মেঘের দেশে! সত্যি মেঘের দেশই বটে। জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই মেঘ, গাছের মাথায় মেঘ, পাতার ফাঁকে ফাঁকে মেঘ, আবার হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়েছি! না না, তাই বলে আমি কিন্তু মেঘের মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছি না বা ভেসে বেড়াচ্ছি না। আমার পায়ের তলায় একেবারে শক্ত মাটি, পিচের রাস্তা। চারিদিকে কেবল মেঘের ভেলা।

আমাদের গন্তব্য কেরালা রাজ্যের ছোটো শৈল শহর মুন্নার। একেবারে উত্তর ভারত থেকে উড়ে এসে পৌঁছালাম দক্ষিণে দেশের প্রায় শেষ বিন্দু। দিল্লি থেকে কোচিন শহর সুদীর্ঘ এই পথ উড়োজাহাজে এলাম সাড়ে তিন ঘণ্টায়। অবাক হয়ে ভাবলাম কত রাজ্যের উপরের আকাশটা আমি ছুঁয়ে এলাম! এটিও একটি অনুভব করার মতো বিষয়।

মুন্নারের বিষয়ে অনেক পড়াশোনা করেছি। তাই আর দেরি নয়, চলো মুন্নার। বেরিয়ে পড়লাম। তিনটি নদীর মিলনস্থল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপচে পড়েছে এই শৈল শহরে। তাই তাকে দেখতেই হবে, জানতেই হবে।

সকাল সাতটায় কোচিন এয়ারপোর্ট থেকে রওনা হলাম মুন্নারের পথে। অচেনা জায়গা, তাই প্যাকেজ ট্যুর নেওয়া হয়েছিল। সেইমতো এয়ারপোর্টে গাড়ি দাঁড়িয়েই ছিল, পটাপট সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। এবার চল রে চল রে চল, মুন্নারে চল।

গাড়িতে উঠে কিছুটা পথ অতিক্রম করতে না করতেই ভীষণ সমস্যার সম্মুখীন হলাম। সে কী! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার! এবার তবে কী হবে উপায়! আমাদের ড্রাইভার ভাই মালয়ালি, অর্থাৎ আমরা কেউ কারও ভাষা বুঝতে পারছি না। উপায় এখন একটাই— কোনওরকমে হাত-পা-মুখ-চোখ নেড়ে, হিন্দি, ইংরেজি ভাষা মিলিয়ে কাজ চালাতে হল। বাহ, কেমন একটা অদ্ভুত নতুন ভাষা তৈরি হল আর সেই ভাষাতেই আমরা বেশ কয়েকটি দিন কাটিয়ে দিলাম বিন্দাস।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর কোচিন শহর ছেড়ে এবার পাহাড়ে চড়বার পালা। আমাদের দেহমন তখন কেবল মুন্নার-কে চায়। ঝকঝকে পাহাড়ি পথ, কিন্তু উঁচু-নিচু এবং সর্পিল। দু-পাশেই সবুজ বনানী। কত রকমের যে গাছ! মাঝেমধ্যে নানা মশলার বাগান, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায় ফল, তেজপাতা। বাগানে ঢুঁ মারলাম।

সত্যি এত রকমের গাছও আছে! চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা চলছি। যেতে যেতে একটি জায়গায় এসে ড্রাইভার ইঞ্জিন বন্ধ করল। আরও কিছু গাড়ি দাঁড়ানো, রাস্তার দুই ধারে বেশ ভিড়, কী হল! কী হল!

আমাদের ড্রাইভার ভাই হাতের ইশারায় দেখাল। বাহ দারুণ! চোখ একেবারে চকচক করে উঠল, জলপ্রপাত (chheyappara falls)! দুধের মতো সাদা জল অনবরত বয়ে চলেছে। শুরুতেই মন ভরে গেল। ওখানে রয়েছে কিছু চায়ের দোকান, চকোলেট- কেকের দোকান এবং তেলেভাজার দোকান। না, আমরা কিছু খেলাম না। কারণ পাহাড়ে চড়বার আগেই আমাদের প্যাকেজ ট্যুর থেকে স্পেশাল কেরালা খালি খাওয়া হয়ে গেছে। বহু বছর পর কলাপাতায় খেলাম। ছোটো ছোটো বাটিতে বহু পদ, লালচে ভাত, রুটি। সকলেরই পেট বোঝাই।

পনেরো মিনিটের পথ পাড়ি দেওয়ার পরই চোখে পড়ল আরও একটি জলপ্রপাত, ভালারা ফলস। এটি কিন্তু রাস্তার ধারে নয়, উলটো দিকের পাহাড়ের গায়ে, বহুদূর। দূর থেকে দুধ-সাদা ঝরনাধারা দেখে মুগ্ধ হলাম। এমনই কয়েকটি ঝরনাধারা বহু দূরে দূরে নজরে পড়ল। একেবারে ওপর থেকে নীচে পর্যন্ত পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে সরু সুতোর মতো।

এখনও অনেকটা পথ বাকি। দুই দিকের দৃশ্য দেখতে দেখতে খেয়াল করিনি কখন আমাদের মাথার উপর মেঘ খেলা শুরু করেছে। পাহাড়ি ছোটো ছোটো নদীর উপর কিছু পুরোনো ব্রিজ পেরিয়ে ৬ ঘণ্টা পর আমরা এসে পৌঁছালাম মুন্নার শহরে, ইদ্দুকি ডিস্ট্রিক্ট। তখন বিকেল প্রায় চারটে। শুরু হল বৃষ্টি। আমাদের থাকবার রিসর্ট ছিল একেবারে হিল টপে। তাই চারটের পর বেরোনো বন্ধ। আমাদের তো বেরোনোর ইচ্ছে। ড্রাইভারকে একটু ইঙ্গিত দিতেই ‘ডেঞ্জার ডেঞ্জার’ বলে চেঁচিয়ে উঠল, মানা করে দিল। এবার কেবল বিশ্রাম আর রিসর্ট-এর ভিতর এনজয় করা।

সকাল দশটা। তেমন তাড়াহুড়ো নেই, তাই ব্রেকফাস্ট সেরে বেরোলাম। প্রথম স্পট টি প্লান্টেশন অর্থাৎ চা বাগান। পথে দেখলাম বিরাট বেলুন আকাশ জুড়ে। প্ল্যান করে নিলাম আগামীকাল আমরাও বেলুনে চড়ে উপর থেকে মুন্নার শহরটি দেখব। এই মুহূর্তে আমাদের সবটুকু আগ্রহ চা বাগানের দিকে, চা বাগানের জন্যই মুন্নার বিখ্যাত।

মুন্নার শহর ছাড়তেই চা বাগান, মাইলের পর মাইল জুড়ে। অপূর্ব দৃশ্য! বাগান ছাড়িয়ে ওই দিগন্তে লাল, হলুদ, নীল বাড়ি। তার উপর হালকা মেঘ। দারুণ! দারুণ! যেন হাতে আঁকা রঙিন ছবি! পথের দুই ধারে দোকানে পর্যটকদের ভিড়। ফটো পয়েন্ট। এখান থেকেই প্রাকৃতিক দৃশ্য অনবদ্য। সবাই ছবি তোলায় মত্ত। ঘুরে ঘুরে কেবল চা বাগান আর চা বাগান। চা বাগান সবসময়ই সুন্দর। তবে এখানে যেন একটু বেশিই তার যৌবন উপচে পড়ছে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...