এবার পৌঁছালাম টি মিউজিয়াম। টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। আসলে এখানে চা বাগানের ইতিবৃত্ত নিয়ে তথ্যচিত্র দেখানো হয়। জানলাম চা বাগানের ইতিহাস। এরপর শোরুম থেকে বেশ কয়েক প্রকার চা-পাতা কিনে বাইরে বেরিয়ে পাশের চা বাগানের দিকে পা বাড়ালাম।
কিন্তু আমাদের ভাগ্যদেবী আজ বিরূপ! ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি শুরু হল। ড্রাইভার তৈরিই ছিল, দেরি না করে সবাই গাড়িতে বসলাম। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গাড়ি ছুটল পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে।
আমাদের পরবর্তী স্পট— স্যাংচুয়ারি। এবারে ঠান্ডা আরও জাঁকিয়ে বসল। স্যাংচুয়ারিতে ঢোকার মুখে বিরাট খিলান। ওই তো লেখা, National Park। মন বড্ড খারাপ হয়ে গেল। মুষলধারে বৃষ্টি। এত বৃষ্টি এখানে, এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কি আর ঘোরা সম্ভব ! না আছে ছাতা আর না আছে রেইনকোট! হঠাৎ আমাদের উৎসাহ একেবারে তলানিতে। ভাগ্যদেবীর ঠিক নজরে পড়েছে আমাদের কান্না কান্না মুখগুলো।

হঠাৎ দেখি বৃষ্টির মধ্যে ক’জন আমাদের গাড়ি ঘিরে ধরল। তাদের হাতে সিগারেটের প্যাকেটের মতো রঙিন প্যাকেট। কী এগুলো? কিছু খাবার? আমরা যে এখানের ভাষা বুঝি না। ড্রাইভার ভাই ইশারা ইঙ্গিতে আমাদের নিতে বলল, বুঝলাম রেইনকোট। কিন্তু এত ছোটো প্যাকেট! তবু পটাপট নিয়ে নিলাম। বলতে দ্বিধা নেই, ব্র্যান্ডেড রেইনকোর্ট দেখেছি, কিন্তু ন্যূনতম মূল্যের এই বর্ষাতি সত্যি হ্যাটস অফ। একটা জামার মতো মাথা দিয়ে গলিয়ে নাও, কোনও বোতামের ব্যাপার নেই। একেবারে নিশ্চিত, একফোঁটা বৃষ্টির জল ঢোকার সম্ভাবনা নেই।
যাক, ধাতস্থ হয়ে এবার টিকিট কাটার পালা। স্যাংচুয়ারিতে কোনও প্রাইভেট ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউ নয়। টিকিট কেটে বিশেষ সরকারি বাসে যেতে হবে। একের পর এক বাস আসছে, পর্যটকদের নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমরাও লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে একটি বাসে চেপে বসলাম।
প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উপরে যেতে হবে। চা বাগানের অপূর্ব দৃশ্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম ধীরে ধীরে। উপর থেকে নীচে সর্পিল কালো চকচকে রাস্তা। সেই রাস্তা কখনও চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে আবার কখনও স্পষ্ট হচ্ছে আবার মেঘ দিয়ে ঢেকে যাচ্ছে— এ যেন রোদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা। পাঁচ কিলোমিটার কেবল চা বাগান, মৌমাছির চাকের মতো। অপূর্ব অপূর্ব! চারিদিকে কেবল সবুজ আর সবুজ। মিনিট কুড়ি পরেই পৌঁছে গেলাম।

বাস থেকে নেমেই এবার পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার পালা। ইরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্ক (Eravikulam National Park)। এই স্যাংচুয়ারি তেমন উঁচু নয়, মোটামুটি রাস্তাগুলো সমতলের মতোই। বাস থেকে নেমেই হাঁটতে শুরু করলাম। ঝিরঝির বৃষ্টি হয়েই চলেছে। নীচে উপত্যকার অদ্ভুত সৌন্দর্যে সবাই অভিভূত। উপর থেকে কেবল সবুজ চা বাগান। ক্যামেরা তাক করতেই আবার সকলের হা-হুতাশ, যাহ তোলা গেল না। আবার নীচটা মেঘে ঢেকে গেল অর্থাৎ আমরা মেঘেরও উপরে দাঁড়িয়ে আছি। নীল, গোলাপি, হলুদ বর্ষাতিপরা মানুষগুলো মেঘে ঢাকা ধূসর পাহাড়ে রং ছড়িয়ে দিল। ভারি সুন্দর লাগছে দেখতে। মানুষগুলোকে যেন এক একটি রংবেরঙের পুতুলের মতো মনে হচ্ছে। অনেক সময় হরিণ, নানা রঙের পাখি চোখে পড়ে, কিন্তু আজ বৃষ্টিতে ওদের সঙ্গে আমাদের দেখা হল না।
আমরা কেবল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হেঁটেই চললাম। তবুও বেশ লাগল রিমঝিম বৃষ্টিতে পাহাড় ভ্রমণ। অনেকটা উপরে পৌঁছে এবার আবার ধীরে ধীরে নেমে এলাম। পার্কে ঢোকার মুখেই বিশাল ক্যাফেটেরিয়া। যখন বেরোচ্ছি সেই ক্যাফেটেরিয়াতে গরম কফি, সঙ্গে তেলেভাজা গরম গরম। খাওয়া শেষ করে আবার লাইনে এসে দাঁড়ালাম বাস ধরার জন্য।
এবার আমাদের স্পট Matupuetty লেক। এই লেকের উপর বিশাল ব্রিজ। বিখ্যাত এই ব্রিজটির উপর বহু হিন্দি সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে। তবে চেন্নাই এক্সপ্রেস বিশেষ ভাবে পরিচিত নাম। চওড়া ব্রিজের দুই দিকে মোটা লোহার নেট দিয়ে আটকানো। ব্রিজ পেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরে গেলেই বোটিং-এর জায়গা। লেকের জলে যতক্ষণ ইচ্ছে ভেসে বেড়াও। টিকিট নিলাম, লেকের জলে ভাসলাম কিছুক্ষণ। আহা এমন শান্তির পরিবেশ! চারদিকে সবুজ পাহাড়, মাঝে নীল সবুজে সাগর সমান লেক। শান্ত, ঢেউ নেই।
বোট থেকে নেমে ব্রিজের উপরেই অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। লেকের রূপ-সাগরে ডুব দিয়ে বুঁদ হয়ে রইলাম। ইচ্ছে ছিল ফেরার পথে বেলুন চড়ে মুন্নার শহরটি উপর থেকে দেখব। সেই ইচ্ছের গুড়ে বালি পড়ল, কারণ বৃষ্টি। লেকটি মুন্নার শহর থেকে প্রায় তেরো কিলোমিটার দূরে। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জল ঠিক ভেরোনিজ গ্রিন, ইম্পেরিয়াল গ্রিন। সবুজ পর্বতমালা (পশ্চিম ঘাট) দিয়ে ঘেরা। চারিদিকের দৃশ্যপট দেখে মনে হয় এই বুঝি স্বর্গ।
লেক থেকে ফেরার পরেও হাতে কিছু সময় ছিল। তবে খোলা আকাশের নীচে আর ঘোরা সম্ভব নয়। তাই পৌঁছালাম অডিটোরিয়াম-এ। টিভির পর্দায় বহুবার কথাকলি নৃত্য দেখেছি। এইবারে অডিটোরিয়ামে বসে দেখলাম। তবে চড়া দামে টিকিট কাটতে হয়েছিল। অবশ্য মন একেবারে ভরে গেল। এর স্বাদই আলাদা। না এলে সত্যিই আমরা এমন সুন্দর নৃত্য পরিবেশনা মিস করতাম। পুরো সন্ধে কথাকলি নৃত্যে ডুবে রইলাম। মনে হল, যদি সারা রাত চলত, তাহলে ক্লান্তি আমাদের ছুঁতে পারত না। কিন্তু শো সন্ধে সাতটার পর বন্ধ হয়ে গেল। তাই অগত্যা রিসর্টমুখী। পর্যটকদের জন্য এই বিশেষ শো-টি রাখা।
পরদিন সকাল ন’টায় গোছগাছ করে তৈরি। কিন্তু হঠাৎ মাথার উপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! বৃষ্টির তোড়ে তখন বুকের ভিতর টিপ টিপ। এই দুর্যোগে পাহাড়িপথে বেরোনো কি উচিত হবে! কত কী দুর্ঘটনা তো খবরে দেখতে পাই। তবু মনের জোরে বেরিয়ে পড়লাম।
সবুজ চা বাগান আর সবুজ দিগন্ত ! মুন্নার যেন অবগুণ্ঠনবতি এক সুন্দরী, তাই তার রূপের টানে পর্যটকরা ছুটে যায়। আমিও তার রূপ সাগরে ডুব মেরে মুগ্ধ হয়েছি। সেই ভালোলাগার রেশটুকু রয়ে যায়। সবুজ আর নীলের মেলবন্ধন এই মুন্নার। মুন্নারকে দক্ষিণের কাশ্মীরও বলা হয়।
কখনও ঝুপঝাপ, আবার কখনও মুষলধারা বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় কিংবা গায়ে বর্ষাতি নিয়ে পায়ে হেঁটে আবার কখনও গাড়িতে মুন্নার পাহাড়ের আঁকাবাঁকা জঙ্গলাকীর্ণ অলিগলি, কখনও রাজপথ ঘুরে বেড়ানো সত্যি নতুন এক অভিজ্ঞতা, নতুন এক চমক, অদ্ভুত এক ভালোলাগা।
(সমাপ্ত)





