সন্ধের আলো গড়িয়ে পড়েছে রাস্তায়। একে একে পথের দুধারের দোকানগুলোর সাইনবোর্ডে নিয়ন জ্বলতে শুরু করেছে। পথচলতি মানুষজনের পায়ে পায়ে শুধুই ঘরে ফেরার তাড়া। কিন্তু এই এলাকায় পা পড়তেই কিছু পুরুষ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ চলে যায় কিছু চোখের ইশারায়। সন্ধ্যাবাতির মতো তারাও যেন নিজেদের জ্বেলে রাখে। আর সেই আলোর ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ে ঘরফেরত পুরুষের অস্তিত্বে। মন উচাটন হয়।
—কিরে অনুরাধা, তুই এখনও ঘরে আলো জ্বালিসনি? সাড়ে সাতটা বাজতে চলল।
—নারে শীলা, আমার মনটা একদম ভালো নেই রে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না।
—কিন্তু এইভাবে তুই কতদিন মনমরা হয়ে পড়ে থাকবি? সেনবাবু তো আর ফিরে আসবে না। মানুষটার চলে যাওয়ার ছিল, চলে গেছে।
—সবই বুঝি রে, কিন্তু তাঁকে তো ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারছি না।
—শোন, আমি বলি কী, ক’দিন কাছাকাছি কোনও রিসর্ট-এ কাটিয়ে আয়। দেখবি কিছুটা হালকা লাগবে।
—হ্যাঁ, সেইরকমই ভেবেছি। কিন্তু তার আগে একদিন সেনবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আসতে হবে। ছোট্ট একটা দরকার আছে।
—ঠিক আছে, সে নয় একদিন যাবি। এখন উঠে একটু ফ্রেশ হয়ে নে। দেখিস ভালো লাগবে।
শীলা চলে যেতেই অনুরাধা উঠে বসে। টের পায় এরই মধ্যে পাশাপাশি কিছু ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারে একটা ঘোর বিষাদ যেন ছেয়ে আছে তার শিরায় শিরায়।
ক’দিন ধরেই আকাশজুড়ে মেঘ, বৃষ্টি আর রোদের বেশ একটা খেলা চলছিল। সবে রোদ এসে দাঁড়িয়েছে, ও মা, কোত্থেকে একরাশ মেঘ হামলে পড়ল রোদের উপর। রোদ গেল হারিয়ে। তারপর সেই কালো মেঘকে হঠাৎ করেই ভিজিয়ে দিল বৃষ্টি। ঝরে পড়ল কার্নিশে, ছাদে, রাস্তায়, টেলিফোনের তারে। মানুষকেও বাদ দিল না। ছাতা, রেইনকোটের পাশ কাটিয়ে জড়িয়ে ধরল সবাইকে। সব ভিজে একেবারে একশা। এইরকম পাগলাটে আবহাওয়া আজ আর নেই। অনেকদিন পর খোলামেলা ঝলমলে আকাশ। আবহাওয়া অফিসও পরিষ্কার জানিয়েছে নিম্নচাপ সরে গেছে। আর সন্ধের দিকে বৃষ্টি নাও হতে পারে। আজ মেয়েটার কিছু জিনিস কিনতে একবার বেরোতে হবে মনে মনে ভাবল সুমনা। ঘরেরও কিছু টুকটাক কেনার আছে।
দু-দুবার কলিং বেল বেজেছে। খেয়াল করেনি সুমনা। তৃতীয়বার ভুল হয়নি। আইহোলে চোখ রেখে দরজা খুলে দেয়। দরজার ওপাশে বেশ মার্জিত পোশাকের এক মহিলা। লম্বা আঁচলের কটকি শাড়ি আর হাতে কানে গলায় বাঁকুড়ার পোড়ামাটির অলংকার। চেহারায় রুচির ছাপের সঙ্গে একটা মাদকতাও জড়িয়ে আছে।
—আপনি? আপনাকে তো চিনলাম না। আগন্তুকের পরিচয় জানতে চায় সুমনা।
—না চেনারই কথা। আমি অনুরাধা। অনুরাধা মিত্র। নমস্কারের ভঙ্গিতে সুমনার প্রশ্নের জবাব দেয় আগন্তুক।
—হ্যাঁ আসুন। ভিতরে আসুন। প্রতিনমস্কার জানায় সুমনা।
—আমি নিজের কিছু কথা বলা ছাড়াও, একটা প্রয়োজনীয় জিনিস আপনাকে দিতে এসেছি।
—আমাকে প্রয়োজনীয় কী জিনিস দিতে এসেছেন? আপনার কাছে তো আমার কিছু ছিল না।
—আপনার স্বামী মানব সেন আর আমি দু’জনে একে অপরের খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। উনিই আমার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার তাগিদে আপনার থেকে ছিনিয়ে আমাকে দিয়েছিলেন। হয়তো আপনি তা জানেন না। আপনাকে উনি কিছু বলেননি।
সুমনা বুঝতে পারে এই অনুরাধা মিত্রের সঙ্গেই মানবের একটা অবৈধ সম্পর্ক ছিল। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে এটা নিয়ে কোনও কাটাছেঁড়া করেনি সে।
—আপনার সঙ্গে আমার স্বামীর এই বন্ধুত্বের কথা আমি জানতাম। কিন্তু এই নিয়ে কোনওদিন অশান্তি করিনি। মাঝে মাঝেই অফিসের দোহাই দিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরতেন। তারপর শুধু এক কাপ কফি খেয়ে শুয়ে পড়তেন। বুঝতাম ডিনার সেরেই এসেছেন। জানেন, প্রায়ই একটা পারফিউমের গন্ধ পেতাম ওর জামায়। যে গন্ধটা…
—হ্যাঁ, এই একটা পারফিউমই আমি ব্যবহার করি। আজও করেছি। তাই গন্ধটা পাচ্ছেন। জানেন, আমি কখনও আপনার স্বামীকে নিজের করে নিতে চাইনি। একজন পুরুষের নির্দয় আচরণে কোনও ঘর ভেঙে গেলে যে কী নিদারুণ অবস্থা হয়, আমার মাকে দেখে বুঝেছিলাম। কিন্তু মানব সেনের রুচিবোধ আর এক আলাদা ব্যক্তিত্বের প্রতি কেমন যেন ঝুঁকে পড়লাম। তাঁর মার্জিত ব্যবহারও এই আকর্ষণের অন্য কারণ হতে পারে। তবুও জোর দিয়েই বলছি, আমরা দু’জনে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে বিশ্বাস করতাম।
—তাই হয়তো আমাদের বিবাহিত জীবনে এই পরকীয়া প্রেমের বড়ো রকমের প্রভাব পড়েনি। তাছাড়া ঝুম, আমার মেয়ের জন্য আমি কোনওরকম অশান্তিতে যাইনি। আর মেয়েও তার বাবার ছায়া থেকে দূরে সরে যায়নি।
—আমাকে তো সবসময় ঝুমের কথা বলত। ওই ঝুমের জন্যই নাকি আপনার সঙ্গে সম্পর্কটা টিকিয়ে রেখেছে।
—বেশ মনে আছে, একবার আমার স্বামীর দিন চারেকের জন্য অফিসের কাজে ট্যুরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু…
—অফিসের নয়, ট্যুর ছিল আমার সঙ্গে। কিন্তু যেতে পারেননি, ওই ঝুমের জন্য। আর আমিও ওই ঝুমের কথা ভেবেই আপনার স্বামীর দেওয়া এই জিনিসটা ফিরিয়ে দিতে এসেছি।
সুমনা কিছুতেই বুঝতে পারে না, অনুরাধা তাকে কী ফিরিয়ে দিতে চায়। কিছুই মনে করতে পারে না।
—এই নিন। সুমনা কাগজটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যায়।
—আরে, এ তো ব্যাংক-এর ফিক্সড ডিপোজিটের কাগজ। আমায় কেন দিচ্ছেন? কৌতূহল জাগে সুমনার।
—এই জিনিসটা আমার সুরক্ষার কথা ভেবে আপনার স্বামী আমাকে দিয়েছিলেন। পাঁচ লাখ টাকার সুরক্ষাবলয়। আমি ভেবে দেখলাম, এই সুরক্ষা এখন ঝুমের বেশি প্রয়োজন। বাবার অভাবে ওর যেন ভবিষ্যতের পথে কোনও বাধা না আসে।
অনুরাধার কথায় সুমনার দুচোখ ভিজতে শুরু করে। মনে মনে ভাবতে থাকে, একজন নারীর শরীর যতই অপবিত্র হোক, তার মননকে এতটুকু কলুষিত করতে পারেনি। শরীরের মলিনতাকে ছাপিয়ে গেছে তার অমলিন হৃদয়সত্তা।
—কী ভাবছেন সুমনা? কিন্তু এবার আমি যে একটা জিনিস চাইব। দেবেন? অনুরাধার গলায় মিনতির সুর।
—আজ আর কাউকে কিছু দেওয়ার মতো সামর্থ্য যে আমার নেই। তবু আপনাকে নিরাশ করব না৷
—আপনার স্বামীর একটা ছবি। যা দেখে আমি আমার দিনযাপনের ক্লান্তি অবসাদ ভুলে থাকতে চাই। আমার শেষ আশ্রয়টুকু পেতে চাই।
সুমনার মনে হল, অনুরাধার শেষ কথাগুলো বলার সময় স্বরটা যেন কেঁপে উঠল।





