ইট ফর হিপ-হপ’। এই গানটিতে সমস্ত র‍্যাপার পুনরায় তাদের শিকড় এবং সংগীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। এটি এমন একজন প্রযোজনাও করেছিলেন, যিনি সেই সময়ে ইন্ডাস্ট্রিতে নবাগত ছিলেন। প্রতীকা তাঁর কাছে থাকা রিসোর্স ব্যবহার করে, ভিডিওটি শ্যুট এবং এডিট করেছেন। ‘আমি এটি নিয়ে খুবই উত্তেজিত ছিলাম যে, মাত্র দু’দিনের মধ্যে ভিডিওটি এডিট করে সবার সঙ্গে শেয়ার করেছি।’

গঠনমূলক চিন্তা

দলটি প্রচারের জন্য একটি টিজারও প্রকাশ করেছে এবং তারপরে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছিল। এতে তাঁরা নিজেদেরকে ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ মহিলা হিপ-হপ দল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এরপর এই দল এতটাই দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, হিপ-হপ কমিউনিটিতে তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে, প্রচুর শো এবং সাক্ষাৎকার-এর সুযোগ পেতে শুরু করে ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’।

প্রতীকা মনে রেখেছেন যে, যারা তাঁর কাছে আসতেন, তাদের তিনি স্পষ্ট ভাবে বলতেন যে, সেই সময় তাঁর কাছে কেবল দুটি গান ছিল। তাঁরা ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর সূচনা পর্বে ‘গেম ফ্লিপ’ এবং ‘গুড্ডু আজাদ’ —এই দুটি ট্র্যাক তৈরি করেছিল। ২০২৩ সালে যখন ‘গেম ফ্লিপ’ ভাইরাল হয়েছিল, তখন থেকেই দলটি আন্তর্জাতিক ভাবেও নজর কাড়তে শুরু করেছিল। পরবর্তীতে, নতুন সদস্যরা ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এ যোগ দিতে শুরু করে। নৃত্যশিল্পী এমসিকে বিগল— যিনি আগে থেকেই ফ্লা-রা-কে চিনতেন, ২০২০ সালে এই দলে পরিচিত হন।

ক্রান্তিনারী শিল্পী গৌরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাঁকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন। তাঁরা দু’জনেই ধারাভি বস্তিতে শিশুদের পড়ানোর জন্য একটি এনজিওতে কাজ করতেন। গৌরী একজন প্রশিক্ষিত জিমন্যাস্ট। তিনি প্রথম ব্রেক ড্যান্সিংয়ের মাধ্যমে হিপ-হপ আবিষ্কার করেন এবং এক বছর ধরে অন্য একটি দলের অংশ ছিলেন। কিন্তু তার বাবা-মা এতে খুশি ছিলেন না। পরে, যখন তিনি মুম্বইয়ের জেজে স্কুল অফ আর্ট থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন, তখন তিনি গ্রাফিটিতে ক্যালিগ্রাফি এবং টাইপোগ্রাফি কৌশল ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এখন, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর পরিবেশনার সময়, তিনি মঞ্চে ক্যানভাস রেখে সরাসরি ছবি আঁকেন। ২০ বছর বয়সি শ্রুতি এই দলের সবচেয়ে ছোটো এবং নবীন সদস্য। ২০১৭ সালে যখন তিনি তাঁর বাড়ির কাছের একটি পার্কে কিছু ছেলেকে স্কেটবোর্ডিং করতে দেখেন, তখন তিনি উৎসাহিত হয়ে নিজেকে স্কেটবোর্ডিং-এ যুক্ত করেন।

একটা ছেলে শ্রুতিকে একটি সেকেন্ড হ্যান্ড স্কেটবোর্ড উপহার দেয়। এরপর, তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে চুপচাপ তাঁর স্কেটবোর্ডিং দক্ষতা উন্নত করেন। কিন্তু শ্রুতির পরিবার যখন জানতে পারেন, তখন তাঁরা শ্রুতি-র স্কেটবোর্ডটি ফেলে দেন। কারণ, তাঁরা মনে করতেন, স্কেটবোর্ডিং মেয়েদের জন্য নয়, এটা ছেলেদের জন্য। শ্রুতির মনে আছে, ‘আমার ঠাকুমা বলেছিলেন যে, ছেলেরা এসব নিয়ে মাতামাতি করে, তুমি এটা করতে পারো না।’

ঠাকুমা এমনকী শ্রুতিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, স্কেটবোর্ডিং করার সময় যদি তাঁর পা ভেঙে যায়, তাহলে তিনি বিয়ে করার জন্য কাউকে পাবেন না। ২০২০ সালে, কোভিড-১৯-এর প্রথম ঢেউয়ের পর, দেশব্যাপী লকডাউন উঠে যায় এবং শ্রুতি বাড়ি ছেড়ে তাঁর খরচ মেটাতে স্কেটবোর্ডিং শেখানো শুরু করেন। একইসঙ্গে নিজের অনুশীলনের জন্যও সময় বের করেন। এর ঠিক এক বছর পর, শ্রুতি স্কেটবোর্ডিং প্রতিযোগিতায় সোনা জিতেছিলেন। সেই বছরের ডিসেম্বরে, তিনি জাতীয় রোলার স্কেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে সিনিয়র মহিলা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। তার বাবা সংবাদপত্রে তার নাম দেখে খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী প্রশ্নটি যা তার মনে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা হল— তাঁর ভবিষ্যৎ কী?

শ্রুতির চোখ ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দিকে, কিন্তু হাঁটুর আঘাত তাঁর স্বপ্নকে থামিয়ে দেয়। তিনি আবার তাঁর পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন উপায়ে স্কেটবোর্ডিংয়ের প্রতি তাঁর আবেগকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

২০২3 সালে, ক্রান্তিনারী একটি ম্যাগাজিনে শ্রুতির উপর একটি ফিচার দেখেন এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর শ্রুতিকে ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এ যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানান।

‘আমি একজন দক্ষ স্কেটবোর্ডার ছিলাম, কিন্তু আমাকে নিয়ে খুব বেশি হইচই হয়নি। অবশ্য, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এ যোগ দেওয়ার পর মানুষ আমার সম্পর্কে জানতে পেরেছেন’, জানান শ্রুতি। তাঁর বেশিরভাগ বন্ধুত্ব ছিল ছেলেদের সঙ্গে, যাঁদের সঙ্গে তিনি স্কেটবোর্ডিং করতেন। কিন্তু ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এ যোগ দেওয়ার পর, তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘এখন আমার অনেক মেয়ে বন্ধু আছে।’

এখন এই দলটি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্রান্তিনারী গ্রামীণ ভারতে ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’ মডেল প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। এই লক্ষ্যে তিনি ‘সাউন্ড অফ উইমেন’ নামে একটি লোকসংগীত উদ্যোগ চালু করেছেন, যার লক্ষ্য স্থানীয় নারী-নেতৃত্বাধীন দল তৈরি করা। এখনও পর্যন্ত এটি উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যের কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেছে। এইভাবে, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সম্মিলিত স্বপ্নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’।

জে কুইন জানিয়েছেন, ‘আমরা যখনই আড্ডা দিই, তখন আমাদের আলোচনার বিষয় সর্বদা সংগীতকে ঘিরেই থাকে এবং আমরা দুর্দান্ত আনন্দ উপভোগ করি।”

#প্রীতি আবেগের সঙ্গে জানান, ‘মাঝে মাঝে আমি কেবল আমাদের দলের সদস্যদের কথা শুনি এবং ভিতর থেকে খুব সুখানুভূতি হয় যে, আমিও এই দলের একজন সদস্য। এরপর অবশ্য আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিই যে, এটা একসময় স্বপ্ন ছিল এবং এখন এটা বাস্তব। তাই, আর ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই।’

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...